১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করা হয়। ভয়াবহ সেই দিনটির কথা উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে। জবানবন্দি থেকে পাওয়া যায় সেদিনের ভয়াবহতার চিত্র। জানা যায় ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ৩২ নম্বরের বাড়িটির ভেতরে-বাইরে। সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে চ্যানেল আই অনলাইনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।
এই মামলার তিন নম্বর সাক্ষী সেলিম (আবদুল) আদালতকে জানান, তিনি বঙ্গভবনে মশালচি হিসেবে চাকরি করছিলেন। ১৯৭২ সাল থেকে এই চাকরি করছিলেন তিনি। ১৯৬৭ সালে ধানমন্ডির ৩২ নং রোডের বঙ্গবন্ধুর ৬৭৭নং বাড়িতে কাজ শুরু করেন। চাকরি হওয়ার পরও তিনি এবং আবদুর রহমান (রমা) বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দোতলায় থাকতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে তিনি ও রমা দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে ঘুমিয়েছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধু খুব জোরে দরজা খুললে তার ও রমার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখেন বঙ্গবন্ধু গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরা অবস্থায় নিচের দিকে যাচ্ছেন।
বঙ্গবন্ধু নিচে নামার পর বেগম মুজিব তাকে বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবি ও চশমা দিয়ে নিচে পাঠান। তখন বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘আমার এবং আমার বোনের বাসা আক্রমণ করেছে। রাজারবাগ ফোন কর।’ এসময় বাইরের দিকে থেকে এক ঝাক গুলি ভিতরে আসে। বঙ্গবন্ধু তখন কোথাও টেলিফোন লাইন না পেয়ে দোতলায় চলে যান। সেলিমও পেছন পেছনে যান। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় তিনি শেখ কামালকে তিন তলা থেকে নিচে নামতে দেখেন। বঙ্গবন্ধু নিজের বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন।
তারপর দক্ষিণ দিক থেকে গুলির শব্দ শোনেন সেলিম। তিনি দৌড়ে গিয়ে জামালের রুম থেকে দেখেন, কয়েকজন কালো পোশাকধারী লোক গুলি করতে করতে বাড়ির ভেতরে ঢুকছে। গুলির ভয়ে তিনি জামালের বাথরুমে ঢুকে বসে থাকেন। তখন তারা জোরে জোরে বলছে ‘যে যেখানে আছো সারেন্ডার করো।’ তিনি সিঁড়ির দিকে উঁকি দিয়ে দেখেন কালো পোশাকধারী ২ জন লোক সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ওই ২ জন কাছাকাছি এলে তিনি কিছুটা সাহস পান কারণ তারা দুস্কৃতিকারীদের খবর পেয়েই এসেছে বলে তার মনে হয়। এই মনে করে উঠতে গেলেই তারা তাকে গুলি করে। গুলি তার হাতে, পেটে লাগে। গুলি খেয়ে সামনের দিকে পড়ে যান তিনি।
পরে সিঁড়ির পাশে হেলান দিয়ে বসে থাকা অবস্থাতেই সেলিম দেখেন, ৪/৫ জন আর্মির লোক বঙ্গবন্ধুকে তার রুম থেকে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যাবার সময় বঙ্গবন্ধু তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে বলেন, ছেলেটা ছোটবেলা থেকে আমাদের এখানে থাকে, একে কেন গুলি করলি? এরপর তিনি বললেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি কি বলবি, বেয়াদবি করিস কেন?’ এর কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ির দিকে গুলির ও চিৎকারের শব্দ শোনেন। একটু পরে দেখেন, বেগম মুজিব, রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে আর্মিরা নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ির কাছে গিয়েই বেগম মুজিব চিৎকার করে উঠে ‘আমি এদিকে যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’ তারপর শেখ নাসের, শেখ রাসেল ও রমাকে নিচের দিকে এবং বেগম মুজিবকে বেডরুমের দিকে নিয়া যায়। এরপরই বেডরুম থেকে গুলির শব্দ ও চিৎকারের শব্দ শোনেন সেলিম। কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর আদালতকে তিনি জানান, একজন আর্মি বলল তোমার গুলি লেগেছে? আমি বলি হ্যাঁ, লেগেছে। আর্মির লোক বলল- তুমি হেঁটে নিচে যেতে পারবা? আমি বললাম, পারব। সিঁড়ি দিয়ে নিচে যাওয়ার সময় দেখে সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে আছে। নিচে বারান্দা দিয়ে গেটের দিকে নেওয়ার সময় শেখ কামালের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তারপর তাকে লাইনে নিয়ে বসায়। সেখানেও একজন সিকিউরিটির লোকের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন সেলিম। লাইনে ডিএসপি নূরুল ইসলাম, মুহিতুল ইসলাম, রমা, শেখ রাসেলকে দেখেন তিনি। শেখ রাসেল মুহিতুল ইসলামের পাশে দাঁড়ানো ছিল। একটু পরই একটা ট্যাংক এবং একটা জিপ আসে। ট্যাংক থেকে আর্মিরা নেমে অন্য আর্মিদের সাথে ইংরেজি ও বাংলায় কি যেন কথাবার্তা বলে।
তখন শেখ রাসেলকে লাইনে দেখে একজন আর্মি অফিসার ইশারা করলে অন্য একজন শেখ রাসেলকে দোতলায় নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই দোতলা থেকে গুলির শব্দ ও চিৎকার শোনেন। তারপর ট্যাংকের পিছনে আসা জিপে করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে যাওয়ার পর শেখ সেলিম ও শেখ মারুফের সাথে তার দেখা হয়। তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সবাইকে মেরে ফেলার খবর দেন সেলিম। তিনি ১ মাস ৩ দিন হাসপাতালে ছিলেন।
৪নং সাক্ষী হাবিলদার কুদ্দুস
প্রসিকিউশনের ৪নং সাক্ষী হাবিলদার কুদ্দুস বলেন, কুমিল্লা ১ ফিল্ড আর্টিলারি থেকে ঢাকায় গণভবনে এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে নিরাপত্তা ডিউটির জন্য ক্যাপ্টেন আবুল বাশারের নেতৃত্বে তাদের ১০৫ জনের একটি কোম্পানিকে ঢাকায় বদলি করা হয়। ১৯৭৫ সালের প্রথম দিকে তাদের ১ ফিল্ড আর্টিলারি থেকে মেজর ডালিম চাকরিচ্যুত হন। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাও তাদের ১ ফিল্ড আর্টিলারির অফিসার ছিল। পরে ঢাকায় বদলি হয়। তারা ২৫ জন ধানমন্ডি ৩২ নং রোডে বঙ্গবন্ধুর ৬৭৭ নং বাসভবনে দুই দলে পালাক্রমে নিরাপত্তা ডিউটি করতেন। ডিউটির পর তারা ধানমন্ডি ৩১নং রোডের একটি বাড়িতে থাকতেন। তিনি একটি দলের গার্ড কমান্ডার ছিলেন।

১৯৭৫ সনের ১৪ আগস্ট ভোর ৬টায় তার দল ডিউটি শেষ করে পরবর্তী দলের গার্ড কমান্ডার হাবিলদার গনিকে ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে ৩১ নং রোডে চলে যায়। ১৫ আগস্ট ভোর পৌনে ৫টায় ৩১ নং রোডের বাড়ি থেকে তার গার্ড দলকে নিয়ে বের হলে গেটের সামনে তাদের রেজিমেন্টের সুবেদার মেজর আবদুল ওহাব জোয়ারদারকে জিপ থেকে নামতে দেখেন তিনি। তাদের মাসিক বেতন এনেছে বলে জোয়ারদার জানায়। এরপর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে বিউগলের সুরে সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে থাকেন কুদ্দুস ও তার দল।
এসময় দক্ষিণে লেকের দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে লাগাতার গুলি আসতে থাকে। তখন তার গার্ড দলসহ দেওয়ালে লাইন পজিশনে যান। গুলি বন্ধ হওয়ার পর পাল্টা গুলি করার জন্য আগের গার্ড কমান্ডারের কাছে গুলি খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। তখন কালো ও খাকী পোশাকধারী সৈনিকরা ‘হ্যান্ডস আপ হ্যান্ডস আপ’ বলতে বলতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ঢুকে পড়ে। ক্যাপ্টেন হুদা, মেজর নূর ও মেজর মুহিউদ্দিন (ল্যান্সার) কে গেটে দেখেন কুদ্দুস। বাসভবনের বারান্দায় শেখ কামালকে দেখেই ক্যাপ্টেন হুদা হাতের স্টেনগান দিয়ে গুলি করে। শেখ কামালের পরিচয় দিলে ক্যাপ্টেন হুদা আবার তাকে গুলি করে হত্যা করে।
এরপর ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর, পুলিশ ও কাজের লোকদের গেটের সামনে লাইনে দাঁড় করায়। মেজর মুহিউদ্দিন তার ল্যান্সারের ফোর্স নিয়ে গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দোতলার দিকে যায়। পরে ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর কয়েকজন ফোর্স নিয়ে দোতলার দিকে যায়। যাবার সময় তাদেরও পেছন পেছন যেতে হুকুম দেয়।
এরপর তিনি জানান, ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর সিঁড়ির চৌকির উপরে গেলে মেজর মুহিউদ্দিন ও তার ফোর্সকে বঙ্গবন্ধুকে নিচের দিকে নামিয়ে আনতে দেখে। তখন মেজর নূর ইংরেজিতে কিছু বললে মেজর মুহিউদ্দিন তার ফোর্সসহ একপাশে চলে যায়। এই সময় বঙ্গবন্ধু বলেন ‘তোরা কি চাস’। ক্যাপ্টেন হুদা এবং মেজর নূর হাতের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। সাথে সাথে তিনি সিঁড়ির মধ্যে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। কিছুক্ষণ পর মেজর আজিজ পাশা, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন এবং ল্যান্সার ও আর্টিলারির ফোর্স গেটের সামনে আসে। মেজর আজিজ পাশা তার ফোর্স নিয়ে বাড়ির দোতলার দিকে যায়। তিনিও পেছনে পেছনে গিয়ে দোতলায় সুবেদার মেজর আবদুল ওহাব জোয়ারদারকে দেখেন। মেজর আজিজ পাশা তার ফোর্স নিয়ে দোতলায় গেলে বেগম মুজিব রুমের ভেতরে থাকা লোকদের না মারার জন্য আকুতি মিনতি করেন। কিন্তু তার কথা না শুনে একদল ফোর্স বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও বাড়ির একজন চাকরকে রুম থেকে বের করে আনে। বেগম মুজিব সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তখন বেগম মুজিবকে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর বেড রুমে নিয়ে যায় এবং শেখ নাসের, শেখ রাসেল ও বাড়ির এক ভৃত্যকে নিচে নিয়ে যায়। তারপর মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন হাতে থাকা স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে থাকা বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ জামালের স্ত্রী ও শেখ কামালের স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে নিচে চলে যায়। তিনিও তাদের পেছনে পেছনে এসে রিসিপশনের বাথরুমের মধ্যে গুলিবিদ্ধ শেখ নাসেরের লাশ দেখেন। গেটের সামনে সাদা পোশাক পরা একজন পুলিশের লাশও দেখেন। তারপর মেজর আজিজ পাশা গেটের বাইরে এসে ওয়ারলেসে কথাবার্তা বলে।
ঠিক ওই সময়ে শেখ রাসেল মায়ের কাছে যাবে বলে কান্নাকাটি করছিল। মেজর আজিজ পাশা ল্যান্সারের একজন হাবিলদারকে হুকুম দেন ‘শেখ রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাও’। ওই হাবিলদার শেখ রাসেলকে তার হাত ধরে দোতলায় নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর দোতলায় গুলির আওয়াজ ও কান্নাকাটির শব্দ শোনেন কুদ্দুস। ওই হাবিলদার নিচে গেটের কাছে এসে মেজর পাশাকে বলে ‘স্যার সব শেষ’। তারপর মেজর ফারুক একটি ট্যাংক নিয়ে গেটের সামনে এসে মেজর পাশা, মেজর নূর, মেজর মুহিউদ্দিন, ক্যাপ্টেন হুদার সঙ্গে কথাবার্তা বলে ট্যাংক নিয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর একটি লাল কারে করে কর্নেল জামিলের লাশ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের ভেতরে আনে।
এর কিছুক্ষণ পর মেজর ফারুক ও মেজর ডালিম গেটের সামনে আসে। তখন মেজর নূর, মেজর পাশা, মেজর মুহিউদ্দিন, ক্যাপ্টেন হুদা ও সুবেদার মেজর ওহাব জোয়ারদার গেটের সামনে ছিল। মেজর ফারুক কাছে ডেকে ক্যাপ্টেন হুদার কাঁধের স্টার খুলে ওহাব জোয়ারদারের কাঁধে এবং ওহাব জোয়ারদারের কাঁধের শাপলা খুলে ক্যাপ্টেন হুদার কাঁধে পরিয়ে হুদাকে ‘মেজর’ বলে এবং জোয়ারদারকে ‘লেফটেন্যান্ট’ বলে ডাকে। যাবার সময় মেজর হুদাকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দায়িত্ব দিয়ে যায়। কুদ্দুস ৮ জনের গার্ড দল নিয়ে সেখানে ডিউটিতে থাকেন। জুম্মার নামাজের আগে ক্যাপ্টেন বাশরকে গেটের সামনে দেখেন।
ওই রাতে মেজর হুদা তাকে মোহাম্মদপুর শের শাহ রোডে একটি কাঠের আড়তে নিয়ে যায়। সেখানে মেজর হুদা ১০টি লাশের কাঠের বাক্স বানিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পৌঁছে দিতে বলে। তারপর মেজর হুদা তাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। শেষ রাতে কাঠের আরতদার ঠেলা গাড়িতে করে ১০টি লাশের জন্য ১০টি কাঠের বাক্স নিয়ে আসে। ফজরের আযানের পরে মেজর হুদা আর্মি সাপ্লাই এবং ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির ফোর্সসহ একটি গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ বাদে বাকি ৯টি লাশ নিয়ে যায়।
আদালতকে তিনি আরো বলেন, ১৬ আগস্ট সকাল ৯/১০টার দিকে মেজর হুদা একটি পিকআপে করে বঙ্গবন্ধুর লাশ বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। ১৭ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টার সময় তিনি তাদের বদলী গার্ডকে চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে তার সঙ্গী গার্ড নিয়ে গণভবনে চলে যান। ১৮ আগস্ট দিবাগত রাতে ক্যাপ্টেন বাশারসহ পুরো গার্ড কুমিল্লায় ফেরত যায়। ৯টি লাশের মধ্যে কর্নেল জামিল, শেখ নাসের, শেখ কামাল, কামালের স্ত্রী, শেখ জামাল, জামালের স্ত্রী, শেখ রাসেল এবং বেগম বেগম মুজিব এবং একজন পুলিশ অফিসারের লাশ ছিল।








