বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বড় জয়টি আসে বিশ্বকাপের মঞ্চে। ১৯৯৯ সালের ৩১ মে ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটনে আসরের টপ ফেবারিট পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন আকরাম-বুলবুল-সুজনরা। প্রথম বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক অর্জনের স্মৃতি আজও ভক্তদের মনে নাড়া দেয়। অভাবিত সেই ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে নিউজিল্যান্ডে যাওয়া মেয়েরা দশ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষ করে ব্যাট-বলের প্রস্তুতিতে নামার অপেক্ষায়। টাইগ্রেস অলরাউন্ডার রুমানা আহমেদ জানালেন ৯৯’র মতো চমক জাগানোর স্বপ্ন দেখছেন তারাও।
আট দলের বিশ্বকাপে সবার সঙ্গে সবার ম্যাচ। আসরের বড় তিন দল ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এখনো ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি মেয়েদের। রুমানা মনে করেন অচেনা তিন দলের একটিকে হারাতে পারলে সেটি হবে ঐতিহাসিক ঘটনা। প্রথম বিশ্বকাপ থেকে রোমাঞ্চকর স্মৃতি নিয়ে ফিরতে চান এ ক্রিকেটার। নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে জনবহুল শহর অকল্যান্ডের পালম্যান হোটেল থেকে চ্যানেল আই অনলাইনকে দেওয়া সাক্ষাতকারে রুমানা কথা বলেছেন বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা, নেতৃত্ব হারানো ও বিশ্বমঞ্চে নিজের বড় একটি রেকর্ডের হাতছানি নিয়ে।
দশ দিনের কোয়ারেন্টিন কতটা কঠিন ছিল?
রুমানা: কোয়ারেন্টিন তো বোরিং এর থেকেও বেশি কিছু। কখনোই বলব না যে, এটা মধুর বা ভালো কিছু। তারপরও যতটুকু পেরেছি সময়টাকে ভালো করার। জিমের কিছু সরঞ্জাম দিয়েছিল। আমরা রুমে বসে কাজ করেছি নিজেদের মতো। পুরোপুরি যেন আনফিট না হয়ে যাই। একটা ভালো ব্যাপার ছিল যে, অনেক সময় রুমের বাইরে উঁকিও দিতে পারি না। কিন্তু এরা নির্দিষ্ট একটা সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ওই সময়ে আমরা ছাদে গিয়ে ২০ মিনিট করে হাঁটাহাঁটি করেছ দুই মিটার দূরত্বে থেকে, দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে।
সময় যত যাচ্ছে আপনারা বিশ্বকাপের মূল ম্যাচের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রথম বিশ্বকাপ, নিশ্চয়ই অনেক রোমাঞ্চ কাজ করছে?
রুমানা: অবশ্যই, ভেতরে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করছে যে জীবনে প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলব, যেটা আমাদের স্বপ্ন ছিল। আমাদের স্বপ্নটা দেশ থেকেই দেখা শুরু হয়েছে। এখানে এসে ওটা নিয়েই চিন্তা করি সবসময়। কী করা যায়, কী করলে আরেকটু ভালো করতে পারব। আরও কীভাবে আমরা সামনের দিনগুলোকে সুন্দর করতে পারব। এটা নিয়েই ভাবনা। আসলে ভেতর থেকেই আমাদের ভালোলাগা কাজ করছে। যত দিন যাচ্ছে আমরা ম্যাচের দিকে যাচ্ছি। অনুশীলনে নেমেই ফোকাস বাড়িয়ে দিতে হবে আমাদের।
অসাধারণ একটি ডাবলের হাতছানি আপনার সামনে। প্রথম বাংলাদেশি নারী ক্রিকেটার হিসেবে ১ হাজার রান (বর্তমানে ৮৯৩, ৪২ ম্যাচে) ও ৫০ উইকেট (বর্তমানে ৪৫) দখলের কাছে দাঁড়িয়ে। বিশ্বকাপের সাত ম্যাচে যদি মাইলফলক পূর্ণ করতে পারেন তাহলে দ্রুততম হিসেবে পঞ্চম স্থানে থাকবেন।
রুমানা: সত্যি কথা বলতে একজন খেলোয়াড়ের কাছে এটা অনেক বড় বিষয় যে তার ক্যারিয়ারে হাজার রান অতিক্রম করবে। তারপর ফিফটি উইকেট পাবে। এটা আমারও একটা স্বপ্ন। তারপরও এগুলোকে খুব বেশি মনের ভেতর আনতে চাই না। তাহলে মনের ভেতর সংশয় কাজ করে যে আমাকে এটার জন্য লড়তে হবে। আমি আসলে আমার দলের জন্য লড়তে চাই। সবসময় এটাই অনুভব করি। এই সমস্ত স্কোর আমি কোনোসময় দেখি না যে কত রান বাকি আছে। কত রান করলে আমার ফিফটি হবে। ব্যক্তিগত স্কোর নিয়ে আমি কখনোই চিন্তা করি না। আমি সবসময় চেষ্টা করি আমার দলের জিততে কতটুকু পথ বাকি আছে বা আমি কী করলে আমার দলটা ভালো করতে পারবে। এটা নিয়েই আমি সবসময় থাকি।
তিন দলের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়। এমন বাস্তবতায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
রুমানা: সত্যি কথা বলতে আমাদের সামনের দিনগুলোতে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ। একসাথে কিন্তু অনেকগুলো চ্যালেঞ্জে পড়ব আমরা। তার মধ্যে আমি বলতে পারি যে কন্ডিশনে আমরা এসেছি… নিউজিল্যান্ডে কিন্তু প্রথমবার আসলাম। এখানে আগে কখনোই আসিনি। এখানকার সম্পর্কে আমরা কিছু জানিও না। এখানে মানিয়ে নেওয়া আমাদের জন্য একটা বড় বিষয়। আমরা জানি যে একটু বেশি সুইং করে। বাতাসের বেগটা বেশি থাকে এখানে, ফলে মানিয়ে নেওয়া একটু কঠিন হয়ে যায়। সবাই এটা বলে। আমরা যেহেতু পরিস্থিতি মোকাবেলা করিনি, সেটি জানি না। তারপরও ধারণা অনুযায়ী বলছি।
কন্ডিশন ছাড়া আর কী চ্যালেঞ্জ থাকবে ?
রুমানা: আমার কাছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ মনে হয় সেটা হলো, আমরা কিন্তু গুনে গুনে কয়েকটা দেশের সঙ্গে ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছি। পাকিস্তান, সাউথ আফ্রিকা, ভারত আর ২০১১ তে একটা ম্যাচ খেলেছিলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। বাকি দেশগুলো কিন্তু কী করে না করে আমাদের সম্পূর্ণ অজানা। তাদের বল মোকাবেলা করা আমাদের জন্য অন্যরকম চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। এখন নিজেদেরকে প্রস্তুত হতে হবে ওভাবে করেই। তাছাড়া এখন কিন্তু সবাই সবার সঙ্গে খেলছে। পাকিস্তান বাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-সাউথ আফ্রিকা ম্যাচ হলো। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড-ভারতের সাথে খেলছে এখন। আমরা খেলার বাইরে এটা বড় চ্যালেঞ্জ। টিভিতে ওদের খেলা দেখছি। আনকামিং বল করছে, ওদের নতুন কিছু খেলোয়াড় দেখলাম, যাদের সঙ্গে আমরা আগে কখনো খেলিনি। এগুলো আমদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ আকরাম-সুজনরা পাকিস্তানকে হারিয়ে দিয়েছিল। কেউ ভাবতেই পারেনি এমন কিছু ঘটতে পারে। সেই ম্যাচের কথা মনে আছে?
রুমানা: প্রথম বিশ্বকাপে যেহেতু আসছি আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা তো অবশ্যই করব। যাদের সঙ্গে খেলা হয়েছে আমাদের যেমন পাকিস্তান, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, সাউথ আফ্রিকা। এই চারটা দেশকে আমরা একটু কাছ থেকে দেখেছি বেশি। তাদের কিছু দুর্বল জায়গাও আমরা জানি। আমরা চেষ্টা করব যে অন্তত এদের সঙ্গে ম্যাচটা যেন আমাদের ম্যাচ ক্লোজ হয় এবং জিতি। অন্যদের সঙ্গে চেষ্টা করব না, তা না। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের খেলার ধরণটা আলাদা, অন্য লেভেলের। এত বেশি ক্রিকেট খেলে, এত বেশি উন্নতমানের যে খুব বেশি চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। আমরা চাইব এদের সঙ্গে ফাইটিং গেম হোক। তিন দলের কাউকে হারাতে পারলে সেটি হবে ৯৯’র মতো ঐতিহাসিক ঘটনা। ওই ম্যাচের কথা খুব মনে পড়ে। ওটা তো আমাদের অনুপ্রানিত করবেই। সেদিন মনজু ভাই (মনজুরুল ইসলাম-নির্বাচক ও ম্যানেজার) বলছিলেন সে ম্যাচটার কথা। পাকিসতানের সঙ্গে বুলবুল ভাইরা জিতেছিল, ওটা বড় অর্জন আমাদের। বিশ্বকাপে ওরকম একটা চমক; আমাদেরও ইচ্ছা আছে। আমরা দেখাবো কোনো দলের সঙ্গে। জিততে পারলে নিজেদের লেভেল বোঝা যায়। আশায় আছি আমাদের ওরকম একটা, ভাইয়াদের যেমন প্রথম বিশ্বকাপ থেকে ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে আছে। আমরাও বিশ্বকাপ থেকে ওরকম স্মৃতি নিয়ে দেশে যেতে চাই।
বেশ কয়েকবছর ওয়ানডে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলকে সেরা অবস্থানে তুলেও বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাপারটি কীভাবে নিয়েছেন?
রুমানা: এই একটা জিনিস আমার হাতে নেই। যদি বলেন আমাকে একশ করতে হবে, ফিফটি করতে হবে-এটা আমার করণীয়, এটা আমার হাতে যে, উইকেট নিতে হবে। অধিনায়ক কে হবে, সেটি অন্যদের হাতে। এটা সম্পূর্ণ বিসিবির ব্যাপার। তাদের যেটা ভালো মনে হয়েছে সেটাই করেছে। আমার এটি নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই। সহজভাবেই মেনে নিয়েছি।








