দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থাকার পর বিএনপি হঠাৎ-ই যেন আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠেছে। গত শনিবার দলের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে এক সমাবেশের আয়োজন করেছে। এই সমাবেশ থেকে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৬টি শর্ত দিয়েছে দলটি।
এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে- নির্বাচনের আগে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব বন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি ও সব মামলা প্রত্যাহার করা, একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, নির্বাচনে আগে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করা।
উল্লেখ্য, এর আগেও বহুবার এই শর্তগুলো বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এসব শর্ত মানার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। বরং বিএনপির এসব শর্তের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতারা নেতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, নিজ গরজেই বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। তাদের কোনো শর্ত মানা হবে না। খালেদা জিয়ার মুক্তির সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটা আদালতের বিষয়। সরকারের হাত নেই। সংবিধান অনুযায়ী আগামী নির্বাচন হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিএনপির নেতানেত্রীরা অবশ্য গত প্রায় আট বছর ধরে বিভিন্ন শর্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং শর্ত না মানলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে চলেছেন। ‘কঠিন’ আন্দোলন, ‘কঠোর’ আন্দোলন, ‘মারাত্মক’ আন্দোলন, ‘ভয়ঙ্কর’ আন্দোলন— এমনি নানা আন্দোলনের হুমকির কথা আমরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে শুনছি, কিন্তু পোড়া চোখে এখনও তেমন কিছুই দেখিনি। যা করার এবং যা না করার— সবই আওয়ামী লীগ করছে, বিনা বাধায়, প্রতিরোধহীনভাবে!
বিএনপির আন্দোলনের হুমকি এখন স্রেফ প্রহসনে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকার পতনের আন্দোলনের কথা বললেও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়ে দলটি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা লক্ষ করা যায়নি। দল বা জোটের কোনো সাংগঠনিক সভায় আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে আন্দোলন সংগ্রামের বাস্তবতা, করণীয় ইত্যাদি নির্ধারণের কোনো নজির নিকট অতীতে ছিল না, ভবিষ্যতে থাকবে-তেমন ভরসাও নেই।
‘অহিংস’ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনপির পাহাড়সম ব্যর্থতার কথা সবাই জানে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও জানে। আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনপির এই দুর্বলতা নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বহুবার কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলনের হুমকি ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নয়’। এর আগে তিনি টিপ্পনি কেটে বলেছিলেন, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করবে এটা যদি সত্য হয়, তাহলে আরব্য রজনীর রূপকথাও সত্য হবে।’
ওবায়দুল কাদেরের এই উক্তি নির্মম হলেও নিরর্থক নয়। বিএনপি আসলে ক্রমেই একটি বুলি-সর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির এই ব্যর্থতা ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া হতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ক্ষমতাসীনরা জেনে গেছে, তাদের কোনো শক্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই। তাইতো তারা ‘গায়ের জোরে’ দেশ শাসন করার নীতি গ্রহণ করেছে। যখন যাকে খুশি ‘টাইট’ দিচ্ছে, আবার সুবিধা মতো ‘ঢিলে’ও দিচ্ছে। সমালোচকদের ভাষায়-‘যা খুশি তাই করছে।’ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের পথ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী এই দলটি এখন আদর্শিক বিচ্যুতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সমালোচনা- আন্দোলন- বিক্ষোভকে শক্তি দিয়ে দমন করা হচ্ছে। অথচ বিষয়টি তারা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে চলেছে!
জনমতকে শ্রদ্ধা, বিরুদ্ধ মতকে সম্মান, সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নেয়ার মানসিকতা ক্ষমতাসীনদের মধ্যে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও অবক্ষয়গ্রস্ত। তারা জামায়াতের প্রভাব থেকে বেরিয়ে গণদাবি নিয়ে কিংবা সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার পথ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে।
দলীয় কার্যালয়ে বসে ‘মুখ রক্ষার’ বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যে তাদের দায়িত্বকে সীমাবদ্ধ করে এনেছে। সুস্থ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার পথ পরিহার করে চোরাপথে ‘হঠাৎ- গড়ে ওঠা গণবিক্ষোভ’কে ‘সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা’র ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এতে তেমন কোনো সাফল্য জুটছে না। দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তারা যে সব শর্তের কথা বলেছে, সেসব শর্ত না মানলে তারা কী করবে, সে ব্যাপারেও স্পষ্ট কোনো ঘোষণা ও অঙ্গীকার নেই। তারা এখন সম্ভবত অপেক্ষায় আছে যদি ক্ষমতাসীনদের খলনের কারণে কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠে, কোথাও কোনো ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে’ ক্ষমতাসীনরা ‘ধরাশায়ী’ হয়, তাহলে তারা ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে সামনে চলে আসবে এবং দয়া করে সিংহাসন আরোহন করবে!
কিন্তু তাই কি সম্ভব? এমন ‘দিবাস্বপ্ন’ নিয়ে বসে থেকে অনেক দক্ষ, অভিজ্ঞ ও চতুর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হঠানো যাবে?
রাজনীতির এসব ‘কূট-কৌশল’ বা ‘গোপন ফাঁদ’ আমরা বুঝি না! সাদা চোখে মোটা বুদ্ধিতে আমরা যা বুঝি তা হলো, আমাদের সামনে আপাতত তেমন কোনো সুসংবাদ নেই। গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক শাসন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ থেকে আমরা অনেক দূরে অবস্থান করছি! বর্তমানে সরকারি দলে যেমন গণতন্ত্র চর্চা নেই। বিরোধী দলেও নেই। নীতি-কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ নেতাকর্মীদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। এতে করে দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন উধাও হতে বসেছে। আর গণতন্ত্রহীনতার কারণে মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
গণতন্ত্রের অন্যতম সংকট হল, সংখ্যালঘিষ্ঠদের মধ্যেও যে সত্য নিহিত থাকে, এই ধারণাটি অনেক সময়ই বাতিল হয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতাই গণতন্ত্রের প্রধান কার্যকর উপাদান হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রের মানস-প্রক্রিয়াটি কার্যকর হয়নি বলেই ‘বাহুবলি’দের হাতে সাধারণ মানুষ মার খাচ্ছে। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার তেমন কোনো বাস্তবায়ন নেই রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি-কর্মসূচিতে।
তা হলে প্রশ্ন উঠে, আমরা কোন পথে চলেছি? আমাদের দেশে তো গণতন্ত্র বদ্ধ জলাশয়ে আটকে আছে। জাতীয় পার্টি, বিএনপি তো দূরে থাক, গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী আওয়ামী লীগও গণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারেনি। এখানে দলতন্ত্রের সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বেচ্ছাতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র। স্বৈরতন্ত্রে আকস্মিকতা আর খামখেয়ালই প্রত্যাশিত। যা এখন বেশিরভাগ সেক্টরেই দৃশ্যমান।
আমাদের দেশে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের তেমন চরিত্রগুণ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। গত দুই দশকে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ক্ষতি যা হয়েছে সেটা হলো ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, যার সংশোধন দুঃসাধ্য। অনেককে বলতে শুনি, ‘ও সব কেতাবি তত্ত্ব রাখুন, এটাই আজ বাস্তব। বেশি নিয়ম দেখাতে গেলে ওএসডি করে রাখবে, অথবা মিথ্যে অভিযোগে ফাঁসিয়ে সাসপেন্ড করে দেবে। দেখলেন না, অমুকের কী হল?’
অথচ যিনি বলছেন, তিনিও এক কালে শিখেছিলেন যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে পেশাদার বিশেষজ্ঞের স্বাধীনতা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেই গড়ে উঠেছিল আমলাতন্ত্র আর শিক্ষক, বৈজ্ঞানিক, আইনজীবী, চিকিৎসক ইত্যাদি পেশার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি। গত কয়েক দশকে বিভিন্ন স্বৈরশাসকের চোখ রাঙানি আর শাস্তি সহ্য করে এই সব প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল শিক্ষিত বাঙালি সমাজ।
আজ সমূহ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ ভোটদাতার অজ্ঞানতা বা অপরিণামদর্শিতাকে দোষ দিলে নিজেকে ঠকানো হবে। প্রতিষ্ঠান বাঁচানোর দায় সাধারণ ভোটদাতার নয়, তার সে সুযোগও নেই। প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রধান দায়িত্ব সেই সব দফতর, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, আদালত যারা চালান, তাদের, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী শিক্ষিত সমাজের সদস্যদের।
তারা যে জ্ঞানপাপী হয়ে আশু সুযোগসুবিধার লোভে অথবা অন্যায় শাস্তির ভয়ে স্বৈরতন্ত্রের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দেবেন না, সে জন্য তারা বৃহত্তর সমাজের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। আজ কি তারা সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারছেন?
আসলে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক খাদের কিনারায়। এখান থেকে গণতন্ত্রের শক্তি জোটবদ্ধ হয়ে দলতন্ত্রের বিপরীতে গণতন্ত্রে নিয়ে যাবে, অন্যথায় দলতন্ত্রের বদলে নতুন দলতন্ত্রের অপশক্তি দেশকে স্বৈরতন্ত্রের রথে অনিবার্য ভাবে জুড়ে দেবে।
আর সেই আলামত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে! এ ক্ষেত্রে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ই আমাদের জন্য এক হতাশার নাম!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








