গণপরিবহনে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার প্রথম সকালে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বেশির ভাগ দৃশ্য ছিল যাত্রী ও হেলপারের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। যাত্রীদের কাছে আগের সিটিং সার্ভিসের নির্ধারিত ভাড়া চাইলে যাত্রীরা লোকাল সার্ভিসের ভাড়া দিতে গেলেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।
সরকার এবং পরিবহন মালিক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোববার থেকে রাজধানীর গণপরিবহনে সব সিটিং সার্ভিস বন্ধ হলেও অল্প দূরত্বে আগের মতোই বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কুড়িল বিশ্বরোড থেকে মহাখালী প্রতিদিন যাতায়াত করেন নাজিম। সিটিং সার্ভিসে এতদিন ২০ টাকা দিলেও লোকাল সার্ভিসে ভাড়া ছিলো ১৫ টাকা। কিন্তু এতদিনকার সিটিং সার্ভিসে আজও তাকে দিতে হয়েছে ২০ টাকা।
অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে ভাড়া দিয়ে নাজিম বেশি ভাড়ার কারণ জানতে চাইলে বাসের হেলপার বলেন, ‘বাস লোকাল হইছে, ভাড়া আগেরটাই আছে। আমরা এহোনো চার্ট পাই নাই, আর মালিকও বলে নাই কত নিতে হইবো। দিনশেষে তো আমাদের থেকে আগের নিয়মেই মালিক টাকা চাইবো। তাই ভাড়া কম নেওনের সুযোগ নাই।’
ভাড়ার এমন যাতাকলে পড়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে নাজিম বলেন, বাসে প্রচণ্ড ভীড় বসার কোনো জায়গা নেই, এরপরও যাত্রী উঠিয়ে যাচ্ছে। যেখানে বাস থামার কথা না, সেখান থেকেও লোক উঠানো হচ্ছে। বাস তো লোকাল হয়েছে কিন্তু ভাড়া তো লোকাল হয়নি। জনদুভোর্গ কমাতে গিয়ে জনদুভোর্গ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। এর ফলে সিটিং সার্ভিসের ব্যবসা কমার বদলে ওদের আরো লাভই হচ্ছে।
চাকরির কারণে প্রতিদিন শেওড়াপাড়া থেকে মহাখালী আসা কর্মজীবী নারী লাবনী জানান, ‘আগে ২০টাকা দিয়ে সিটিং সার্ভিসে আসতাম। ভাড়া বেশি দিলেও মনের মধ্যে কিছুটা শান্তি থাকতো। বাড়তি যাত্রী নেই, হৈহুল্লোর একটু কম। আর আজকে ২০ টাকা ভাড়া দিলাম কিন্তু বাসের চিত্রটা ভিন্ন। অতিরিক্ত যাত্রী, বাসের মধ্যে বিশৃঙ্খলা, ভাড়া নিয়ে ঝগড়া। একসময় অতিষ্ঠ হয়ে বাস থেকে নেমেই গেলাম।’
‘হেঁটেই আজ অফিস পৌঁছালাম । কিন্তু এই দুভোর্গ যে নিত্যদিনের সঙ্গী হবে সেটা বুঝে গেছি। কোনো আইন না মেনে এভাবে গণপরিবহন ও ভাড়া আদায় চললে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষরা কোথায় যাবে?’ বলছিলেন কর্মজীবী নারী লাবনী।
সিটি সার্ভিস বন্ধ হলো কিন্ত ভাড়ার কেনো পরিবর্তন নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘সিটিং সার্ভিস বা লোকাল বলতে কোনো কথা নেই। বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়া নিতে হবে। তবে ভাড়া নিয়ে আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসছে। কোনো জায়গায় ভাড়া ঠিক মতো নেয়া হচ্ছে, আবার কোনো জায়গায় হচ্ছে না। একদিনে আসলে ভাড়ার নৈরাজ্য ঠিক করা সম্ভব নয়। ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য যাত্রীদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।’
গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফিরে না আসা পর্যন্ত বিআরটিএ, পরিবহন মালিক সমিতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে যাবে বলে জানান তিনি।
এছাড়া রাজধানীর গুলশান নতুন বাজার থেকে মহাখালী-আগারগাঁও-গাবতলী হয়ে সাভার রুটে চলাচল করা অগ্রদূত পরিবহন এবং খিলগাঁও থেকে মিরপুর রুটের হিমাচল পরিবহনে লোকাল সার্ভিসের মতো অতিরিক্ত যাত্রী নিলেও রোববার আগের মতোই অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই গাড়ীগুলো এতদিন তথাকথিত সিটিং সার্ভিসের নামে বেশি ভাড়া আদায় করে আসলেও অতিরিক্ত যাত্রী নিতো না বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কৌশল বন্ধ করতে গণপরিবহনে সিটিং, গেটলক ও স্পেশাল বাস সার্ভিস আজ থেকে বন্ধ হয়েছে। এর আগে গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ সার্ভিস বন্ধ ঘোষণা করে ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি। ওই দিন সমিতির পক্ষ থেকে বিআরটিএ নির্ধারিত চার্ট অনুসরণ করে গণপরিবহনগুলোকে ভাড়া আদায়ের কথা বলা হয়। কিন্তু এতদিন সিটিং সার্ভিস হিসেবে চলা বেশিরভাগ গাড়ীতে বিআরটিএ’র চার্ট দেখা যায়নি।
ছবি: রণ মাহমুদ







