দেশি ব্যাটসম্যানদের কাছে একটি সেঞ্চুরি বড্ড আকাঙ্ক্ষিত ছিল। সেটি এলো ফাইনালের মঞ্চে। তামিম ইকবাল খেললেন ৬১ বলে অপরাজিত ১৪১ রানের বিধ্বংসী ইনিংস। পরে ফিল্ডিংয়ে নেমে নিলেন দুর্দান্ত দুটি ক্যাচ। ব্যবধান তৈরি হয়ে গেল তাতেই। ঢাকা ডায়নামাইটসকে ১৭ রানে হারিয়ে বিপিএলে শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস। শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে নীল উৎসব ম্লান করে হল লালের জয়।
২০১৫ সালে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নেতৃত্বে প্রথমবার শিরোপা জেতে কুমিল্লা। দুই মৌসুম পর ইমরুল কায়েসের অধিনায়কত্বে দ্বিতীয় শিরোপার স্বাদ নিল তারা। শুরুতে দলটির অধিনায়ক ছিলেন স্টিভেন স্মিথ। চোট নিয়ে ফিরে যাওয়ায় ইমরুলের কাঁধে ওঠে নেতৃত্বের ভার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: কুমিল্লা-১৯৯/৩, ঢাকা-১৮২/৯
২০০ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়ায় নেমে শুরুতেই সুনিল নারিনের উইকেট হারায় ঢাকা। তবে রনি তালুকদার ও উপুল থারাঙ্গার ব্যাটে জয়ের সুবাস পাচ্ছিল দলটি। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ৫২ বলে ১০২ রান যোগ করে কঠিন লক্ষ্য সহজ করে দিচ্ছিলেন তারা।
কিন্তু এই জুটি ভাঙার পরই সাকিব আল হাসান, আন্দ্রে রাসেল, কাইরেন পোলার্ড দ্রুত সাজঘরে ফিরলে ম্যাচ থেকেই ছিটকে যায় ঢাকা। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভার খেলে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৮২ রানের বেশি তুলতে পারেনি ২০১৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ও গত আসরেও ফাইনাল খেলা দলটি।
বড় লক্ষ্য তাড়ায় নেমে দ্বিতীয় বলেই রানআউট সুনিল নারিন। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ হয়নি তখন। শুরুর হোঁচটে কঠিন হয় লক্ষ্যের কাছে যাওয়া। থারাঙ্গার সঙ্গে জুটি বাঁধেন রনি। ব্যাটে ঝড় তুলে ২৬ বলে ফিফটি তুলে নেন। চড়াও হন থারাঙ্গাও। ৬ ওভারে চলে আসে ৭১ রান। ১০ ওভারে সেটি হয়ে যায় ১১০। রানের স্রোত বয়ে চললেও থারাঙ্গা-রনির জুটি ভাঙার পর উইকেট পড়েছে নিয়মিত বিরতিতে।
থিসারা পেরেরার স্লোয়ারে লংঅন দিয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়েন থারাঙ্গা। করে যান ২৭ বলে ৪৮ রান। এ বাঁহাতির ইনিংসে ছিল ৪টি চার ও ৩ ছক্কা।
ঢাকা তৃতীয় উইকেট যায় দলের রান যখন ১২০। ১২তম ওভারের প্রথম ডেলিভারিটি ওয়াহাব রিয়াজ দেন বাউন্সার। পুল করতে গিয়ে মিডঅনে তামিমের দারুণ ক্যাচে সাজঘরে ফিরে যান সাকিব। ৫ বলে করেন ৩ রান।
পরে ১ রান যোগ হতেই রানআউট হয়ে ফেরেন দারুণ খেলতে থাকা রনি তালুকদার। ৩৮ বলে ৬৬ করার পথে মারেন ৬টি চার ও ৪টি ছক্কা।
১৯ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরে কুমিল্লা। দলীয় ১৩২ রানের মাথায় আন্দ্রে রাসেল পেরেরার দ্বিতীয় শিকার হয়ে সাজঘরে ফিরলে ব্যাকফুটে চলে যায় দল। এ ডানহাতি ৩ বলে করেন ৪ রান।
উইকেট হারানোয় রান তোলার গতিও কমে আসে। শেষ ৫ ওভারে দরকার পড়ে ৫৯ রান। কঠিন সমীকরণের সামনে দলকে রেখে সাজঘরে ফেরেন কাইরেন পোলার্ড। লংঅনে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন তামিম। ১২ বলে ১৩ রান করে এ ক্যারিবিয়ান সাজঘরে ফিরতেই একরকম জয়ের উদযাপন সেরে ফেলে কুমিল্লা!
শুভাগত হোম উইকেটে এসে ফিরে যান রানের খাতা খোলার আগেই। পেরেরার হাতে ক্যাচ বানিয়ে প্রথম শিকারের দেখা পান মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ওয়াহাব রিয়াজ তৃতীয় শিকার বানান নুরুল হাসান সোহানকে (১৮) আউট করে। নিজের দ্বিতীয় উইকেটের দেখা পান পরের ওভারেই। মাহমুদুল হাসান লিমনকে (১৫) ফিরিয়ে।
বিপিএলের ষষ্ঠ আসরের ফাইনাল স্মরণীয় করে রাখেন তামিম। তার ওয়ান ম্যান শো’য়ের কাছেই মূলত সাকিবদের হার। শুক্রবার গ্যালারিভরা দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন ছক্কার বৃষ্টি নামিয়ে। তামিম ৫০ বলে শতক ছুঁয়ে শেষপর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৬১ বলে ১৪১ রান করে।
মিরপুরের রহস্যময় উইকেটে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করাকেই শ্রেয় মনে করে বোলিং বেছে নেন ঢাকা অধিনায়ক সাকিব। দ্বিতীয় ওভারে কুমিল্লা ওপেনার এভিন লুইসকে ৬ রানে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে সাকিবকে স্বস্তি দেন রুবেল হোসেন।
লুইসকে হারানোর পরই সাবধানী হয়ে যান আরেক ওপেনার তামিম। এনামুল হককে নিয়ে এগোতে থাকেন ধীরে।
প্রথমে আস্তে চললেও পরে রীতিমতো দৌড়েছেন দুজনে। বিশেষ করে তামিম। সাকিবের করা ষষ্ঠ ওভারে টানা দুই চার মেরে শুরু করেন ঝড়। ৩১ বলে তুলে নেন এবারের বিপিএলে নিজের তৃতীয় ফিফটি।
তামিম তার মতো থাকলেও বিপত্তি বাধান অপরপ্রান্তের ব্যাটসম্যানরা। ১২তম ওভারে এনামুলকে আউট করে ৮৯ রানের জুটি ভাঙেন সাকিব। গড়েন বিপিএলের এক আসরে সর্বোচ্চ ২৩ উইকেট নেয়ার রেকর্ড।
পরের ওভারে ভুল বোঝাবুঝিতে কোনো রান না করেই সাজঘরে ফেরেন কুমিল্লার ফর্মে থাকা ব্যাটসম্যান শামসুর রহমান শুভ। ১ উইকেটে ৯৮ রানে থাকা কুমিল্লা এক রানের ব্যবধানে হারায় দুই ব্যাটসম্যানকে। খানিকটা বিপদ তখন।
কিন্তু সব ক্ষয়-ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য থেকে গেলেন তামিম। বল দেখতে লাগলেন ফুটবলের মতো সাইজে! যেখানেই মারতে চেয়েছেন, কথা শুনেছে ব্যাট। মাঠের সবখানেই খেলেছেন চোখজুড়ানো সব শট। ৩১ বলে পেয়েছিলেন প্রথম ফিফটি, পরের ফিফটি পেলেন মাত্র ১৯ বলে। ঠিক ৫০ বলে সেঞ্চুরি।
সেঞ্চুরির পরেও থামানো যায়নি তামিম ঝড়। আরও বেড়েছে। শেষ ১১ বল খেলে নিয়েছেন আরও ৪১ রান। এই ১৪১ রানের মধ্যে ১০৬ রানই তামিম করেছেন বাউন্ডারি থেকে। যাতে ১০ চারের সঙ্গে এসেছে বিশাল ১১টি ছক্কার মার। বিপিএলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস এটি। অল্পের জন্য গেইলের ১৪৬ টপকে যাওয়া হয়নি।







