এই প্রজন্মের দুর্ভাগ্য যে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক একটি রাষ্ট্র তারা দেখেনি। খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, লুটপাট, অরাজকতাবিহীন একটি একশো ভাগ শিক্ষিত মানুষের দেশ, যা সত্যিই রূপকথার মতো। মানব সভ্যতার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোসালিস্ট রিপাবলিক বা U S S R নামক রাষ্ট্রটির প্রায়োগিক কাঠামোতে। দেশে দেশে হয়ে উঠেছিল শোষিত বঞ্চিত মানুষের স্বপ্নের দেশ। এই বাংলায় রবীন্দ্রনাথ থেকে একেবারে সুভাষ মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত সেভিয়েত ইউনিয়ন দেখে এসে লিখেছেন তাদের চোখে নতুন পৃথিবী দেখার কথা।
সদ্য প্রয়াত নিসর্গ সখা দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা-
‘সোভিয়েত ইউনিয়ন—এ রকম দেশ পৃথিবীতে কোনো দিন ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না। এমন এক অদ্ভুত দেশ, আমি গিয়ে তো অবাক হলাম যে সব মানুষই প্রায় সমান। কে ইঞ্জিনিয়ার, কে ডাক্তার, কে প্রফেসর, কে শ্রমিক, তা বোঝা যায় না। বাড়িঘর সবার এক, দোকানে সবাই কিউয়ে দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করে—এমন দেশ তুমি পাবে কোথায়? এক রুবল পকেটে নিয়ে তুমি স্বস্তিতে সারা দিন ঘুরতে পার। টাকাপয়সার অভাব তোমাকে বিন্দুমাত্র তাড়িত করবে না, এসব অভিজ্ঞতা ওই সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কোথাও হয় না।’

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর প্রথম প্রায়োগিকতা তার বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুযায়ী বিবর্তনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়। মানুষের নৈতিক সীমাবদ্ধতার জন্য এই রাষ্ট্র কাঠামো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি। ফলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর মতো সেখানেও আমলাতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়,যা লেনিনীয় মার্কসবাদী চর্চার বিপরীত। ফলে মাত্র সত্তর বছরের ব্যবধানে ভেঙ্গে পড়ে এই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামো। আবারো তারা ফিরে যায় প্রচলিত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে।
ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরার ইতিহাস এই প্রথম নয়। এর আগেও ফরাসী বিপ্লব উত্তর আমরা দেখেছি সভ্যতা কীভাবে পেছনে যায়। এই উত্থান পতন মানবেতিহাসেরই অংশ। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব মাত্র তিন দিন স্থায়ী হয়েছিলে। কিন্তু এরপর পৃথিবীর এগিয়ে যাওয়ার সভ্যতা থেমে থাকেনি। সামন্ততন্ত্রের চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটেছিল। শেষ পর্যন্ত পুজিঁবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর জন্য শিল্প বিপ্লবও অনেক বড় ভূমিকা রাখে। কার্ল মার্কস বলেছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতির চরম বিকাশের পথে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে। কিন্তু ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা রাশিয়াতে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করে মার্কসীয় তত্ত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে যে বিপ্লব সংঘটিত হয় ইতিহাসে সেটা রুশ বিপ্লব নামে পরিচিত। সেই রুশ বিপ্লবের একশো বছর হলো। কার্ল মার্কসের যুগান্তকারী অর্থনৈতিক তত্বের এই প্রায়োগিক বিপ্লব দুনিয়া বদলে দিয়েছিলো। মার্কিন সাংবাদিক জন রীড লিখেছিলেন ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’। আসলেই মার্কস এঙ্গেলেসের কমিউনিস্ট ইশতাহের পর আবারো পুঁজিবাদী বিশ্ব কেঁপে উঠে রুশবিপ্লবের প্রাক্কালে। সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দার্শনিকরা ছিলো এই বিপ্লবের পুরোধা। লিও ট্রটস্কি, জোসেফ স্টালিন, বুখারিন, ক্যামিয়ানোভসহ লেনিনের স্ত্রী নাদেজদা স্ক্রুপকায়া পর্যন্ত এই বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
কেন রুশ বিপ্লব পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা?
সভ্যতার ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় পুজিঁবাদ একটি সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুঁজি রাষ্ট্র সমাজ ও মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই ব্যবস্থায় ব্যাপক সামাজিক বৈষম্য থাকে। এখানে পুঁজির একচেটিয়া মুনাফার কারণে শ্রমিক কৃষকসহ সমাজের অপরাপার ক্রিয়াশীল পেশার লোক শোষিত হয়। তাদেরকে ন্যায্য পাওনা না দিয়ে ব্যক্তি পুঁজি ফুলেফেঁপে ওঠে। শ্রমিক শোষণের অর্থনৈতিক ফাঁকটা আবিষ্কার করেন কার্ল মার্কস। তিনি তার পুঁজি বইটিতে দেখিয়েছেন, কীভাবে মালিকরা শ্রমিকদের শোষণ করে। তিনি প্রথম অাবিস্কার করেন উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব। তিনি মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের জন্য রাষ্ট্রকে বাধ্য করার মূলনীতি সামনে নিয়ে আসেন। অন্ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র,ও বাসস্থান এই অধিকারগুলো রাষ্ট্র ভর্তুকি দিয়ে জনগণকে সেবা দেবে। মূলত পুঁজিবাদী অর্থনীতির একচেটিয়া শাসন শোষণের পথ বন্ধ করে দেয় কালজয়ী এই মৌলিক নীতির প্রয়োগ।
লেনিনের রুশ বিপ্লবের পর বিশ্বব্যাপী শোষক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো ব্যাপক শংকিত হয়ে পড়ে। কারণ একচেটিয়া পুঁজিবাদ সমাজের বৃহদাংশকে দরিদ্রতার ভেতর রাখে। রাষ্ট্র কেবল তাদের নির্মমভাবে শোষণ করে থাকে। এই বিপ্লব বিশ্বকে তাই নাড়া দেয় প্রবলভাবে। ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোসালিস্ট রিপাবলিক হয় সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মেহনতি মানুষের অদম্য শক্তির উৎস। দেশে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি।
পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ভূভাগ হয়ে যায় লাল পতাকার দেশ। সে এক মহাকাব্যিক ইতিহাস। অদূর ভবিষ্যতে সমাজতন্ত্র বিশ্বসভ্যতার জন্য অনিবার্য হয়ে উঠবে। এই কারণে যে, মানব সমাজের উন্নততর রাষ্ট্রিক কাঠামোর প্রয়োগে সমাজতস্ত্রের কোন বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বের বহু দেশ এখন সমাজতন্ত্রের মূলনীতির ভিত্তিতে কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেছে। এখন গোটা বিশ্বে এই কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলো উন্নত সমাজ বিনির্মাণে সক্ষম হয়েছে। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের এই ধারণা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব না হলে সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের একচেটিয়া মুনাফার ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক পরাজয়। পুঁজিবাদ বিশ্বব্যাপী তার মৌলিক চরিত্র হারিয়েছে মূলত সোভিয়েত বিপ্লবের পর। বিশ্বব্যাপী জনগণ তাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের সংগ্রামে এক নতুন দিশা খুঁজে পায়। সমাজতন্ত্র সব মানুষকে সমান করে না, কিন্তু সবার অধিকার সমান করে। এই বাক্যটির বহুল ভুল ব্যাখ্যা গোটা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে এই একটি বৈজ্ঞানিক মানবিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে মানুষকে দূরে রাখছে বিদ্যমান সমাজ।
আজকের যে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নতুন কিছু শব্দ দেখি আমরা সেগুলো আসলে সমাজবাদের অর্ন্তনিহিত ধারাগুলোর নাম। উদারতাবাদ, মানবতাবাদ, নারীবাদ এসব এখন আলাদাভাবে ব্যবহৃত হলেও সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এগুলোর সম্মিলন। সমাজবাদ কোনো ডগমা নয়, সুতরাং এটি বৈজ্ঞানিক সূত্র মোতাবেকই বদলাবে। কিন্তু ডগমেটিক বিচারে এই ব্যবস্থার সংকীর্ণ সমালোচনা করা হয়। সমাজবাদেই নারীমুক্তি, মানবমুক্তির পথ রয়েছে। এটির যথাযথ প্রায়োগিক দিকটি চর্চিত হলে আমরা এক নতুনতর সভ্যতার দেখা পেতাম। এখনও ইউরোপের কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলি এই সমাজবাদ থেকেই সাম্য ও মানবাধিকারের বিষয়টিকে রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ করে তুলেছে। এবং গোটা বিশ্বেই তারা প্রশংসা কুড়িয়েছে। সমাজতন্ত্র মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারে নিশ্চয়তা দেয়। শুধু এই বিষয়টি এখনও উপেক্ষিত ধনবাদী অর্থনীতিতে।
সোভিয়েত বিপ্লবের একশো বছর পূর্তিতে আমরা এর চুলচেরা বিশ্লেষণে না গিয়ে মোটা দাগে বলতে পারি, সমগ্র বিশ্বসভ্যতার জন্য এই বিপ্লব অপরিহার্য ছিলো। যার পথ ধরে আজ দেশে উন্নত কল্যাণকামী রাষ্ট্রে উদ্ভব ঘটছে। সারা বিশ্বকে তার নৈতিক মানদণ্ডে বিকশিত করার ক্ষেত্রে, দেশে দেশে স্বাধীনতা সাম্য মৈত্রীর সংগ্রাম হয়েছে তা ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি দেশ স্বাধীন হয় এই অনুপ্রেরণায়। এমনকি আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনেও তৎকালীন সেভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল ভূমিকা ছিলো।
সত্তর বছরের সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিন বেশিদিন বাঁচেননি। তারপর স্টালিনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে যায় এক মহাপরাক্রমশালী শক্তিধর দেশ হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন না থাকলে আজকের ইতিহাস হয়তো নাজীদের ইতিহাস হতো। পৃথিবীর মানচিত্রের প্রায় অর্ধেক এই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আস্থা পায়।
যদিও ধীরে ধীরে, মানে সত্তরের দশক থেকে সোভিয়েত রাষ্ট্রে একটি আমলাতন্ত্রের জন্ম হয় যেটি আসলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আদর্শের সঙ্গে যায় না। এই বৈপরিত্যই এই রাষ্ট্রের কাঠামোতে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় সেটির কারণে প্রথাগত সমাজতন্ত্রের তথাকথিত পতন ঘটে। এই আদর্শ যে আসলেই পুঁজিবাদের মৃত্যু ভাইরাস ছিলো তা পশ্চিমাবিশ্বের উল্লাস দেখে বোঝা যায়।
আজকে যেখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের মুক্তি সংগ্রামে প্রচুর অপপ্রচার চালানো থামেনি, তেমনি সোভিয়েত বিপ্লবের পর আজও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের অপপ্রচার বন্ধ করেনি। এটি ইতিহাসের সহজরৈখিক কোনো ব্যাপার নয়। দেশে দেশে পণ্ডিত বুদ্ধিজীবী সমাজ সবাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সময়ে। বিপ্লবের পথ নিয়ে মতাদার্শিক দ্বন্দ্ব থাকলেও এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে ইউটোপিয়া বা কাল্পনিক নয়, তা প্রমাণ করেছে সোভিয়েত বিপ্লব। সোভিয়েত বিপ্লব বিশ্ব মানচিত্র পাল্টে দিয়েছিলো। সারা দুনিয়া বদলে দিয়েছিলো এই বিপ্লব। রুশ বিপ্লবের কারণেই পুঁজিবাদের একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী মানসে ঘটে গেছে অভূতপূর্ব বদল। এখনও বিশ্বের শান্তিকামী দেশসমূহ এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষেই তাদের নৈতিক অবস্থান নিয়েছে। একটি উন্নততর মানব সমাজ বির্নিমাণে সমাজতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই। এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতে এত উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিকল্প কোন পদ্ধতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আবিস্কৃত হয়নি। এই অনিবার্যতায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এখনো কোনো বিকল্প নেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








