আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রশ্নে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ৩ আগস্ট তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের শত ফুল ফুটছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট হবে, এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’
প্রশ্নটা এখানেই যে, গণতন্ত্রের ফুল ফোটাতে গেলে অর্থাৎ বিউটি থেকে ফুল পেতে গেলে সেই ফুলের গাছটা তো লাগাতে হবে। সেটি কি লাগানো হয়েছে? যদি এখনও লাগানো না হয় তাহলে সেই কাজটি কে করবে? আর গাছ লাগালেই তাতে ফুল ফোটে না; বরং তার পরিচর্যার প্রয়োজন। সেই বাগানের মালি কি তার কাজটা করছেন?
আমরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলি, যখন সংবিধান অনুযায়ী জনগণকে রাষ্ট্রের মালিক বলে দাবি করি, তখন এই মালিকানা বা গণতন্ত্রের প্রয়োগ দেখি কেবল ভোটের সময়। নিয়মিত বিরতিতে ভোট দেয়া ছাড়া আর কখন দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে বা করতে পারে, তা নিয়ে হাজারও প্রশ্ন করা যায়। আবার জনগণের ভোট ছাড়াও যে নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব, সেই উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। সুতরাং যে গণতন্ত্রের ফুল ফোটার কথা রাজনীতিবিদরা বলে থাকেন, সেই ফুল আসলে একটি বিমূর্ত ধারণা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নানামুখী রাজনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবেই দেশের বৃহত্তম দুটি দল ও জোটের বাইরে গিয়ে কথিত তৃতীয় ধারার বা তৃতীয় শক্তির আবির্ভাবের খবর আমরা পাচ্ছি। অনেক ছোট দল জোটবদ্ধ হয়ে একটি বড় শক্তিতে পরিণত হবার চেষ্টা করছে। ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় এটি হয়তো গণতন্ত্রের শত ফুল ফোটারই উদাহরণ। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে এসব জোটের কর্মসূচি ও কার্যক্রম কী হবে, তারা শেষ পর্যন্ত আলাদা জোটই থাকবে নাকি বড় দুটি জোটের ঘাটেই শেষ পর্যন্ত নোঙর করবে, সেটিও দেখার বিষয়।
সবশেষ এই জোট গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর উদ্যোগ। ২ আগস্ট রাতে রাজধানীর বারিধারায় তার বাসায় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার যে বৈঠক হয়েছে সেখানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জেএসডি সেক্রেটারি আব্দুল মালেক রতন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান এবং দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরাশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের। আশার কথা হলো, জোট গঠনের এই উদ্যোগকে সরকারের তরফে কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেয়া হয়নি। বরং স্বাগত জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং এই উদ্যোগকে ইতিবাচ হিসেবে দেখছেন বিএনপির মহাসচিবও।

এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। যদিও সেটি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। কারণ ওই জোটে যেসব দল রয়েছে, তারা দেশের মূলধারার রাজনীতিতে ওই অর্থে কোনো ‘ফ্যাক্ট’ নয়।
এরপর গত ৭ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত জাতীয় জোট নামে এইচ এম এরশাদও তার দল জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে একটি নতুন জোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যেখানে অধিকাংশ দলই ধর্মভিত্তিক। কিন্তু জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু গত ৫ আগস্ট একটি টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই বলেছেন যে, তারা আগামী নির্বাচনে সেই দলের সঙ্গেই জোট করবেন যাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা আছে। সেইসাথে এও বলেছেন যে, যাদের সাথে জামায়াত (নিবন্ধন বাতিল) আছে, তাদের সাথে জাতীয় পার্টি যাবে না। তার মানে তারা বিএনপির সাথে জোট করবে না এবং এ দুই নেতার কথায় এটি স্পষ্ট যে, তারা আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সাথেই জোট বাঁধবে এবং আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে।
জাতীয় পার্টি ক্ষমতার বৃত্তেই থাকতে চায়। যে কারণে তারা এখনও একইসঙ্গে সংসদে প্রধান বিরোধী দল আবার তারা সরকারেরও অংশ। সংসদীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় এরকম অদ্ভুত বিরোধী দল বিশ্বের আর কোনো দেশে আছে কি না সন্দেহ। আবার এই দলের প্রধান এইচ এম এরশাদ বরাবরই সরকারের নানা কাজের সমালোচনায় মুখর থাকলেও এবং যেকোনো সময় সরকার থেকে তার দলের নেতারা বেরিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিলেও তিনি নিজে এখনও মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত পদে বহাল তবিয়তে আছেন। অর্থাৎ গাছের উপরেরটা এবং তলারটা খেয়ে জাতীয় পার্টি যে মজা পেয়েছে, সেটি আগামী নির্বাচনেও তারা ধরে রাখার ব্যাপারে স্থিরপ্রতিজ্ঞ।

গণতন্ত্রের শত ফুল ফোটার ধারাবাহিকতায় জোট বা সমীকরণ নিশ্চয়ই ইতিবাচক। কিন্তু এসব জোট আখেরে দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে কতটা সহায়ক হবে, মূলধারার দুটি দল ও জোটরে বাইরে গিয়ে সাধারণ ভোটাররা এসব জোটে আদৌ আস্থা রাখবে কি না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। কেননা দেশের মানুষ এখনও ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে বিভক্ত। যতই সুশীল তৎপরতা সক্রিয় হোক না কেন, আখেরে মানুষ সিল মারে ওই নৌকা আর ধানের শীষেই। এই সংস্কৃতি আদৌ বদলাবে কি না বা কবে বদলাবে, তা বলা মুশকিল।
গণতন্ত্রের শত ফুল ফুটুক এটি সবারই প্রত্যাশা। কিন্তু সেই ফুলের গাছ লাগানোর দায়িত্ব যে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর, তারা নিজেরাই বা কতটা গণতান্ত্রিক, তারা নিজেদের দলের ভেতরেই কতটা গণতন্ত্রের চর্চা করেন, তারা পরিবারতন্ত্রের বাইরে গিয়ে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক চর্চার মতো পরিবেশ আদৌ তৈরি করতে পেরেছে কি না, এসব প্রশ্নও বহু বছরের।

আবার গণতন্ত্রের ফুল ফোটানোর কাজে একটা বড় দায়িত্ব যে নির্বাচন কমিশনের, বিশেষ করে ভোটের সময় যারাই আসলে প্রধান পক্ষ, যারা আসলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিকারী দলসমূহের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ রচনার কাজ করে, যারা আসলে গণতন্ত্রের ফুল ফুটতে মূল সহায়তাকারী তারা নিজেরা কতটা সক্ষম; কাজীর গরু কিতাবে থাকলেও বাস্তবে কতটা স্বাধীন এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি সেই প্রশ্নও আমরা বছরের পর বছর ধরে করছি।
সুতরা গণতন্ত্রের শত ফুল ফোটানোর জন্য সেই বাগানের মাটি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, গাছের বেড়ে ওঠার পরিচর্যার মতো সবগুলো ধাপেই রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের যে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার কথা, সেটি যদি তারা রাখতে পারে, তাহলে ফুল আসলেই ফুটবে। না হলে কলি ঝরে যাবে। মরে যাবে দেশ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







