বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিএনপির জনসমর্থন আছে এইটা মানতে তাররাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরও কোন দ্বিমত নেই। এই অর্থে বিএনপি একটা বিশাল জন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের নামও বলা যায়। তাদের আদর্শের জায়গা বা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বিষয়টা আলোচনার বাইরে রাখলে এই রাজনৈতিক দল নিয়ে কিছু কথা বলাই যায়! (আদর্শের প্রশ্নে বিএনপিকে রাজনৈতিক দল বলার চেয়ে একটি প্লাটফর্ম বলায় শ্রেয়।)
দেশের সব কয়টি মিডিয়াতে একটা সংবাদ খুবই গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্য পেয়েছে। তা হলো বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সব আইনী প্রক্রিয়া শেষ হলে বিএনপির দাবি তাদের দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য ন্যায়বিচার পাননি বলে দাবি করেছে দলটি।
দলটির দাবি, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের জন্য সাকা চৌধুরীর ‘কমিটমেন্ট’ ছিল। তাঁর স্বপক্ষে যেসব দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিলে তিনি হয়তো ন্যায় বিচার পেতেন। ১৯ নভেম্বর, গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন এই দাবি করেন। একটি দল কতটা নির্লজ্জ হলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে একজন দণ্ডিত ব্যাক্তির পক্ষে এমন সাফায় গাইতে পারে তা আবারো প্রমাণ করলো বিএনপি । সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মত আত্মস্বীকৃত অপরাধীকে দল থেকে বাদ না দিয়ে বরং তার পক্ষে দলীয়ভাবে দাঁড়ানো প্রমাণ করে বিএনপি সব সময়ই দল হিসেবেই অপরাধীদেরকে সমর্থন দেওয়ার রাজনীতি এখনো ত্যাগ করতে পারেনি।
বাংলাদেশের জন্মশত্রু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিএনপি কখনোই মানতে পারেনি। বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত ইসলামীকে রক্ষার এমন কোন চেষ্টা নেই তা করেনি দলটি। জামায়াত ইসলামী বিচার প্রতিহত করার নামে দেশব্যাপী সন্ত্রাস করলে জামায়াতকে নৈতিক সমর্থনও দিয়েছিল বিএনপি। বিএনপি নেত্রী ২০১০ সালের নভেম্বরে এক সমাবেশে জামায়াত নেতাদেরকে রাজবন্দী বলে দাবি করেছিলেন এবং তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্ববান করেছিলন।
কিন্তু কেনো বার বার দল হিসেবে অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে বিএনপি? এর ব্যবচ্ছেদ করতে হলে পিছন ফিরে তাকাতে হবে আমাদেরকে। জানতে হবে বিএনপির জন্মের আতুরঘর সর্ম্পকে এবং অতীত ইতিহাস সর্ম্পকে।
বিএনপির জন্ম যেমন ঠিক কোনো গণতান্ত্রিক পথে হয়নি তেমনি এই দলটি রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কখনো গণতান্ত্রিক আচরণও করেনি। বিএনপি নামক দলটি এক সামরিক স্বৈরশাসকের হাত ধরে ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। এর আগে ঘটে গেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা। ৭৫ এর মধ্য আগস্টে সপরিবারে বাংলাদেশের জাতির জনক ও তার পরিবারকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে যে ক্ষমতা ভাগভাগির এক নোংরা খেলা জমে উঠে সেই খেলাতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান জিতে যায়!
অবৈধ ভাবে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়া প্রথমে যে কাজটি করেন তা হল জাতির জনকের হত্যাকারীদেরকে দায়মুক্তি দিয়ে দিলেন! শুধু তাই নয় ইমডেমনিটি জারির সঙ্গে সঙ্গে খুনীদের জাতীয় বীর হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে দেয় জেনারেল জিয়া। তাদের পুর্নবাসন করার দায়িত্বও নিজ কাঁধে তুলে নেন তিনি। বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে জিয়া তাদের প্রতি তার ঋণ শোধ করেন। এই হচ্ছে জেনারেল জিয়ার ‘ভালোমানুষি’র নমুনা!
বিএনপি নেতাদের অনেকেই বলে থাকেন জেনারেল জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছে। তার বহুদলীয় গণতন্ত্রের নমুনা পাওয়া যাবে বাংলাদেশ জন্মের বিরোধিতা করা জামায়াত ইসলামীকে রাজনীতি করার সুযোগ দানের মধ্য দিয়ে তিনি সেই বহু দলীয় রাজনীতির সূচনা করেন! সেই থেকেই জামায়াত ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সহবাসের শুরু বিএনপি। বিএনপি এবং জামায়াত যেন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।
বিএনপির জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এই ভয়ঙ্কর অপরাধীদের পক্ষে কাজ শুরু করে দিল। শুধু তাই নয় ক্যুখাত রাজাকার ও মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমানকে জিয়া তার অবৈধ সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বানিয়েছিলেন। এইটা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর সরাসরি চপেটাঘাত করার মত একটি ঘটনাও বটে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সবচেয়ে বড় বিশ্বাস ঘাতক বা রাজাকার শিরোমণি গোলাম আজমকেও এই জেনারেল জিয়াই প্রথম বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে জেনারেল জিয়া পত্নী বেগম জিয়া ক্ষমতায় এসে গোলাম আজমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়।
বিএনপির এমন অপকর্মের কথা বলতে গেলে বহু অপকর্মের হিসেব দেওয়া যায়। তারা সব সময়ই অপরাধীদেরকেই প্রমোট করে এসেছে, আসছে , হয়তো আগামীতেও এমনটাই করতে থাকবে।
২০০২ সালে বুয়েটের সানি হত্যাকাণ্ডের কথা মনে আছে? ছাত্রদলের গুলিতে যে প্রাণ দিয়েছিল? সেই সানি হত্যাকারী ছাত্রদল নেতারা কিন্তু সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার কাছ থেকে পুরুস্কৃত হয়েছিল। সর্বশেষ ছাত্রদলের কমিটি হওয়ার সময় সাবিকুন নাহার সানি হত্যার দায়ে মামলার আসামীরা কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড় পদও পেয়েছে।
এটাই বিএনপির অপরাধীদের পক্ষ নেওয়া রাজনীতির প্রমাণ। তারা সব সময়ই দলগত ভাবেই অপরাধীদের পক্ষ নিয়েছে। রাজনৈতিক ভাবেই তারা সন্ত্রাসের লালন কর্তা -পালন কর্তা।
একটা গণতান্ত্রিক দেশে এমন ধারার রাজনীতি যে চলতে পারেনা সেইটা কি বিএনপির হাইকমান্ড বুঝে না? বুঝেও না বোঝার ভান করলে সেটা বিএনপির জন্যই হিতে বিপরীত হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের
নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে
প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







