চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবা (পর্ব: পনেরো)

মিলন ফারাবীমিলন ফারাবী
১২:৪৫ অপরাহ্ণ ১৭, মে ২০১৬
অন্যান্য, শিল্প সাহিত্য
A A

ফৌজী-ফকরী এই মেজরটি ছেলেবেলা থেকেই ভীষণ আত্মলুপ্ত-আত্মকেন্দ্রিক। তার খোলাচোখ কেউ কখনওই দেখে নি। এ নিয়ে তার ভীষণ আত্মতৃপ্তি। সেলফ রিয়ালাইজেশন – সেলফি বলে একখানা বই লেখার তার খুব ইচ্ছে । কিন্তু লিখতে পারে না বলে লেখে না। তবে বইটির একটা ভারী বাংলা নামও ঠিক করে রেখেছে। আত্মোলব্ধ তত্ত্বাবলী। কারও কাছে নামটা বলেনি। বই আদৌ লিখতে পারে কিনা কে জানে। বলে কয়ে বিজ্ঞাপন করে না লিখতে পারলে বড় লজ্জা। তারপরও বইয়ের ইংরাজি ও বাংলা নাম নিজেই আওড়ায়। ইংরেজিটা জবর হয়েছে। সেলফি! আহা ভাবাই যায় না। সময় থেকে কয়েক দশক এগিয়ে রয়েছে। বাংলা নামটা বেশ খটোমটো। নিজে নিজেই এক ফোঁটা হাসে। তত্ত্বাবলী! কেমন যেন তক্তাবলী বলে মনে হয়। নাহ। বাংলা ভাষাটা বড্ড গোলমেলে। কী সব কী সব তক্তামার্কা শব্দ। এর চেয়ে ইংরেজিটা ভালো। উর্দুটাও খুব ফোর্সফুল। বাংলায় ওই ফোর্সটা আসেই না। মেজরটির বেশিরভাগ রিয়ালাইজেশন মানে আত্মোপলব্ধি ফৌজী-বাদশা কেন্দ্রিক। হিটলারের যেমন উজির নাজির ছিল – মন্ত্রী অমাত্য অমনই হওয়া দরকার। অবশ্য মন্ত্রীফন্ত্রীর দরকারই বা কী! যত্তসব জঞ্জাল। সিভিলিয়ান পলিটিশিয়ান মানেই ইংরেজি মোটেই জানে না। এগুলারে মন্ত্রী মিনিস্টার বানিয়ে কী লাভ! ইংরেজি জ্ঞানবুদ্ধি নাই; কেবল পাবলিককে এজিটেট মানে উত্তেজিত করতে পারলেই বিরাট পল্টনবন্ধু! এইসব গাধারাম-হাঁদারামদের টাইট দেয়া দরকার। কূটনীতি বোঝে না। মওকা বোঝে না। খালি রেসকোর্সে জনসভার ডাক। পাবলিককে খেপাও। আর ঘেউ ঘেউ করো। পলিটিশিয়ানদের বক্তব্য ভীষণ জঘন্য। দু’তিন ঘন্টা ধরে একই প্যাচাল। আমার দেশের এই নাই। আমার ঘরে চাল নাই। ডাল নাই। খালি নাই আর নাই। পলিটিশিয়ানদের দু’একটা বক্তৃতা শোনার তার দুর্ভাগ্য হয়েছে। মহা দুর্ভাগ্য। কোন সারবত্তা নাই। জ্ঞানগম্যি নাই। খালি কথায় কথায় তালবাজি – কী বললে পাবলিক খেপবে। কী বললে পাবলিক লাঠি নিয়ে নামবে।

আর লিডারগুলা যাই বলে মূর্খ-ইলিটারেট-অজ্ঞ-অকাট-নিরক্ষরগুলো খালি হাত তালি দেয়। লিডার দেয় তাল। গাধার জনগোষ্ঠী দেয় তালি। এই তালিবাজি-টাল্টিবাজি হচ্ছে রাজনীতি। এসবের স্থায়ী অবসান দরকার। এ নিয়ে মেজরের নিজস্ব ধুরন্ধর পরিকল্পনা আছে। বিচিত্র সব ফ্যানটাসি। সানগ্লাসের আড়ালে সেসব কল্পনা ফানুশ হয়ে উড়ে বেড়ায়। সানগ্লাস খুললেই ফটাস করে মিলিয়ে যায়। নাহ! নাহ! মেজর হাপিত্যেস করে। একবার যদি আইয়ুব খানের মত পাওয়ারে যাওয়া যায় – সে দেখিয়ে দেবে – দেশ কীভাবে চালাতে হবে। ওইসব ব্লাডি সিভিলিয়ান পলিটিশিয়ানদের জন্য পলিটিক্স ডিফিকাল্ট করে দেবে। হারামজাদা মূর্খগুলো আর কখনও রাজনীতিতে আসবে না। নাকে খত দিয়ে পালাবে। আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ এড্রেসের মত একটা শার্প-এড্রেস সে ঠিকও করে রেখেছে। সে সাফ সাফ বলবে, আই উইল মেকস পলিটিক্স ডিফিকাল্ট।

একা একা কথাগুলো বলে। আর মনে মনে অতি সঙ্গোপনে হাসে। তাকিয়ে দেখে – গন্ধ শোঁকে – ড্রাইভারটা তার বক্তৃতা শুনে ফেলল কি না। কখনো সে মিশরী জেনারেল গামাল আব্দুল নাসেরের ভীষণ ভক্ত। খুব আয়রন পারসন ছিলেন লোকটা। একবার তিনি কায়রোর রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। মখমলের মতো মসৃণ রাস্তা। এমন সুকোমল রাস্তা ফৌজীরাই পারে বানাতে। ব্লাডি সিভিলিয়ানদের দিয়ে হয় না। এই তো এই মুহুর্তে হালিশহর দিয়ে যে রাস্তায় ছুটছে – আইয়ুবি রোড। কনক্রিট দিয়ে বানানো। মনে হচ্ছে চল্লিশ বছরেও কিছু হবে না। কিন্তু কায়রোতে মখমল রাস্তায় বিভ্রাট হয়েছিল। মাইলকে মাইল যেতেই হঠাৎ নাসেরের গাড়ি মৃদু কেঁপে উঠল। একটু ঝাঁকুনি খেলো। নাসের সপাটে ড্রাইভারকে চটকালেন। ড্রাইভার কাঁচুমাচু। বলল, হুজুর, আমার কোনো কসুর নেই। গাড়ি চাকা সব ঠিক আছে। কোনো গাফিলতি নাই। দোষ রাস্তার।

বিশ্বাস হয় না নাসেরের। এত খরচ করে রাস্তা বানানো। সেটার কার্পেটিং খারাপ হওয়ার কথা নয়।

ড্রাইভার বলল, হুজুর, পরীক্ষা প্রার্থনীয়। নাসের মহাবিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। কপাল কুঁচকে দেখলেন – সত্যি! রাস্তার ঢালাইয়ে কার্পেটিং-এ সমস্যা। খোয়া ওঠা। তাই গাড়িতে কম্পন। ড্রাইভারের গর্দান সে যাত্রা রক্ষা পেল।

কিন্তু গর্দান গেল অন্যদের। পাবলিক ওয়ার্কস-এর চিফ হেকমতিয়ার কে! তলব সেই হেকমতওয়ালাকে। বেচারা থরথরি কম্প। ইঞ্জিনিয়ার বেটা জানাল, সে কোনো গাফিলতি করেনি। টেন্ডার ড্রপিং-এ লোয়েস্ট যে হয়েছিল, কাজ দেয়া হয়েছে তাকেই। বিশিষ্ট ঠিকাদার। বিশাল কনট্রাকটরি হাউজ। কওমের বেশিরভাগ উন্নয়ন তারই করা। কে সে! তলব করা হলো তাকেও। ঠিকাদার আসতেই কপাল আকাশে নাসেরের। আশ্চর্য! এ যে তারই ছোট ভগ্নিপতি। নাসের কোনো ক্ষমাঘেন্না করলেন না। কোর্ট মার্শাল টাইপ দ্রুত বিচার। তার চেয়েও দ্রুত পানিশমেন্ট। ভগ্নিপতি, চিফ ইঞ্জিনিয়ার – সবাইকে ব্রাশফায়ারে দিলেন। কোনো মার্সি করলেন না নাসের।

Reneta

সানগ্লাস মেজর এই গল্পটি কোথাও পড়েছে নাকি ফৌজী-পানশালায় শুনেছে – মনে করতে পারছে না। কিন্তু এই যে ব্রাশফায়ার-কোর্ট মার্শাল তার অতি পছন্দের। কোর্ট মার্শালের ওপর কোনো বিচার নাই। খুন কা বদলা খুন। কল্লা কা বদলা কল্লা। বিলম্ব মানেই গাফিলতি। সেও যদি একবার সর্বময় পাওয়ার কব্জা করতে পারে – গামাল নাসের, আইয়ুব খানদের সব ইতিহাস জাতিকে ভুলিয়ে দেবে। তাকে নিয়ে লেখা হবে নতুন ইতিহাস। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানেরও সে ভক্ত।

যে যত শক্ত, সে তার তত ভক্ত। ডান্ডার ওপর যেমন কোনো ওষুধ নাই। ব্লাডি সিভিলিয়ানদেরও চুরি চামারি ছাড়া কোনো কাজ নাই। এগুলোকে ডান্ডার ওপরই রাখতে হয়। সিভিলিয়ানদের লাঠি দেখিয়ে রাখলে সব শান্ত। হিটলার, নাসের, আইয়ুব খানদের ভুল ভ্রান্তি নিয়ে নিয়মিত সে ধ্যান করে। নাসেরের ভুল কী ছিল? ফৌজী উর্দি ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট হওয়াই তার কাল হয়েছে। সে যদি আজীবন জেনারেল হিসেবেই মিশর দাবড়ে রাখত – ভগ্নিপতি ওই টেন্ডারবাজির মধ্যে আসতই না। আইয়ুবের প্রতি অজস্র ইজ্জত। ফিল্ড মার্শাল। কথাটা শুনলেই বুকটা শ্রদ্ধায় ফুলে ওঠে। বেসিক ডেমোক্রেসি, বুনিয়াদি গণতন্ত্র তার ঠিক ছিল কিনা – খুব সংশয় রয়েছে সানগ্লাসের। এই ভড়ংবাজি করতে গিয়েই সে ঠকেছে। সে যদি ফিল্ড মার্শাল হয়েই ব্যাটনবাজি করত – মুজিব সাহসই পেত না ছয় দফা দেয়ার। মুজিবর নামে কোনো নেতা ফেতার জন্মই হতো না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তো একটা জেনুইন মামলা।

সবগুলা ইন্ডিয়ান এজেন্ট। আইয়ুব সঠিক পথেই ছিল। কিন্তু ফিল্ড মার্শাল থেকে ফিল্ড পলিটিশিয়ানদের সঙ্গে সহবত করায় সব ইজ্জত-স্পর্ধা হারিয়েছে। ফিল্ড মার্শাল হিসেবে মুজিবের বিচার করলে উনসত্তুর সালে ঠিকই লটকে দিতে পারত। মুজিবের মত দশটা সিভিলিয়ানকে লটকালেও গাছের পাতা গাছেই থাকত। একটু নড়তে সাহস পেত না। শুধু বেসিক ডেমোক্রেসি করলেই তো হবে না। মাথায় পর্যাপ্ত বুদ্ধি থাকতে হবে। গণতন্ত্র কী, কত প্রকার, গণতান্ত্রিক পার্টি ফার্টি – এসব তো ফৌজীরাই ঠিক করে দেবে। কার সাথে কতটুকু কথা বলা যাবে, পাবলিকের সাথে কতটুকু সহবত করা যাবে – সব ফৌজী ফরমানে হবে – সেও ঠিক আছে। মানুষ মাত্রে এক ভোট – সে কেমন করে হয়। একটা অফিসার আর একটা জুতামোছা সিপাই কেমন করে এক হয়। অফিসার ভোট দিতে পারলে অবশ্যই সিপাইর ভোট দেয়ার ক্ষমতা খর্ব করা উচিত। সব কিছু একপাল্লায় মাপা ঠিক নয়। আইয়ুবের সবই ভাল ছিল। কিন্তু ফিল্ড মার্শালগিরি ছেড়ে ফিল্ড পলিটিশিয়ানগিরি করতে যাওয়া তার ভুল হয়েছে। তাই পচা শামুকে পা কেটেছে। মুজিব ঠিকই তার কাম বানিয়ে নিয়ে গেছে।

সানগ্লাস কখনও পাওয়ারে যেতে পারলে এইসব ফালতু ভুল একদম করবে না। ব্লাডি সিভিলিয়ান আর ব্লাডি পলিটিশিয়ান সবগুলো ইলিটারেট মিসক্রিয়েন্ট। অপকর্ম-দুর্বৃত্তগিরিই এদের পেশা। একবার মওকা পেলে সে এগুলোকে উল্টা লটকিয়ে মুখে গামছা বেধে গরমপানি থেরাপি দেবে। গরম পানি এবং বরফঠাণ্ডা পানিতে ওদের মুখ চুবিয়ে রাখবে। নো মার্সি। পশ্চাদদেশে গরম ডিম ঢুকিয়ে দেবে। নো মার্সি। জেলায় জেলায় ক্যাম্প করে গরমাগরম শাস্তি দেবে। পানিশমেন্ট কখনও পেন্ডিং রাখতে নেই। গরম গরম দিতে হয়। কওমকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে পলিটিক্সকে ডিফিকাল্ট করে তুলতে হবে। কেউ রাজনীতি করার আগে যেন সত্তুর বার ভাবে। পলিটিশিয়ানরা করবে পলিটিক্স; আর সানগ্লাস করবে পলিট্রিক্স। হা হা হা।

আইয়ুব খান ফেল মেরেছে। ইয়াহিয়াও পারবে কিনা বলা মুশকিল। মুজিবের সাথে ডান্ডাগুলি খেলতে কেনো গেল এই দুই নির্বোধ জেনারেল। এ দু’টির মাথায় গোবর পোড়া। ঘিলু হাঁটুতে। পলিটিশিয়ানরা হলো ঘাগু। ওরা হলো ঘুঘু। ওদের সব সময় ডান্ডা দিয়ে টাইট রাখতে হয়। ডাংগুলি খেলতে গেলে নানা প্যাঁচ-প্যাঁচালি করে ঠিকই লাভ বের করে নেবে।

আহা! যদি সে একবার ফিল্ড মার্শাল বা জেনারেল হতে পারত – দেখিয়ে দিত কত ধানে কত চাল। এই মুজিব ফুজিব টাইট দেয়া কোনো ব্যাপারই ছিল না। নো মার্সি। মসনদে বসেই ডাইরেক্ট একশনে যেত। আগে দড়িতে ঝুলিয়ে কিংবা ব্রাশফায়ারে দিয়ে তারপর ওয়ান কাপ অব ব্রাউন কফি। কিন্তু এই পাঞ্জাবি বুলহেডেডগুলো কি কোনো বাঙালিকে সে সুযোগ দেবে? ওরা তো বাঙালিদের কর্নেল ফর্নেল হতেই দিতে চায় না। পশ্চিমা খানসেনারা ব্লাডি সিভিলিয়ানেরও চেয়েও অকর্ম্মার ধাড়ি। খালিই ফোঁসফাঁস। হ্যান করেঙ্গা; ত্যান করেঙ্গা। খালি ভ্যানতারা। কাজের কাজ কিছুই পারে না। মদ গেলা আর মেয়েমানুষ নিয়ে ফূর্তিই তাদের স্ট্যাটাস। এই করে দেশটার বারোটা বাজাচ্ছে। মেজর যদি একবার মওকা পেত, দেখিয়ে দিত কেমন করে পাবলিক কন্ট্রোল করতে হয়। সেই সুযোগ এইসব শরাবী জেনারেল থাকলে আদৌ আসবে কিনা বলা মুশকিল। তারপরও মেজর চুপচাপ চেষ্টা করে যাচ্ছে – যত দূর যাওয়া যায়।

ভেতো বাঙাল মোহাম্মদ আলী উত্তরবঙ্গের বগুড়া থেকে জাহাজে চড়ে করাচি গিয়ে পাকিস্তান শরীফের উজিরে আজম পর্যন্ত হয়েছে। ইচ্ছা আর স্বপ্ন থাকলে সবই সম্ভব। একটা বাঙালি সিভিলিয়ান সেটা পারলে সানগ্লাস কেনো পারবে না? ক্যারিয়ার-মাইন্ড আর প্রফেশনাল আর্মি হিসেবে সকলের মন জয় করেই সে চলছে। মাঝে মধ্যে অবশ্য মনে হয় – এই বাঙালি হওয়াই তার মতো প্রতিভাবানের জন্য কাল হয়েছে। বাঙালি না হয়ে যদি পাঞ্জাবি হয়ে জন্মাত! কেউ তার ফ্যানটাসির বাস্তবায়ন রুখতে পারত না। পাকিস্তানে একটা জবরদস্ত মার্শালশাহী প্রতিষ্ঠা করে দেখাত। বাঙালির নানা খুঁত-খারাবি রয়েছে। একই রকম চেহারা ছাঁট; একই রক্ত, একই জবান, কিন্তু ধর্মে আবার জাত দুইটা। বেশিরভাগ কনভার্টেড মুসলিম। নমঃশুদ্র দিয়ে হওয়া মুসলমান। ছোট জাত। কমজাত। এদের উত্তেজনা হয় বেশি। জোশ বেশি; জজবা কম। রোজা নামাজ করে।

ওয়াজ-কালাম শোনে। আবার গানবাজনাও ছাড়ে না। হিন্দু থেকে নিয়ে আসা ঐতিহ্য-কালচার কেমন করেই বা ছাড়বে। দোয়াদরুদ খতম কালাম-মৌলুদশরীফ পড়ে; আবার কৃষ্ণ কালাইয়ার গানও শোনে। এই রকম শঙ্কর জাত বেশি দূর যেতে পারে না। এই কমজাতটাকেও শরীফ বানানো দরকার। নিজের ভবিষ্যত নিয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারে না সানগ্লাস। বাঙালি না হলে না হয় বাস্তবিক অনেক স্বপ্ন দেখতে পারত। কিন্তু এখন যদি অনেক উপরে যায়ও – দেখা যাবে বাঙালিরাই তাকে টেনে নামাবে। তবে একটা জায়গায় তার থিওরি পরিষ্কার – মওকা সে ছাড়বে না। চোখ কানই নয় – সে সব সময় সবকিছুর গন্ধও শুঁকবে। যদি কখনো মওকা আসে – সেটির ষোলআনা ফায়দা উসুল করবে। সেজন্য যা যা করা দরকার সব করবে। বাপচাচা আত্মীয়স্বজন-ভাই-ভগ্নিপতি কোন রেয়াত নাই। চমকপ্রদ তার ফ্যান্টাসি।

অদ্ভুত অদ্ভুত নানা জিনিস সে দেখতে পায়। হিটলারি কন্সেনট্রেশন ক্যাম্প – নাৎসি নির্যাতনের নানা বর্ণনা তার অসম্ভব প্রিয়। এগুলি খুব দরকার। কোথায় যেন পড়েছে – মানুষ ভয় পেতে পছন্দ করে। আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া মানুষের প্রিয় একটি অবদমিত আকাঙ্খা। এজন্য ভয় দেখালে ভয় পায়। তবে একই কেতায় ভয় দেখালে অচিরেই সে ভয়কে জয় করে। একটি ডাক্তার প্রথম যখন অপারেশন টেবিলে যায় – তখন রক্তপাত দেখে আতঙ্কিত হয়। তার হাত পা কাঁপে। কিন্তু কয়েকবার সেখানে যাওয়ার পর আর ভয় পায় না। তখন সে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এই জন্য ভয় দেখানোর নিত্য নতুন ফর্মুলা থাকা দরকার। মানুষকে আতঙ্কিত করতে ইনোভেশন দরকার। মানুষ যে আতঙ্কিত হয় এটাই তাকে দমন করার বড় অস্ত্র।

মেজরের একটা প্রিয় বিষয় হলো মার্শাল পানিশমেন্ট নিয়ে নবতর চিন্তাভাবনা। সানগ্লাস যখন প্রথম প্রথম ফৌজীশালায় দাখিল হয়েছে – মার্শাল ল কোর্টের পানিশমেন্ট নিয়ে নানাভাবে আতঙ্কিত করার চেষ্টা করত পাঞ্জাবিরা। মেজরের কাছে বিষয়টা মোটেই ভয়ংকর ভীতিপ্রদ মনে হতো না। কাউকে সে বলত না। পূর্ব পাকিস্তানি সৈনিকদের নানাভাবে ভীতিগ্রস্ত করতে চাইত ওরা। যদি বাঙালি সেনা ও অফিসাররা মার্শাল কম্যান্ড অগ্রাহ্য করে, রিবেলিয়ন হয় – তখন কিসব ফাউল পানিশমেন্ট। পশ্চিমারা বোঝাতে চাইত – মার্শাল ল’ কোর্ট মানেই দোজখের আজাব। ওরা ভয় পেত – বাঙালি অফিসার ও সেনারা যদি সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ করে। কিন্তু কিসের কী দোজখের আজাব। পাকিস্তানি এই খানজেনারেলরা মনে হয় খান্দানি কসাই। ওরা বোঝে শুধু কতল। আরব জাহানের মত তলোয়ারের কোপে গলা কাটতে পারে না। রেওয়াজ নেই। ওদের একটাই ফরমান – ফায়ারিং স্কোয়াডে দিয়ে দাও। গুলি করো। বেওনেট চালাও। হত্যা করো। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থাকা অবস্থায় সানগ্লাস যখন এইসব ফালতু ভয়ভীতির বিবরণ শুনত – মনে মনে হাসত। এই একা একা হাসা; কথা বলা তার মধ্যে অনেকটা ব্যাধির মতো হয়ে যায়। তাই সে সানগ্লাসে নিজেকে আড়াল করে বড্ড সুখে মধুর-কল্পনাগুলো চালিয়ে যায়।

রিবেল সেনা বা অফিসারকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দেয়া তার একদম অপছন্দ। এটা রীতিমত লঘু শাস্তি। ফায়ারিং হয়ে গেল তো বেচারা মুক্তি পেয়ে গেল। মুক্তিই যদি মিলে যায় তা হলে পানিশমেন্ট কোথায় হলো। আসল শাস্তি হলো ভয় দেখানো। তাকে বাঁচিয়ে রাখা। বার বার হত্যা করা। বেলুচ সেকটরে রিবেল হয়েছিল। বেশ কিছু বেলুচি সেনাও খানসেনাদের বিরুদ্ধাচারণ করেছিল। তাদেরকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দিয়ে খালাস করে টিক্কা খান। টিক্কা ভাবছে, কি একখানা বীরত্বপূর্ণ কাজ করেছে। কিসের বীরত্বপূর্ণ কাজ। মাথামোটা পাঞ্জাবি। তাজা গম খেয়ে খেয়ে গতরেই খালি বেড়েছে। মাথার বুদ্ধি একটু পাকেনি। প্রফেশনালি অনেক সিনিয়র। তার কোনোরকম ক্রিটিসিজম করা চরম গর্হিত অপরাধ। কিন্তু প্রকাশ্যে তো মেজর কিছু করছে না। আরে গর্দভ – এতগুলো বেলুচি যে মারলি, বিদ্রোহের আগুন কি আদৌ নিভেছে। নিভে নাই। বরং ধিকি ধিকি জ্বলছে। যে কোনো সময় ভয়ংকর দাবানল হয়ে উঠবে।

এই ক্ষেত্রে তুমি কী পানিশমেন্ট দিতে মেজর সাব!

নিজেকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সানগ্লাস। জবর ভেবে টেবে পেরেশান মেজরসাব। নানারকম পানিশমেন্ট আসছে মাথায়। কোর্ট মার্শালে যাদের ডেথ সেন্টেন্স হয়েছে – তাদের জলদি জলদি মারা একদমই ঠিক হবে না। তবে পানিশমেন্টের মজাটাই মাটি। প্রথমে ভয়ংকর বাঁশডলা। ডান্ডা দিয়ে বাড়ি আর বাড়ি। পিটাতে পিটাতে আধমরা। তারপর অর্ধ উলঙ্গ করা। মানে নিন্মাঙ্গ নগ্ন। শিশ্নের সঙ্গে দশসেরি ইট বেঁধে দিলে কেমন হয়! এমন কোনো বর্ণনা সে কি কোনো টর্চার সেলে দেখেছে! কোথাও কি পড়েছে! ঠিক মনে করতে পারছে না। নাকি তার একান্ত নিজস্ব আবিস্কার। নিজস্ব ইনোভেশন বলেই তো মনে হচ্ছে। বাহ! দারুণ আইডিয়া মাথায় খেলে গেল। মওকা পেলে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। শিশ্নের সঙ্গে ইস্টক বেঁধে দিলে কী হবে! টপ টপ করে রক্ত পড়বে। রিবেলগুলো মরণপ্রান্তের কষ্টে কাতরাবে। কোনোরকম মিলিটারি ট্রেনিং কাজে লাগবে না। কোনোভাবেই এই নির্যাতন সহ্য করতে পারবে না। মানুষের ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা কতটুকু! সেই ক্ষমতার চেয়ে বেশি কষ্ট দিতে না পারলে কিসের কী ঘোড়ার ডিমের শাস্তি! টপ টপ করে রক্ত পড়বে। আহা। দারুণ একটা ব্যাপার। সানগ্লাস দারুণ আত্মতৃপ্তি পাচ্ছে। এইভাবে দিনের পর দিন রেখে দিলেই আচ্ছা হয়।

কিন্তু এই পানিশমেন্টকে কেন্দ্র করে আরও কোনো ইনোভেশন! এইভাবে তো আর বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। ওরা মরবেই। শিশ্ন দিয়ে রক্তক্ষরণে মরবে। তারপর সব মজা শেষ। মিসক্রিয়েন্ট মরে গেলে তো কিছুই করার থাকে না।

দারুণ একটা আইডিয়া মাথায় ঝিলিক মারল। কোর্ট মার্শালে সকলের শাস্তি হয় না। অনেকে বেঁচে যায়। অনেকে রেহাই পাওয়ার পর নতুন করে ষড়যন্ত্র করে। বদলা নেওয়ার শপথ নেয় মনে মনে। এগুলোকে কেমন করে টাইট দেয়া যায়। এমন টাইট শাস্তির এনতেজাম করতে হবে – জীবনে আর কোনোদিন বিদ্রোহ শব্দটি মনের কোণাতেও স্থান দেবে না।

আছে ফর্মুলা। শিশ্ন থেকে রক্ত যখন পড়ছে – মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে – জিহবার ইশারায় পানি পানি বলে আহাজারি করছে – সেই সময়ে রেহাই পাওয়া ফৌজীগুলোকে সেখান থেকে লাইন ধরিয়ে হাঁটিয়ে নেয়া হবে। আস্তে আস্তে ওরা হাঁটবে। ওই যন্ত্রণা ওরা দেখবে। দেখে দেখে নিজেরাও অনুভব করবে অন্তহীন যন্ত্রণা। টর্চার+টর্চার+মেন্টাল টর্চার=কন্ট্রোল।

বাহ! একসেলেন্টো থিওরি মাথায় খেলে গেল।

শুধু তাদেরকে কেন! সন্দেহভাজন রিবেলদের হাঁটিয়ে নেয়া হবে। যাদের ব্যাপারেই সিক্রেট সার্ভিসের ফাইল থাকবে – তাদেরকে হাঁটানো হবে। সবচেয়ে ভাল হয় – নবীন যত অফিসার, সবাইকে লাইন করিয়ে ওই নির্যাতন হাঁটিয়ে দেখানো। আতঙ্ক ওদের কলিজার পরতে পরতে ঢুকে যাবে। কেয়ামতের আগে আর কোনোদিন বিদ্রোহ করার চিন্তা মাথায়ও আসবে না।

আহা। যদি পাওয়া যেত এমন একটা ফুরসত। মেজর তার সকল ক্যারিশমা দেখিয়ে সবকিছু ঠাণ্ডা করে রাখত।

এইসব ভাবনায় সানগ্লাসের পরম আনন্দ। হঠাৎ তার গাড়ি থেমে যাওয়ায় সুখস্বপ্ন চটকে যায়। হোয়াটস রং! ভ্রু কুঁচকে তাকায় ড্রাইভারের দিকে। ড্রাইভার দেখায়, স্যার, পাবলিক সব জ্বালাইয়া দিতেছে। শেখ সাব স্বাধীনতা ডিক্লেয়ার করছে। মানুষ দেখি রাস্তায় নাইমা আসছে।

জনতার কণ্ঠে জয় বাংলা ধ্বনি। জয় বাংলা শব্দটি মেজরের কানে শেলের মতো বিঁধে। এটা কী বলছে। জয় বাংলা! মাই গড! এ তো হিন্দুস্থানি শব্দ। যত্তসব হিন্দুস্থানি কারবার। জয় আবার কী! কিসের জয়! বল জিন্দাবাদ। বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ। মেজরের প্রচণ্ড ইচ্ছা হলো – নিজেই নেমে গিয়ে ব্যাটন দিয়ে জয় বাংলাদের পিটায়। পিটিয়ে ঝুলিয়ে দেয়। শিশ্নতে ইট বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়। এত সুন্দর জিন্দাবাদ। আর কিনা বলছে – জয় । জয় বাংলা।

অস্থির বোধ করে মেজর। কানে শুনছে। চোখে দেখছে – উম্মাদ মানুষ। জয় বাংলা বলে যেন জিকির করছে। একটা শব্দের এত তীব্র শক্তি – সে কখনোই অনুধাবন করতে পারেনি। মেজর নাকটা এগিয়ে দেয় সামনে। গন্ধ শোঁকে। সামথিং ইজ গ্রেট রং। জয় বাংলা শব্দটার গন্ধ শুঁকে সে রীতিমত আঁতকে ওঠে। না, না। এটা তো খালি শব্দ নয়। এই শব্দ থেকে ভয়ংকর বিধ্বংসী বারুদের গন্ধ আসছে। যতই সে জয় বাংলা শব্দটা শুঁকতে যায়। কেবলি বিধ্বংসী মহাশক্তির ঝাঁঝাল গন্ধ পাচ্ছে। আলামত তো সুবিধার নয়। মেজর মহাবিপদ সঙ্কেত টের পাচ্ছে। না। এই পাবলিককে ব্যাটন করে ঘরে ঢোকানো যাবে না। গাড়ি ঘুরাতে বলে ড্রাইভারকে। এইখানে থাকা নিরাপদ নয়। তার মন যা চাইছে – সেটা যদি ভুলে করে ফেলে – ভবলীলা এখানেই শেষ। জয় বাংলা তীব্রভাবে তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। উর্ধ্ব সে তার জীপ নিরাপদ জায়গার সন্ধানে ছুটছে। পেছন পেছন জয় বাংলা আসছে। গিলেই খাবে বুঝি তাকে। মেজরের অস্থিও মন কঁকিয়ে ওঠে – ভয়ংকর কোনো বিপদের আশঙ্কায়। এই বিপদের গন্ধ সে শুঁকে আন্দাজ করেছে। মনে মনে পাবলিকের উদ্দেশে সে বলল, ব্লাডি সিভিলিয়ন। জয় বাংলা বলিস না। নো জয় বাংলা। বলবিই যখন বাংলা জিন্দাবাদ বল। বলবিই যখন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বল। দোহাই তোদের, জয় বাংলা বলিস না মেরে সাথিওঁ।

পালাতে পালাতে মেজরের মনে ভয়ংকর এক পরিবর্তন এলো। এই তো সামনে মওকা। মওকা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। ফরমানও এলো ঢাকা থেকে। অয়ারলেস বকেই চলছিল।

ওভার ওভার বলে পার পাওয়া যাচ্ছিল না। টিক্কা ও রাও ফরমান প্রচণ্ড গালি দিচ্ছিল চট্টগ্রাম পরিস্থিতি নিয়ে। সামাল দিতে কেনো পারছে না চিটাগং কমান্ড? হোয়াটস রং দেয়ার?

টিক্কা-রাওয়ের কাছে আর্মি গোয়েন্দারা জানিয়েছে, চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেছে বাঙাল রেজিমেন্ট। আজাদীর পক্ষে তারা লড়ছে। পোর্টে আর্মি মিউটিনি হয়েছে। কি একটা স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে মুজিবরের ডিক্লারেশন ব্রডকাস্ট করা হয়েছে। সিভিল আর্মি রাস্তায় নেমে এসেছে।

অয়ারলেসে সব খবরাখবর শোনা যাচ্ছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার – এটা আবার কী চীজ! এই নাম কখনও শুনে নাই। বেতার মানে কী! ওহ! ইয়েস ইটস রেডিও। ইজ ইট রেডিও অব মুজিবস। ইজ দেয়ার জয় বাংলা।

অয়ারলেসে রক্ত শীতল করা ফরমান – কাঁহা হ্যায় ইয়ে গাদ্দার বাংলা রেডিও। উয়ো গাদ্দার কো পাকড়ো। গর্দান লে লো। ব্রাশফায়ার কর দো। আভি। আভি কি আভি।

মেজর খুবই বিভ্রান্ত। চট্টগ্রামে এসব কী হচ্ছে। মুজিব কা আদমী এসব কী করছে। হোয়্যার ইজ দ্যাট ব্লাডি রেডিও স্টেশন। কাহা কিধার মিলেগা। মেজর গন্ধ শুঁকে কিছুই পাচ্ছে না। ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবে কিনা – বুঝতে পারছে না। ভুইয়া সর্বনাশ করে দিয়েছে। টিক্কা-ফরমান বুনো মোষের মত চেঁচাচ্ছে। ঘোৎ ঘোৎ করছে। অয়ারলেসে অবিরাম গাদ্দার বাঙাল আদমি – ফাকিং মাদার চোদ… অশ্রাব্য সব গালি দিয়ে চলেছে। সব বাঙালি আর্মি অফিসারকে অবিলম্বে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে রিপোর্ট করার রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। রেড নোটিশ কেনো! বাঙালি অফিসারদের সব অথরিটি সিজ করা হয়েছে। অনতিবিলম্বে ক্যান্টনমেন্টে সারেন্ডার না করলে কোর্ট মার্শালের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। অয়ারলেসে সব খবর পাওয়া যাচ্ছিল। এ তো কড়া বিপদের গন্ধ। কটু তীব্র পোড়া পোড়া।

টিক্কা ইয়াহিয়া যে বুচারি বেলুচিস্তানে করেছে – একই অপারেশন সার্চ লাইট পূর্ব পাকিস্তানেও শুরু করেছে। ও মাই গড! ভয়ংকর অশুভ লক্ষণ। বাঙালি অফিসারদেরকে ক্যান্টনমেন্টে দাখিল হতে কেনো হবে! কী করতে চাইছে ওরা। বাঙালি অফিসারদের অথরিটি ও কম্যান্ড কেনো সাসপেন্ড করেছে। ভুইয়া তো মিউটিনি করে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। ক্যান্টনমেন্টে গেলে গর্দান থাকছে না। মেজরের ধুরন্ধর বুদ্ধি সেই ইশারাই দিচ্ছে। বেলুচি সেনা অফিসারদের যেমন কোর্ট মার্শাল করে ফায়ারিং করা হয়েছিল – বাঙালি অফিসারদের ক্ষেত্রেও একই দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে। চমৎকার যে সব পানিশমেন্টের সুখ স্বপ্ন মেজর দেখছিল – এখন তো মনে হচ্ছে সেটা তার কপালেই লেখা আছে। আর মাথামোটা পাঞ্জাবিরা অপেক্ষা বেশি করবে না – গাদ্দার, ব্লাডি ফাকার, মাদার চোদ বলে গালি দিয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে সারা শরীর ঝাঁঝরা করে দেবে। এগুলোর বুদ্ধিশুদ্ধি বিশেষ নাই। খুনখারাবি ছাড়া ওরা কিছুই বোঝে না। না।

ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া এই মুহূর্তে মোটেই নিরাপদ নয়। সেধে গিয়ে তলোয়ারের নিচে গর্দান দেয়ার কোনো মানে হয় না। তাহলে নাক দিয়ে বিপদ শুঁকে কী লাভ! এখন সিচুুয়েশনকে আন্ডার অবজারভেশন রাখতে হবে। হাওয়া বুঝে চলতে হবে।

সানগ্লাসের নিচে এক চিলতে সে হাসল। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছে না। উদভ্রান্তের মতো অনেকটা এলেবেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ফ্রিডম রেডিও স্টেশনটা কই, খুঁজে দেখলে মন্দ হয় না। সন্দিগ্ধ চিত্তে সে কালুরঘাট পৌঁছে গেল। চট্টগ্রাম বেতার ওখানেই। যারা মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণা করছে – তাদের নিজস্ব ট্রান্সমিটার থাকার কথা নয়। পাবেই বা কোথায়। নিশ্চয়ই চট্টগ্রাম রেডিওর ট্রান্সমিটার দিয়ে এই নাশকতা চালাচ্ছে। গন্ধ শুঁকে শুঁকে মেজর নিশানামতো এগুতে লাগল।

একেই বলে রাজকপাল। বেলাল দেখতে অতি সুপুরুষ। তরুণ এবং সুরসিক। সন্দ্বীপ রয়েছে তার সঙ্গে। বেতার কণ্ঠ দু’জনার অতি চমৎকার। তারা দু’জন মিলে ভয়াবহ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বেশ কয়েকবার বেতার ট্রান্সমিটার চালু করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা শুনিয়েছেন। তারপর বন্ধ করে দিয়েছেন। পাকিস্তানি সেনারা নিশ্চেই এর মধ্যেই ডালকুত্তার মতো তাদের খুঁজতে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা নিশ্চয়ই বিশ্ববাসীর কানে চলে গেছে। হানাদারদের মনিটরিং-এও ধরা পড়েছে অবশ্যই। ইয়াহিয়া-টিক্কা পাগলা কুত্তার মতো ক্ষেপে যাবে – সেটা স্বাভাবিক। পুরো চট্টগ্রাম শহরে ব্যাপক আতঙ্ক। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাধারণ মানুষ নেমে পড়েছে প্রতিরোধে। এর মধ্যেই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ সে চাট্টিখানি কথা নয়। এম এ হান্নানের পাঠ-ভাষ্যটি কয়েকবার সম্প্রচার করা হয়েছে। অদ্ভুত এক উদ্দীপনা রক্তের মধ্যে খলবল করে উঠছে। সন্দ্বীপ নিজেও অনুষ্ঠান করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা নিয়ে নানারকম বেতার-কার্যক্রম দরকার। বাঙালি সেনারা বন্দরে মিউটিনি করেছেন – বিশাল একটা খবর। বন্দর শ্রমিকরাও অসমসাহস দেখিয়েছে। বুঝতে কারও বাকি নেই – পাকিস্তানি হানাদাররা চট্টগ্রামে ব্যাপক গণহত্যা চালাবে। এজন্য চাই আরও প্রতিরোধ। চাই গণপ্রতিরোধ-গণযুদ্ধ। বাঙালি সেনাদের বিদ্রোহ বিরাট একটা ঘটনা। এ খবরও সম্প্রচার করা হয়েছে। চট্টগ্রামের খবর দেয়া দরকার। সারাদেশকে জানানো দরকার। বীর সূর্যসেন আবার চট্টগ্রামে নতুন জন্ম নিয়েছেন। প্রীতিলতার চাটিগাঁ। আবেগে টগবগ করছে এই উদ্যমী তরুনদের চিত্ত। আরও অনেক কাজ করা দরকার। বেশি সময় পাওয়া যাবে না। স্বাধীন বাংলা বেতারকে অকার্যকর করার সব চেষ্টা করবে পিন্ডি ও ঢাকার টিক্কাশাহ। টিক্কা তো বম্বিং করে বেতার গুড়িয়ে দিতে চাইবে। তার আগেই যতটা পারা যায় সম্প্রচার করা দরকার। তাই থেমে থেমে সম্প্রচার হচ্ছিল। যাতে হানাদাররা সম্প্রচারস্থল সন্ধান করতে না পারে। এভাবে বেশিক্ষণ চালানো যাবে না। ফৌজীদের হাতে আধুনিক সব সরঞ্জাম। যে কোনো সময় তারা ঠিক পৌঁছে যাবে।

একটা প্ল্যান বেলালের মাথায় খেলছিল। কাজটা করতে পারলে দারুণ হয়। কোনো আর্মিকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটা যদি পাঠ করানো যায়। তাদেরকে দিয়ে যদি বলানো যায়। বাঙালি অফিসার সেনা, ইপিআর এর মধ্যেই প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই সময় কাজটা করতে পারলে নতুন মাত্রা যোগ হবে। বাঙালির এই মহান মুক্তি-লড়াইয়ে বিদ্রোহী সেনারাও যোগ দিয়েছে – সেই মেসেজটা জবরদস্তভাবে সবার কাছে পৌঁছে যাবে। সেনা বিদ্রোহের খবর আর্মিকে দিয়ে বলাতে পারলে বেশ হয়। কিন্তু বিদ্রোহী আর্মিদের সঙ্গে কেমন করে যোগাযোগ সম্ভব। ক্যাপ্টেন ভুইয়া, শওকতসহ বেশ কিছু অফিসার বেলালের চেনা। কিন্তু বিদ্রোহী ভুইয়াকে কোথায় পাওয়া যাবে! বেলাল তার সাহস সর্বস্ব বলি দিতে প্রস্তুত। দেশমাতৃকার জন্য কিছু করার – অগ্নিপরীক্ষার এখনই সময়।ঠিক তখনই কাকতলীয় যোগাযোগ।

উদভ্রান্ত মেজরের সঙ্গে দেখা মেজরের। পরস্পর ঘনিষ্ট হৃদ্যতা ছিলনা। কিন্তু পরস্পরকে চিনতো। এই মেজরটি বড় চুপচাপ। মনখুলে কথা বলে না। হাসে না এটা বেলাল জানতো। তারপরও তাকে দেখতে পেয়ে হাতে যেন চাঁদ পেল। সে জানতো না- মেজরটি রহস্যজনকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভুইয়া যখন পক্ষ পরিবর্তন করেছে তখন অন্য কোন বাঙালি অফিসার পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে সে অসম্ভব। ওই পাঞ্জাবিগুলো সেটা হতে দেবে না। মেজরটি যতই রহস্যমানব হোক বেলাল নানা হিসাব করে তার কাছে প্রস্তাবটি পারল। বললো যা করার করতে হবে এখনই। মেজর তখন আরও বিভ্রান্ত। কি করা উচিত মওকা কোনদিকে সে হিসাব করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এই স্বাধীন বাংলার লোকজন তাকে দিচ্ছে না। অনেক দুর থেকে শুঁকতে শুঁকতে সে এই কালুরঘাটে এসেছে। ঘাঁটি ঠিকই তল্লাশি করে পেয়েছে।

গম্ভীর হয়ে সে জানতে চাইলো আপনারা তো ডিক্লারেশন এনাউন্স করেছেন। এনাউন্স তো হয়ে গেছে। ওয়ান্স এনাউন্সড, দ্যাট মিনস ইটস ডিক্লেয়ারড। হোয়াই আই এগেইন এনাউন্স! বেলাল বেশী কিছু বোঝাতে গেল না। গম্ভীর কন্ঠে রসিকতা করে বললো উই আর মাইনর পিপল। এমং আস ইউ আর মেজর। আমরা মাইনর। আপনি আমাদের মাঝে মেজর। কথাটা খুব মনে ধরলো মেজরের। বেশ কথা। ইয়েস আর্মি অফিসারস আর অলওয়েজ মেজর। বাকি সব ব্লাডি সিভিলিয়ান। ওরা সব মাইনর।
মেজর বলল ওকে। ওকে। কি পাঠ করতে হবে বল। তোমরা একটা রাইটআপ লিখে নিয়ে আসো। আমি এনাউন্স করে দিচ্ছি। বেলাল গং তার হাতে বিরাট এক নিউজ স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দিল। তাতে অনেক কথা লেখা। ক্যাপ্টেন ভুইয়ার গুনগান করেছে বেটা। শেখ মুজিবকে গড বানিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখেছে। জঘন্য। রাষ্ট্রিক। শেষে আবার লিখেছে জয় বাংলা। মেজর ভেতরে তেতে উঠল। জিন্দাবাদ নয় জয়। মনটা বিষিয়ে গেল। ইচ্ছে হচ্ছিল থাপ্পড় কষিয়ে চলে যায়।

চট্টগ্রাম রেডিও এই শ্রুতিমধুর নামটা পর্যন্ত পাল্টেছে। বলছে চট্টগ্রাম বেতার; আবার বলছে স্বাধীন বাংলা বেতার। অশ্লীল লাগছে শুনতে। অশ্রাব্য। তার খুব রাগ হচ্ছিল। এ কোথায় সে এসেছে। ইচ্ছে হচ্ছিল সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে দেয়। এগুলো সব গাদ্দার। সব হিন্দুস্থানি এজেন্ট। চিটাগং রেডিওকে নগ্ন ন্যাংটা করে পলাপলি খেলছে। এসব খেলতে খেলতে নিশ্চয়ই ইন্ডিয়া পালাবে। তার আগেই এই গাদ্দার ট্রেইটরদের খতম করে দেয়া দরকার। তীব্র ইচ্ছা হচ্ছিল।
কিন্তু আরেকটা ভয়ানক দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে খচ খচ করছে।  এই গাদ্দার বাঙালি গুলোকে খতম করে সে যাবে কোথায়! ক্যান্টমেন্টে গেলে সেখানে ঠাঁই হবে না। সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে অপরিনামদর্শী ক্যাপ্টেনরা। ওদের উত্তেজনা বেশী।

কি যে করে মেজর। বার বার নিজের উদ্দেশে বলল কুল ম্যান। কুল। ইউ আর মেজর। ইউ আর নট মাইনর। বিহেভ লাইক মেজর। তিক্ত মনে স্ক্রিপ্টটা দেখল। সানগ্লাসের ভেতর দিয়ে মাইনর লোকগুলোকে দেখল। খেয়াল করলো ওদের মধ্যে উদ্দীপনা ঝলকাচ্ছে। ঝিলিক দিচ্ছে প্রতিজ্ঞা। মেজর খুবই বিরক্ত। কিন্তু তার তৃতীয় চিত্ত বলছে মাথা গরম করলে চলবে না। কুল ম্যান কুল।  মেজর নাক লম্বা করে নিঃশ্বাস নিল প্রকান্ড। হাওয়া কোন দিকে! এই মানুষগুলোর কি টিক্কার জল্লাদখানায় বলি হওয়ার জন্য লাফাচ্ছে। শেখ মুজিব কোন বুদ্ধিতে বাসায় বসেছিল। ইয়াহিয়া তাকে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে জবাই করবে একশ পার্সেন্ট গ্যারান্টি।

তারপর হাওয়া কোন দিকে বইবে। ইয়াহিয়া কি পারবে পূর্ব পাকিস্তানকে বেলুচিস্তান বানাতে। মিলিটারি স্ট্রাটেজি কি বলে! বাঙালি পাবলিক পাকিস্তানের পক্ষে নেই। মিলিটারি ক্র্যাকডাউনই ইয়াহিয়ার একমাত্র অস্ত্র। পূর্ব পাকিস্তানের ফিল্ড কন্ডিশন অতি জটিল। এটা বেলুচিস্তান নয়। মুজিবকে খুন করার পর বাঙালি কি দমে যাবে। গুলি করে তাদের খতম করা যাবে কি!

হাতে বেশী সময় নেই। সানগ্লাসের আড়াল থেকে পুরো ভবিষ্যতটা তার দেখা চাই। হোয়াট নেক্সট! হোয়াট ইজ আফটার মুজিব কিলিং! অয়ারলেসে এর মধ্যেই খবর পাচ্ছিল বাঙালি অফিসাররা পক্ষ পাল্টে মুজিবের সঙ্গে যাচ্ছে। টিক্কা ক্যান্টনমেন্ট গাদ্দার, ট্রেইটর বলে  গালির তুবড়ি ছোটাচ্ছে। বারবারই রেড অর্ডার কোর্ট মার্শাল।
ব্লাডি ইয়াহিয়া; ব্লাডি টিক্কা, রাও ফরমান আলী। এ গুলো আসলেই বেজন্মা-জারজ। নির্বোধ, ঘিলুহীন। কোর্ট মার্শাল এইসব ভয় ভীতি দেখিয়ে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় বানিয়ে ফেলছে। এমনিতেই পাকিস্তান আর্মিতে বেঙ্গল পল্টন দুর্ধর্ষ। শরীর স্বাস্থ্যে পাঞ্জাবিরা নাদুস নুদুস বলশালী হলেও বাঙালি পল্টন অপরাজেয়। দুর্ধর্ষ অনেকগুলো কারণে। বেশীর ভাগই মদ্যপায়ী নয়। নারী বিলাসী নয়। পারফমেন্সে চৌকস ও শ্রেষ্ঠ না হলে প্রমোশন বন্ধ সে আশঙ্কা প্রবল। এই হিসাব গুলো বাঙালি পল্টনে দুর্ধর্ষ সব যোদ্ধা ও অফিসারের জন্ম দিয়েছে। এরা মুজিবের পক্ষ নিলে ভয়াবহ বিপদ।

মেজর স্ক্রিপ্টটি আবার পড়ল। খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ল। সাতই মার্চে শেখ মুজিব বাঙালি জাতটাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দিয়েছে লেলিয়ে দিয়েছে সেটাও তো ভয়ংকর সত্য। কপাল কুঁচকে, মাথা গরম করে এই সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। রেসকোর্সের শো শো লু হাওয়া চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বসে তারও চামড়ায় এসে লেগেছে। যে কাজটা বেলুচিস্তানে কেউ পারে নি। সেটা মুজিব পেরেছে।  তার হাতে ধরিয়ে দেয়া লেখাটার মধ্যে মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষনাটাও রয়েছে। কি বলেছে এই  সিভিলিয়ান লিডার। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বিদেশী শত্রু সৈন্য বাংলাদেশ আক্রমন করেছে রাতের অন্ধকারে। তার মানে এটা তো সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অস্বীকার।

বিদেশী শত্রু সৈন্য বলতে পাকিস্তানিদের বুঝিয়েছে। লোকটা দেখি কোন রাখঢাক করে নাই। পাকিস্তান থেকে এক ঘোষণায় আলাদা করে ফেলেছে পূর্ব পাকিস্তানকে। আশ্চর্য! সারপ্রাইজিং লোকটার দুঃসাহস। ভয় ডর নাই।  এই লোক তো জীবন বাজি রেখেছে। একে তো ইয়াহিয়ার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অতি সহজে ঝুলিয়ে দেবে। লোকটা হয় অতি চালাক; নয় তো অতি সরল। রাষ্ট্রনীতি বোঝে না। নিজের জীবন বাজি রেখে কঠিন চালটা চেলে দিয়েছে। বাঙালির আর পেছনে সরবার রাস্তা নাই। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হোক বা না হোক মুজিবর গিলোটিন হচ্ছেই। গিলোটিনে কাটা পড়বে তারাও।

ইয়াহিয়া মুজিব আর রিবেল আর্মিকে কোন প্রশ্রয় দেবে না। পাকিস্তান টিকলে সব কটাকে ঝুলাবে। কঠিন সমস্যা। মুজিবের স্বাধীনতার ডিক্লারেশনটা আবার পড়ল। আপামর জনসাধারণের প্রতি আমার নির্দেশ আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন, এবং আপনাদেও হাতে যাই থাকুক তাই নিয়ে দখলদার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যান্ত লড়াই করুন।

পড়ে নড়ে চড়ে বসল মেজর। কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগল চারদিক। মনে হল হায়। এলাস। পূর্ব পাকিস্তান কি তবে আর পূর্ব পাকিস্তান নাই। মুজিব তো সরাসরি পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে ফাইট করার অর্ডার দিয়েছে। আর অর্ডার! এই লোক বাঙালি ক্ষেপানোর ভয়ংকর গুন নিয়ে জন্মেছে। যা ক্ষেপানোর সেটা সে সাত মার্চেই সেরে রেখেছে। সেদিনকার ভাষনের পুরো বিবরণ মেজর আর্মি ফোরামে পড়েছে। মাই গড। বাঙালিকে কেমন করে ক্ষেপাতে হয় শেখ মুজিব জানে। আচ্ছা। একটা কাজ করলে কেমন হয়! সে যদি নিজের মত একটা ডিক্লারেশন দিয়ে দেয়। যদি বলে স্বাধীন রেডিও পূর্ব পাকিস্তান থেকে আমি মেজর বলছি। সে যদি নিজের মতো কওে একটা এনাউন্সমেন্ট দিয়ে দেয়। কেমন হয়। এই তো আসল মওকা। এই তো গোল্ডেন চান্স। এই চান্স জীবনে বার বার আসে না। এখন এখন চিটাগং রেডিও পাকিস্তানে সেই হচ্ছে একমাত্র মেজর। বাকি সব মাইনর। সে যা বলবে এনাউন্স করতে চাইবে বাকিরা সেটা মানতে বাধ্য।

তার কাছে ফুল লোডেড রিভলবার আছে।হের  হিটলার তো সেই কবেই বলে দিয়েছেন বন্দুকের নলই হচ্ছে ক্ষমতার উৎস। এই গুটি কয়েক মাইনর সব মানতে বাধ্য। কোন নসল্লিপনা করলে কপালে রিভলবার ঠেকাবে। বলবে এপাশ ওপাশ ছিদ্র করে দেব। মাইনরগুলো টু শব্দটি করবে না। ফৌজী আর সিভিলিয়ানের পার্থক্য ওরা জানে না। ফৌজীরা বিনা বাক্য ব্যায়ে যে কাউকে মুহুর্তেও মধ্যে খতম করতে পারে। সিভিলিয়ান তা কল্পনাও করতে পারবে না।

এনাউন্সমেন্ট দিয়ে দেবে নাকি মেজর সাব। কিসের শেখ মুজিব। কিসের বঙ্গবন্ধু। এই দুনিয়ায় সে এখন কয়েকদিনের মেহমান। ইয়াহিয়া তাকে খাঁচায় পুরেছে। তার লাশ পর্যন্ত মুজিবের বেগম দেখতে পাবে না। মুজিব এখন বাতিল লাশ মাত্র। কিন্তু কি হিসেবে দেবে! দুর্দান্ত মওকা এসেছে হাতের মুঠোয়। এটা কাজে লাগালেই কেল্লা ফতে। কি হিসেবে ঘোষণাটা দেয়া যায়!

নিজেকে বাবায়ে পাকিস্তান বলে এনাউন্সমেন্ট দিলে কেমন হয়। নাহ। জিন্নাহ স্যারকে অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না। হি ওয়াজ দ্য গ্রেট লিডার। কায়েদে আযম, বাবায়ে আজম, বাবায়ে মিল্লাত বললেই কেমন খুশ হয়ে ওঠে দিলটা। উর্দু প্রতিটা শব্দ উচ্চারণে দারুণ জোর পাওয়া যায়। এমন ফৌজী ভাষা আর হয় না। সে তুলনায় বাংলা উচ্চারণ বড় মেন্দা মারা। বাংলা ভাষাটাকে বদলানো দরকার। প্যান প্যানে ভাবটা রাখা চলবে না। তাকত আনতে হবে। আরবী ফারসী উর্দু শব্দ বাড়িয়ে তাগতবান করতে হবে। আফসোস, কবে যে সেই মওকা আদায়  হাসিল হবে।

আচ্ছা , পাকিস্তান আর্মির  চিফ অব আর্মি স্টাফ হিসেবে এনাউন্স করলে কেমন হয়। কিংবা সদরে পাকিস্তান বলে নিজেকে ঘোষনা দিলে কৌন কেয়া বলেগা। সদরে পাকিস্তান মানে হেড অব স্টেট কি সুন্দর লাগে শুনতে। দিল গুলশান গুলশান হয়ে যায়। এখন রেডিও পাকিস্তানের চিটাগং স্টেশনের সর্বময় ক্ষমতা তার হাতে। যা মন চায় , তাই করতে পারে। চাইলে সে ফোর স্টার জেনারেল হিসেবে নিজেকে এনাউন্স করতে পারে। চাইলে সে পাকিস্তান আর্মির সর্বাধিনায়ক হিসেবেও এনাউন্সমেন্ট করতে পারে। উফস! থ্রি স্টার, ফোর স্টার জেনারেল কি বিশাল একটা ব্যাপার। সমগ্র পাকিস্তান থাকবে তার হুকুমের তাঁবেদার। পকেটে রিভলবার; মুখের সামনে রেডিওর মাইক্রোফোন। মন চাইছে বলে দিলেই হয়। ইথাও অয়ারলেসে ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র। সবাই জানবে এক এনাউন্সমেন্টে মেজর থেকে সে সদরে পাকিস্তান ফৌজ হয়ে গেছে।

বন্দুকের নলের যে এত রোমাঞ্চকর ক্ষমতা মেজর আগে কখনও অনুভব করে নাই।  কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে তার এই ফ্যান্টাসির। মাইনরগুলো চেচাঁবে। হাউকাউ করবে। বলবে কিসের ছাতার মেজর তুমি। তোমার  তো দুই পয়সার দামও নাই। তুমি পাগল ছাগলের মত কিসব বলে চলেছ। তোমারে চেনে কেডা! তোমারে নিয়া আসছি বঙ্গবন্ধুর ডিক্লারেশনটা আরেকবার এনাউন্সমেন্ট দিতে তুমি দেখছি ফাজলামি-ইয়ার্কি তামাশা করে চলেছো। তুমি কি পাগলাগারদের পাগল!

মাইনরদের দিকে তাকিয়ে মেজর চোর চুপটি হাসে। বেলাল তাকে তাড়া দেয় কি হল ব্রাদার। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটা চটজলদি পাঠ করে শোনান না। কি ভাবছেন। আপনি এনাউন্সমেন্ট করে দিলে সম্প্রচারটা সেরে ফেলতে পারি। এখানে তো বেশী সময় থাকা চলবে না। যে কোন সময়ে আর্মি রেড হতে পারে। মেজর মনে মনে হাসে। ব্লাডি সিভিলিয়ান। রেড রাইস এন্ড ফিশ ইটার। এন্ড স্লিপিং উইথ ওয়াইফ। ব্লাডি নেটিভ।

মেজরের মনের ফ্যান্টাসির বিভ্রম কিছুতেই কাটে না। একা একা কথা বলে যায় নিজের সঙ্গে। আজ নয়। আজ নয়। মওকা মিলেগা তো একদিন হবেই। বাইগার নদীর কাকচক্ষু জল বয়ে চলেছে দূর দক্ষিণে। পশ্চিমের দিকটায় ঘন নিঝুম জঙ্গল। ভীষণ সবুজ। তাল তমাল হিজল সুপারির সারি। তার আড়ালে টুনি খাল। পুবের কোলায় আদিগন্ত শস্যক্ষেত। শিশির ভেজা ভোর রাতে জল জঙ্গলে  হঠাৎ পাখির উড়াল। কাছে পিঠে ডেকে উঠল বিষণ্ণ ডাহুক। একরত্তি একটা রাঙা হালতি উজান আকাশ থেকে উড়ে এসে মাটিতে আছড়ে পড়ে গোঙাতে লাগলো। কী হল রাঙা হালতির! কয়েকটা ধানশালিক সেখানে কোত্থেকে হাজির। মৌন অচঞ্চল। বাইগার স্রোত কেমন উদাস, উচাটন। অশ্রুসজল ধারা শ্লথ ও শম্বুক।

বাইগার জলধারায় কেন আজ অশ্রু-উচ্ছ্বাস!

গোলাম পাকিস্তানির চোখে কয়েকদিন ধরেই ঘুম নেই। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েছে। মদুদীই তাকে এই মহৌষধের কথা বলেছিল। দিনের পর দিন যদি ঘুম না আসে এটা বৈজ্ঞানিক মহৌষধ। মদুদির সবসময় ফাজিল ফাজিল চোখ। যাই বলে মৌজে থাকে। ইয়ার্কি তামাশায় মশগুল।ধর্মকর্ম্ম নিয়ে যখন বলে তখনও লোভ লাভালাভ-জিগাংসা-হিংসায় হিস হিস করে চোখগুলো। মদুদি বলেছিল ইসলাম তো ধর্মই নয় আসলে সাইন্টিফিক লাইফস্টাইল। এটাকে পরজগতের জান্নাতের সিঁড়ি দিলে হবে না। এটাকে ইহজাগতিক সুখ-সুবিধার মোক্ষম অস্ত্র বানাতে না পারলে ধর্মকর্ম্ম করে কি লাভ!

রাষ্ট্রক্ষমতা শর্টকাট দখলের ক্ষুরধার তরবারি এই ধর্ম্ম। মানবমনের গভীর রহস্য হল সে পরজগতের জন্নাত তো চায়ই ইহজগতেও ফকির-মিসকিন হয়ে থাকতে চায় না। জান্নাতে গেলে তুমি সদরে পাকিস্তান হবে এই লোভ দেখানোর চেয়ে যদি তুমি এই প্রলোভন তাকে দেখাতে পারো ধর্ম্মকর্ম্ম করলে তুমি এই জগতেই সদরে পাকিস্তান খেদমতগারে পাকিস্তান এল এম এ হতে পারবে আরামশাহীর জীবনযাপন করতে পারবে দেখবে মানুষ তোমার দিকে সুড় সুড় করে লাইন দিয়েছে। তোমাকে মস্ত বিশ্ব নেতা মানছে। মনে রেখো জান্নাতের সুখ সুবিধা হুরপরী-গেলমা ওটা হচ্ছে এডভারটাইজমেন্ট কর্মার্শিয়াল সার্ভিসেস অব রিলিজিয়ন; লেকিন কেবল এডভারটাইজ করলেই ব্যবসা জমে না। মাল কেনার পর সুখসুবিধা কি সেটা পরখ করতে অবশ্যই ইহজগতের বেসিক প্রাকটিস দরকার।

ইহজগতে নানা সুখসুবিধা নিশ্চিত করছে সাইন্স। সাইন্স শব্দটা সবার মধ্যে খুব পপুলার। তালেবর-তালেবান-নও জওয়ান তাই সাইন্স পড়ার জন্য পাগল। সুতরাং তুমি যখন এডভারটাইজমেন্টে নামবে প্রতিটা কথায় পারলেই সাইন্স-সাইন্টফিক কথাগুলো রাখবে। বলবে কিসের খেরেস্তানি-জিউস্ট সাইন্স-ফাইন্স আসল সাইন্স হচ্ছে এই ধর্ম্ম। হুজরাখানার হুজুরের সাথে তাল মিলিয়ে চলার দরকার নাই। বরং দরকার পপুলার হুজুগের সাথে সুকৌশলে তাল মিলিয়ে চলা তোমার ঘুম আসতেছে না।

সারারাত জেগে রয়েছ। ঘুমানোর জন্য মন আনচান করছে। একখানা কাজ করো। তাহাজ্জুদেও সালাত আদায় করতে থাকো। দুই রাকাত;দুই রাকাত। পড়তে থাকো। সওয়াবের ধান্দা রাখো। কিন্তু সাইন্টিফিক কার্যকারণও কাজ করা শুরু করেছে। তোমার শরীরের এক্সারসাইজ চলতেছে। শরীর দুর্বল হচ্ছে। একসময় তোমার ঘুম আসবেই। কিন্তু সওয়াবের ফিকির ধান্দা ছাড়বে না। তোমার লাভ একঢিলে দুই পাখি। সওয়াবও কামালে। ঘুমাতেও পারলে। মদুদি যখন বয়াত-বয়ান করে। দাঁড়ি নাড়াচাড়া করতে থাকে হাতে। তারপর হাত নাকের কাছে নিয়ে জাফরানি সুবাস নেয়। নিজের মধুর বচনামৃতে নিজেই মুগ্ধ। গোলাম মুগ্ধ ততোধিক বেশী।

বলে হুজুর, আপনার সবগুলো কিতাব-তফসির-বয়ান বেঙ্গলীতে তরজমা করতেছি। মৌলানা লাগাইয়া দিছি। সে মনের মাধুরী মিশিয়ে বেঙ্গলীতে ওয়ার্ড টু ওয়ার্ড তরজমা করছে। মদুদি খুশি হয় শুনে। বলে মৌলানা লাগালে কেন! ইউনিভার্সিটি টিচার পেলে ভাল হত। ঢাকা ইউনিভার্সিটির আরবী উর্দুর এলেমদার টিচার। মদুদি হাসে বুঝলে হে গোলাম, মাদ্রাসা মৌলানায় এখন আমার বিশেষ ইনটারেস্ট নাই। ইসলাম ফের জিন্দা নেহি হোগা হর কারবালা কি বাদ; নেহি ফের জিন্দা হোগা মাদ্রাসা মে;জমানা-এ মাদ্রাসা বাতিল হো গিয়া। ইসলাম জিন্দা করনে কেলিয়ে স্কুল-কলেজকি সহবত জরুরত হ্যায়।

ইংলিশ স্কুল-প্রো-ইংলিশ স্কুলকে টার্গেট করতে হবে। মাদ্রাসা লাইনে কয় জন চান্স পায় সিভিল সার্ভিসে। মাদ্রাসার সিএসপি কয় জন। এডমিনিস্ট্রেশন-ডিএম-এডিএম, মুন্সেফ-কোর্টকাচারি সব তো ইংলিশ লাইনের স্কুলের দখলে। মাদ্রাসা এখন খালি ইয়া নবী সালামালাইকা। খালি রমজানে কোরান খতম। মৌলুদশরীফ- আর মুসলিম লিল্লাহখানা। এই লিল্লাহ বোর্ডিং ফি সাবিলিল্লাহ দিয়ে রাষ্ট্র-এডমিনিস্ট্রেশন দখল হবে না। আর্মিতে মাদ্রাসার জওয়ান কি আছে। উপরের দিকে নাই।

তলের দিকেও থাকলে থাকতে পারে। সংখ্যায় খুব কম। পুলিশে কি আছে প্রেস-পাবলিকেশনে আছে!! ডাক্তারি-এঞ্জিনিয়ারিং-এ আছে! নাই মিঞা। থাকলেও সংখ্যা খালি কমতেছে। যে মাল কমতেছে তার দিকে নজর-আন্দাজ করে লাভ নাই। লাভ হবে যে মাল বাড়তেছে প্রডাকশন বেশী ডিমান্ড বেশী; ক্রাইসিস বেশী সেই মালের মধ্যে হিস্যা বসাতে পারলে। আমি কি বুঝাতে পারলাম গোলাম মিঞা।  মদুদি যখন গোলাম পাকিস্তানিকে আদর হে করতো ; তখন কোমল কন্ঠে মিয়া বলে সম্বোধন করতো। শুনো মিঞা অত্যন্ত ইমপরট্যান্ট কথা বলে যাই। মুসলমান ঔরসে পয়দা হলেই মুসলিম হলাম; মালাউন কতল করলাম তাতেই মুসলমান হওয়া হল না।

মুসলমান হতে চাইলে জমাতে ইসলামে বয়েত নিতে হবে। বয়েত না নিলে সে আর কাফির-মুশরিকে কোন তফাৎ নাই। বয়েত হচ্ছে আসল। এই বয়েত চালু করেই কাদিয়ানিরা খোদ পাকিস্তানে ইউরোপে আফ্রিকায় বিশাল জমাত কায়েম করেছে। মদুদি কথা বলে ফুর্তি ফুর্তি চালে। মালাউন অবশ্যই কাটতে হবে। কিন্তু কোন মালাউন আমরা কাটবো। মালাউনের ডেফিনিশন এখন বদলেছে। যে বা যারা জমাতে আসবে না বয়েত নেবে না ওরা হচ্ছে বড় মলাউন। হিন্দু ইহুদি খেরেস্তানের সঙ্গে চাইলেই আমরা পেরে উঠব না। তাদের সঙ্গে পারার কি দরকার। তার আগে জমাতে মদুদিতে সবাইকে জমায়েত করতে হবে। জমাতে না আসতে চাইলে বলে দাও সে নাস্তিক মলাউন-এথিস্ট। ওর চেয়ে মারাত্মক কাফির-বেদ্বীন হয় না। রটিয়ে দাও। গুজব ছড়াও।

বলো আসমান থেকে এদেরকে কতল করার গায়েবি আওয়াজ এসেছে। বলে দাও, গভীর রাতে চান্দার মধ্যে থেকে এই গায়েবী আওয়াজ শোনা গেছে। কে কে শুনেছে। নিজের বয়েত নেয়া কর্মীদের দাঁড় করিয়ে দাও। ওরা সাক্ষ্য দেবে। মদুদি ধুরন্ধর দার্শনিক। আস্তিক মানে কি বিশ্বাসী। তাই তো। আর বিশ্বাসী মানেই হল নানা অদ্ভুত জিনিস বিশ্বাস করার জন্য যে আদমসন্তান  প্রস্তুত। যদি বল মধ্যরাতে চান্দাকে আল্লাহ আল্লাহ বলে জিকির করতে শুনেছ। যদি বানিয়ে কিছু সাক্ষ্য দাঁড় করাতে পার দেখবে বিশ্বাস করার ধুম পড়েছে। লোকের অভাব হবে না। যদি কয়েকজন মিলে বল গাছকে নামাজ পড়তে দেখেছ। দেখবে বিশ্বাস করেছে অনেকে। এই বিশ্বাস হচ্ছে ভয়ংকর বস্তু। ভয়ংকর অস্ত্র। এটাকে কাজে লাগিয়ে তুমি জাগতিক সব কিছু হাসিল করতে পার।

তবে হ্যা, মুখে খালি ধর্ম-কর্ম আর পরজগতের ভয়ভীতির কথা আওড়াবে। আর কার্য ক্ষেত্রে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস নিয়ে খেলবে। বিশ্বাসীদের যা খাওয়াতে চাইবে তাই খাবে। বিশ্বাসের এই ভয়ংকর শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলেই কেল্লা ফতে। এই ভয়ংকর শক্তি  এটম বোমার চেয়েও শক্তিশালী। বোমা-গুলি-টর্পেডো-মর্টার-ট্যাঙ্ক দিয়ে এই শক্তিকে দমন করা যায় না। এখন কৌশল হচ্ছে তুমি কিভাবে তোমার বিশ্বাসকে বিনিয়োগ-বিপণন- মার্কেটিং করছো।

মফস্বলের কলেজে লেকচার দিত গোলাম পাকিস্তানি। তার পরম সৌভাগ্য মস্ত কপাল গুনেই মদুদির কাছে সে জমাতে বয়েত নিয়েছে। তারপর যতবারই বয়ান-বয়েত শুনেছে মুগ্ধ থেকে বিমুগ্ধ হয়েছে। কতরকম জ্ঞান-বিজ্ঞানই না গুলে খেয়েছে এই মদুদি। তাকে আল্লামা বললে কমই বলা হয়। সে যখন বয়েত করে, তখন তার দাঁড়ি গুচ্ছ থেকে জাফরানের সুগন্ধ আসে। সেও এক মুগ্ধকর অভিজ্ঞতা বটে। জমাতে বয়েত করার জন্য আম-মুসলমানদের টার্গেট করো। যারা নামাজ পড়ে না, তাদের একঘরে করো। নামাজ পড়তে ডাকো। বয়েতে ডাকো। 

না আসলে  তাকে মলাউন বানাও। ঘোষনা করে দাও গুজব রটিয়ে দাও সে নাস্তিক। রগ কাটো। গলায় ছুরি মারো। ভয় দেখাও। আতঙ্ক করো। দেখবে সবাই সুরসুরিয়ে বয়েতে আসবে। ধর্মকে আর দর্শনের জায়গায় রেখ না। জায়নমাজে রেখ না। জায়নমাজ হচ্ছে মুসল্লির। কিন্তু ধর্মকে এইসব ফালতুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে।  মসজিদ কেন নামাজ পড়ার জায়গা হবে। ওখানটায় রাজনীতি করো। রাজনীতি ঢোকাও। আস্তে আস্তে ঢোকাও। কেউ টেরও পাবে না। জমাতের বয়েতের কাজ করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ আসবে। পালিয়েও কাজ করতে হতে পারে। যখন পালিয়ে বেড়াবে ঢুকবে গিয়ে মসজিদে। বলবে নামাজ পড়তে এসেছি। বলবে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে পড়তে বেদিশা হয়ে পড়েছি।
দেখবে কেউ তোমাকে সন্দেহ করছে না। আর প্রতিটা বয়ানে সাইন্সকে রাখবে। পাবলিকের কাছে বেশী যাওয়ার দরকার নেই।

ওসব খাইখাটনির কাজ মুজিব মার্কা পাবলিক লিডার-পাবলিক পার্টি করবে। বরং স্কুল কলেজে ঢোকো। নামাজ রোজার নামে মটিভেশন করো। মসজিদে ডাকো। নামাজ পড়ো বা না পড়ো কোনায় গিয়ে মটিভেশন করো। বয়েত দাও। বয়েত মানেই তো মটিভেশন। স্কুল কলেজে ঢুকলেই তুমি অটোমেটিক্যালি মেডিকেলে ঢুকছো। এঞ্জিনিয়ারিং-এ ঢুকছো। ভার্সিটিতে ঢুকছে। তুমি স্কুলের বয়েত প্রজেক্ট দিয়ে সরে যেও না। আঠার মত লেগে থাক। দেখবে অল্প ইনভেস্টমেন্টে কি বিশাল রিটার্ন। ওরাই ডাক্তার হয়ে বেরুবে। এঞ্জিনিয়র হবে। হেকমত দেখাবে। গভর্নমেন্ট সার্ভিসে ঢুকবে। আইএসপি সিএসপি হবে। প্রশাসনের হর্তাকর্তা হবে। আর্মিতে ঢুকবে। সেই যে একবার বয়েত করিয়ে নিয়েছ দেখবে যেখানেই যাক না কেন তোমার কলকাঠিতেই নড়ছে।  অদ্ভুত। মাশাল্লাহ। মাশাল্লাহ। ওস্তাদ কি ওস্তাদ মদুদি। তার মুখের বয়ান বয়েত মানেই মুখভর্তি গুলশান মুখভর্তি গুলিস্তাঁ। শুকরিয়ার ভাষা খুঁজে পায় না গোলাম পাকিস্তানি। 

একান্ত গোপনীয় এক বয়েতে গোলাম পাকিস্তানি তার ওস্তাদ মদুদির কাছে কাদিয়ানি-কতল নিয়ে জানতে চেয়েছিল। পশ্চিম পাঞ্জাবের বাড়িতে মসজিদে ঢুকে ঢুকে হাজার হাজার কাদিয়ানি মুসলমানকে কতল করেছিল মদুদি আর জমাতিঅলারা। প্রশ্ন শুনে মোটেই বিব্রত হয় নি মদুদি। বরং তার মুখ দারুন সুখ-প্রশান্তি-খোশনূরে ভরে গিয়েছিল। বিগলিত হাসিতে বললো জমাতের এই আসমানী বয়েত লাভের পর পরম পূণ্যের কাজ হয়েছিল ওই কাদিয়ানি কতল। দি গ্রেট জায়েজ ওয়ার্ক। ওরা যেভাবে এগুচ্ছিল পুরো পাঞ্জাবকে বয়েত করে ফেলত।

ওদের বয়েতের দারুন শক্তি। কৌন হ্যায় ইয়ে গোলাম আহমদ কাদিয়ানি। কাদিয়ান কা আদমী হ্যায়। কাদিয়ান কি ধার হ্যায়। ইয়ে তো পাঞ্জাবকা ডেরা হ্যায়। মদুদি আস্তে আস্তে বললে মুসলিম মিল্লাতের  মধ্যে সবচেয়ে কমজোরি  কওম হচ্ছে পাঞ্জাবি মুসলিম। দে আর নট মুসলিম। ওদের নতুন করে ইসলামে বয়েত হওয়া দরকার। মুসলিম খান্দানে জন্ম নিলেই মুসলমান হওয়া যায় না। জমাতে বয়েত হওয়া দরকার।

পাঞ্জাবের ডেরায় ডেরায় মাজার আর মাজার। সেখানে সঙ্গীতের লহরী চলছে। নৃত্যগীত চলছে। আওরত ভি সঙ্গীত করছে মাজারে। নাচছে। কুঁদছে। পাঞ্জাবি ফিলম কি  তুমি দেখেছ প্রফেসর। দেখ নাই। দমাদম মাস্ত কলন্দর। আলী কা পহেলা নম্বর। কেয়া দম হ্যায়। দুনিয়া গুলজার কর দিয়া। শরাবোঁ কি শরাব হ্যায় এই মাজারোকা গীত। সঙ্গীত আর উদ্দাম নৃত্যের ভয়ংকর লহরী। পাঞ্জাবিরা বহুত কমজোরি মুসলিম।

শরাব, আওরত ছাড়া ওরা কিছু বোঝে না। কাদিয়ানিরা ঠিক টার্গেট করেছিল। যেভাবে বয়েত করে করে এগুচ্ছিল তাতে এই কমজোরি কওমকে দুএক দশকের মধ্যেই কাদিয়ানি-খালিস্তানি বয়েত করিয়ে ফেলত। দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে মদুদি ফাজিল ফাজিল হাসে। আমি যদি ওই কতল-জজবার উস্কানি না দিতাম; আম-পাঞ্জাবিদের মধ্যে কতলের জোশ পয়দা করে না দিতাম তাহলে তামাম পাঞ্জাবিরাই কাদিয়ানি বয়েতে কতল হয়ে যেত। আর কাদিয়ানিদের কওমী ইকনোমিক্স ভীষণ মজবুত।

কওমের প্রতিটি মেম্বর এই বুনিয়াদি ইকোনমিক্যাল ক্লাবের সভ্য। বায়তুল মাল শরীফ। এইটার মেম্বর হওয়া ফরজ। ওরা সারা দুনিয়া থেকে চান্দাবাজি করে ডলার পাউন্ড আনছে।  আর কওমী ব্যাঙ্কে বায়তুল মালে  জমা করছে। দুর্দান্ত এই পলিসি। এই কওমী টাকশাল তাদের সকল শক্তির ফাউন্ডেশন। ওদের নিশানা থেকে পাঞ্জাবীদের নিস্তার ছিল না। কাদিয়ানি জমাত থাকবে আবার আমার মিল্লাতি জমাতও থাকবে সে হয় না। এক কওমে দুই শের থাকতে পারে না।

(চলবে…)

অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন

Channel-i-Tv-Live-Motiom

শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

‘ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার’ দাবি ঘিরে বিভ্রান্তি, যা বলছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ

জুন ২৩, ২০২৬

নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে স্পাইডার-ম্যানের চতুর্থ সিনেমা

জুন ২৩, ২০২৬

ঢাকায় আশুরার ৬৩ মিছিলে বিশেষ নজরদারি

জুন ২৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

ক্যান্সারের ওষুধের ঘাটতি: ভারতীয় ওষুধের দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র

জুন ২৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে সুইস রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

জুন ২৩, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT