বিএনপির কাউন্সিলের প্রায় ৫ মাস পর গত ৬ আগস্ট দলটির পুর্নাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৯ মার্চ বিএনপির জাতীয় সম্মেলনে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার ক্ষমতা দেন কাউন্সিলররা। এরপর তিন দফায় ৪২ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। বাকিদের নাম ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল। এ কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩৫ জন, যুগ্ম মহাসচিব পদে ৭ জন, নির্বাহী কমিটির সম্পাদক পদে ২০৯ জন, নির্বাহী কমিটির ২৯৩ সদস্যের নামও ঘোষণা করা হয়। আর উপদেষ্টা পদে এখন পর্যন্ত জায়গা পেয়েছেন ৭৩ জন সদস্য। সর্বমোট ৫৯৪ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এরমধ্যে ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির দুটি পদ খালি রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পাদকের ২ টি, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও যুববিষয়ক সম্পাদকের ৫টি পদ ফাঁকা রয়েছে। ৫৯৪ সদস্যের এই কমিটিতে ঠাই পেয়েছে অন্তত ১১৩ নতুন মুখ। এখানে সম্পূর্ণরুপে দলের গঠনতন্ত্রে যে সংখ্যার উল্লেখ আছে তার চেয়ে বেশী সদস্য রাখা হয়েছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি হবে অর্নুধ্ব ৩৫১ সদস্য বিশিষ্ট (https://www.bnpbd.org/page/details/457)।
২০০৮ সালের বিএনপির সর্বশেষ কমিটির সদস্য ছিলেন ৩৭১ জন। ছাত্রদলের কমিটিতেও গঠনতন্ত্র-এর কাঠামো তোয়াক্কা না করে ৭শ জনের কমিটির মতোই বিএনপিরও একই অবস্থা। ১৯ মার্চের কাউন্সিলে দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এক নেতার এক পদ যুক্ত করা হয়েছে। নতুন কমিটিতে তাও মানা হয়নি। এই কমিটি নিয়ে জনগণের তেমন কোন প্রত্যাশা ছিল না যতটা ছিল দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। দীর্ঘদিন পর কমিটি হওয়ায় দলের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রতিক্রিয়া যা হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। তাদের দলের নেতাকর্মীদের নামে বেনামে বিরুপ মন্তব্য ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিএনপির তেমন কোন শক্তিশালী ভূমিকা নেই বরং সেনা ছাউনীতে জন্ম নিয়ে শুধু ক্ষমতার রাজনীতিতে দলটি অভ্যস্ত। কাউন্সিলের আগে দলের নেতৃত্ব বহুবার বলেছিল যে কাউন্সিল হলে দল চাঙ্গা হবে, তা তো হয়নি বরং উল্টোটাই হয়েছে, দলের মধ্যেই বিদ্রোহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোন প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ বিএনপি এখন কার্যত বিরোধীদল নয় এবং সংসদে তারা নেই। গত কয়েক বছরে বিএনপি কোন সুষ্ঠু রাজনৈতিক কর্মসূচী দিতে পারেনি, যখন সংসদে ছিল (২০০৯-২০১৩) তখনও ভাল ভূমিকা রাখেনি, এখন সংসদের বাইরে থেকেও কার্যত দলের কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী নেই যা জনগণকে কাছে টানবে। বরং আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মেরে, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়ে এখন তারা জনগণ থেকে দূরে সরে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন উন্নয়নের সুফল উপভোগ করছে।
বিএনপির কমিটির পর দলে নাটকের পর নাটক চলছে, প্রতিদিনই কেউ না কেউ পদত্যাগ করছে, খালেদা জিয়া বলতেন তার সাথে নাকি দেশের ৯৫ ভাগ মানুষ আছে, এখন তো দেখা যাচ্ছে তার সাথে দলের লোকই নাই; নইলে তারা দল ছাড়বে কেন? মানুষ রাজনীতি করে সুনির্দিষ্ট আদর্শ নিয়ে। দলের নেতৃত্ব সেই আদর্শ ঠিক করে দেয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে, জনগণ নিয়ে কাজ করতে। দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা না থাকলে সেই দল করবে কি করে, আর জনগণকেই বা কি বোঝাবে। এখন এই পদত্যাগ পদত্যাগ খেলাই তো প্রমাণ করে বিএনপি দলই ঠিক নাই। গণতান্ত্রিক চর্চা বা আন্দোলনই বা কেমনে করবে, দেশ ও জাতিকে কি দিবে? নিজেরাই তো সংকটে। আরো আশঙ্কা ও হতাশার ব্যাপার হলো দলে গণতান্ত্রিক চর্চাও নেই।

বিএনপির এই কমিটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বংশধরদের এমনকি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামীসহ বিভিন্নভাবে বির্তকিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়েছে যা সত্যিই ভয়াবহ। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুকে এবারও সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কারাবন্দি লুৎফুজ্জামান বাবরকেও সদস্য করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধে মৃতুদন্ডে দন্ডিত সালাউদ্দিন কাদেরের পুত্রকে সদস্য এবং সাকার ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যানের পদ দেয়া হয়েছে। আবার যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে মৃত্যুবরণকারী আবদুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমকে নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা সমগ্র জাতির সঙ্গে, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ২ লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন সকলের সঙ্গেই প্রতারণা করেছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের খবরে আলোচিত আগের কমিটির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুকেও রাখা হয়েছে। বিএনপি যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের দল তা আবারো প্রমাণ হল। পাশাপাশি কমিটিতে আত্মীয় স্বজনদের প্রাধান্য দেয়ার মধ্য দিয়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদের হেয় করা হয়েছে। যা দেশের রাজনীতিতে নজিরবিহীন ঘটনা, যেন পারিবারিক-আত্মীয়তার কমিটি।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে দল ঠিকমতো কমিটি দিতে পারে না, তারা দেশ কী পরিচালনা করবে? মানুষকেই বা কী দিবে? বিএনপির এই কমিটিই বলে দেয় রাজনীতির শুভ পথে তারা নেই বরং তাদের লক্ষ্য হল যেকোনভাবে ক্ষমতায় যাওয়া- দুনীর্তিকে বৈধতা দেয়া। জিয়াউর রহমান যেমন যুদ্ধাপরাধীদের পুর্নবাসন করেছিল খালেদা জিয়া এখন যুদ্ধাপরাধীদের বংশধরদের পুর্নবাসন করছেন যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। আর বিএনপির রাজনীতি যে শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধীদের ক্লাব এটাও পুনরায় স্পষ্ট হল।
বিএনপির কমিটি নিয়ে ছোটবেলার পাড়ার বড়মাঠে ফুটবল খেলার স্মৃতি মনে পড়ছে। বিকালে আমরা যখন খেলতে যেতাম। বড় মাঠ, সবাই খেলতে আসত। সিনিয়র জুনিয়র সবাই, একটাই মাঠ, দুটো বারপোস্ট, প্রথমে খেলা শুরু হতো আসরের নামাজের পর। তারপর খেলোয়াড় বাড়তে থাকতো, খেলা চলতে থাকতো, প্রথম দুই গ্রুপে হয়ত সাতজন সাতজন করে, তারপর লোক বাড়ায় ১০ জন ১০ জন, আরো লোক বাড়লে যার যে পক্ষে মন চায় সেপক্ষে খেলবে, ১১ জনের বেশী হলেও দুই পক্ষে ভাগ হয়ে খেলত। কারণ কাউকে তো বাদ দেয়া যায় না, সবাই পাড়ার পরিচিত। সবাই খেলতে চায়, তাই নিয়মের কোন বালাই নাই, দেখা যায় এক দলে ১৫ জন আরেক দলে ১৩ জন। আর ফুটবল যেদিকে সেদিকে সবাই দৌড়ায়, সবাই স্ট্রাইকার, কেউ ডিফেন্স বা গোলকিপার হতে চায় না। খেলা চলে টাইমট্যাবল ছাড়াই, যে যখন মন চায় নামে, আবার উঠে, সন্ধ্যা নামলে খেলা শেষ। খেলা শেষে যে যার যার ঘরে ফেরা- নতুবা আড্ডা। বিএনপির কমিটি হয়েছে পাড়ার এই সার্কাস মার্কা ফুটবল খেলার মতো। কাউকেই বাদ দেয়া যায় না তাই সবাইকেই রাখ। তবে রাজনীতি কিন্তু পাড়ার ফুটবল খেলা নয় এটা হয়ত তাদের মাথায় নেই। তাই নাটকের নামের মতো করে বলতে হয় বিএনপির কমিটি নিয়ে “চলিতেছে সার্কাস।”
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







