পৌরসভা নির্বাচনে সুবিধা করতে না পেরে বিএনপি আবার রাজপথমুখী হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের ঠেকাতে যথারীতি ক্ষমতাসীনরাও মরিয়া। ৫ জানুয়ারি উভয় দলের ‘সমাবেশ’ প্রস্তুতি শীতকালীন নিরুত্তাপ রাজনীতিতে আকস্মিক উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ‘হাইবারনেশান’-এ থাকার পর বিএনপির এই রাজনৈতিক নড়াচড়া ভুল ও অপরিণামদর্শী একের পর এক উদ্যোগের ফলে অপমৃত্যুর মুখোমুখী পৌঁছানো এই দলটির পতন ঠেকাতে কতটুকু কী ভূমিকা পালন করে-সেটাই দেখার বিষয়।
২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ডাক দেয়ায় এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের পতনের আন্দোলনের নামে অনির্দিষ্ট কালব্যাপী পেট্রোল বোমা সন্ত্রাস সৃষ্টির যে জঘন্য নজির বিএনপি সৃষ্টি করেছে, ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। বিএনপির এই অবক্ষয়ের সুযোগে আওয়ামী লীগও দলটির ওপর মারমুখী ও জবরদস্তি আচরণ চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে আন্দোলন কিংবা নির্বাচন-কোনটাতেই দলটি সুবিধা করতে পারছে না। আপাতত সুস্থ আন্দোলনের পথ এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কৌশল খুঁজে বের করা ছাড়া বিএনপির জন্য অন্য কোনো পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না!
কারণ ‘গণতন্ত্রায়নের’ জন্য ‘রাজনৈতিক দল’ এবং ‘নির্বাচন’ একান্ত অপরিহার্য। রাষ্ট্র ও সমাজকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই সংযুক্ত করার প্রক্রিয়াটি, অন্য যে কোনো সময় ও প্রক্রিয়ার চেয়ে ‘নির্বাচনের’ মাধ্যমে সর্বাধিক সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়ে থাকে।
রাজনৈতিক দলগুলো সমাজ থেকে জনগণের চাহিদাগুলো সংগ্রহ করে এবং পরে সেগুলোকে দাবি-দাওয়ার আকারে উপস্থাপন ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করে। অবশ্য সংগৃহীত এসব দাবি-দাওয়া যেমন ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে তেমনি দাবি-দাওয়াগুলো আদায় ও বাস্তবায়নের পথও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
পথ যাই হোক না কেন, মানুষ হত্যা করে, আগুন দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও করে কিংবা মানুষের ওপর পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে দাবি-দাওয়া আদায়ের পথ কেউই সমর্থন করে না। আর তাই গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন। স্থানীয় কিংবা জাতীয় যে কোনো নির্বাচনই হোক না কেন, গণতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়াকে তা শক্তিশালী করে থাকে।
রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন প্রায় অসম্ভব। আর দলীয় ব্যবস্থা যেহেতু ‘গণতন্ত্রায়নের অপরিহার্য উপাদান’ সেহেতু দলভিত্তিক পৌরসভা নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি তথা ‘গণতন্ত্রায়নের’ অন্যতম দৃষ্টি আকর্ষণের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
দেশে প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দলীয় নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকেরও বেশি পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ২৩৪টি পৌরসভায় ভোট হয়। এই পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থীরা ভোট পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৫৭ শতাংশ; আর বিএনপি মনোনীত মেয়রপ্রার্থীরা পেয়েছে ২৮ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট।
মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী বেসরকারিভাবে ২৩৩ পৌরসভার মেয়র পদের ফলাফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকে ১৮১টি, প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২৪টি পৌরসভায় বিজয়ী হয়েছেন। এছাড়াও লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টি-জাপার ১ জন, আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী ১৬, বিএনপি বিদ্রোহী ২ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ৯ জন জয়লাভ করেছেন।
পৌরসভা নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম-সন্ত্রাস না হলেও তা জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। বেশ কিছু স্থানে অনিয়ম ও গোলযোগের খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচন নিয়ে দেশের সবচেয়ে পুরানা বামপন্থী দল সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেছেন, ‘বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনকে কোনোভাবেই জনগণের প্রত্যাশিত অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করা যায় না।’
‘ভোটে সর্বত্র জনগণের অংশগ্রহণ ও ভোটের দিনে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক স্থানে সকল ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেনি। নানা করচুপির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ফলে ভোটের ফলাফলে জনমতে প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেনি। নির্বাচনকে প্রহসনের ধারা থেকে মুক্ত করা যায়নি। তাই এই নির্বাচনের ফলাফলকে জনগণের মতামতের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।’
সিপিবির বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করে শুধু এটুকু বলা চলে যে, বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাতে করে এর চেয়ে ভালো নির্বাচন আপাতত আশা করাটাও বাতুলতা।
মজার ব্যাপার হলো, দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে মানে না। নির্বাচন কমিশনকেও মানে না। তারপরও নিজের রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনেই পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। এই নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের ফল যথেষ্ট হতাশাব্যঞ্জক।
গণতন্ত্র কাকে বলে, এ নিয়ে প্রাচীন গ্রিক সমাজ থেকে হাল-আমল অবধি একাডেমিক ও সাধারণ চর্চায় কৌতূহল ও কুটকচালির অন্ত নেই। কিন্তু অন্তহীন সংজ্ঞার জঙ্গলে খেই হারিয়ে না ফেলে, গণতন্ত্রকে আমরা বুঝতে চেষ্টা করতে পারি তার ব্যবহারিক রূপ দেখে।
সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচন, বা অদূর-অতীতের সংসদ নির্বাচন দেখে মনে হতে পারে, গণতন্ত্র হলো একটা নির্দিষ্ট দিনে নির্বাচন ঘোষণা, মনোনয়ন জমা দেওয়া, প্রতিশ্রুতি ও প্রচার, নির্বাচনী বুথ, ভোটারদের লাইন, পরিচয়পত্র পরীক্ষা, ভোটদান, ফলপ্রকাশ ও সবশেষে বিজয়ীদের সরকার গঠন/দায়িত্বগ্রহণ।
কিন্তু অনেকেই এই বিবরণ মানবেন না। বলবেন, এ হলো আদর্শ বা পাঠ্যপুস্তকে লেখা বর্ণনা। এ বারের ও বিগত বেশ কয়েক দশকের নির্বাচনের নিরিখে বলবেন, এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ভোটার লিস্টে কারচুপি, সেই নির্বাচনের তারিখ নিয়ে বাদানুবাদ, একপক্ষের নির্বাচন বর্জন, আরেক পক্ষের অংশগ্রহণ, দিন ঘোষণার পর থেকে হিংসা ও সন্ত্রাসের চড়তে থাকা পারদ, ভোটের দিন বুথ-জ্যাম, জাল ভোট, ব্যালট ছিনতাই, প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, রিগিং, ছাপ্পা ভোট, বোমাবাজি, গোলাগুলি, প্রশাসনিক পক্ষপাত, রক্তপাত, লাশ এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনের মুণ্ডুপাত। মানি না, মানব না, মারামারি হানাহানি। অস্থিরতা।
একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যাবে, উপরে বলা ব্যবহারিক গণতন্ত্রের দুটি উদাহরণই (আদর্শ ও ফলিত) ভোট-কেন্দ্রিক। ভোটের সঙ্গেই গণতন্ত্রের এই ধারণার শুরু ও শেষ। গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে এখানে মুখ্যত নিরপেক্ষ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে শান্তিপূর্ণ ভাবে পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অধিকারের কথাই বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ, মানুষের যা কিছু দায়দায়িত্ব বা অধিকার, তার শুরু ও শেষ এই ভোটপ্রক্রিয়া ঘিরেই।
এই ধারণার বিপরীত একটি তাত্ত্বিক ধারণা আছে। সেটা এই যে, আমাদের মতো উত্তর-ঔপনিবেশিক দেশে ভোটকেন্দ্রিক গণতন্ত্র হল নৈতিক বোধম্পন্ন নাগরিক সমাজের প্রান্তে তথা বিপরীতে থাকা ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’র (‘শাসিত’) মানুষদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরকারি আর্থিক বা প্রশাসনিক উদ্যোগ তথা পলিসি-র বিনিময়ে, এ-সব দিতে সক্ষম ‘শাসক’দের বেছে নেওয়ার রাজনীতি।
এই দৃষ্টি অনুযায়ী, আমাদের হালফিলের গণতন্ত্রের ভিত্তি, নাগরিক সমাজের উচ্চ নৈতিকতা নয়, উপরে বর্ণিত শাসিতের রাজনীতি। এই শাসিতেরা গণতন্ত্রের উচ্চ আদর্শের পতাকাবাহী সিটিজেন বা নাগরিক নয়, তারা জীবনধারণের চৌহদ্দির মধ্যে আটকে থাকা পপুলেশন বা জনসমষ্টি।
পলিটিক্যাল সোসাইটি-র ধারণাভিত্তিক শাসিতের রাজনীতি হয়তো সাম্প্রতিক ভোটকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের হালহকিকত অনেকটা বর্ণনা করে, কিন্তু তাত্ত্বিক ভাবে তাদের আত্মসত্ত্বা কেড়ে নিয়ে তাদের শাসন-পারঙ্গম শাসক গোষ্ঠীগুলির চির-অধীন করে রাখে। যদি তথাকথিত শাসিত বা নিম্নবর্গীয়দের এই অবস্থাকে তাদের অলঙ্ঘ্য বিধিলিপি বলে না মানি, তবে গণতন্ত্র সম্পর্কে কিছু মৌলিক ধারণার পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে।
গণতন্ত্র কেবল ভোটসর্বস্ব কিছু বে-আইনি আচার-ব্যবহার নয়, তা প্রাত্যহিক অনুশীলন বা চর্চার বিষয়। ফলে, ভোটপ্রক্রিয়া মিটে গেলেই, এমনকী পরম শান্তিপূর্ণ ভাবে মিটে গেলেও, তার চর্চা শেষ হয়ে যায় না, বরং শুরু হয়। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের-পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা উপজেলার স্তরটি এই চর্চার আদর্শ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
আর হ্যাঁ, গণতন্ত্রের চর্চাটা সবার আগে দলে, প্রতিদিনের আচরণে, বুলিতে, চিন্তায় ও কর্মে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







