কি রে!
ফুল খেলা সামলে জানতে চায় হাসু।
কামাল কিছু বলে না। লজ্জা পাচ্ছে কি বলতে? আপুর সঙ্গে খেলছে একমনে।
– হাসু আপু, ও হাসু আপু! কামাল আপুর জামার হাতা ধরে টানছে।
– কী বলবি ভাই বল না।
– তোমার আব্বুকে আমি একটু আব্বা বলে ডাকব! আমাকে আব্বা বলে একটু ডাকতে দেবে?
সেদিন পুতুল পুতুল চোখের কামালের কথা শুনে হাসু কি যে অবাক হয়েছিলো; কী অদ্ভুত কথা বলছে তার ভাইটি। সেটা কি তখন অবাক হওয়ার বয়স? নাকি তখন হেসে ফেলেছিলো হাসু? সে বলেছিলো, হ্যাঁ রে, আব্বু কেবল আমার আব্বা হবে কেনো! ঐ আব্বু তোরও আব্বু। চল, চল, আব্বা এবার তোকে কোলে নেবে।
কামালকে সে আব্বার কাছে নিয়ে গেছে। গট গট করে বলেছিল কামাল যা বলেছে।
তারপর আব্বা ওকে গভীর বন্ধনে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। রেখেছেন অনেকক্ষণ। আব্বা বুঝি আর তাকে কাছ ছাড়া করতে চাননি। বলেছেন, ও বাপরে, আমিই তোর বাপ গো।
সবুজ মাঠ, শত বর্ণা ফড়িং আকাশ নদীর ফ্রেমে বাঁধানো সেই দিনগুলি।
আজও যেন দেখতে পাচ্ছে অবিকল। কোন স্মৃতি ছবিই হাতড়াতে হচ্ছে না।
সব চোখের সামনে আপনাই ভেসে উঠছে।
কামাল ও হাসু পিঠাপিঠি। একে অপরের চোখের সামনে কখন যে বড় হয়ে উঠল টেরই পায়নি। কামাল তার আপুর জন্য কেবল কি রাজহাঁস-পূর্ণিমার গোল চাঁদ; হাতির শূঁড়ের মতো দেখতে নীল মেঘ; হাসু যা চাইত – সবই আদুল আদুল পায়ে ছুটে ছুটে এনে দিতে চাইত। কচুপাতার ওপর শিশিরের হীরক বিন্দু – চেষ্টার পর চেষ্টা চালিয়ে হন্যে – হাসু আপাকে দেবেই সেই হীরকজল। কিন্তু কী যন্ত্রনা! ও পাতায় হাত ছোঁয়াতেই ফোঁটাটা গড়িয়ে যেতো – হাসু ভাইয়ের ভালবাসায় হাসতো – আর আপুকে তা দিতে না পেরে তার কি কষ্ট।
তারপর আপু যখন খেলতে বসত – কামাল হরেক বুনোফুল, সজনে কুঁড়ি, বেল ফুল; কাঁঠাল পাতা, মুঠো মুঠো কাঁঠালচাঁপার গন্ধ বোনের জন্য এনে দিত।
এসবের বিনিময়ে সম্ভবত ওর চাওয়া ছিলো একটাই – আব্বাকে একটু আব্বা বলে ডাকতে দিতে হবে।
এই ছবিগুলোর অক্ষয় ফ্রেম হাসুর সামনে দিয়ে এখন ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে। মনে হচ্ছে কামালের কাঁধে মাথা রেখে যদি কাঁদতে পারত – কামাল আমার ভাইটি।
হাসু এখন ভাইদের কাছে ছুটে যেতে চাইছে – রাসেলকে কোলে নিতে চাইছে – কিন্তু ব্রাসেলস থেকে ঢাকার এই দীর্ঘ পথ কেমন করে মুহূর্তে পাড়ি দেবে –
আবার যেন টের পাচ্ছিল – কামাল আমার পাশেই। ওরা দু’জন মনমরা হয়ে টুঙ্গিপাড়ার সবুজ বাড়ির শ্যামল উঠোনে বাবার অপেক্ষায়। শহরে মাঠের পাশের শাদা টিনশেড বাড়ির বারান্দায় বসে বাবা বলেছিলেন – শিগগিরই তিনি বাড়ি আসবেন। কবে কবে কবে – হাসু আকুল হয়ে জানতে চেয়েছিলো।
এই তো মাত্র আর কয়েকটা দিন – তারপর কেউ আটকায়া রাখতে পারবে না।
সেই প্রথম জানল – আব্বাকে কেউ আটকে রেখেছে চার দেয়ালের মধ্যে। কারা তারা? কেনো আটকে রেখেছে আব্বাকে? হাসুর মনে প্রথম প্রশ্নের স্ফূরণ।
আর কামাল করল অবাক কাণ্ড। হাসু আপুর আব্বুকে সে আস্তে আস্তে আপনার করে নিচ্ছিল। কিন্তু তীব্র প্রকাশ ছিল না। হাসু আপুর আব্বুটা খুব ভালো। খুব আদর করছে দুঃখী ছেলেটাকে। এক সময় দেখা গেল ছোট্ট হাতে সে বাবার পাঞ্জাবীটা টেনে ধরেছে। পিতা তার আঙুল-হাত বাড়িয়ে দিলেন পুত্রের দিকে। আঙুল ধরে বাবাকে টানছে।
কী ব্যাপার! কামাল টানছে কেনো? সে কী চায় –
বাড়ি চলো – বালি চলো – সন্তানের সে কি আকুল আহ্বান। আব্বা নিশ্চয়ই সেই কোমল ডাকে আপ্লুুত হয়ে পড়েছিলেন। তার চোখও হয়তো ভিজে যাচ্ছিল গোপন অশ্রুতে।
তিনি সহাস্যে মাকে বললেন, দেখ রানু, তোমার ছেলে তো আমাকে আর জেলে থাকতে দেবে না। বড় হয়ে নিশ্চয়ই আমাকে জেলের তালা ভেঙে আনবে।
আব্বার সেই কঠিন কারাগার জীবনে পুত্র-কন্যার স্মৃতি বলতে এইসব সুবর্ণ মুহূর্তই ছিল সঞ্চয়।
মায়ের উদ্দেশ্যে বাবার সেই উক্তি নিশ্চয়ই ছিল সন্তানের প্রতি স্নেহশীল মহৎ পিতার আশীর্বাদ।
কিন্তু সেবার সঙ্গে ওরা করে বাবাকে আনতে পারেনি। তারপর শ্যামল আঙ্গিনায় ভাইবোন খেলে আর অপেক্ষা করে – আব্বা আসছে।
দু’দিন যায়, তিনদিন, সপ্তাহ যায় – আব্বা আসে না।
ওদের সে এক অপেক্ষার দিন গেছে।
বাইগার নদীর তীর থেকে একটা টুনি খাল পূবে ঢুকে পড়েছে। খালটি থেমেছে যেখানে বাঁশঝাড়, আম সজনে কাঁঠালের নিচে দিয়ে পথ এসে বাড়ির চত্বরে পৌঁছেছে – ওরা সেই পথটির পানে তাকিয়ে থাকত। ওখানে কাচারি ঘর। বুনো গন্ধঅলা পাতা লতা ঝোঁপ। ওরা কখনো ছুটতে ছুটতে কাচারি অবধি ছুটে যেত।
মাস যায়। দিন যায়। থানা, কোর্ট কাচারি ছাড়া বাবার সঙ্গ পায় না।
একদিন দেখে – কামাল তার ছোট্ট হাত তুলছে, নামাচ্ছে। আর কী যেন বলছে। আরেকটি বুকে চাপড় দিচ্ছে দারুণ ভঙ্গিতে।
আস্তে কাছে গিয়ে শুনলো – কী বলছে ভাইটি।
কতই বা বয়স তখন! বলতে গেলে হাসুও একরত্তি বুটিদার লাল শাদা ফ্রক।
কামাল আব্বুর নাম নিচ্ছে বারবার। ছন্দে ছন্দে বলছে – শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।
তখনও হাসু পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারেনি – কামালের মিঠে নরম উচ্চারণের সেই ছন্দ শ্লোগানেরই ছন্দ।
বাবার মুক্তির জন্য মিছিল হয়ে থাকবে এলাকায়। কাচারি ঘরে, টুনি খাল পাড়ে তার ঢেউ তো আছড়ে পড়বেই।
কামাল শান্ত, চুপচাপ। অতি নিরীহ। কিন্তু তার চিত্ত তখনই জাগ্রত। তার স্মৃতিশক্তিও প্রখর।
কাচারি থেকে বেশ কয়েকটি আগুন বুলি সে ওই বয়সেই মুখে তুলে এনেছে। এখনও শুনতে পাচ্ছে হাসু সেই মায়াবী উচ্চারণ – শেখ মুজিব, শেখ মুজিব, মুক্তি দাও মুক্তি দাও।
‘মুক্তি’ শব্দটা ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারছে না শিশুটি। ‘মুকতি’ মতোন হচ্ছে।
মাকে বলল হাসু, কামালের শ্লোগানের কথা।
শুনে আম্মা হাসেন। তুই সত্যিই মুক্ত করে আনবি তোর আব্বাকে বাপধন!
কামাল হাসুর ভাই। আব্বাকে যে কি গভীর ভালবাসতো – যৌবনেও তার প্রমাণ দিয়েছে।
আব্বার সামনে বরাবর চুপচাপ। একটু দূরে দূরে। কিন্তু কত দূরে! ও সব সময় আম্মার স্নেহে ছায়ার মতো থাকত। জেলজুলুম, নির্যাতন, আন্দোলন, আগুন লড়াই – এসবের মাঝেও আব্বা ফুরসৎ পেলে সন্তানদের বুক আগলে রাখতেন। তার তেপান্তরের মাঠের মতো দীঘল বুকে ওরা ঠাঁই পেত। কামাল শুকনো লম্বা মানুষ। ও তার বুকে সর্বদা আম্মাকে আগলে রাখত।
ওর বুক চাপড়ানো মুঠোভরা উচ্চারণ – ‘শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ এখনও যে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে।
হাসুর চোখের জলের হঠাৎ স্বস্তি – আব্বার যাই হোক, যত কঠিন অসুখই হোক, যত কঠিন আঘাত – কামাল নিশ্চয়ই বাবাকে আগলে রাখবে। ও থাকতে পিতার গায়ে সামান্য আঁচড় লাগতে দিবে না।
বাবার সান্নিধ্য না পাওয়া সেই শিশুটি এবার ছাব্বিশ বছরে পা দিয়েছে। বয়সের তুলনায় তার চেহারা অনেক পরিণত। বাবার দুর্বার সাহস, মানুষের পাশে থাকবার স্পৃহা – সাধারণ আটপৌরে জীবনযাপনের প্রতি স্বভাবগত মোহ – ষোল আনাই সে পেয়েছে। বত্রিশ নম্বর, ভার্সিটি ক্যাম্পাস, আবাহনী ফুটবল – তিন ঠিকানাতেই কামালের শত কাজ। এমনও হয়েছে, ওকে হাসুর দরকার। হাতের কাছে খুঁজে পাচ্ছিল না। কোথায় সে!
পরে জানলো, একদল ঠাঁইহারার জন্য কামাল ছুটে বেড়াচ্ছে। কারা তারা? ঢাকা ভার্সিটি অথরিটি ক্যাম্পাসের ভেতরকার বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বড় হচ্ছে। অনেক জায়গা দরকার। কোনো জায়গা এখন আর ফেলে রাখার উপায় নেই। কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া গরীব মানুষগুলো কামালকে খুব করে ধরেছে। তারা এখন যাবে কোথায়! কামালের ক’দিন ধরে নাওয়া নেই। খাওয়া নেই। কামাল গণপূর্তর অফিসে নানা দরবারে ছুটছে।
ক্যাম্পাস তাড়ানো মানুষগুলোর তো ঠাঁই চাই। মিরপুরে খাসজমি প্রচুর রয়েছে। ওখানে বে-ঘর লোকগুলোকে ঘর দেয়ার জন্য তার প্রাণান্ত ছুটোছুটি। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তাতে কী! সে আছে মাটির অকৃত্রিম কাছে।
চেনা পরিচিত অনেকেই ভ্রুকুটি হেনেছে। পেছনে কামালের কাজ নিয়ে রঙ ছড়াচ্ছে। শুভানুধ্যায়ী কেউ কেউ বলেছে, এসব তো তোমার কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের কাজ এসব নয়। তুমি এসব বস্তির ফকির মিসকিনদের জন্য ছুটছো কেনো! তুমি তো থাকবে বাদশাহীর আরাম-বিছানায়।
এসব কথায় কষ্ট পেয়েছে কামাল। তাকে থামানো যায়নি। গরিব মানুষ, ফকির মিসকীন, মজুরদের ভালবাসাতেই তার পিতা আজ জাতির পিতা। গরীবের পাশে না দাঁড়িয়ে সে পিতৃঋণের সঙ্গে বেঈমানি করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীপুত্র হয়েছে বলে সে আরাম আয়েশে ডুবে থাকবে – আম্মা তাকে সে শিক্ষা দেয়নি।
বাবা তখন প্রেসিডেন্ট – বঙ্গভবন তার জন্য প্রস্তুত। হাসুরাও সবাই ওই শাদা অট্টালিকায় উঠবে – তেমনটাই ভেবেছিল অনেকে। মায়ের কানে প্রস্তাবের কানাঘুষা আসতে তিনি আবারও ক্ষুব্ধ। তার আশঙ্কা ওই প্রাসাদে এই প্রাণের আনন্দময় সাবলীল পরিবেশ থাকবে না। সন্তান-সন্ততিকে তিনি যেমন সাধারণ পরিবেশে দেখতে চান তাতে মারাত্মক ছন্দপতন হবে।
কামালও এই প্রস্তাবের মোটেই পক্ষে ছিল না। যারাই তার সামনে এই প্রস্তাব তুলেছে – সাফ জানিয়েছে, বঙ্গভবনে আমরা যাব না। আম্মা যাবেন না। আমরা বত্রিশ নম্বরেই থাকব।
বাড়িটার জন্য তার অসম্ভব দরদ। দরদ হাসুদের সকলের। আম, কাঁঠাল সুপারি নারকেলের ছায়ায় কী প্রশান্তি; গাছে পাখপাখালির কিচির মিচির – সানশেডে কবুতরের বাকবাকুম।
এই বাড়ি থেকেই দেয়াল টপকে জান হাতে নিয়ে কামাল পালিয়ে যোগ দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। মাত্র বিশ-একুশ বছর বয়স তখন। জামাল তখন আরও ছোট। ষোল-সতের বছর। পিতা ডাক দিয়েছেন। ওরা অকুতোভয়। সাড়া দিতে একটুও বুক কাঁপেনি।
জামাল এখন সেনা অফিসার।
কামাল এখনো অগ্রসেনানী। ধ্বংসপুরী দেশটাকে সাজাতে বাবার পাশে সে সামান্য মাঠকর্মী। সাধারণ মানুষের সঙ্গেই মিলে মিশে আছে সে। কামাল ভুলেও প্রেসিডেন্টের রাজপ্রাসাদপুত্র হয়ে যায়নি। রাজনীতির মেঠো পরিচয় ছেড়ে সে প্রেসিডেন্ট নন্দন হতে মোটেই রাজি নয়।
ও কথা বলে কম। চশমার ভেতর দু’চোখে তার জ্বল জ্বলে প্রত্যয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। গুরুগম্ভীর বিষয়ও অল্প কথায় ব্যাখ্যা করত।
কিছুদিন ধরেই সে নৈরাজ্য, সাবোটাজের আশঙ্কা করছিল। গুপ্তহত্যা বেড়ে যাওয়ায় ছিল খুবই উদ্বিগ্ন। আপুকে একাধিকবার বলেছে, হাসু আপু, ফিফথ কলাম গোপন মিশনে নেমেছে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। পঞ্চম বাহিনী মিত্র বেশেই থাকবে। ওদেরকে চিহ্নিত করা খুব জরুরি। ওরা সবকিছু তছনছ, লণ্ডভণ্ড করে দিতে চাইবে। ওরা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে চাইবে।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় উদ্বিগ্ন আব্বা নিজেও। গুপ্তহত্যা বাড়ছে। চার জন এমপিকে খুন করা হয়েছে।
আব্বা বুক পেতে সব সামলাচ্ছেন। ব্যাঙ্ক ডাকাতি, অস্ত্র লুণ্ঠন, থানায় হামলা হচ্ছে। ক্যাম্পাসেও অস্থিতিশীলতার পাঁয়তারা। গত বছর আব্বা যখন চিকিৎসার জন্য মস্কোতে। হাসুরা সকালে ডাইনিং-এ বসে নাস্তা করছিল। কামালও টেবিলে। হঠাৎ ফোন বাজতেই সে উঠে যায়। খানিকবাদে এসে জানাল বিস্ময়কর এক খারাপ খবর। ক্যাম্পাসে সূর্যসেন হলে সাত ছাত্রলীগ কর্মীকে স্টেনের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছে। আগের দিন রাতের বেলায় এই পৈশাচিক হত্যা। ক্যাম্পাসে রক্তের হোলি খেলা – ওরা উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত হয়েছিল কম নয়।
কিন্তু কামাল নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনি। মুহূর্তেই সে নাস্তার টেবিল ছেড়ে উঠে যায়। নিজেই ছুটে যায় ক্যাম্পাসে। ওর মধ্যে বিন্দুমাত্র ভয়ডর দেখা যায়নি। এই নির্ভীক চিত্তের জন্য তাকে মাশুলও গুনতে হয়েছে। ওর তৎপরতার পথে কাঁটা বিছানোর জন্য রটানো হচ্ছে অদ্ভুত সব দুর্নাম।
পঞ্চম বাহিনীর দড়বাজ দস্যুদের ছায়া দেখতে পাচ্ছে কামাল। ওদেরকে কব্জা করতে না পারলে দৌরাত্ম্য বাড়বেই। ওরা দজ্জালের মতো চেটেপুটে খেয়ে ফেলবে সব। কামাল মাঠকর্মী। বাবা জাতির পিতা, দেশের হর্তাকর্তা। অবিসংবাদিত নেতা – তাকে তার দায়িত্বের অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। দেশকর্মীর দায় পালন থেকে সে সরে আসতে পারে না।
ব্যাংক ডাকাতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছিল। এক সন্ধ্যায় খবর এলো, মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকশালে দস্যুরা হামলা করেছে। ওরা ট্রেজারি লুট করে পালাচ্ছে।
কামাল স্থির থাকতে পারেনি। সে-ও মাইক্রো নিয়ে ছুটলো। লুটকারীদের বীরদর্পে ধাওয়া করতে জানবাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
পরদিন গণকণ্ঠে ব্যানার হেডলাইন – ঘটনার ভয়ঙ্কর বানোয়াট বিবরণ। তাতে আকারে ইঙ্গিতে কামালকেই বলা হলো ব্যাংক ডাকাতির সঙ্গে জড়িত।
চমক-বিস্ময়ের চেয়েও ভয়ংকর মিথ্যে।
আব্বা-আম্মা-হাসু-জামাল পরিবারের সবাই বেকুব, বিহ্বল।
আব্বা খুব কষ্ট পেলেন ভয়ংকর এই মিথ্যায়। এই কি স্বাধীন বাংলার মুক্ত গণমাধ্যম? এই অবাধ নির্বিচার মিথ্যা প্রপাগান্ডার নেপথ্যে কারা! তাদের টার্গেট কি!
জঘন্য রটনা তারা পত্রিকার পাতায় বিশাল বিশাল অক্ষরে ছাপতেও দ্বিধা করেনি! এই যদি হয় মুদ্রিত মিথ্যাচার। তা হলে মুখে মুখে গুজব-রটানো হচ্ছে কতগুণ!
সেদিন মুদ্রিত সংবাদের কথা জেনে বত্রিশ নম্বরে ওরা যেভাবে বিস্ময় স্তব্ধ হয়েছিল, একবারও তাতে মনে হয়নি ওরা দেশের মুকুটহীন গণ-সম্রাটের সন্তান। যার অঙ্গুলি হেলনে প্রশাসন চলছে – তার পুত্রকে নিয়ে জঘন্য মিথ্যা ছেপেও ওরা আহ্লাদে নিশ্চিন্ত। ওদের পক্ষে সবই ছাপা সম্ভব; কেউ তাদের কিছু বলবে না। আশ্চর্য! আব্বা এমনই বরাভয়; অকুণ্ঠচিত্তে মিথ্যা বলার স্বাধীনতা দিয়েছেন।
হাসু তখন কেবলি ভাবছিল গল্পের গরু কিভাবে চারপায়ে হেঁটে হেঁটে গাছে চড়ল! বানোয়াট গল্প রটনারও তো সীমা থাকে। তারও নিশ্চয়ই মাথামুণ্ডু থাকে। এই ডাকাতি গল্পের মাথা কই, মুণ্ডু কই! ব্যাঙ্ক ব্যবসা, রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন – সবকিছুর দণ্ডমুণ্ডের কর্তার পুত্রের বিরুদ্ধে ব্যাঙ্ক ডাকাতির অভিযোগ – টাকাপয়সা চাইলে তার ব্যাঙ্কে যাবার কী দরকার – কী হাস্যকর তামাশা! ডাকাতি তো পরের কথা – কামাল তখন চাইলে ব্যাঙ্কই এসে হাজির হতো বাড়িতে। অর্থ সম্পদ, টাকাপয়সার প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ নেই আব্বুর। লোভ লালসাবিহীন চিত্তের ষোল আনাই পেয়েছে কামাল। কামাল ফিফথ কলামের কথা বলেছিল। ওর পঞ্চম বাহিনীকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বইয়ের পাতার তত্ত্ব কথাই ধারণা করেছিলো হাসু। পরে আর আন্দাজ করতে কষ্ট হচ্ছে না, ইয়াজুজ মাজুজরা জিহ্বায় শান দিচ্ছে। বহুরূপী লেবাস পরে ওরা কখনো ক্যাম্পাসে লাশ ফেলছে। কখনো অদ্ভুত প্রপাগান্ডায় মত্ত।
হাসুদের জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। আব্বা এই ভয়ংকর মিথ্যার সংবাদ প্রকাশকেও উদারতার দৃষ্টিতে দেখলেন। মুজিবপুত্রকে ওরা শতমুখে গালি যখন দিচ্ছে দিক; তার সফেদ পাঞ্জাবীতে যখন কালির ছিটা লাগাতে চায় – লাগাতে দাও – দেশ-জাতি-সংসারের পিতা হয়ে তিনি নীলকণ্ঠ; তাকে আকণ্ঠ বিষ পান করে যেতেই হবে। সকল অসুন্দরকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা; সকল যন্ত্রণা বেদনা কষ্টকে মুখ বুজে সহ্য করা – এই বুঝি জাতির পিতার নিয়তি।
কামাল আব্বারই দীর্ঘ ছায়ার প্রশান্তি। তাকেও সব গুজব গঞ্জনা সহ্য করতে দেখা গেছে। বাড়ির তিনতলায় ছাদ লাগোয়া শাদামাটা থাকার রুমটি। সংলগ্ন একটি বাথরুম। ওই দীনহীন কক্ষটিতেই থাকতে পারার মধ্যেই তার সর্বসুখ। আব্বার মতো অসীম সহ্যগুণ ওর মধ্যেও ষোলআনা। তার মৃদু মূল্যায়ন – ওই কাগজটা পঞ্চম বাহিনীর দস্যুদের মুখপাত্র। ওরা চাইছে দেশে লুটপাট, ব্যাঙ্ক ডাকাতি, হত্যা গুম নৈরাজ্য বেড়ে যাক। নির্দোষে দোষ চাপিয়ে ওরা তাই আসল ব্যাঙ্ক ডাকাত-লুটেরাদের রক্ষা করতে চাইছে। যত নৈরাজ্য, তত মুজিবকে ভুলুণ্ঠিত করা সম্ভব।
কী ঘটছে ঢাকায়! বাবা অসুস্থ? নাকি পঞ্চম বাহিনী সত্যিই ভয়ংকর কোনো নৈরাজ্য ঘটিয়ে ফেললো!
ওয়াজেদ সাহেব, সানাউল আঙ্কেল, মিসেস এ্যামবাসেডর – সবার মুখ শুকনো। যে প্রশ্নই করে হাসু – পরিষ্কার উত্তর পাচ্ছে না। দুঃসহ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। কিন্তু কেউ তা বুঝতে পারছে না।
ভাই কামালের কি কিছু হল!
ছাব্বিশ বছরে পা দিয়েছে এই আগস্টেই – মাত্র ক’দিন আগে! আর তার কয়েকটা দিন আগে বউ করে ঘরে এনেছে খুকীকে। ওদের হাতের মেহেদীর রঙ এখনো শুকোবার কথা নয়! হাসুর ভাইটির যদি কিছু হয় – সে তা সহ্য করতে পারবে না কিছুতেই।
সে জানতে চাইল – কামালের কিছু হয়েছে কিনা! কামাল কি গোপন আততায়ীর হাতে আহত-অসুস্থ?
তার প্রশ্নে ওরা কেমন বেদিশা! ওদের দৃষ্টি নিষ্প্রাণ-শূন্য! মিসেস এ্যামবাসেডর বললেন, তারাও স্পষ্ট কিছু জানেন না।
যদি কিছু নাই জানবেন – তবে এরা বাড়িটাকে এমন শোকপুরী বানালেন কেনো। মনে হচ্ছে এটা যেন মরণঘর। বাতাস নেই, অক্সিজেন নেই। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এই মরণঘর থেকে কখন মুক্তি?
পশ্চিম জার্মানির বনেই ওদের পরবর্তী গন্তব্য। ওখান থেকে ঢাকায় যাবার বন্দোবস্ত হবে কিনা সে ব্যাপারেও জবাব মিলছে না। এই ব্যাপারও খুব গোলমেলে, রহস্যময় লাগছিল।
ওয়াজেদ সাহেব বললেন, ভেঙে পড়ো না। একটা কিছু ব্যবস্থা হবেই।
হাসু তার কাছে আবার জানতে চাইল কামালের কিছু হয়েছে কিনা – তিনি নিরুত্তর। এমনভাবে মাথা নাড়লেন চোখের সামনে যেন বেদনাবহ কোনো আলামত দেখছেন।
কী হতে পারে কামালের!
ভাইটি তার রাজহাঁসের মুক্তোর মত চকমকে গ্রীবার পালক-পশম এনে দিতে চেয়েছিল। বড় হয়েও তার সেই দেয়ার অদম্য-আকাঙ্ক্ষা মরে যায়নি।
হাসুর বিয়ে হয়েছিল নিরানন্দময় পরিবেশে। তা নিয়ে কামালের কষ্ট ও আফসোস কম ছিল না। পরিবারে তখন তীব্র অর্থকষ্ট। অবশ্য অভাব-অনটনকে পাত্তা না দিয়েই আম্মা মাথা উঁচু করে চলছিলেন। আব্বা জেলখানায়। জেলখানাকে মোটামুটি স্থায়ী বাসস্থান হিসেবে নিয়েছেন। জেল জুলুমের অগ্নি পরীক্ষায় তিনি সাহস হারাতে রাজি নন।
আম্মাও দমবেন কেন! সন্তানদের বুকে আগলে তিনি জলন্ত কড়াইয়ের তীব্র উত্তাপে ঝলসে চলেছেন। আম্মার সেই জীবন সংগ্রামের ঘাত-প্রতিঘাতের কথা অনেক কিছুই মনে পড়ে যাচ্ছে হাসুর। কী সংগ্রামের দিন গেছে। প্রতিপদেই আম্মার বেদনা ও কষ্টের ফিনকি রক্ত বেরুচ্ছিল। রক্তাক্ত পায়েও মা তার লক্ষ্যে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মা, মাগো। মায়ের সেই গল্প ফুরোবে না কোনোদিন। হাসু তখন কুড়ি বছরে পা দিয়েছে। মেয়ের বিয়ের গুরুদায়িত্বের কথা তিনি ভোলেননি। জেলে বসে বাবাও বেভুল ছিলেন না। মায়ের উপর তিনি ছিলেন গভীর আস্থাশীল। তিনি জানতেন – রানু সবকিছু ঠিক সামলে নেবে। নিজের গৌরি-স্বর্ণাভ পায়ের চামড়া দুঃখের আগুনে পুড়িয়ে তামাটে করে ফেললেও সন্তানদের দায়িত্ব পালনে ভুল করবে না। মা সন্তানদের সামান্যতম বিলাসী জীবনের শিক্ষা দেননি। তার কাছে অভিজ্ঞতার পরতে পরতে ওরা শিখেছে – কিভাবে দুঃখ-কষ্ট অনটন, সরল জীবনের সঙ্গে মিতালী করে মেলে অনাবিল সুখের আস্বাদ।
আপুর বিয়ের দিনগুলোয় কামাল খুব মন খারাপ করেছিল কেনো! অমন অনাড়ম্বর, শাদামাটা বিয়ে তাই! ও কি চেয়েছিল – খুব ধুমধাম হোক! অন্তত আর দশটা সাধারণ বিয়ের মতো হোক।
কিন্তু হাসু তো আড়ম্বর চায়নি। বাবার সান্নিধ্যে যা শিক্ষা পেয়েছে – তাতে সেই পথরেখা পেয়েছে। কিন্তু সেই আব্বুই আজ পাশে নেই। তিনি জেলখানায় কষ্ট করছেন; তার অনুপস্থিতিতে বিয়ে – বড় কষ্ট পাচ্ছিল বড় কন্যাটিও। কামালও কষ্ট পাচ্ছিল সে কারণে। বাবার না থাকাটা মেনে নিতে পারছিলো সে।
বাবাকে চাইলেই তো তখন রূপকথার সোনার পাথরবাটির মতো হাতের কাছে পাওয়া মুশকিল। বাঙালির প্রাণ ভোমরা জেনে জালিমশাহী তাকে চার দেয়ালে আটকে রেখেছে। কারাগারে তো ছিল হাসুরাও। সুস্থ নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগটুকু ওরা বন্ধ করে দিয়েছিল। ওই অবস্থায়ই আকদ হলো। আব্বাও তাই চাইছিলেন। তার জন্য যেন আনুষ্ঠানিকতায় ছেদ না পড়ে। কবে জেল থেকে মুক্তি পাবেন; জালিম আইয়ুবশাহীর ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র। উপর্যুপরি শয়তানিতে পিণ্ডি লিপ্ত। সত্যের জয় হবেই। অনিবার্য। কিন্তু কবে – তা কেউ জানে না। তার এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য তিনি কোনোভাবেই সন্তানের স্বাভাবিক জীবন, ভালোমন্দ অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিতে চান নি। আড়ম্বর, ধুমধাম – আব্বা আম্মা দু’জনারই ছিল প্রবল অপছন্দ। বাবার উন্নত শির কথা – শেখ মুজিবের ঘরে সেই দিনই আনন্দের কোনো অনুষ্ঠান হবে – যেদিন প্রতিটি সাধারণ বাঙালির ঘর হবে উৎসবমুখর। (চলবে…)
অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন







