এক
বালক বয়সে আমাকে বাজার করতে পাঠানো হবে শুনলেই আগাম প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনায় খুশিতে বাকবাকুম হয়ে উঠতাম। আমার সেই বয়সে বাজারে পাঠানো মানেই বিনা নোটিশে পৃথিবীর বুকে খুশির নহর বয়ে যাওয়া এক অনাবিল আনন্দের দিন।
মানুষ ঠকে ঠকে কঠিন চিবরের মতো কিছু সত্য ইচ্ছের বিরুদ্বে তার জীবনে মেনে নেয়। সুখের দিন বেশিদিন থাকে না- সম্ভবত সেসব সত্যগুলোর মধ্যে একটি এবং আমার জন্য অন্যতম।
দুই
বাজার করতে আমার ভালোই লাগে। মাছের বাজারে ঢুকলে যখন দেখি জ্বলজ্বলে আলোয় সিলভারের বড় থালায় হরেক পদের তাজা মাছগুলো লাফালাফি করছে আমি তখন অপার আনন্দ লাভ করি। তরতাজা তরিতরকারি দেখলেও আমি একই আনন্দে উত্তেজিত হয়ে উঠি। ব্যাগ ভর্তি করে তরিতরকারি বাসায় আনতে সাধ জাগে। প্রিয় লেখক, কবি আবু কায়সারের কাছে শুনেছি কবি জসীমউদদীনের নাকি বাজার করার বেজায় বাতিক ছিল। তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে বাজার করতেন। তার এই বাজার করার কারণ হিসেবে তিনি নাকি ঘনিষ্ঠজনদের বলতেন, বাজারে গেলে ক্রেতা বিক্রেতার পারস্পরিক কথাবার্তা, তর্কবিতর্ক, চালচলন দেখলে আর শুনলে বিনে পয়সায় দেশের দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির আঁচ করা যায়। মানুষের ঘরের খবরও নাকি বাজারে শোনা যায়!
তিন
ঘরে থাকলে শুয়ে বসে, নিজের মতো করে নিজের মধ্যে থাকাটাকে একান্ত আরাধ্য বলে জ্ঞান করি। আজো তাই করছিলাম। কিন্তু ঐ যে ‘সুখের দিন বেশিদিন থাকে না’- আছে না!
সকাল থেকে বৃষ্টি বৃষ্টি আবহাওয়া, গতরাতের বৃষ্টিতে আশেপাশের রাস্তাঘাট, গলি থিক থিক করছে। বাতাসের শরীরেও এক ধরণের বিবাগী গন্ধ ঘুরপাক খাচ্ছে। শুয়ে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না।
ঘরে রান্না হচ্ছে। নোনা ইলিশ মাছের সঙ্গে কম-কম ঝোল করে চিকন বেগুন দিয়ে, মিষ্টি কুমড়া চাক চাক করে ভাজি, মাসকলাইয়ের ডাল আর শোল মাছের মাথা দিয়ে লাউ।
এর মধ্যে হঠাৎ করে মনের মধ্যে একটু মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার স্বপন আলোর নাচনের মতো নেচে উঠল।
একটু বাজারে যাওয়ার খায়েশ জেগে উঠল।
কি আর করা!
মধ্যবিত্ত হয়ে উঠলাম।
আমার আচানক বাজারে যাওয়ার মাতমে স্ত্রী কন্যা প্রায় হতভম্ব!
তারা ভাবছে, লোকটার কি মাথায় গণ্ডগোল আছে!
এতক্ষণ তো ভালোই চলছিল ঘরের ভেতর গান শোনা, বই পত্র ঘাঁটাঘাঁটি, একেতাকে ফোন- হঠাৎ কি এমন হলো তাকে এই বৈরি আবহাওয়ার ভেতর ছুটতে হবে বাজারে!
চার
মাথার ওপর মন খারাপ করা মেঘমেদুর সকালবেলা নিয়ে কাছের বাজারে গেলাম। অনেক কাল পর মাছের ঘরে ঢুকে বিভিন্ন পাওয়ারের ঝুলে থাকা লাইটের আলো আমাকে মুহূর্তের মধ্যে নিয়ে ফেলে দিল দয়াগঞ্জের বাজারে। আমি একটু ধাক্কাই খেলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই ধাক্কা সামলে নেয়ার চেষ্টা করি। সামাল দেয়া কি এত সহজ!
পাঁচ
শুধু আমি না আমার মতো আরও অনেক মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, অর্ধ নিম্নবিত্ত মানুষের দল মাছের বাজারে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। মাছের বাজারে লোকজনের কথাবার্তা তাদের নিজেদের অজান্তে এক ধরণের গুনগুন সুর তোলে। এই সুরটা আমার সবসময় ভালো লাগে।
আমি মাছ বাজারের মানুষজন দেখি।
তাদের অঙ্গভঙ্গি পড়ি।
মাছবাজারের এসব দেখতে দেখতে একসময় আমি আবিষ্কার করি এইসব মানুষজনের সামনে যত না ঝলমল করে উঠছে ঝুলে থাকা লাইট, লাইটের আলো, ক্রেতা বিক্রেতাদের বারোয়ারি কথাবার্তার গুনগুন সুরধ্বনি আর মাছেদের বিত্ত বৈভবের বহুমাত্রিক উচ্ছ্বাস তারচেয়ে আমার সামনে অনেক অ-নে-ক বেশি ঝলমল করে উঠছে বালকবেলায় বাজারে যাওয়ার সংবাদ শুনে আগাম প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনার বিপরীতে নেচে ওঠা আমার আনন্দেরা…








