মা হার মানার পাত্রী ছিলেন না। কখনো তিনি সভা সমাবেশে বক্তব্য রাখেননি। কখনো মিছিলের অগ্রভাগে শ্লোগানমুখর হয়ে ছোটেননি। কিন্তু তিনি ছিলেন দীর্ঘ ম্যারাথন দৌঁড়ে শামিল। তিনি দীর্ঘপথ পাড়ির কাজটিই বেছে নিয়েছেন। আব্বা শত জুলুমবাজির মুখেও হাজারো কষ্ট সহ্য করে ক্রমশ বাঙালির নেতা হয়ে উঠছিলেন। আম্মা তখন নেপথ্যের নিউক্লিয়াস। এক নারীর এই বীরবিক্রম লড়াইয়ের কাহিনী তখন গুটি কয়েকজন ছাড়া আর কে বা জানত!
তিনটি বছর জেলে নির্যাতন সয়ে আব্বা যখন উদীয়মান মহাবীর হয়ে বের হয়ে এলেন বাইরে – আম্মা তখন লড়ে লড়ে ক্লান্ত। বিধাতা যেন অলক্ষ্যে সব রকম দুঃখকষ্টের স্টিমরোলার চালিয়ে এই মহিয়সীকে আরও কঠিন পরীক্ষার জন্য তৈরি করে নিচ্ছিলেন।
মা একবার সম্ভবত একটু স্বস্তি সুখ পেয়েছিলেন। ষাটের দশকের শুরুতে বত্রিশ নম্বর রোডের একান্ত আশ্রয়ের ইটের গাঁথুনি শুরু হলো; সন্তানেরাও বেখবর ছিল না; শুনল এবার নিজেদের বাড়ি হচ্ছে। হোক ঢাকার উপকণ্ঠে – বনজঙ্গুলে এলাকায় – তারপরও নিজেদের ঠাঁই বলে কথা। আপন পরম আশ্রয়। ৩২ নম্বরের বাড়িটি সুরম্য কিছু নয়। মন্ত্রী মিনিস্টারদের দূর্গ টাইপ আধুনিক প্রাসাদও নয়। অতি সাধারণ ইটে গাঁথা বাড়ি। এটিও রাতারাতি নির্মিত হয়নি। ফাউন্ডেশন দিয়ে এক বছর লেগেছে একতলাটা বানাতে। কোনো সঞ্চয় নেই। ঢাকায় মাথা গোঁজার একটা প্লট মিলেছে – সেই ভাগ্যি। হাউজ বিল্ডিং লোন নিয়েই বাড়িটি হচ্ছিল।
গৃহ প্রবেশের জন্য আম্মা উতলা হয়েছিলেন প্রচণ্ড। নিচতলার কাঠামোটা বসবাসের উপযোগী হতেই তিনি চটজলদি উঠে পড়লেন। তার মনে প্রশান্তি, অঢেল আনন্দ। খুব খুশি হাসুরাও। টুঙ্গীপাড়ার অনাদি ঠিকানার পর ঢাকাতেও নিজস্ব ঘর হলো। আর যাই হোক ওরা আর বেঘর হচ্ছে না। এই মিনিস্টার বাংলো, এই এঁদো গলি ঘুপচি – এই ঘর-বেঘর খেলা – বাড়ি খোঁজার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার নিশ্চয়ই মুক্তি।
একতলা নতুন বাড়ির সামনে পেছনে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা; আম্মা আম, কাঁঠাল, জামরুল গাছ লাগালেন দারুণ যত্নে। খোলা আঙ্গিনায় মুক্ত হংস হয়ে হৈ হৈ চই চই করে ফিরছিল ওরা। দম বন্ধ হয়ে আসছে না। চারপাশে প্রচুর আলো বাতাস। লতাপাতা ফুল-ফলে ভরে উঠতে লাগল সুখের ঠিকানা। একতলা, দোতলা হলো – গাছগাছালি বাড়ছে – বকুল শিউলি ফুলের ডালে অফুরন্ত সুগন্ধ। যেদিন নিজের জন্য আলাদা রুম পেল হাসু; মনে হচ্ছিল আশ্চর্য উপহার হাতে পেয়েছে। ৩২ নম্বরের স্বচ্ছ সাদা সাধারণ বাড়িটি আস্তে আস্তে ওদের অস্তিত্বে শিরায় অনুভবে মিশে গিয়েছে।
চার ভাইবোন আনন্দে ভাসছিল; বাড়ির সামনে রাস্তা – চারপাশের পরিবেশ অদ্ভুত পরিপাটি; লেনগুলো একে বেঁকে যায়নি; সেই চিরদেখা টুনি খালের মতো লেক হচ্ছে বাড়ির সামনে; স্বপ্ন স্বপ্ন সবকিছু। এমন সুন্দর স্বচ্ছ পানির খাল; সেটিকে ঘিরে সবুজ বনানী; পার্ক – সবকিছু চোখের সামনেই হচ্ছিল। ওরা আপন খেয়ালে মায়ের অনুশাসনে বড় হয়ে উঠছিল; কিন্তু আম্মার একদণ্ড স্বস্তি ও ক্লান্তি মোচনের সুযোগ তেমন হয়নি। শুধু বাড়ি তৈরিই সার। তিনি আগেও যেমন ছিলেন; ৩২ নম্বরের নিজ বাসগৃহে থেকেও একইভাবে যুদ্ধ করে চলছিলেন। তার জীবন অভিধানে সুখ কথাটা বিধাতা বোধ করি ভুলের খেয়ালে লেখেননি।
সুখের জন্য হাপিত্যেস তিনি কখনো করেননি। দুঃখকেই নিয়েছিলেন নিত্যসঙ্গী করে। আজ জীবনের সেই সব দিনে যত ঘুরে ফিরে তাকাচ্ছে হাসু – এক কিশোরীর বিস্ময় মুগ্ধ চোখে তরুণী মাকে জীবন্ত প্রাণবন্ত দেখতে পাচ্ছিল। দুঃখ ছিল, কষ্ট ছিল, প্রকট অনটন ছিল – কিন্তু মায়ের জীবনে প্রাণময়তার অভাব দেখে নাই। এই আম্মা এখন কেমন আছে কে জানে! মা তার চোখে চিরতরুণী। হিমালয়ের মতো বোঝা যার কাঁধে; আশ্চর্য – তিনি সদাহাস্য-সর্বংসহা মা জননীই আছেন। তিনি একটুও বুড়িয়ে যাননি। তার অস্তিত্ব তার অম্লমধুর অনুশাসনই আজীবনের অলংকার।
বত্রিশ নম্বর বাড়িতেও তিনি সদা সাদাসিধা; পুরো বাড়ি একাই গুছিয়ে রাখতেন। বাড়িটা বেড়ে উঠছিল তার তত্ত্বাবধানেই। কোথায় কোন ইটটা পড়ছে – কোন রুমটা কেমন হবে – ডিজাইন ‘এল’ শেপ না স্কয়ার শেপ হবে – সব তার নখদর্পণে। আর বকুল শিউলি ফুল যেন তার দুধ আলতা গায়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে উজ্জ্বলতা ছড়াত।
নিজের বাড়ি হয়েছে কি হলো – তিনি বিলাস-চাকচিক্য আরামকে একদমই আমলে নিলেন না। বারান্দায় হাসু, কামাল, জামাল বসবে কই – বেতের মোড়ার চেয়ে আরামের আর কিছু হতেই পারে না। এত বড় একজন নেতার বাড়ি – শানশওকত ঠাটবাট তো দরকার – শুভাকাঙ্খীরা মায়ের কানে বুদ্ধির গুঞ্জন তুলেছেন। পাত্তাই দেননি তিনি। জীবনের আকুল নদী সাঁতারাতে গিয়ে তার চেয়ে কে দিব্যজ্ঞানী – তাই তুচ্ছ করেছেন সকল আয়েশকে। বত্রিশ নম্বর বাড়ির আটপৌরে তরুণী – কিন্তু তার চেয়ে সারাদেশের হাল কে-ই বা ভালো জানত। তার উপদেশ নিত্যই শুনে চলেছে হাসুরা – অল্পতে তুষ্ট থাকবি। তোদের বাবা যাদের জন্য লড়ছেন সেই দেশের মানুষ তোরা যা অল্প পাচ্ছিস, সেই অল্পও তারা পাচ্ছে না। উপরের দিকে তাকাবি – উপরে যাওয়ার শেষ নেই – এক সময় নমরুদের মতো ঈশ্বর হয়েও খায়েশ মিটবে না। আর নিচের দিকে তাকাবি – দেখবি যা আছিস তাই অঢেল।
মায়ের এইসব উপদেশমালা বিতরণের কোনো কার্যকর কারণ ছিলো না। ওরা কখনোই তার কাছে আরাম-আয়েশের কিছু চায়নি। কামাল জামাল তো এখনো মোড়ায় বসেই অভ্যস্ত। ওরা জামা কাপড়ে বিলাস করে নি। সেলোয়ার-কামিজ পরেছে অতি সাধারণ। তারপরও কেনো বলেছেন, কী তার গূঢ় রহস্য! এখন বুঝতে পারে হাসু – তার এই কথামালায় জীবন হয়েছে অতি অল্পে অঢেল প্রাচুর্যে ভরা; চিত্ত হয়েছে নিঃশঙ্ক নির্লোভ ও সমৃদ্ধ। হ্যাঁ, বাড়িতে একটা আরাম কেদারার বন্দোবস্ত হয়েছিল। আহা! বারান্দায় সেটিতে বসে আধশোয়া হলে চোখের উপর অখণ্ড আকাশ দেখা যায় – লেক ছাড়িয়ে দূরের সবুজ মনকে করে তোলে চনমনে।
এই ইজি চেয়ারটি বাবার জন্য। রাজনীতির অমর কবি অবসরে একটু হেলান দিয়ে ধ্যান করবেন নিরিবিলি। তার চৈতন্যের অরুণোদয়ের জন্য আম্মা নিজের মগ্ন চৈতন্য দিয়ে সব সময় ছিলেন ছায়াময়ী।
কিন্তু আব্বার বাড়ি থাকার সুযোগ কোথায়! তিনি তখন বাঙালির ঘুম ভাঙাতে মাঠ ঘাট চষে বেড়িয়ে জেগে ওঠার মন্ত্র-পদাবলী শুনিয়ে চলেছেন। আর জেলজুলুম তো আছেই। এক মুজিব আজ এখানে, কাল ওখানে। মুজিব কোথায় নেই, মুজিব সারা বাংলায়। চারণ কবি হয়ে তিনি ছুটছেন। মাতাল জালিমশাহীর চোখে সর্ষে ফুল। এক মুজিবের এই লাখো মুজিব হয়ে ছড়িয়ে পড়াটা তারা ভয়ংকর আতঙ্ক হিসেবে দেখল।
যে কোনো মূল্যে ঠেকাতেই হবে এই চারণ মেঠো কবিকে! কবির আবার অমর কণ্ঠ। তাতে বাঙালির মহাজাগরণের সুর। সে যখন মেঠো সভায় কথা বলে – গমগমে সেই আওয়াজ বহুদূর থেকেও শোনা যায়।
কবির উচ্চারণ দৃঢ়। জালিমের জন্য ক্রমশই বিষের বাঁশি হয়ে উঠল। এই বাঁশিঅলাকে আর সহ্য করতে পারছে না পিন্ডিশাহী। তার এই জন-জাগরণ ও আন্দোলনের মন্ত্র-পাঠের অবিনাশী কণ্ঠকে দমন করতে হবে।
আব্বা তখন অদ্ভুত ছন্দে অবিনাশী গান গেয়ে চলেছেন। জালিমশাহী চোরাগুপ্তা পথে তাতে ছন্দ পতনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু যে মোহনবাঁশির মহান কণ্ঠ সারা বাংলার আকাশ বাতাস সুরে ভরিয়ে তুলছিল – সেটি দিন দিন অদম্য হয়ে উঠছিল।
বাবা কখন যে কোথায় – বত্রিশ নম্বরে বসে তা দিন তারিখ ধরে বলার কোনো উপায় ছিল না। কী আর করবে ওরা! পশ্চিমারা জেলে ভরার ষড়যন্ত্র-জাল নিয়ে বাবার পেছনে হন্যে হয়ে উঠল। কখনো রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা, কখনো রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্যের মামলা। ষড়যন্ত্রীদের হাতে একটা না একটা ছুতা বাহানা আছেই। বাবাকে জেলে ভরা হচ্ছে। সাজানো আদালত; মিথ্যে সাক্ষ্য; তোতা পাখির শেখানো রায়। কখনো দুঃসংবাদ পাচ্ছিল – বাবার কারাদণ্ড হচ্ছে। আম্মাও লেগে আছেন। ধৈর্যহারা হচ্ছেন না। উচ্চ আদালতে ফাইলপত্র উঠছে। মুক্ত হচ্ছেন বাবা। বাবা জেলমুক্ত হলে কারাগারের সামনে, বত্রিশ নম্বর বাড়িতে মানুষের ভালবাসা আর ফুলের মালার সমারোহ। কারামুক্ত মুজিব আর ফুলের মালার তোয়াক্কা করছেন না। তার সামনে অনেক পথ বাকি। অসমাপ্ত কাজ বাকি। তিনি বাঙালির মজলুম। যতই জুলুম নির্যাতন নিপীড়ন হচ্ছিল – তিনি ততই শক্তিশালী হচ্ছিলেন। তার মনোবল দৃঢ় হচ্ছিল। জঙ্গি-ফৌজিদের রক্তচক্ষুকে পরোয়াই করছেন না। বরং মুক্ত মুজিব ছুটে গেলেন লাহোরে। ঘোষণা দিলেন ছয় দফার। বাংলার মুক্তি সনদের সেই সূচনা। বললেন, বাঙালিদের ঠকানো চলবে না। ন্যায্য হিস্যা চাই। পূর্বের সম্পদ দিয়ে পশ্চিমে সোনার পিণ্ডি কেনো হবে? না পূর্বের সম্পদে পূর্ব বাংলাকেই সমৃদ্ধ করতে হবে। অর্থনীতি, মুদ্রা ব্যবসা নিয়ে যুগান্তকারী রায় জানালেন। তিনি জনগণের অমিতপ্রতাপ নায়ক হয়ে উঠছিলেন। তার উচ্চারণই হয়ে উঠছিল বাঙালির প্রাণের ম্যান্ডেট। বাংলার সম্পদে বাংলা জাগবে – বাংলার জাগরণ রোখা যাবে না।
সারা বাংলায় অধিকার আদায়ের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ঘুম ভাঙ্গার গান আত্ম জাগরণের উদ্দীপনা তুলল। হাসুও চৈতন্যের সরল মাঠে বড় হয়ে উঠছিল। তিনি এমন সাবলীল মাঠের ভাষায় কঠিন অর্থনীতির জট ছাড়াতেন; কৃষক শ্রমিক শিক্ষিত-অশিক্ষিত কারোরই বুঝতে অসুবিধা হলো না।
মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে মায়ের আঁচল তলায় বড় হতে হতে আকস্মিক – বাবার গল্পগাছার মহাসাগরের কিনারায় এসে পৌঁছেছিল হাসু – কেমন করে এসে পৌঁছুল কিছুই হদিস করতে পারছিল না। তবে অনুভব করতে পারছিল – আব্বা-আম্মা একে অপরের পরিপূরক। বাবার এই মহত্তম হয়ে ওঠার নেপথ্যে এই মহিয়সীর অনন্য অনুপ্রেরণা ছিল; কেউ দেখতে পায়নি – ইতিহাসের পাতায় এই বীরজায়ার কথা লেখা হবে কিনা কে জানে। তবে এটা বলাই বাহুল্য – যুগন্ধর ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে পৌঁছুবার হাজার মাইল পথ পরিক্রমায় যে দিকবিজয়ী দুলদুলকে বাবা সমুন্নত মস্তকে অগ্রসর করে নিয়েছিলেন। সেই ঘোটকটা যখনই আটকে গিয়েছে কালান্তক আলেয়া এবং চোরাবালিতে – আম্মা দ্বিধা করেননি কোনো। তিনি আগুপিছু কিছু না ভেবেই নেমে পড়েছেন দুর্গম-দুশ্চল বালিয়াড়িতে। কর্দমে ঠেলেছেন দুলদুলকে – যতক্ষণ না সেটি দিকবিদিক জয়ী ছন্দে তুর্কি তারুণ্যে নেচে ওঠে – মা থামেননি। তিনি ছিলেন অদম্য।
আজ তো হাসু মাকে ঘিরে স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে বসেনি – তারপরও সন্তানের অনিবার্য রক্তটানের আহ্বানে বার বার স্মৃতি ভারাতুর হয়ে পড়ছিল। কনিংসউইটারের বাড়ির অলিন্দ থেকে ঢাকার পানে ছুটছে মন পবনের নাও – সেটির সঙ্গে ঝড়ো উন্মনা উচ্ছাসে মন-ঠিকানায় উড়ে চলছিল – এই মুহূর্তে অন্তিম ইচ্ছে টুঙ্গীপাড়ায় ছুটে যায় – শিমুল, পলাশ, কদম, কাঠ বাদাম বনে নিজের বালিকা বেলায় পৌঁছতে চাচ্ছে সে। এক্ষুণি ওর ইচ্ছে – ৩২ নম্বরের শিউলি বকুলতলার সুগন্ধ হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেয় প্রাণভরে।
হাসুর দিব্য চোখে মায়ের অম্লান মুখ ভেসে উঠছে – মা যেন অজয় অপার এক নারী – তার আদলেই বাবার হাজারো ছবি। জন্মের পর থেকে যখন দেখা, জানা, বোঝার বয়স হলো – জীবন পরিক্রমার নানা বাঁকে মনের গহীন সিন্দুকে এই ছবিগুলো জমিয়ে রেখেছিল হাসু।
মায়ের কখনোই সে বয়স হতে দেখেনি। তার চিত্তে-চক্ষুতে মা সর্বদাই মা। জন্মের পর চোখ মেলে আম্মাকে যেমনটা পেয়েছিল – প্রতিটি দিন প্রতিটি মাস বছরান্তে ঠিক তেমনটাই অবিনশ্বর দেখেছে। মাতৃলাবণ্যে কখনো বয়সের দাগ পড়েনি। স্মৃতির তৃতীয় চক্ষু এবং অনুভূতি শক্তি কি তবে গোপন কোনো আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে হাসুর! কিন্তু ছবিগুলো নানান ফ্রেমে বাঁধানো। বাবার তারুণ্যের সেই মুখ, যৌবনের সেই দীপ্ত দৃপ্ত পুরুষ; উন্নত নাসা, বাংলাদেশের মানচিত্র দিব্যি এঁকে দেয়া যায় এমন দীর্ঘ চওড়া ললাট; শক্তিমান প্রত্যয়দীপ্ত মুখ আর চোখের দূরদৃষ্টি যেন সবুজ শ্যামল বর্ণিল শস্যক্ষেত পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পৌঁছেছে – এই তরুণপিতাকে হাসু নানান ঘাত-প্রতিঘাতে অমল ধবল হয়ে উঠতে দেখে এসেছে।
বাবার চুল কম নয়; শুভ্র কেশের উজ্জ্বল ব্যাকব্রাশে ঢাকা মস্তক – গোফেঁও কাশ ফুলের ছোঁয়া – কপালে চিন্তার বলিরেখা – তারপরও সারাজীবনের নিরাপোষ লড়াইয়ের অমলতায় তিনি দেদীপ্যমান। তাই মানস চোখে অমল ধবল বাবাকেই দেখতে পাচ্ছিল সে।
এ সত্যিটি অদ্ভুত এক রহস্য – মা কেমন করেই বা অমন ভাস্বতী রূপ ধরে রাখতে পেরেছেন – এ কি কন্যার অনুভবের বিভ্রম –
কিন্তু এই মুহূর্তে মাতৃস্বরূপার সমীপে সামনে দাঁড়িয়ে পিতার স্নেহ স্মৃতি: ওর জন্মকে স্বার্থক করেছে এমন দুর্লভ কিছু দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে কন্যা – ঐ তো বাবা কারাগারের লৌহপ্রাচীর থেকে মুক্ত হয়ে এসে বললেন, হাসু, কেমন আছিস মা! এই ক’দিন কোন কষ্ট হয়নি তো মাগো!
তারপরই বাবার মুখে আত্মতৃপ্তির মিলিয়ে যাওয়া হাসি – তোদের মা তো ছিলেনই। রেনু সব সামলে রেখেছে তাই না।
মায়ের প্রতি এই অটুট বিশ্বাস – এই বরাভয় বাবাকে করেছে অজেয় নির্ভীক। অগ্রকদমে অগ্রসর।
বাবার সান্নিধ্য তেমন একটা ওরা পেল কই! তিনি তখন স্বাধীকারকামী বাঙালির ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়ার কাণ্ডারি হয়ে উঠছেন। বাঙালির হিয়ার মাঝে বেড়ে উঠছিলেন তিনি। এলেন দেখলেন জয় করলেন – এমন কোনো অলৌকিক ঘটনা বাবার ক্ষেত্রে ঘটেনি। ষোলো আনাই ছিলেন লৌকিক। আপাদমস্তক ছিলেন বাস্তব। কোনো খাদ নেই। তার যা কিছু জয়মাল্য; সবই শ্রমে ঘামে দুর্বার লড়াকু পদক্ষেপে, প্রখর তাপে বাংলার মানচিত্র ধরে ঘুরে বেড়িয়ে সকলের মন জয় করে নিতে হয়েছে। কোন ভণ্ডামি করেননি। প্রতারণা, প্রবঞ্চনা করেননি। সরল দর্শনে যা বিশ্বাস করেছেন; বাংলার হৃদয় থেকে যে মর্মবাণীর আহ্বান শুনেছেন, তিনি তার মেঘমন্দ্র কণ্ঠে তার প্রতিধ্বনি করেছেন। ওরা যে বাবাকে কাছে পায়নি তা কেবল তার কারাজীবনের জন্য নয় – কাছে পায়নি এ জন্যে যে তিনি সারা বাংলায় হয়ে উঠেছিলেন স্বপ্নপুরুষ। সাড়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলই ছিল তার ইপ্সিত সোনার সংসার। টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লীতে হাসুর জ্ঞাতি কোনো কিশোরী বোন, উত্তরের কানসোনার চরাচরের কোনো বালক সন্ন্যাসী ভাবুক কিশোর এক অবশ্যম্ভাবী মুজিবরের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল; ৩২ নম্বর বাড়িতে বসে ঔরসজাত সন্তানেরা ঠিক তেমনই খবর পত্তর পেত, বাংলাময় তাকে যেমনটা দেখা যেত। বাড়িতে কস্মিনও নয়।
কন্যার এই উপলব্ধিতে আবেগ থাকবেই। মুজিবকে ওরা বাবা জানত – কিন্তু বাস্তব সত্যাসত্যের নিরিখে বলতে হয় – ঘরের বাবা হিসেবে তাকে কী-ই বা পেয়েছিল – তাকে ওরাও যে জেনেছে বাঙালির মুজিবর হিসেবে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে মনের মধ্যে কোনো শূন্যতা বোধ করেছে কি! সেই মওকাও ওরা পায়নি। মা সে সুযোগ দেননি। তিনি একই সঙ্গে বাবা ও মায়ের দুটো অস্তিত্বের স্বাদ দিয়েছেন। শৈশবের হাসু বাবার অঢেল স্নেহ পেয়েছিল – তার জের বাবাও টেনে গেছেন সবসময়। বাড়িতে যখন পা রাখতেন – সবকিছু ওয়াকিবহাল করতে কন্যাটিই ছুটে আসত তার পায়ে পায়ে। বাগান, কবুতর কলোনি, এমনকি আরাম কেদারার পাশে। জামাল কামালের কাছে তিনি একটু দূরের মানুষ; বাবা আপুর সঙ্গে হাসছেন, খুনসুটি করছেন, কখনো মাথায় হাত রাখছেন – আরও বিস্ময়ের যে তিনি হাসুর চুল এলোমেলো করে দিতেন – কামাল-জামাল ঈর্ষাভরে তা দেখত।
এই বুকভরা স্নেহ-ভালোবাসার মানুষটা অন্যদের কাছে সত্যি দুর্লভ। ওরা বঞ্চিত আদর-হারার কষ্ট-চাপা হৃদয়ে উদার উজাড় উচ্ছল দৃশ্যগুলো দেখত। সেই সব দৃশ্যাবলী এখন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে হাসু। অভূতপূর্ব শিহরণে সারা শরীর কম্পমান। আর জলের ধারায় ভিজে যাচ্ছে স্মৃতির ফ্রেমগুলো। সেই স্নেহ উচ্ছসিত বাবা এখন কেমন আছেন! আজ যে সে আদর কাঙাল হয়ে তার আকাশখণ্ড বুকে মাথা রাখতে চাচ্ছে – কখন সেই সুযোগ মিলবে!
এমন কাতর-কাঙাল উদাস সে এই জীবনে আর কখনও হয়নি! সেই অগ্নিগর্ভ ষাটের দশকেও হয়নি।
সেই সময়ে বাবাকে কাছে পায়নি দিনের পর দিন। মাস ফুরিয়ে বছর। অন্য কোনো বাঙালি কিশোর কিশোরী মুজিবের খবর যেভাবে পেত – হাসুরাও সেভাবে পাচ্ছিল। আব্বা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কিংবা সভাপতি হচ্ছেন খবর পাচ্ছিল – আব্বা বাঙালি মুক্তি-মানবমুক্তি সনদ হাজির করছেন – তাও দেখছিল পত্রিকার পাতায়। কিন্তু এই মুক্তি মন্ত্রদাতা বাবাকে মাটির চোখে দেখতে পাচ্ছিল বড্ড কম। একটা সময়ে এমন হলো, কখন যে আব্বা জেলে, কখন বাইরে – কখন খুলনা বরগুনায় – কখন পটিয়া-হাটহাজারী – তা হালনাগাদ জানা তাদের আয়ত্ত্বের বাইরে চলে গেল।
কোনো এক সোনা রোদভরা সকালে তালাশ পেল আব্বা ফিরছেন বাড়িতে – ২/৪টা দিন থাকবেন। সকাল দুপুর রাত অপেক্ষার মধুর যন্ত্রণায় কাটল; তাকে একনজর দেখতে পাওয়াই পরম আনন্দ। কই বাবার দেখা নেই। বাবা কই! ওরা যে অপেক্ষায় অস্থির – সে কথা সাহস করে আম্মাকে মুখ ফুটে বলে না। তিনি হয়তো বলবেন, বাবার ন্যাওটা হয়েছিস – বাবা বাবা করে অন্যদের লেখাপড়ার বারোটা বাজাচ্ছিস। তোর বাবা তোকে বেশি আহ্লাদ দিয়েছে।
কিন্তু চার ভাইবোনই গোপন সলাপরামর্শ করছে – বাবা এলে মা কোন রান্নাটা রাঁধবেন। মাছের মুড়োটা বাবা নিজের পাত থেকে হাসুর না কামালের পাতে তুলে দেবেন। মা রুষ্ট হবেন – তাই তিনি জলদকণ্ঠে বলবেন, বরগুনায় একটা রুইয়ের মুড়ো খেয়ে পেটটা গুড় গুড় করছে রেনুু।
মা বিরক্ত হয়ে সব দেখবেন, শুনবেন। কিস্যুটি বলবেন না।
কিন্তু সব আশায় গুড়েবালি। ওই অপেক্ষার রাত তো গেলই – ওরা মধ্যরাতে চুপি চুপি জেগে দেখছে তিনি এলেন কিনা – কতবার তেমনটা ঘটেছে – শেষ রাতে নিচের বারান্দায় শোরগোল বাবার পদধ্বনি।
একদিন, দু’দিন যায়। রাত হলো ভোর। বাবা আসছেন ভুলই শুনেছে নিশ্চয়। তারপর পত্রিকায় পড়ে জানল, খুলনা থেকে ফরিদপুর হয়ে গোয়ালন্দ পেরিয়ে উত্তর বাংলায় জনপদ থেকে জনপদে তিনি ছুটছেন। মানুষের কথা শুনছেন; আবার তাদের কথার প্রতিধ্বনিই তাদেরকে গুছিয়ে শোনাচ্ছেন। তিনি স্টেথিস্কোপ কানে লাগিয়ে বাঙলার প্রাণ ও নাড়ীর স্পন্দন শুনে চলছেন।
কোনোবার জেলখানা থেকে বেরিয়েও বোকা বানিয়েছেন ওদেরকে। ওরা জানত, অন্তত এবার বাড়ি স্পর্শ না করে কোথাও তিনি যাবেন না। কী ছাইপাশ তিনি সেখানে খেয়েছেন। ক্লিষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অন্তত ২/৪ দিন বিশ্রাম তো প্রয়োজন।
সে ফুরসত কোথায় – বাংলার মানুষ তাকে ডাকছে। ঘরের ডাকের চেয়ে বাংলার ডাক তার কাছে অনেক বড় এবং পবিত্র।
হাসুরা উপেক্ষা-অনাদরের আড়ালে ঢাকা পড়তে লাগল। ওরা টের পেতে লাগল – এই বাবা ওদের একার বাবা নয়।
তবে সবকিছু মিলিয়ে নিশ্চিন্তের ব্যাপার একটাই। আগে বাবার আন্দোলনের ছন্দে ওরা ছন্দপতনের শিকার হয়েছে বারবার। গৃহহারা হয়েছে। পথে নেমেছে। কোথাও বাড়ি পায়নি – খুঁজেছে শহরময়। ৩২ নম্বরে নোঙর করার পর আর ছন্নছাড়া হতে হয়নি। কিন্তু এই সুখ-স্বস্তিও যে অতি সাময়িক – একদম ধারণা করতে পারেনি।
ওরা ৩২ নম্বরে নোঙর আটকে পড়েছিল – আর বাবা মুক্ত বুলবুলি হয়ে আকাশ জুড়ে উড়ে ফিরছিলেন।
সেই বিহঙ্গের পায়েও পশ্চিমা শোষকরা বেড়ি পরাতে চেয়েছে বার বার। এমন মাসও গেছে তাকে জেলে ঢুকতে হয়েছে ৩/৪ বারেরও বেশি। কিন্তু মুক্তিপাগল পাখিকে আটকে রাখা যায় না। তিনি কখন যে ফাঁকি দিয়ে লাহোর গেছেন – ছেলেমেয়েরা জানতে পায়নি। যখন তা সবিস্তারে জানল – সতেরো/আঠারোতে পা দিতে না দিতেই মুক্তির দীক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে উঠল। ৬ দফা সবার মনে অনির্বাণ এক শিখা জ্বালিয়ে দিলো। সেগুলো নিষ্প্রাণ কাগুজে দফা নয় – মুক্তিমন্ত্র আলোর মশাল। মুহূর্তেই তা জালিমশাহীর তখতে ধ্বংসের সলতে জ্বালিয়ে দিলো। ওরা করাচি-পিন্ডির জগদ্দল তখতে তাউস ধ্বংসের আশঙ্কায় পাগল হয়ে উঠল। পশ্চিমারা কুৎসিত গীবতে নেমে পড়ল। মুজিবের যাত্রাভঙ্গ করতে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে শুরু করল। গীবত-কুৎসায় থেমে থাকার পাত্র নন মুজিব। তিনি চষে বেড়াতে লাগলেন সারা বাংলা। পায়ে শিকলের বেড়ি পড়ানোর ভয় দেখিয়ে কি মুজিবকে ঠেকিয়ে রাখা যায়!
এই ওরা তাকে জেলে পুড়ছে। ভুয়া আইনে, ভুয়া মামলায়। ভুয়া অভিযোগে। কিন্তু মুজিবকে বন্দি করলেই ফুঁসে উঠছে বাংলা। ছাড়তে তারা বাধ্য। ছাড়া পেয়ে মুজিব আরও তেজি, আরও দাবিমুখর। আরও সুতীব্র।
বাংলা জুড়ে তখন দাবি আদায়ের আন্দোলনের উচ্ছ্বাস। বাবা খুব সরল ভাষায় বাঙালির দাবিগুলো গুছিয়ে বললেন ছয়দফায়। তার মধ্যে তত্ত্ব-জ্ঞানের জটজটিলতা ছিল না। তিনি কখনোই জনগণতন্ত্র ও নিয়মতন্ত্রের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে চাননি। অভিন্ন দেহহীন দুই বাহু রাষ্ট্র পাকিস্তানের মজলুম জনগণের সর্বদা তিনি ছিলেন পাশে। তার চেয়েও অধিক বাঙালি। সার্বভৌম জনগণ, সংসদ এবং পার্লামেন্টারি সরকার শক্তিশালী ও কার্যকর না হলে এই রাষ্ট্র রাষ্ট্র খেল নিছকই তামাশার – তার অবস্থান পরিষ্কার। বাংলার স্বাধিকার কায়েমে লাহোর প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি স্থাপন করে বললেন, এই শাসনতন্ত্র হবে ফেডারেল রাষ্ট্রসংঘ। যেখানে অঙ্গরাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ – কেবল দেশরক্ষা ও বিদেশনীতি ফেডারেলের হাতে। অন্য সব বিষয়ে অঙ্গরাষ্ট্র নেবে স্বাধীন কল্যাণী সিদ্ধান্ত। কর, শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে তারা সার্বভৌম – ফেডারেলের এক্ষেত্রে ক্ষমতা নেই। তারা প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজস্বের একটি অংশ পাবে। বিদেশ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অঙ্গরাষ্ট্রের থাকবে পৃথক হিসাব। যার অর্জিত বিদেশ মুদ্রা – তার এখতিয়ারে। কেন্দ্রের চাহিদা মেটাবে তারা সমান কিংবা সর্বসম্মত হারে। মুদ্রা থাকবে দু’টি পৃথক অথচ অবাধ বিনিময়যোগ্য। কিংবা অভিন্ন মুদ্রাও হতে পারে – কিন্তু বাংলার মূলধন পশ্চিমে পাচারের সকল পথ বন্ধ থাকবে।
পূবের পৃথক ব্যাঙ্কিং রিজার্ভ ও পৃথক আর্থিক নীতি থাকবে। আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র সুরক্ষায় অঙ্গরাষ্ট্রের স্বীয় আধা সামরিক আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতার কথাও ৬ দফায় উল্লেখে তিনি ভোলেননি। বাবা তখন অস্পষ্ট কিছু বলেননি। বাঙালির স্বার্থের সুরক্ষা কবচ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যদের কল্যাণ সুরক্ষায় ছিলেন ব্রতী।
অথচ তারপর কুৎসা গীবতের ঢেউ ছোটাল পশ্চিমা জন শত্রুগোষ্ঠী। মজলুম জনগণের কথা বলায় জনবিচ্ছিন্নরা হুক্কা হুয়া ডাক ছেড়ে ফৌজি ছত্রচ্ছায়ায় দেশ পুড়িয়ে ভুঁড়িভোজে শামিল হলো।
ওরা শৃগালের মতো লোভী ও ষড়যন্ত্রী হলেও যখন জনতার মহাসাগরে ঝড় উঠল তারা নির্বোধ, হতভম্ব-মাতাল অকর্মণ্য হয়ে পড়ল।
মুজিবকে কোনোভাবেই আটকানো যায়নি। ৬ দফা তো মুজিব রাষ্ট্রশাস্ত্রের কঠিন তত্ত্ববিধানে পাননি; তিনি বাংলা প্রাণের হৃদয় সেঁচে তুলে এসেছিলেন এসব মণিমুক্তো। তাই যতই অপপ্রচার বাড়ল; এই প্রাণের দাবিগুলো প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে অক্ষয় প্রত্যয় হয়ে উঠল।
পশ্চিমা কায়েমী দালালদের কুৎসার মুখে বাবা ছিলেন শান্ত। তিনি জানতেন, জনদুশমনদের ক্ষমতা অসীম, বিত্তবেসাতি প্রচুর, হাতিয়ার অফুরন্ত; গালমন্দ কুৎসায় বিষাক্ত নাগিনীর শতমুখ; গলার সুর স্বাভাবিক। এরা বিচিত্ররূপী, কখনো ঈমান ঐক্য সংহতির লেবাসে, কখনো ইসলাম ও গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে শতমুখে গীবতের শোরগোল তুলেছে। নানা ছলাকলায় জনগণকে ঠকিয়ে দুশমনির আসরে এরা একজোট। ওদের সঙ্গে ধর্মবরদার মোসলেম লীগ তো ছিলই। এখন আরও কিছু ধর্ম-ভণ্ড যোগ হয়েছে। জামাতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম-গোলাম আযম – পিন্ডি-জান্তার পায়ে পায়ে তাল মিলিয়ে চলছে। পিন্ডিজান্তা যেখানে পায়ের ছাপ রেখে যায় ওরা সেখানে চুম্বনে পায় চানতারা ক্ষমতা আলিঙ্গনের আনন্দ। ওরাও লেগেছে মুজিবের পেছনে। তারপরও বাবা ভয় পাননি, পিছু হটেননি।
দাজ্জাল গোষ্ঠী নানা চেহারায় গীবতের তুবড়ি ছোটাচ্ছিল। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বাঙালির ঐক্য ও প্রতিতীতে ভাঙন ধরাতে চাচ্ছিল – বাবা একরকম এক দেহেই সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে কখনো মাইক্রোফোনে, কখনো খালি গলায় বজ্র উচ্চারণে রুখেছেন ইয়াজুজ মাজুজের আগ্রাসন।
সেইসব দিনে ওরা কি কাছে পেয়েছিল কখনো বাবাকে! একদম নয়। ওরাও খুঁজত তাকে খবরের কাগজের পাতায়।
কাগজে সভা সমাবেশ ও বাবার ছবি বেরুলে কামাল সযত্নে রাখত। জামাল আবার ভাগ বসাত সেখানে। ওদের কাছে চোখে দেখা বাবার চেয়ে ছবির বাবাই হয়তো বড় ছিল।
হাসু অবশ্য কখনোই বাবার ছবি সংগ্রহ করে রাখেনি। লেখাপড়া হাতেখড়ি দাদার হাতে হয়েছিল; রাজনীতির হাতেখড়ি খোদ বাবার হাতে। অন্য দু’দশটা সাংসারিক-পারিবারিক কথার মাঝেই তিনি একই ভঙ্গিতে রাজনীতির ব্যাপারগুলো হালকা চালে কন্যার কানে তুলে দিতেন। হালকা চালে সরল ভাষায়। হাসু টেরই পেত না বাবা-কন্যা দেশ দশের ইস্যু নিয়ে কখন আলাপে মগ্ন হয়েছে। কখনই বা আলাপ শেষ হয়ে গেল। সে ছিল যেন সংসারেরই আটপৌরে আলাপ। এটা এমনও হতে পারে যে, তিনি সবসময় মানুষ নিয়ে মগ্ন থাকতেন। তিনি রাজনীতির স্বভাবকবি ও দার্শনিক। ৬ দফা নিয়ে হাসুর আগ্রহ ছিল কম নয়। বাবার প্রতিটি ব্যাখ্যা কৈফিয়ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিত।
তার বাইরেও স্বাগতোক্তি শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। তিনি বলতেন, পূর্ববাংলায় ন্যায্য হিস্যা না দিলে ঐতিহাসিক কারণেই পাকিস্তান টিকবে না। লুট করে লুটেরা হওয়া যায়, শাসক হওয়া যায় না। আজ বাঙালি প্রাণের দাবি ৬ দফা দিয়েছি বলে ওরা আমাকে শূলে চড়াতে তৎপর। কিন্তু এই মূর্খরা জানে না – একদিন এমন দিনও আসবে যেদিন ৬ দফা না মেনে নেয়ার জন্য ওরা কপাল চাপড়াবে। পস্তাবে। ওরা আমাকে হত্যা করতে পারবে – ফাঁসি দিতে পারবে – কিন্তু ৬ দফার প্রাণের উচ্চারণকে আর দমিয়ে রাখতে পারবে না। বাঙালির হিস্যা দিলে কখনোই ওদের অকল্যাণ চাই না। কিন্তু ওরা নিজেদের বিবেক বুদ্ধি, দূরদর্শিতা জলাঞ্জলি দিয়ে আমার আর বাঙালির অকল্যাণ চাইছে। ওদের মস্তিষ্কে প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, ওদের বিবেক বুদ্ধি পুড়ছে জাহান্নামের আগুনে। সেই আগুনে আমাকে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে চাইছে। কিন্তু আমরণ আমি শান্ত, স্থিতধী এবং জনতন্ত্র ও নিয়মতন্ত্রের পক্ষে থাকব। বাঙালিকে ঠেলতে ঠেলতে ওরা বঙ্গোপসাগরে ডোবাতে চাইবে। কিন্তু সাগরে অনিবার্য জোয়ার যেদিন আসবে – সেদিন ওরা পিছু হটবার পথও খুঁজে পাবে না। আইয়ুবের ফৌজী-শাহী মেজাজ কখন যে জন-ঝড়ের মুখে কর্পুরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে – তার তল্পিবাহক স্যাঙ্গাতরা তা আন্দাজ করতে পারছে না।
বাবার কথায় মৃত্যু-শঙ্কার কথা শুনে কন্যার আবেগে উষ্মা জানায় হাসু, মরণের কথা কেনো বলছ; এ আবার কেমন ধারার কথা!
বাবা সস্নেহে হাসলেন। তুই তো আমার মায়ের ধারাই পেয়েছিস! এই ধরাধামে যখন জন্মেছি মরতে একদিন হবেই। আমরা কেউই অবিনশ্বর নই। কিন্তু প্রশ্ন হলো – সেই মৃত্যু বীরের না কাপুরুষের। সেই মৃত্যু পলাতকের নাকি সম্মুখ সমরে শির-উন্নত সাহসীর! বাঙালি মজলুমের দাবি আদায়ের এই মহাসমরে আমি হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে রাজি – মহত্তম এবং পরম কাঙ্ক্ষিত হবে সেই মৃত্যু – যদি সেই ত্যাগ মুক্তি আনে মানুষের।
মৃত্যুর কথা শুনতে ভাল লাগত না। হাসু বাবার মুখে আলতো করে হাত চাপা দিয়ে বারণ করত।
কন্যার বালখিল্যতা দেখে মৃদু হাসতেন বাবা। মাগো মৃত্যু তো কেবল এক রূপান্তর। ওরা হয়তো আমার জন্য ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করবে – ভয় দেখাবে আমাকে। কিন্তু ভয় পেলে বাঙালির অবশ্যম্ভাবী বিজয় কেমন করে আসবে। তার চেয়ে একটি মৃত্যু যদি রূপান্তরিত হয় জাতির মুক্তিতে – সেটাই কি উত্তম নয় মাগো! এমন মহান মৃত্যু আমার বড় কাঙ্ক্ষিত মাগো।
বাবার মেঘমন্দ্র উচ্চারণ কন্যার কোমল হৃদয়ে তখন তৈরি করত শোক উচ্ছ্বাস। বাবার হাঁটুর ওপর মাথা রেখে বলত, মৃত্যুর কথা কেনো বার বার বলছ। এই অলুক্ষুণে কথা ছাড়া কি কোনো কথা নেই? এক কথাই যখন বলবে আমি তবে ঘুমাই গিয়ে। তোমার কথা আর শুনব না।
বাবা তখন নিশ্চুপ। তার চোখ বারান্দা পেরিয়ে লেক ছাড়িয়ে দূর গগনের দিকে। তিনি আলতো করে কন্যাটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
নৈঃশব্দের সেই মুহূর্তগুলো এখন যেন হৃদয়ের তন্তুতে উপলব্ধি করছিল হাসু। আর ভাবছিল – কি অসাধারণ ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তিনি। মাত্র কয়েকটা মাস যেতে না যেতেই শুরু হয়েছিল তাকে ফাঁসির মঞ্চে টেনে নিয়ে যাওয়ার নানা আয়োজনের। বাবা কেমন করে দেখতে পাচ্ছিলেন অনাগত ভয়ংকর দিনগুলোর ছবি?
হাসুদের নিয়ে সময় অলক্ষ্যে খেলে চলছিল এই ঘর, এই বেঘর খেলা। এই একটু স্বস্তি – এই ভয়-আতঙ্কের এক্কা দোক্কা। ৩২ নম্বরে উঠে আবার বেঘর হতে হবে একদিন – কল্পনাও যে করেনি। কালরাত্রিতে আবার নেমে এসেছিল ঘোর অমানিশায় ভরা জঘন্য বিভীষিকা। বাবা কি তবে জীবন নিংড়ানো রক্তাক্ত দিনগুলোর কথা আশঙ্কা করতেন! দেখতে পেতেন দিব্য চোখে? আর তা ধারণা করেই প্রাণকে বলি কাঠে খাড়ার নিচে উৎসর্গ করেই বাঙালির জিয়ন কাঠির সন্ধানে সকল ভয়কে ছিন্নভিন্ন করে এগিয়ে চলছিলেন! তার উপর, তার পরিবারের সামনে মৃত্যুময় অন্ধকারগুহা – বাবা তার পরোয়াই করেননি।
সুখ-স্বস্তি ওদের জীবনে একদমই লেখা ছিল না। এ নিয়ে কারো কোনো অনুযোগ অভিযোগ মনোকষ্ট ছিল না। বাবা সয়েছেন ঋষির দিব্য অনুভবে। আম্মা সয়েছেন নিরন্তর বাস্তবের কঠোর অভিঘাতে। সয়েছে ওরাও। মুজিবের পুত্র-কন্যা-পরিবার সুখে থাকবে, সে কি হয়? বাঙালি ও বাংলার জিয়নকাঠি মুজিবের বুকের উপর আস্ত একটা রাষ্ট্রযন্ত্র উঠে বসে তার কণ্ঠনালি, রক্তনালি চেপে ধরেছিল। মুজিবর, ফজিলাতুননেসা, তাদের সন্তানদের মুখ তখন বেদনা বিষে কালচে গাঢ় নীল।
বিয়ের দিনে বাবাকে পায়নি হাসু। রসুমত-আকদ-এ ছিলেন না তিনি। এমন কি কন্যা বিদায়ের দিনেও পায়নি তাকে। সেই স্মরণীয় দিনগুলোতে কি তরুণী হাসু কষ্ট পেয়েছিল! কেউ তাকে কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি এ নিয়ে। কিন্তু আজ মনের ঘুলঘুলিতে একটা কষ্টপাখি যখন ডানা ঝাপটে ছুঁড়ে দিচ্ছে প্রশ্নটা – কেমন করে গভীর চাপা বেদনাকে অস্বীকার করবে সে! কেমন করে সত্যাসত্যকে এড়িয়ে বলবে, আমার মন তখন আনন্দে খিলখিল করছিল! না, আনন্দের সেই মধুরক্ষণগুলো বাবাহীনতায় বিষাদঘন হয়ে উঠেছিল।
তারপরও কোনোদিন কোনোকালে মুখ ফুটে এই কষ্টকথা উচ্চারণ করে নি সে।
কেননা সে জানে, তার যা কষ্ট, বাবা পেয়েছেন তার শতগুণ বেশি কষ্ট। বিয়ের পর জেলগেটে বন্দি বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে – আরও পরে মুক্ত বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে। বাবার চোখের দিকে তাকানোর সাহস করেনি সে। বাবা তো বাবাই। আড়চোখে তাকিয়ে দেখেছে – হিমালয়ের আদিম পাহাড়ের মতো দৃঢ়-কঠিন মানুষটা। তার মুখে অব্যক্ত বেদনার ভিড়; চোখ যেন জলে ছলছল। হাসু ও বাবা বাদে এই কষ্ট আর কেউ দেখেনি, অনুভব করেনি। কিন্তু একজন স্নেহশীল দায়িত্ববান বাবার সামনে তখন দ্বিতীয় বিকল্প ছিল না। তিনি তখন বলতে গেলে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। বাঙালির মুক্তি তার জীবন; বাঙালির দাসত্ব তার মৃত্যু। বড় কঠিনেরে ভালবেসেছিলেন বাবা। ষড়যন্ত্রের জাল বুনে বুনে তার জন্য জালিমশাহী ফাঁসির মঞ্চও তৈরি করেছে এক রকম। এখন মুজিবকে তাতে চড়িয়ে জীবন সংহার করে বাঙালিকেও জীবন্ত চিতায় তুলতে তারা তৎপর।
মুজিবের সামনে মৃত্যু বিকট হাতছানি। তিনি ভয় পাননি তাতে। টলেননি। দমেননি। একদিকে পিতৃ বাৎসল্যের টানে; অন্যদিকে পিতার কর্তব্যের দায় – আব্বা জীবনকে থামিয়ে রাখতে চাননি। আগরতলা ষড়যন্ত্রর মিথ্যা সাজানো কল্পনাপ্রসূত মামলার খাড়ার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি মাকে বললেন, জানি না, এ মামলা কতদিন চলবে। জানি না আমি আদৌ মুক্তি পাব কিনা, তুমি আর দেরি না করে হাসুকে আনুষ্ঠানিকভাবে উঠিয়ে দাও। মা তখন আব্বার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ টের পাচ্ছিলেন। তিনি নিজেকে সামলে অভয় দিয়েছেন, বলেছেন, চারদিকে জেগে উঠছে মানুষ। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে সারা বাংলার মানুষ। মিথ্যা মামলা যতই সাজাক না কেনো, বাঙালি তোমাকে কারাগার থেকে বের করে আনবেই।
আব্বা জীবনের গতির চাকাকে সাবলীল রাখার তাগিদ দিয়েছেন। বলেছেন, না, ওকে অবিলম্বে তুলে দাও। ওদের ষড়যন্ত্রের শত বাহানা রয়েছে। আমাকে চূড়ান্ত খতম না করতে পারলে ওরা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। আমাকে হত্যা করতে না পারলে ওরা বাঙালি জাতির ওপর হামলা করবে। প্রাণ দিয়ে হলেও আমি তা হতে দেব না। ওরা বহুরূপী। ওদের ছলাকলার শেষ নেই। ওরা ভালবাসায় বিশ্বাস করে না। ওরা বিশ্বাস করে রক্তপাতে। সেজন্য আর অপেক্ষা না করাই উত্তম।
মায়ের দিকে তাকিয়ে অমলিন চিত্তে তিনি হেসেছেন, তুমি তোমার মনকে দৃঢ় করো রেনু। পেছনে তুমি জলন্ত কয়লার উপর দিয়ে হেঁটে এসেছ জানি। আগুনকে তুমি ভয় পাও না জানি। সামনে তার চেয়েও কঠিন দিন আসতে পারে। আমার কী হবে আমি জানি না। কিন্তু এটা জানি বাঙালি একদিন মুক্ত হবেই। বাঙালিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। জেলজুলুম অনেক সয়েছি। ওরা আমাকে লাল দালানে কষ্ট দিয়ে দিয়ে মৃত্যুকে ভয় না পাওয়ার সাহসী বানিয়েছে। সামনে ফাঁসির মঞ্চ হোক, যাবজ্জীবন হোক – আমি বাঙালির দাবি আদায়ের রাস্তা থেকে এক রত্তি নড়ছি না। তুমি চিত্তকে আরো শক্ত করো রেনু। ওরা বড়জোর মুজিবকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলাতে পারবে। বাঙালিকে আর দমিয়ে রাখতে পারবে না। বাঙালির মহাজাগরণের জন্য যদি এক মুজিবরের জীবন উৎসর্গ করতে হয় – সেই শ্রেয়। তাই হবে। আমি হাসিমুখে ফাসির মঞ্চে বাঙালির মুক্তির বার্তাবহ জয় বাংলা উচ্চারণ করে যাব।
সেদিন জেলগেটে দেখা করতে যায়নি হাসু। যদি যেত, বাবা ও সে – কেউই শ্রদ্ধা, স্নেহ-ভালবাসার অদম্য আবেগকে বাঁধ মানাতে পারত না। মায়ের কাছে শুনেছে – বাবার কথোপকথন। মায়ের কণ্ঠ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর হাসু চোখের কোণে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু সম্বরণ করে আপন মনে পেয়েছিল স্বর্গীয় সুখ। শেখ মুজিবর রহমান। হোক তার জন্মদাতা পিতা। সেই মানুষটা জেলখানায় ধুঁকে ধুঁকে বাঙালির পরম কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন; জীবন না মৃত্যু – অনিশ্চয়তার দোলনায় নির্ভীক চিত্তে দুলছেন; তার অতুল আত্মত্যাগের কাছে টুঙ্গীপাড়ার কোনো এক বাঙালি কন্যার মনগহীনের কষ্ট নিতান্তই তুচ্ছ। অতি তুচ্ছ।
হাসুর বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল অতি সাদাসিধা। হাতে গোনা আত্মীয়-স্বজন। খাওয়া দাওয়া অতি সাধারণ। দৈনিক ইত্তেফাক পরদিন লিখতে ভুল করেনি – ‘শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠ মেয়ের বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় নিরানন্দ ও আলোকসজ্জাবিহীন……।’
ঠিকই লিখেছিল ইত্তেফাক। সবই ঠিক। আনন্দ হয়নি। নিরানন্দ বটেই। কন্যার পিতা বিয়েতে নেই। জেলখানায়। কেমন করেই হবে আনন্দ। এমন বিষাদপূর্ণ বাড়িতে কে-ই বা জ্বালাবে আলোর ঝাড়বাতি। আলোকসজ্জা যে হবে – মায়ের হাতে সেই পয়সাই বা কোথায়! মা কন্যাকে ভালবাসার ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিয়েছিলেন; স্বর্ণালংকারের যে চেষ্টা চরিত্তির করবেন, সেই অর্থ কোথায় – তার চুলায় তখন অভাবের আগুন জ্বলছে। বাবার মামলার টাকা পয়সা যোগাড় করতেই তিনি হিমশিম।
তারপরও আলো জ্বলেনি, আলোকসজ্জা হয়নি কথাটা মহাভুল। অনেক অনেক আলো জ্বলছিল। নিষ্ঠুর বাস্তবতার নিরিখে সবাই সেই আলোর মিছিল দেখতে পায়নি। বাবা গরাদের ওপাশে থেকে বিষণ্ন মনে নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছেন।
যে সময়টায় বিষাদময়তায় অনাড়ম্বর পরিবেশে কন্যাটির বিয়ে হচ্ছিল – সেই সময় বাংলা জুড়েই ঘরে ঘরে আলোর পিদিম জ্বলে উঠছিল; আস্তে আস্তে তা স্ফুলিঙ্গে রূপ নিয়েছিল। অলক্ষ্যে লেখা হচ্ছিল বাঙালির নবজন্মের আলোকময় অমর কবিতা। মুজিবরকে মিথ্যা মামলার বেড়িতে যতই মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছিল; বাঙালি ততই জাগছিল।
এ সবই সত্য। ঐতিহাসিকভাবে সত্য। বাঙালির মহৎ অর্জনের গৌরবে সত্যাতিরিক্ত সত্য।
ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে কি হবে না, কে জানে। কিন্তু এ যে পরম সত্য। এটা সত্য যে, অমর কবিতা লেখার উজ্জীবনী দিনগুলোয় মুজিবপত্নী রেনুর সংসার ভেসে যাচ্ছিল দুঃখ রজনীর অকুল পাথারে।
সাল দিনক্ষণ আজও সব মনে পড়ছে হাসুর। ভয়ংকর দুঃসংবাদ পেয়ে একটি পরিবারে শোকের কৃষ্ণছায়া। ১৯৬৮ সাল। ২০ শে জানুয়ারি।
ওদের জীবনে কালোরাত এসেছে অনেকবার। নানা রূপে। নানা আতঙ্করূপ নিয়ে। আব্বা গ্রেফতার হয়েছেন অনেকবার। তাতে উদ্বিগ্ন হয়েছে ওরা। কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু আতঙ্কের করালগ্রাস হানা দেয়নি মনে। ৬৮’র অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রমী।
এর আগে আরো কতবার জেলে গেলেন; বিনা বিচারে মাসের পর মাস জুলুম সইলেন, সে সবের হিসাব রাখা ইতিহাসের ছাত্র ছাড়া অন্যদের পক্ষে মুশকিল। তবে সেসব কন্যার স্মৃতিতে থোকা থোকা দুঃখ হয়ে ভাসছে। কিশোরী বয়স থেকেই দেখছে – বাবাকে কারণে অকারণে বলা নেই কওয়া নেই জেলে পোরা হচ্ছে। বাবাকে তখন খুব অসহায়, নিঃসঙ্গ একা বলে মনে হতো। এই মানুষটাকে বার বার জেলে ভরার রোগে ধরেছে গভর্নমেন্টকে। হাতের কাছে কাউকে পাচ্ছে না যেন তেমন। সরল নিরীহ বাবাটাকেই তারা সহজে পাচ্ছে। যখন তখন ধরছে আর ঢোকাচ্ছে। শৈশবে ওরা ভাবতো, বাবাটার একটু সরে টরে থাকলে কী দোষ! তখন তো আর শয়তানগুলো তাকে জেলে ভরতে পারবে না। আর ওরাও বাবাকে কাছে পাবে। প্রাণভরে দেখতে পারবে। আদর নেবে। কিন্তু সে ভাগ্য নিয়ে ওরা জন্মায়নি।
আব্বা কিছু বললেই তাকে জেলে পোরে। আব্বা কিছু করলেই তাকে জেলে পোরে।
আব্বা কিছু না বলে, না করে কেমন করেই বা বোবা, অন্ধ, অকর্মণ্য হয়ে থাকবেন!
অদ্ভুত একটা বাবা হাসুদের। মন্ত্রী বাহাদুর হলেও তাকে জেলে ঢোকায়। মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিলেও তাকে জেলে ঢোকায়।
কী এমন অপরাধ বাবার। তিনি কি নিজের ব্যক্তিগত কোনো অপরাধের জন্য জেলে যাচ্ছেন! প্রশ্নগুলো মাথায় গুনগুন করত শৈশবে। মা বেশি কথা বলার মেয়ে নন। তিনি বলতেন, নিজের দোষের জন্য যায় না। পলিটিক্স করে। মানুষের জন্য খাইয়া না খাইয়া দৌঁড়ায়। মিছিল দেয়। ভাষণ দেয়। গরীবের জন্য কথা কয়। সেজন্য খালি জেলে যায় তোর বাবা।
অন্যের জন্যে জেলে যাওয়া – শিশুদের মন এই অদ্ভুত স্বভাবের কথা কেমন করেই বা আন্দাজ করবে। সত্যি! পাগল একটা বাবা পেয়েছিল তারা। একটা সময় ছিল, যখন কলেজে বাঙালিদের নেতৃত্ব দিয়েছিল হাসু – তখন শতকিয়ার মতো বাবার অমর সব উচ্চারণের দিনপঞ্জি ঠোঁটস্থ ছিল। না, বাবাকে চমকে দেয়ার জন্য নয়; কখনো তাকে চমকে দিতেও যায়নি; জানলে হয়তো তিনি আত্মতৃপ্তি পেতেন তার আত্মজার স্মরণশক্তি দেখে। বাবা পরমপ্রিয় বাবা – এক কন্যার চোখে বাবা – দুনিয়ায় ক’জন কন্যা তার পিতাকে নিয়ে স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার অঞ্জলি লিখেছে হাসু জানে না। সেও কখনো লিখে যেতে পারবে কি না জানে না। শুধু জানে, যদি লেখে গীতাঞ্জলির মতো মহৎ গীতিকবিতা হয়ে উঠবে প্রতিটি ছত্র। আজ এই ইউরোপের নীলপাহাড় থেকে বাবাকে তার যে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে ইচ্ছে হচ্ছে। মনে হচ্ছে – বাবাকে নিয়ে শত শত পৃষ্ঠা লিখে ফেলে। কিন্তু সেজন্য কালি কোথায়; কাগজ কোথায়? বহুদূরে আকাশের গায়ে ধবল শুভ্র পাহাড়, ও সব কি শোক শীতল কাগজের পাতা! আর তার চোখের অবিরাম অশ্রু একা নির্জনে নিজের সঙ্গে কথোপকথনের কালি! হায়! এই কথালেখ্য হাসু কবে কেমন করে লিখবে।
বন্ধু, সতীর্থরা যারা জানতেন, তারা বিষয়টি সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখতেন, ভাবতেন মুজিব কন্যার কি অপূর্ব মুখস্ত শক্তি। কিন্তু হাসু জানে, মুখস্ত শক্তির কোনো চমৎকার প্রকাশ তা ছিল না। নিজের অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকা নিয়ে একটু স্মৃতি হাতড়ালেই সে কোনো কষ্ট ক্লেশ ছাড়া সব মনে করতে পারত। যেমন এই মুহূর্তে সেই শতকিয়া, এমনকি বাবার বক্তৃতার অনেক জীবন্ত শব্দাবলী স্মৃতিতে প্রখর হয়ে উঠছে। ওর মধ্যে কে যেন স্মৃতির আলোক শিখাগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। মুজিবরের বাংলা ও বাঙালির নয়নমণি হয়ে ওঠার সার্বজনীন গাঁথা উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু। বাঙালি যে তার চিত্তগৌরব নিয়ে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হবে – সেই আসন্নকালের পিঠে মুক্তোর অক্ষরে তখনই কথামালার শুরু। ইতিহাসের অপ্রতিরোধ্য ময়ূরপঙ্ক্ষীকে যেমন কালজয়ী কাণ্ডারিকে এগিয়ে নিতে হয়।
কান্ডারিকে বারংবার প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছে। ৪৮-এ বাবা তখন ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ পড়ছেন। কলকাতায় অসংখ্য নিরীহ প্রাণের মৃত্যু, দাঙ্গায় অকারণ লোকক্ষয়ের কষ্ট বুকে চেপে ঢাকায় এসে দেখলেন – এখানেও অপেক্ষা করছে মোহভঙ্গের বেদনা।
পশ্চিমে রাতারাতি বাসা বেঁধেছে দশ দুষ্টচক্র। যে ভাষাটি আদৌ কোন মাতৃভাষাই নয় – ফৌজি আস্তানায় নানা ভাষার জঘন্য খিচুড়ি; সেই অচিন উর্দুকে ওরা বাংলা মায়ের মুখে বসিয়ে দিতে প্রাণান্ত। মাতৃভাষার এই অবমাননা কেমন করেই বা তরুণ মুজিব মেনে নেন। মা-কে ‘মা’ বলে ডাকার অধিকার হারাতে তিনি রাজি নন। বিনা প্রতিবাদে তিনি সূচাগ্র মেদিনী ছেড়ে দিতেও নারাজ। মুজিব আকুল কণ্ঠে মা-কে ‘মা’ বলার অধিকার চাইলেন। কী আশ্চর্য। তার এই কণ্ঠচেরা আকুলতাই হয়ে উঠল আশ্চর্য মর্মস্পর্শী কবিতা। তা সুর তুলল। তুলল অনুরণন।
সারাদেশেই খণ্ড খণ্ড ঝড়। অসন্তোষ। বাংলার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। মুজিব আন্দোলনে প্রস্তুত। ৩ মার্চে মায়ের ভাষা বাংলার ন্যায্য অধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ করছিলেন সেক্রেটারিয়েটের সামনে। উন্নত ললাট, অনির্বাণ বহ্নিশিখায় প্রজ্জ্বলিত মশাল মুজিবকে চিনে নিতে ভুল করেনি পশ্চিমা বৈরী চক্র। গ্রেফতার করে জেলে ভরেছিল তাকে। কী দোষ এই তরুণের! সে মায়ের ভাষায় কথা বলতে চেয়েছিল। কারাশৃঙ্খল ভেঙে বেরুতে না বেরুতে আবার গ্রেফতার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যের শিকার কর্মচারীদের আন্দোলনে ন্যায্য দাবি-দাওয়ায় সমর্থন দিলেন তিনি। ১১ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার। ১৯৪৯ সালে মুক্তি।
তার হাতে পায়ে বেড়ি পরানোর দুষ্ট চেষ্টা চলছেই। কিন্তু তার চিত্ত দুয়ারে তখন দ্যুতি ছড়াচ্ছে বাঙালি মুক্তির মন্ত্র। মুজিব ক্রমশই দুনির্বার। পঞ্চাশের বছর শুরুর দিনেই তিনি লিয়াকত শাহীর বিরুদ্ধে বের করলেন ভুখা মিছিল; চাইলেন সবার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার। আবার গ্রেফতার। এবার জেলখানায় টানা দুই বছর। ভাষার জন্য রক্তফুল ফোটানোর বাগান অমর অজর বাহান্ন সাল। অমর একুশে। রাজপথে গুলি। ঢাকা রক্তাক্ত। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের অতুল আত্মদান। মুজিবকে জেলে আটকে রেখেও জুলুমশাহী চরম উদ্বিগ্ন। জেল থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। ঢাকা থেকে নেয়া হলো ফরিদপুরে। সতেরো দিন অনশন করলেন তিনি।
১৯৫৪ সালের জুলাইতে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী। ক’মাস বাদে মন্ত্রিসভা বাতিল পশ্চিমাদের কূট ষড়যন্ত্রে। ’৫৫-তে গণপরিষদের সদস্য। করাচীতে গণপরিষদের সভায় বাংলার প্রাণের আওয়াজে আলোড়ন। মুজিব বললেন, পূর্ব পাকিস্তান নয়, পূর্ব ভূখন্ডের নাম হোক বাংলা। বাংলার মুক্তিগাঁথার অমর মহাকাব্য লেখা সেই থেকে শুরু হয়ে গেল। রুপসী পূর্ববাংলা মুজিবের উচ্চারণে অযুত আলোকশিখায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
সেই থেকে গোপনে ষড়যন্ত্রের প্যাঁচ কষাও শুরু। মুজিব নিজেদের নাম আপন করে উচ্চারণ করতে চাইল কেন? ওর গায়ে রাষ্ট্রদ্রোহীর তকমা এঁটে দাও। অক্টোবরে বাঙালির একান্ত প্রাণের দল আওয়ামী লীগের নিজস্ব নামে রুপান্তর। সেপ্টেম্বরে কোয়ালিশন সরকারে মন্ত্রীত্ব। স্বেচ্ছায় পদত্যাগ। ’৫৮ সালে আইয়ুব শাহীর মার্শাল ল’ জঙ্গি শাসন। ১২ অক্টোবর জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার। টানা দেড় বছর বিনা বিচারে জেলখানায় ধুঁকলেন। ৬ টি মিথ্যা মামলার বেড়ি পরিয়েও তাকে আটকে রাখা যায়নি। সসম্মানে মুক্তি। কিন্তু গোয়েন্দারা তার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকল। নানারকম নজরদারি ও খবরদারি। ঢাকার বাইরে যেতে বিধিনিষেধ। ’৬২ সালে কথিত জননিরাপত্তা আর্টিকেলে আবার আটক। ৬ মাস বিচারবিহীন কারান্তরালে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা। তারপর বারবার গ্রেপ্তার নামের প্রহসন। হয়রানির চূড়ান্ত। কোথায় কখন কতবার গ্রেফতার করা হয়েছে – তার হিসাব দেয়া বাবার জন্যই দুরূহ।
১৯৬৬ সালের ৮ মে বাবা নারায়ণগঞ্জে জনসভা করে রাতে ৩২ নম্বরে ফিরেছেন। রাত একটায় পুলিশের শোরগোলে সবাই জেগে উঠল। গভীর রাতে বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। ওরা অসহায়ের মতো সে দৃশ্য দেখেছে। পাকিস্তান রক্ষা বিধির ৩২ ধারায় নিষ্ঠুর নির্যাতন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর। বাংলার মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদের সেই মুখর দিনগুলোর শুরু। হরতাল, ধর্মঘটে অচল হতে লাগল বাংলা। ৭ জুনের হরতালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলি। ১১ লাশের রক্তে লাল রাজপথ। মোনায়েম খাঁ যত্রতত্র আস্ফালন করে ফিরছেন। তার আমলে মুজিবের মুক্তি নাই। সে গদিনশীন মানেই মুজিব শৃঙ্খলিত। মোনায়েম কারাকক্ষেই প্রহসনের বিচারালয় বসাল। ২১ মাস এ ভাবে চলল। মাসের পর মাস অনিশ্চয়তায় কাটছে। বাবার বাতের বেদনা ছিল। তার সুচিকিৎসার কোন ব্যবস্থা ছিল না। আম্মা ছুটাছুটি করেও কুলকিনারা করতে পারেননি। মামলার অর্থকড়ি যোগাড়ে তিনি কাহিল হয়ে পড়লেন।
’৬৮ সালের জানুয়ারিতে আশার খবর কানাকানি হচ্ছিল। বাবা মুক্তি পেতে পারেন – এমন একটা মিষ্টি খবর কেউ বয়ে এনেছিল। বাবাকে মুক্ত দেখবে বলে ওরা অপেক্ষায় বুক বাঁধল।
দিন পেরিয়ে রাত, রাত পেরিয়ে অপেক্ষা। এর আগেও কারাবন্দি বাবার জন্য অনেকবার প্রতীক্ষা করেছে। এবার তার চেয়ে বেশি ব্যাকুল। তার কারণ – বাবার ভবিষ্যত, জীবনাশঙ্কা নানা কথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আইয়ুবের চামচা মোনায়েম তো তর্জন গর্জন করেই যাচ্ছিল। বাংলার মাটি পানি হাওয়ায় জন্ম নিয়েও ওরা বাঙালির রক্তপিয়াসী হয়ে উঠেছিল। এই পিপাসার শেষ কোথায়? মুজিবকে প্রহসনের বিচারের নামে গোপনে হত্যা করে ওরা বাংলার কণ্ঠরোধ করার প্লান করেছে – কেউ কেউ এমন আশঙ্কা করছিলেন। আব্বাও হতোদ্যম নন। ফাঁসির মঞ্চে তিনি বাঙালির জয়গান মরণ-বরণে এগুচ্ছেন। কন্যার কাছে পিতার জীবন সংশয় কখনোই কাম্য হতে পারে না। অথচ তেমন আতঙ্ক বাতাসে ভাসছিল। বাবার আন্দোলনের শতকীয়া ওদের প্রত্যাহিক জীবনে বিপর্যয়ের অশনি সঙ্কেত দিচ্ছিল বারবার। ওরা ক’টা প্রাণী বাবার ছায়া না পেয়ে কষ্টে ছটফট করছিল।
জানুয়ারির ১৫, ১৬, ১৭ তারিখ ধরে ওরা আশা-নিরাশার পেন্ডুলামে দুলছে। ভীষণ টেনশন। কামাল জামালদের সঙ্গে এই মনোবেদনা শেয়ার করতে পারছে না হাসু। আম্মা আর সে চুপি চুপি আলাপ সারছিল। বাবা মুক্ত হলে বুঝবে, এ যাত্রা মস্ত ফাঁড়া কেটে গেল। সারারাত ঘুম নেই। এটা তো তখন রেওয়াজই হয়ে দাঁড়িয়েছে – ওর বাবাকে পুলিশ ধরেও নিয়ে যায় মধ্যরাতে। মুক্তিও রাতের বেলায়। যাতে তাকে ঘিরে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে না পারে।
১৮ জানুয়ারিতে আশঙ্কা সত্য হলো। আম্মা নানান সোর্সে সব খবরই পাচ্ছিলেন। মধ্যরাত । তখন ১ টা। সেন্ট্রাল জেল থেকে তাকে নামকাওয়াস্তে মুক্তি দেয়া হলো। ফটকও তিনি পেরুতে পারেননি। সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর লোকজন রাতের আঁধারে অতর্কিতে তাকে একরকম ছিনিয়ে নিলো। তাকে তারা অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে গেল। কোথায় নেয়া হলো – পরিবারকে কিছুই জানতে দেয়া হলো না। প্রচণ্ড মুষড়ে পড়ল সকলে। সারা বাড়িতে বিষণ্নতা।
ফেব্রুয়ারি, মার্চ ২ টি মাস। বাবার কোনো খোঁজ-খবর পাচ্ছে না। খুবই ভেঙে পড়লেন আম্মা। তার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠছিল। কিছুতেই নিজেকে সম্বরণ করতে পারছিলেন না। মায়ের কান্নায় ওরাও ব্যাকুল-আকুল হয়ে পড়ল। দিনের পর দিন নানা জায়গায় আম্মা খোঁজ খবর করেছেন। কেউ জানেন, এমন কোনো ব্যক্তির খোঁজ পেলে আশায় বুক বেঁধে ফোন করেছেন। কিশোর কামাল খবর জানতে ছুটে গেছে। আম্মা নিজেও অনুরোধ উপরোধ করেছেন – বেঁচে আছে কিনা, অন্তত এই খবরটা দাও।
ওরা শেখ সাহেবকে গুম করে ফেলল কিনা – এমন শঙ্কামালা নিয়ে তিনি কেমন করেই বা চোখের জল ধরে রাখবেন। দিন যাচ্ছে। হতাশ হয়ে পড়ছিল সবাই। সেই দিনগুলোতে বাবার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদে চলেছে হাসুরাও। জামাল রেহানার সে কি আকুতি। বারান্দায় বসে গালে হাত দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত।
শেখ মুজিবরের মতো মানুষকে গুম-অপহরণ? নানা গুঞ্জন বাতাসে পাখা মেলবেই। কিন্তু সে সব গুজব হাসুদের মতো কিছু অসহায় মানুষকে বেদনার শূলে জর্জরিত করছিল – এমন কোনো ভাষা নেই যে তার বর্ণনা করা সম্ভব।
আজ তাই মনে হচ্ছে – ছোট্ট এই জীবনের প্রতিটি পলে পলে এ কোন ধৈর্য ও সহ্যশক্তির সুকঠিন পরীক্ষা দিয়ে চলেছে হাসু? বাবার কল্যাণের জন্য, জীবনের সুরক্ষা চেয়ে আম্মা কত দোয়া খায়ের করেছেন। জায়নামাজে নামাজ শেষে দু’হাত তুলে ধরেছেন – সেই দোয়া আর যেন শেষই হতে চায় না। মান্নত করেছেন আম্মা। তিনি এমনিতে দুধের মতো ফর্সা। হালকা রঙের শাড়ি পরতেন। তাকে ভীষণ ফ্যাকাশে দেখাতে লাগল। মুখে যেন রক্ত নেই। আর পরণের হালকা শাড়িতে চোখে বিভ্রম লাগল। একটা সফেদ শাড়ি যেন তাকে ঘিরে রয়েছে। দাদা-দাদীকে দুঃসংবাদ দিতে চায়নি ওরা। যেখানে পুরো বিষয়টি রহস্যে ঘেরা; অপহরণ না গুম সেটা অনিশ্চিত – এই দুশ্চিন্তার বেড়াজালে তাদেরকে ফেলতে চাননি বেগম মুজিব। কিন্তু খবর যে শেখ মুজিবরকে নিয়ে। নানা খবর রটছে দেশ জুড়েই। টুঙ্গিপাড়া কেমন করেই বা বাদ রইবে। দাদা-দাদী ব্যাকুল হয়ে রইলেন। কিন্তু জালিমরা কোন খোঁজখবরই ওদেরকে দেয়নি। (চলবে…)
অলংকরণ: শিল্পী শাহাবুদ্দিন







