চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবা (পর্ব: তেরো)

মিলন ফারাবীমিলন ফারাবী
১:২৩ অপরাহ্ণ ১৫, মে ২০১৬
অন্যান্য, শিল্প সাহিত্য
A A

বত্রিশ নম্বর বাড়ি। সাদা রঙের অতি সাধারণ বাড়ি। নির্মাণে জৌলুস নেই। কারুকার্য নেই। সিংহ দুয়ার নেই। বাড়িতে অতি সাধারণ বসার ব্যাবস্থা। ভাল সোফাসেটও নেই। বাবা বেশীর ভাগ সময় তার শোবার কক্ষে বসেই ব্যস্ত সময় কাটান। নেতাকর্মীরা ভীড় করে আছেই। সবসময় সরগরম। বেডরুম লাগোয়া প্রশস্ত বারান্দা। বাড়ির বৈশিষ্ট্য এই যা। বাবা বারান্দায় গিয়ে একটু বিশ্রাম নেবেন; হাওয়ায় জুড়িয়ে নেবেন দেহ। সে ফুরসতও মিলছে না।

ইয়াহিয়া সিন্ধুর শিকারশালা থেকে ফিরে নব্যজোশে চাঙ্গা। নিত্যনতুন এলানে সেও ব্যস্ত। ৬ই মার্চ বিকালে রেডিও টিভিতে ভাষণ দেবার কথা প্রচার করা হচ্ছিল। বাবা সেদিন তার বেডরুমে বসে আলোচনায় মগ্ন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম আছেন। কামরুজ্জামান, তাজউদ্দিন, মনসুর আলী আছেন। হঠাৎ এক মস্ত জেনারেল ফোন করলেন বাবাকে। ঢাকাস্থ সেনাপ্রধান কমান্ড প্রধান সে। বলল, ইয়াহিয়া খান কথা বলতে চায়। লাইনে আছে ইয়াহিয়া। বাবা ফোনটা ধরলেন। ঢাকা থেকে দুস্তর দূরে রাওয়ালপিন্ডি। লাইন পরিষ্কার নয়। ইয়াহিয়া যাই বলুক; বাবা ভাবগম্ভীর মুখে ফোনটা রেখে দিলেন। ইয়াহিয়াকে দুবার জানালেন – কিছু শুনতে পাচ্ছি না। শোনা যাচ্ছে না কিছুই।

বুঝতে কারও বাকি রইল না – এই ফোন ইয়াহিয়ার নয়া চালবাজি। পিন্ডি ঠান্ডা মাথায় রক্তবাজির ষড়যন্ত্র চুড়ান্ত করেছে। এখন নকশা করছে সে। বাঙালিদের অন্ধকারে রাখতে চায়। পিন্ডিতে বসে ইয়াহিয়া, ভুট্টো, গোলামরা যে পরিকল্পনা করেছে – বাঙালি ও শেখ মুজিব যেন সেটা আন্দাজ করতে না পারে – এটাই ওদের ছল-কৌশল। ইয়াহিয়াকে আবার ফোন করতে বললেন বাবা। হাসিনা, ওয়াজেদ সেদিন ছিলেন বাবার আশে পাশেই।

হঠাৎ ইয়াহিয়ার ফোন কেন – কি বলতে চায় সে – তা নিয়ে খানিকটা পর্যালোচনা দরকার। বাবা ওয়াজেদকে বললেন, এবার ইয়াহিয়ার কল এলে তুমি বাবা তাকে কিছুক্ষণ ব্যস্ত রাখবে। বলবে আমি মিটিং এ আছি।

সে মতই কাজ হল। এবার জেনারেল রাও ফরমান আলী জানাল ইয়াহিয়া লাইনে আছেন। যথারীতি তাকে বেশ কিছুক্ষন ব্যস্ত রাখা হল। শেষমেশ বাবা সৌজন্য রক্ষার জন্য ফোনটা ধরলেন। কোন রাখ ঢাক করলেন না। তিনি ইয়াহিয়ার কাছে সাম্প্রতিক রক্তপাতের জন্য কৈফিয়ত চাইলেন। কেন এই গুলি ও রক্তপাত। কিসের জন্য মানুষ মারা হল। মানুষ মেরে বাঙালিকে দমানো যাবে না। বাবা ইয়াহিয়াকে বললেন, উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিশন করতে হবে। এই রক্ত বৃথা যেতে দেয়া হবে না। আর একটি ইশতেহার প্রকাশ করতে বললেন ইয়াহিয়াকে। ইয়াহিয়া ঢাকায় আসুক। জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে এসে বসুক। জনগণের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার ঘোষণা দিতে বললেন তাকে।

ইয়াহিয়া বাবার কথা শুনলেন না। একখানা ভাষণ দিল বটে – তা ফৌজী ফরমানের মত কর্কশ ও জঘন্য। আচমকা ঢাকা অধিবেশন বাতিলের কারণ হিসেবে বলল, আওয়ামী লীগের একগুয়েমিতার কারণেই তা নাকি হয়েছে। যত দোষ নন্দ ঘোষ। ইয়াহিয়ার এলানে জঙ্গ-জঙ্গী হুমকি ধমকি পরিষ্কার। পিন্ডির মসনদ বাঙালির জন্য কুসুমাস্তীর্ণ হচ্ছে না।

Reneta

রেডিওতে সবাই শুনলেন ইয়াহিয়ার জঙ্গী-বচন। বেশ অনেকক্ষন নীরবতা নেমে এলো বত্রিশ নম্বর বাড়িতে। সবাই নিশ্চুপ। ইয়াহিয়ার কুকুরলেজ সোজা হবে না – সে আশঙ্কা তো ছিলই। তারপরও কি চাইছে ইয়াহিয়া – কি চাইছে ফৌজী পিন্ডি – তা নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত লাইব্রেরী রুমে আলোচনায় মগ্ন ছিলেন বাবা।

বাংলার মাটিতে রক্ত ঝরিয়েছে আইয়ুব। ইয়াহিয়া এসেও একই কান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। লাশ হচ্ছে মানুষ। ইয়াহিয়া তদন্ত কমিশন তো দূরের কথা – দু:খ প্রকাশ পর্যন্ত করল না। তার কন্ঠে ছিল দম্ভ আর অহঙ্কার। আবার সেই প্রহসনের গোলটেবিলের কথা বলল। কিসের গোলটেবিল। নিরঙ্কুশ মেজরিটি পেয়েছে বাংলা। জনগন বন্যার মত ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট দিয়েছে শেখ মুজিবকে। পিন্ডির ভাগ্যবিধাতা বাংলা। অনেক ঠকানো হয়েছে বাঙালিকে। প্রতারণা প্রহসন হয়েছে। এখন পিন্ডির রাজ ক্ষমতা বাঙালির হাতের মুঠোয়। এখন কার সঙ্গে গোলটেবিলে বসবেন বাবা! কেন বসবেন! ইয়াহিয়া খান কার্যত অতীত। সে এখন অকার্যকর। জনগনের ক্ষমতা মুজিবের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে দ্রুত প্রস্থানই তার মঙ্গল। খানশাহী সে পথে হাঁটল না। মসনদকে ফৌজী তাল্লুক ভেবে জগদ্দল থাকতে চাইছে সে। এই বেয়াদবী অসহ্য। শহীদের রক্ত নিয়ে পিন্ডির খেল তামাশা কোন অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় না। সেরাতেই কড়া জবাব দেয়া হল হারাম ইয়াহিয়ার এলানের।

জানিয়ে দেয়া হল, শহীদের রক্তে রাজপথ এখনও রঞ্জিত। তাজা রক্তের দাগ এখনও শুকোয় নি। শহীদদের পবিত্র রক্ত পদদলিত করে গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারে না। বাংলাদেশ এবং বাঙালির সঙ্গে কোন অবস্থাতেই বেঈমানী করবে না জনগনমনধন্য এই দলটি। ঢাকা শহর সেইরাত থেকে আর ঘুমোয় নি। লাখো মানুষ জড়ো হতে লাগল সারাদেশ থেকে। বানের মত মানুষ আসতে লাগল। রাতভর ঢাকায় নব উত্থান আর জাগরণ। মহাকবির ডাক শুনেছেন সবাই। জোতির্ময় এক মহামানবের পদধ্বণি শুনতে পেল সবাই। আসসালাতু খাইরুম মিনাল নাউম। ভোরের আজান মধুর সুরে উচ্চারিত হচ্ছিল ঢাকার আকাশে বাতাসে। সেই আহবানে তীব্র ঐশী মাদকতা। শীতমাখানো মিঠে আবহাওয়া। সুবেহ সাদিক দিগন্তে। লাল লালিমা। তার আগেই ঢাকা লোকারন্য। এত মানুষ কেউ কখনও দেখে নাই। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ। লঞ্চে চড়ে এসেছে মানুষ। ঠাঁই ছিল না দক্ষিনের সকল লঞ্চে। মানুষে মানুষে হাবুডুবু অবস্থা। নৌকা ভর্তি করে এলো লোকজন। ট্রেন উপচে এলো লাখো লাখো মানুষ। বগির ভেতর ও ছাদে ভীড়-ভীড়াক্কার। ট্রেনের ইঞ্জিনের ওপর নির্ভিক বাঙালির ঝুলে বসে আসা। বাস ভর্তি করে এলো সবাই। ছাদঠাসা হয়ে। কে রুখবে এই বাঙালিকে। কে ঠেকাবে! কার সে সাধ্যি।

ভোরবেলা ঢাকায় সূর্য যখন উঠল, এই শহর আর আগের চেহারায় রইল না। দরদালান ইটকাঠ পাথরের শহর আচম্বিতে মানুষময় হয়ে উঠল। মহাবিস্ময়ের ঘটনা। কোত্থেকে আসছে এই মানুষ! ভোজবাজি না ইন্দ্রজাল। সদরঘাট থেকে প্রতিটি রাস্তা লোকপূর্ণ। সবাই ছুটছে রেসকোর্সের দিকে। ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল। মানুষের অবিস্মরনীয় বিস্ফোরন। প্লাটফর্ম, রেললাইন মানুষ আর মানুষ। সবার গন্তব্য রেসকোর্স। কি হবে আজ রেসকোর্সে! গাজীপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল – হেঁটে আসছে মানুষ। মিছিল আর মিছিল। শ্লোগান আর শ্লোগান। আগুনের ফুলকি ছুটছে জনতার মুখে। তোমার আমার ঠিকানা , পদ্মা মেঘনা যমুনা। সবাই উম্মুখ শেখ সাহেবকে একনজর দেখতে। সাভার, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর থেকে অবিরাম জনস্রোত। অনিরুদ্ধ। অদম্য। অসমসাহসী। দুপুরের মধ্যেই রেসকোর্স জনভারে মহাসমুদ্র।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সারাদেশের লাখো ছাত্রের তীর্থস্থান। সবাই উদগ্রিব নেতা কখন আসবেন। আইয়ুব খানকে টেনে হিচড়ে মসনদচ্যুত করা হয়েছে। জনবিক্ষোভের ফুৎকারে তুলার মত উড়ে গেছে ফিল্ডমার্শাল বাদশাহী। এখন আবার হারাম ইয়াহিয়ার আইয়ুবি-পাঞ্জাবি খান্দান জবরদখল করে রেখেছে দেশকে। শেখ মুজিবই পারবেন এই হারাম-হার্মাদদের শায়েস্তা করতে। শেখের অবিনাশী বজ্র উচ্চারণ ওদের তখতে তাউস ছারখার করে দেবে । শাহবাগ, ময়মনসিংহ রোড, হাইকোর্ট রোড, নিউমার্কেট, ইডেন কলেজ, কার্জন হল – মানুষের অফুরন্ত প্রবাহ। তিল ধারণের জায়গা নেই। রেসকোর্স ময়দানের দক্ষিণ পূর্ব কোনে বিশাল নৌকা মঞ্চ। অনেক দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে নয়নমনোহর মঞ্চটি। অধীর অপেক্ষায় মহাজনতা। ক্ষনে ক্ষনেই জনজোয়ারে শ্লোগানের ফেনিল ঢেউ। জয় বাংলা উচ্চারণে মুখর চারিদিক। লাখো কন্ঠে আওয়াজ উঠছে – আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। জিকির করছে মানুষ – শেখ মুজিব। শেখ মুজিব। অপ্রতিরোধ্য আবেগে বুক চাপড়াচ্ছে তারা।

অদ্ভুত সেই দৃশ্য। কেন এমন উম্মাতাল মানুষ। কি চায়! কিসের জন্য তারা এসেছে এই শহরে। বুক চাপড়ে শেখ মুজিবের নাম নিয়ে তাদের কিসের আকুতি! বাবা কি শুনতে পাচ্ছেন এই আর্তি-আকুতি! বন্যার মত মানুষ এসেছে। খেটে খাওয়া মানুষ। ছিন্ন ছন্ন পোষাক। পরনে লুঙ্গি। অনেকের গায়ে জামা বলতে নেই। যার যেমন সাধ্যি – ফতুয়া, পাঞ্জাবি , ছেড়া খোড়া জামা পরে এসেছে ময়দানে ছুটে। খালি গায়ে মানুষও কম নয়। কিছু করার নেই। তাকে আসতেই হল। শেখ মুজিবকে দেখতেই হবে। মুজিবই পারবে এই ছন্ন-উদোম বাঙালিকে জীবনের দিশা দিতে। গভীর বিশ্বাস। সুগভীর প্রত্যাশা। হৃদয়কোটরে আকাঙ্খা সুতীব্র। মুজিব মুজিব শেখ মুজিব-হৃদয় নিঙরানো ভালবাসায় প্রতিধ্বনি চারদিকে। সবার বুকে অটুট মনোবল। বৈঠা লাঠি লগি যে যা পেরেছে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। অনেক সহ্য করা হয়েছে। অনেক সয়েছি। আর নয়। কোন কিছুই আর বিনা লড়াইয়ে ছেড়ে দেয়া হবে না। মানুষের প্রত্যাশা ও বিশ্বাস অনি:শেষ। সবাই বিশ্বাস করে – শেখ সাহেব আজ তাদের মনের কথাটি বলবেন। কি সেই তাদের সেই মনের কথা। বাবা কেমন করে তা বুঝবেন! তিনি কি সত্যিই সাত কোটি মানুষের মন পড়তে পারবেন। শেখ মুজিব আজ কোন ব্যাক্তিমানুষ নন। তার চিত্তে আত্মায় অন্তরের অন্ত:স্থলে আসন নিয়েছে বাংলা। তিনি আজ মহামানব। তিনি সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অভিন্ন আত্মা। সাড়ে সাতকোটি বাঙালির হৃদয়-নি:সৃত উচ্চারণ আজ ধ্বনিত হবে তার কন্ঠে।

বাবা যখন মঞ্চে উঠলেন – হিল্লোলিত ঢেউয়ের কলতান ময়দান জুড়ে। লাখ লাখ মানুষ সমস্বরে আওয়াজ দিয়ে রাওয়াল পিন্ডির মসনদ লন্ডভন্ড করে দিল। লাখ লাখ লাঠি আকাশে ছুড়ে দিল জনতা। বর্শার চেয়েও ভয়ংকর এই মানবাস্ত্র। কী বিস্ময়। সেই ইস্পাত-দৃঢ় লাঠি আবার যার যার হাতে। কে শেখালো এই কুচকাওয়াজ। কেমন করে এটার সম্ভব। ইসরাফিলের শিঙ্গার হুঙ্কার শোনা গেল জনসমুদ্রে। শেখ মুজিব মাথা তুলেছেন আকাশের পানে। আকাশকে দেখলেন। দিগন্তরেখাকে দেখলেন। অনমনীয়। অবিচল। লৌহ-দৃঢ় অভিব্যাক্তি। বাবা ধীরস্থির ভাবে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। মানুষের এই বিশালতা দেখে তিনি মুহুর্তের জন্য অভিভূত। না, এই জনসমুদ্রকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। কেউ না। কারও পক্ষেই সম্ভব না।

বাবা অনঢ়। হাত তুললেন। শ্লোগান-জিকিরে মাতোয়ারা জনসমুদ্র নিমিষেই নীরব হয়ে গেল। বাবা বলবেন। সবাই তার প্রতিটি উচ্চারণ নিজ কানে শুনতে চায়। কেউ এই বিরল সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। নি:শব্দ জনসমুদ্র।

কদিন ধরেই দু:ভারাক্রান্ত ছিলেন বাবা। মন বিষাদগ্রস্থ। চিত্ত কান্নাতুর। বাংলার মাটিতে আবারও রক্ত ঝরেছে। মরেছে তার ভাই। মরেছে তার সন্তান। শোকগ্রস্ত তিনি। কিন্তু মানুষ আজ শোককে শক্তিতে রুপান্তর করার মহান শপথ নিতে এই ময়দানে উপস্থিত। বাবাকেও শোক কাটিয়ে উঠতে হবে। ভাইয়েরা আমার, বাবা বললেন। তার ন¤্র কন্ঠের বিষাদ কিছুতেই কাটছে না। বললেন, আজ দু:খভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দু:খের বিষয় আজ ঢাকা চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়। বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়। বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।

বাবার সুললিত কণ্ঠে বেদনার ঝরনাধারা। জনসমুদ্রের মহামোহনায় দাঁড়িয়ে তিনি রক্তরঞ্জিত শোকার্ত রাজপথ দেখতে পাচ্ছেন। বিভিন্ন শহরে নিহত মানুষের আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছেন। তার জলদগম্ভীর কন্ঠের নেপথ্যে আহত নিহত পরিজনের আর্তনাদ। করুণ কান্না। কয়েক মুহুর্তের জন্য বিষণ্ন হয়ে রইলেন তিনি।

কি অন্যায় করেছিলাম। নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্নভাবে আমাকে আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে;আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব; এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলব; এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দু:খের বিষয় আজ দু:খের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস, মুমুর্ষূ নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস।

বাবার উচ্চারণ প্রাঞ্জল। গভীর কষ্ট ও আর্তি তাতে বহমান। প্রতিটি করুন দৃশ্য তিনি চোখের সামনে মানসপর্দায় দেখতে পাচ্ছেন। সারা বাংলার সেই কষ্ট বুকে পুষে রেখেই তাকে আজ বক্তৃতা করতে হচ্ছে। পিন্ডি চক্রের এই রক্তপাতের শেষ কোথায় – কেমন করে তিনি তার প্রানপ্রিয় বাঙালিকে রক্ষা করবেন – সেই ভাবনাও তার উচ্চারণের প্রতিটি ছত্রে বিষাদময়তা তৈরী করছে। বললেন,

বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সনে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সনে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সনে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে দশ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম বানিয়ে রেখেছিল। ১৯৬৬ সনে ৬ দফা আন্দোলনে, ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আয়ুব খাঁনের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খাঁন সাহেব সরকার নিলেন – তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন -গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।

তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেলো, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁন সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম – ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে আমরা এসেমব্লিতে বসবো। আমি বললাম, এসেমব্লির মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি এও পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশী হলেও একজন যদিও সে হয়, তাঁর ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।

মন্ত্রমুগ্ধ কোটি মানুষ। দিগন্ত বিস্তারি জনসমুদ্রে বাবার কন্ঠ ঐশী আহবানের মত ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে আকাশের অতলান্ত ঠিকানা থেকে মেঘের ওপার থেকে ভেসে আসছে প্রতিটি উচ্চারণ। জনগনেশ্বর কথা বলছেন এক অচিন অপার থেকে।

জলের মত সহজ প্রাঞ্জল করে তিনি সব খুলে বলছেন।

জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, যে আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাঁদের সঙ্গে আলাপ করলাম- আপনারা আসুন-বসুন আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেমব্লি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে, যদি কেউ এসেমব্লিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেমব্লি চলবে। তারপরে হঠাৎ ১ তারিখে এসেমব্লি বন্ধ করে দেওয়া হলো।

ধীর স্থির বাবার উচ্চারণ। প্রতিটি শব্দ জন্ম নিচ্ছে তার হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে। তিনি বাঙালির মহাত্মার প্রতিটি স্পন্দন শুনতে পাচ্ছেন। সেই মহান স্পন্দনের ভাষাই তিনি বিবরণ দিচ্ছেন মহাজনতার দরবারে। কোন তথ্যই বাদ যাচ্ছে না তার সারাংশ থেকে।

ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসাবে এসেমব্লি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করে দেয়ার পরে এদেশের মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠল।

আমি বললাম , শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিলো। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। কি পেলাম আমরা, আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী আর্ত-নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে- তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু-আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি – তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

বাবা আবারও বিষাদগ্রস্ত। প্রস্তরের ফলার মত তার উচুঁ শির। যে দিকেই তিনি তাকাচ্ছেন তার দৃষ্টিতে শিখর হিমাদ্রির শুভ্র পবিত্রতা। চোখ নিষ্কলুষ। বাঙালি বাংলাদেশ উজাড় করে এসেছে মুজিবের কথা শুনতে। প্রতিটি কথা জানা মহাজনতার অধিকার। প্রতিটি বাঙালির অধিকার। রাজনীতি আজ থেকে আর রাজাধিরাজের নয়। রাজনীতি গনমানুষের। মুজিবের রাজনীতি সাড়ে সাত কোটি মানুষেরে নিয়ে। প্রতিটি ঘটনা তাই বয়ান করছেন জনসমুদ্রের কাছে। এই সাগরের উথলিয়া ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে। প্রতিটি ইঞ্চি বাংলাদেশে, প্রতিটি বাঙালির কানে পৌছাবে এই কথা। পৌঁছানো একান্ত দরকার। কোন বাঙালিকে অন্ধকারে রেখে বাবা বাংলা ও বাঙালির ভার নেন নি। সব কথা, পিন্ডি ও ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সব চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বাঙালি মাত্রেই জানা উচিত। বাবা বললেন,

তার সাথে আমার দেখা হয়, তাকে আমি বলেছিলাম জনাব ইয়াহিয়া খাঁন সাহেব আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে। কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কি করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি নাকি স্বীকার করেছি ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে।

আমিতো অনেক আগেই বলেছি কিসের আরটিসি, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘন্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন সমস্ত দোষ তিনি আমার উপর দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।

ভাইয়েরা আমার, ২৫তারিখ এসেমব্লি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০তারিখে এসে বলে দিয়েছি যে, ঐ শহীদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। এসেমব্লি কল করেছে, আমার দাবি মানতে হবে প্রথম সামরিক আইন মার্শাল ল উইথ ড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপরে বিবেচনা করে দেখবো আমরা এসেমব্লিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেমব্লিতে বসতে আমরা পারি না।

বাবার প্রতিটি উচ্চারণ কামানের গোলার মত তার জলদকন্ঠ থেকে উদগীরণ হতে লাগল। প্রতিটি শব্দে অনির্বাণ স্ফুলিঙ্গ। জ্বলে জ্বলে মশাল হয়ে উঠছে তার কথা। জনতার উদ্দীপনাও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল। মুজিব মুজিব ধ্বনিতে পুরো রেসকোর্স ময়দান, সন্নিহিত সকল রাজপথÑসকল দরদালান, সকল অঞ্চল প্রকম্পিত হতে লাগল। শীতের মনোরম আবহাওয়ায় জনতার মুখে ঘামের স্বেদবিন্দু। আবেগ-উত্তেজনায় সবার হৃদয় কম্পমান। অদ্ভুত অদেখা এক দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষ অনিরুদ্ধ আবেগে কেঁদে চলেছে। জল গড়িয়ে পড়ছে চোখ থেকে। এই কান্না দুই যুগ ধরে পিন্ডির শোষনপিষ্ট হওয়ার বেদনার কান্না। এই অশ্রু স্বজন হারানোর । এই জলধারা পিন্ডির জঘন্য কয়েদখানায় বছরের পর বছর বন্দী থাকার যন্ত্রনা। আজ সেই বন্দীত্ব থেকে মুক্তির উচ্ছাস আকাশে বাতাসে। ভাইয়েরা আমার – বলতেই জনসাগরে উচ্ছ্বলি সাড়া। বিচিত্রভাবে সাড়া দিচ্ছে সবাই। লাখো মানুষ লাঠি ছুড়ে লাফিয়ে উঠে অকুন্ঠে কন্ঠ মিলাচ্ছে মহাকন্ঠের সঙ্গে।

আমি, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিস্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্টকাচারী, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেইজন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিস গুলো আছে সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না- রিকসা-ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে- শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।

এরপরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো,প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু-আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমারা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই , তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবেনা। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবাইয়া রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের ডুবাতে পারবে না।

দিগন্ত রেখা অতিক্রম করে যাওয়া জনতা অবিশ্বাস্য উদ্যমে উম্মাতাল। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা;বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো – অনি:শেষ শ্লোগানে সেই মুহুর্তে রেসকোর্স আগ্নেয়গিরির মত ফুঁসে উঠেছে। বাবা কোমল কঠোর শান্ত স্থিতধী চিত্তে প্রতিটি আদেশ নির্দেশ দিয়ে চলেছেন। আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাঁদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর এই ৭ দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাঁদের বেতন পৌঁছাইয়া দেবেন। সরকারী কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হয় , খাজনা – ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না। শুনেন, মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলার হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিও -টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। ২ ঘন্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাঁদের মাইনা পত্র নেবার পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন-টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ পাঠাতে হলে আপনারা চালাবেন। কিন্তু যদি এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়- বাঙালিরা বুঝেশুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।

মহাসাগরে তখন তান্ডব। মানুষ আর নিজেকে সম্বরণ করতে পারছে না। লাঠি বৈঠা লগি সব আকাশে ছুড়ে একাকার। সবাই সারা বাংলাদেশের সকল বাঙালির শক্তি ধারণ করে অবিরাম গর্জন করে চলেছে। গর্জনশীল সেই মহাশব্দ ক্রমশ:ই দুর্দমনীয় গগনচেরা হয়ে উঠল। বাবা সেই মহাগর্জনকে তার কন্ঠে ধারণ করে বললেন –

মনে রাখবা, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

জয় বাংলা।

জয় বাংলার জয়োল্লাসের সূচনা সেই থেকে। এই জয়োচ্ছাস আর থামবার উপায় রইল না। প্রতিটি বাঙালি এক একজন অসমসাহসী মুজিবর হয়ে নতুন প্রাণ পেল। মরতে আর ভয় পায় না সে। মৃত্যুঞ্জয়ী আত্মা প্রতি প্রানে প্রানে। জীবনমরণকে বাজি রেখে শেখ মুজিব ডাক দিয়েছে বাঙালির স্বাধীনতার; ডাক দিয়েছে মুক্তির – বন্যার লাহান, ঝড়ের লাহান সারা বাংলাদেশে মুক্তি ও দেশ স্বাধীনের মহাসংগ্রামের ডাক বজ্রপাণি হয়ে চতুর্দিক চঞ্চল করে ছড়িয়ে গেল। মুজিব বলে দিয়েছেন – জয় বাংলা। বাংলাদেশের বিজয় সূচিত হল সেই উচ্চারণ থেকে। অনিবার। অনিবার্য। বাংলাদেশ এখন থেকে কারও করায়ত্ত নয়।

বাবা কি সেই দিনই আলিঙ্গন করেছিলেন মৃত্যুকে। তার কখনওই মৃত্যু ভয় ছিল না। আর তাই বার বার মরণকে জয় করেছেন ক্লেশহীন চিত্তে। আর তাই টেরও পান নি এবার পিছু নিয়েছে হায়েনা। চিহ্নিত শত্রুকে চেনা যায় – কিন্তু ফেউ, হায়েনা, আততায়ী শ্বাপদ যখন পিছু নেয় ছদ্মবেশে – তখন তাকে চেনা বড়ই মুশকিলের। বাবা কোন পাত্তাই দেন নি মৃত্যুর যমদূতকে। বাবা অনেকবার বলেছেন, মুক্তি, স্বাধীনতা সব সময়ই উৎসর্গ ছাড়া হয় না। অপার মুক্তির জন্য চাই উৎসর্গ-অন্ত প্রাণ। বাঙালির মুক্তির জন্য আমি জীবন যৌবন উৎসর্গ করেছি সেই কবে। এখন প্রাণও যদি উৎসর্গ করতে হয় – আমি সদা সর্বদা প্রস্তুত; মুক্তি সাধন থেকে কেউ রুধতে পারবে না। ভয়ংকর সেই প্রতিজ্ঞা তাকে বার বার মুখোমুখি করেছে মৃত্যুর। পিন্ডির পিশাচ রক্তলোলুপ-খানশাহী অচিরেই তাকে ঘিরে ফেলল রক্তাক্ত তরবারি হাতে। মুজিব অনেকবার দিব্যি হেসে খেলে প্রবঞ্চনা করেছেন যমের সঙ্গে। এবার আর তাকে কোন মওকা দেয়া হবে না। মুজিবকে ফাঁসির মঞ্চে তুলতে হবেই। মুজিব বাঙালির প্রাণ পাখি। এটিকে যে কোন মূল্যে বধ করতে হবেই। আইয়ুব পারে নি। ইয়াহিয়াকে পারতে হবেই। শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে বাঙালির মুক্তি অনিবার্য। মুক্ত মুজিব মানে মুক্তবাংলা। জীবন্ত মুজিব মানেই নির্ভিক-নি:সংশয় বাঙালি। তাই প্রথমে মুজিবকে বন্দি করো। তারপর বাঙালির স্বাধীন স্পৃহার চরম মূল্য হিসেবে ঝোলানো হবে ফাঁসিকাঠে। মুজিবের বজ্রকন্ঠে গর্জাচ্ছে ওরা। ওদেরকে শায়েস্তা করতেই হবে। সমূলে বিনাশ করতেই হবে।

সেই কূটপরিকল্পনায় মশগুল পিন্ডি। ইয়াহিয়াকে নয়া খানশাহী কায়েমের রমনীয় সুখস্বপ্নে বিভোর রাখলেন ভুট্টো। তার সঙ্গে গোলাম-নেজাম-খানসামা-ফেউচক্র এসে জুটল। ঢাকায় ইবলিশের নায়েবে আমির টিক্কা-কসাইর ফৌজীশালায় মজলিসে গুলজার আর রাওয়ালপিন্ডিতে সদরে ইবলিশের মজলিসে শূরা বসল। শয়তানুল আজিম ইবলিশ-এর তখতে ইয়াহিয়া। তাকে শলা-পরামর্শ-শূরা-সুরা দিতে ভুট্টো তো ছিলই। বাসা থেকে লেংচাতে লেংচাতে ছুটে গেল গোলাম-খানসামারা। গোলাম ধর্না দিল টিক্কা-কসাইর কাছে। ভোটে তাদের বাঙালি এমন থাপ্পড় দিয়েছে – গাল থেকে অপমান-জঞ্জালের দাগ মিটছেই না। এখন বাঙালির বারোটা বাজিয়ে ওরা কঠিন প্রতিশোধ নিতে তৎপর হয়ে উঠল। নানা শুরা-মদিরায় টিক্কা-ইয়াহিয়ার পেয়ালা তারা ভরিয়ে দিতে লাগল। শরাব-পাগল ইয়াহিয়ার উম্মত্ততা দেখে কে! তার মস্তিষ্কের ঘিলু হাঁটুতে নেমে এসেছিল অনেক আগেই। এখন হাঁটুর বাটিও মগজশূন্য। মস্তিষ্ক-শূণ্য শরাবীর সুযোগটাই নিতে ব্যগ্র হল অনুসরণকারী শয়তানকুল। ওরা ইয়াহিয়ার শূন্য মস্তক ভরিয়ে দিতে লাগল নানা ভয়ংকর শয়তানি চালবাজি আর কল্পিত উল্লাসে। গোলাম তো সেই ইবলিশি দরবারে কবুল করে বসল – বাঙালি নারী মাত্র গনিমতের মাল। পাকিস্তানি সৈন্য মানেই পবিত্র সৈন্য। শরীফ ও আতরাফ। এই শরীফরা গনিমতের মালকে এনে ভোগ করলে পূর্বপাকিস্তানও মর্দে-পাকিস্তানিতে ভরে উঠবে। গোলামী পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠুর, নির্মম, সুচতুর চিন্তা গোলামের। তার কাছে ধর্ম মানেই মওকা আর নিষিদ্ধ হারেম হাসিলের মহা-অস্ত্র। তার মন বড়ই বিষাক্ত। ধর্মাস্ত্র, পাকিস্তান জিগির – কত বদমাইশি করলো সে । কিন্তু বেঈমান বাঙালিরা তাকে ঝেটিয়ে খেদিয়ে দিল। এই বাঙালিদের টাইট দিতে হবে। ইসলাম ধর্মের নাম ভাঙিয়েই সে আইয়ামে জাহিলিয়ত কায়েম করবে। একহাত নেবে ইসলাম ধর্মের ওপরও। পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে পুরো জাতিকে গনিমতের মাল বানাতে পারলে তার আবু-জাহেল-দিলে অঢেল শান্তি। ভুট্টো মহা ধুরন্ধর।

সে বুঝেই গেছে বাঙালির হাতে পিন্ডির মসনদ একবার চলে গেলে নিখিল পাকিস্তানে বাঙালিরাজ কায়েম হবে। রাওয়ালপিন্ডি থেকে সদরে পাকিস্তান চলে যেতে পারে ঢাকায়। ঢাকার অঙ্গুলি হেলনে চলবে সারা পাকিস্তান। এটা কোন ভাবেই হতে দেয়া যায় না। ভুট্টোর বুঝতে আর বাকি রইল না – বাংলায় আর কখনওই পিন্ডিরাজ চলবে না। রাওয়ালপিন্ডির খানশাহী-পাঞ্জাবীশাহী বাংলায় চিরতরে খতম হয়ে গেছে। বাঙালি জনসংখ্যায় মেজরিটি। ভোটে মেজরিটি। ম্যান্ডেটে মেজরিটি। এই মেজরিটি মুজিবের হাত ধরে পাকিস্তানকে গ্রাস করতে যাচ্ছে। পশ্চিমা-শরাবী শাহী বিত্তবিলাস মুজিবের অঙ্গুলি হেলনে খান খান হয়ে যাবে। তুলোর মত ছিন্নভিন্ন হবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের জমিনদার রাজ। দাসপ্রথা থাকবে না। গরীব আর জমিনদারদের দাস হয়ে থাকবে না। সব পশ্চিম পাকিস্তানি আজাদ হয়ে যাবে। মুজিব একবার রাওয়ালপিন্ডিতে বসতে পারলে সবার আগে সব দাসদের আজাদ করে দেবে। বাঙালি বড় ভয়ংকর জাত। ওরা মুক্তিতে বিশ্বাস করে। গোলামিতে বিশ্বাস করে না। পশ্চিম পাকিস্তানি জনগনকে জমিনদারি গোলাম বানিয়ে জন্নাতি বালাখানা উপভোগ করছিল তারা। টুঙ্গিপাড়ার প্রত্যন্ত গাঁওগেরাম থেকে উঠে আসা শেখ মুজিব সব লন্ডভন্ড করে প্রতিটা মানুষকে গোলাম থেকে আজাদ করবে – ভুট্টো কেমন করে সেটা সহ্য করে। সেও ভবিষ্যতকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। মুজিবের প্রতিটা পদক্ষেপ সে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করতে পারছে। এই নেজামী-গোলামী ফকিরজাদা দিয়ে কোন কাজ হবে না। এইসব গোলাম-পুত ফেউ ছাড়া কিছু নয়। ধর্মের নামে ফৌজী পদলেহন করে ওরা একটু আমিরী পেতে চায়।

ভুট্টো তাই কাউকে কিছু বুঝতে দিল না। নিখিল পাকিস্তানকে মুজিব-মুক্ত রেখে কেমন করে অন্তত: পশ্চিম পাকিস্তানে জগদ্দল বান্দারাজ ও বান্দিরাজ কায়েম রাখা যায় – ভুট্টো তার জুলফিকার মগজ-মস্তিষ্ক সেই লক্ষ্যেই শানাতে লাগল। অখন্ড পাকিস্তান রক্ষার ধুয়াটা মুখে রাখল বটে – তার চেয়ে বেশী মনোযোগ দিল এই মওকায় পশ্চিম পাকিস্তানীদের মুখ্য নেতা হতে। শরাব-ধর্ম-অধর্ম – কোন কিছুতেই তার অরুচি নেই। সুকৌশলে পশ্চিম পাকিস্তানি ভূস্বামী-জমিনদার আর বাইশ কোটিপতি পরিবারের মোক্ষম স্বার্থ নিয়ে সে অগ্রসর হতে লাগল।

গোলাম-নেজামীচক্র পিন্ডির নয়া মৌঁতাতে নেশা নেশা আবহাওয়ায় বেশ নেশাতুর হয়ে উঠল । গোলামের সে কি ছোটাছুটি। কখনও টিক্কার দরবারে গিয়ে সাষ্টাঙ্গে সিজদা ঠুকছে। কখনও করাচি-পিন্ডি লাহোর। ইয়াহিয়ার পেয়ালায় তারা ঢেলে দিতে লাগল ধর্ম-সুরা। পাকিস্তানের এবং পূর্বপাকিস্তানের মসনদের পদলেহনের সূবর্ন মওকা তারা পেয়েছে। এ সুযোগ কেমনে হাতছাড়া করে! তাদের ইমান-আমল-ধর্মবিশ্বাস আদতে ছিলই না। ধর্মকে তারা জিম্মি করল। ধর্মের নামে তাদের হারাম-নাজায়েজ-মালাউন সব বে-দাতি চিন্তা ভাবনা-ষড়যন্ত্র পিন্ডির পেয়ালায় ঢেলে দিতে লাগল। ইয়াহিয়ার শরাবীখানায় নর্ত্তকী-নাচনেওয়ালী-ফিল্মী স্টাররা ছিল। পিপের পর পিপে ভর্তি শরাব ছিল। কিন্তু সেই পিপেতে ধর্ম-মদ ছিল না। গোলাম চক্র তাদেরকে নতুন স্বাদ দিল। পিপেতে অকাতরে ঢেলে দিতে লাগল ধর্মমদ। বললো, এটাই হচ্ছে শরাবান তহুরা। পবিত্র জান্নাতি শরাব। এটা পান জায়েজ। এটা পান করে ধর্ষণ, খুন-খারাবি-বলাৎকার সব জায়েজ। পবিত্র ধর্মকে চুড়ান্ত অসম্মান-অপমান করে গোলাম চক্র মেতে উঠল ধর্ম ধর্ম খেলায়। এই খেলায় কয়েক যুগ ধরে তারা হাত পাকিয়েছে। একাজে তারা সিদ্ধ হস্ত।

নতুন মদমত্ততায় ইয়াহিয়াদের উল্লাস দেখে কে! ধরাকে সরা জ্ঞান করতে লাগল। এরকম দু-দশটা গোলামপুত্র বাঙালি পেলেই ঢের। এদের ইন্ধনেই সব অপকর্ম জায়েজ করা যাবে। ফৌজীশালায় ছোটবড় সকল সিপাহসালারই মশহুর শরাবী। নারী-সংসর্গেরও জন্য তারা সদা-মশগুল। ধর্মে মতি কখনওই তাদের ছিল না। হা হা হা,গোলামচক্র এখন ধর্মরক্ষার সার্টিফিকেটও যখন তাদের দিতে চায় – ওদের আনন্দ আর ধরে না। ধর্মকে ব্যবসায়ের মহামূল্যবান মাল করেছে গোলামরা।এটা করে তারা মালামাল হতে চায়। বেশী কিছু তাদের চাই না। পিন্ডির পানশালার ছড়ানো ছিটানো রক্তমাংস আর পূর্ব-পাকিস্তানের মওকা-লোটি-আমিরীর একটু হিস্যা পেলেই গোলাম-আব্বাসরা মহানন্দে গদ গদ। ধর্মের জাহান্নুমি ঠিকাদারি নিয়েছে তারা। এজন্য হারাম ফৌজীশালার জেনারেলরা যে ফতোয়াই চাইছে না কেন – তারা সে ফতোয়া বানিয়ে অকাতরে বিলাতে প্রস্তুত।

উল্লাসে ফেটে পড়ে ফৌজী-টিক্কারা জানতে চাইল, ওহে গোলাম, তুমি না বাঙালি। তোমার মা-বোন যদি ফৌজীদের শিবিরে ভোগ্যা হয়, তখন তোমার ফতোয়া কি হবে!

গোলামও মাথা দুলিয়ে হাসে। বলে, আমি বাঙালি না। আমি সাচ্চা পাকিস্তানি। বাঙালি নারী-কন্যাজায়াজননী আমার কেউ না। ওরা হারাম জেনানা। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে মুজিবকে ভোট দিয়েছে ওরা। সবগুলো নাপাক আওরত। ফৌজীদের হাতে এই নাপাক-নাজায়েজ আওরতে বাঙালরা ভোগ্যা হলে তারা গনিমতের মাল হিসেবে জায়েজ হয়ে যাবে।

ফৌজীরা খুব খুশ। পূর্ব পাকিস্তান হারাম-শাহীর দুখানা উজিরি গোলাম-এ-ইয়াহিয়ার জন্য বরাদ্দ হয়ে গেল। গোলাম বলল, মর্দে পাকিস্তানি জাত পয়দা করতে হবে। পাকিস্তান আদর্শ রক্ষা তহবিল তৈরী করে সে খয়রাতবাজি করতে লাগল। দুবাই , কাতার কুয়েত সৌদী আরব মিডল ইস্টে খয়রাতবাজি করে মশহুর হল। আরবরা চিনল মিসকিনে পাকিস্তানিদের। তাতে কি! গোলামের মস্তিষ্কে আইয়ামে জাহিলিয়তি প্লানপ্রোগ্রাম। টিক্কা পেল তার ইন্ধন। বললো, বাঙালিরা মুসলমানই নয়। আধা হিন্দু আধা মুসলমান। এই নাপাক জাতটাকে মুসলমানি করাতে হবে। ইবলিশ ইয়াহিয়া ঘোষনা দিয়েছিল ২৫ শে মার্চ পার্লামেন্ট বসবে। সে ছিল লোক দেখানো, মানুষ ভুলানো বাতচিত।

টিক্কা কসাই নিল অন্য প্রস্তুতি। বেলুচিস্তানে সে তার কসাইগিরির ভীতি-ভয়ংকর মকশো করে এসেছে। হাজার হাজার বালুচিকে হত্যা করেছে সে। দানব চেহারা। মস্তিষ্কে কেবল হত্যার নৃশংস নেশা। বালুচি-কতলে ফৌজীশালায় দারুন নামযশ। তাকে কসাই বললে সে বড্ড খুশ হয়।

২৫শে মার্চ গোলাম-এ পাকিস্তানির আস্তানায় হিংস্র উল্লাস।এই বার মুজিব খতম হবেই। বাঙালির খতমে জানাজাও হবে। মধ্যরাতে খতমে জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে গোলাম বললো, পাকিস্তান পায়েন্দাবাদ। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ মুর্দাবাদ। শেখ মুজিব মুর্দাবাদ।

ঢাকা শহর তখন অন্ধকার। ভয়ংকর আঁধার নেমেছে রাস্তায় রাস্তায়। ক্যান্টনমেন্টে ফৌজীশালায় বসে টিক্কা খান অবিরাম গর্জন করে যাচ্ছে। বুনো মোষের মত গজরাচ্ছে সে। মুজিবকে খতম করা চাই । শেখ মুজিবকা জান চাহিয়ে। বাঙাল লোগোকো জান চাহিয়ে। খুন চাহিয়ে। পূর্ব পাকিস্তান কা মিট্টি চাহিয়ে। ইয়ে মিট্টিমে সাচ্চা পাকিস্তানি পয়দা করেঙ্গা। অ্যাকশন। অ্যাকশন। টিক্কা অবিরাম চেঁচিয়েই চলেছে। তার বিশাল কক্ষের মধ্যে সে হাঁটছে। লেফট রাইট লেফট রাইট। সেই সঙ্গে অট্ট-চিৎকার। তার সঙ্গে ছিল এক সেপাই। হঠাৎ টিক্কা খান সেপাইটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নাক বরাবর ঘুষির পর ঘুষি মারতে লাগল। মুষ্ঠির পর মুষ্ঠাঘাত। টিক্কা থামছে না। নাক চোখ ফেটে সেপাইটা প্রচন্ড আহত। তারপরও পালিয়ে যাচ্ছে না। টিক্কার এই কসাই প্রবৃত্তি তার জানা। টিক্কা এভাবে তাকে রক্তাক্ত করে যাবে। কিন্তু তাকে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুষি খেয়ে যেতে হবে – যতক্ষণ না টিক্কা নিজে থামবে। সেটাই ফৌজী-রেওয়াজ। টিক্কার নিজস্ব-রেওয়াজ। সেপাইটা বেলুচি। রক্তে সারা শরীর ভিজে একাকার । মরেই যাবে এমন দশা। অবশেষে টিক্কা ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ল। আরেক সেপাই এসে তার রক্তমাখা হাত তোয়ালে দিয়ে মুছে দিয়ে গেল। তার হাতে এক গ্লাস শরাব ধরিয়ে দেয়া হল। টিক্কা গ্লাস ভর্তি খুন দেখে আনন্দে আটখানা হয়ে উঠল। তার পর পেগের পর পেগ পান করতে লাগল। ঔর এক পেয়ালা খুন লে আও। ঔর এক পেয়ালা। মেরা দিল খুশ কর দো। মার্চ! মার্চ! বাঙ্গাল লোগো কো খুন পি লো।

আহত সেপাইটা মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েছে। শব্দহীনভাবে কাতরাচ্ছে। হঠাৎ তার গোঙাণির আওয়াজ হল। নিজেকে সামলাতে পারল না। গোঙানির আওয়াজ টিক্কার কানে যেতেই ছুটে গিয়ে মৃতপ্রায় লোকটাকে অবিরাম লাথি দিতে লাগল। হারামজাদা! আওয়াজ করছে! হারামজাদাকো খুন কর দো।

গোলাম-এ পাকিস্তানি অবশ্য মদ খায় না। সে মদ্যপ নয়। সন্ধ্যার পর থেকেই সে ছিল অপেক্ষায়। আজকেই খতম-শরীফ শুরু হবে। কখন যে শুভারম্ভ!

সময় আর কাটতেই চাইছিল না। হঠাৎ সারা নগরী জুড়ে অবিরাম গুলি। কামান, মর্টারের গোলার ভীতিপ্রদ শব্দ। মুশলধারায় বৃষ্টির মত গুলি ও বজ্রপাতের অবিরাম শব্দ হচ্ছে। গোলাম তখন গুটি কয়েক নেতাকর্মী ও সন্তানদের নিয়ে উল্লাসে মত্ত। এক কর্মী মুজিবের সাদাকালো ছবি অলা একটা পোস্টার এনেছে। গোলাম গং সেটি পায়ে মারাতে লাগল। পাড়িয়েই যাচ্ছে। টিক্কা লাত্থির পর লাত্থি দিচ্ছিল তারই অধস্তন সৈনিককে। আর গোলাম পদাঘাত করলো মুজিবের ছবিতে। তার চোখমুখ ফুটে বেরুচ্ছে ঘৃন্য-হিংস্র রুপ। তারপরও অসম্ভব খুশি সে। গুলির শব্দ যত তীব্র হচ্ছিল – গোলাম তার হালাল-জেনানাকে ডেকে বললো, আজকের রাত বড় পবিত্র। লাইলাতুল শরীফ। তোমার বড় ছাওয়ালের শাদী মুবারক করাবো এই রাতে। এই রাত উৎসবের। এই রাত পাকিস্তানের আজাদী রক্ষার। এখন থেকে গোলাম ফেমিলির আনন্দ গুলজার হবে এই লাইলাতুল খতম-এ।

গোলাম মাথায় জিন্নাহ টুপি চড়িয়ে তার ডায়েরী খুলে বসল। খুঁজতে লাগল লাল কালি। আজকের রাতটা আক্ষরিক অর্থেই লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে দুছত্র লিখে রাখতে চায় সে। গোলাম লিখল, পাকিস্তানকা আজাদী জিন্দা রহে। পূর্ব পাকিস্তান ভি জিন্দা রহে। শুকর আলহামদুলিল্লাহ। এট লাস্ট জেনারেল টিক্কা খান সেভড দি নেশন। লং লিভ পাকিস্তান। পাকিস্তান পায়েন্দাবাদ।

নিজের লেখা দুছত্র উর্দু বার বার পড়ছে। গোলাম লেখাপড়া শুরু করেছিল মাদ্রাসায়। তাই এখনও উর্দু লিখতে পারে সে। উর্দু ভাষাটা বড় মিষ্টি। কী শরীফ জবান! আহা! সবাই যদি উর্দু জবানে বাতচিৎ করতে পারত। মালাউনি জবান বাংলা। পুরো কওমকে উর্দু জবান না শেখানো গেলে বড় মুশকিল। গোলাম-এ-পাকিস্তানি খুব চেষ্টা করল – উর্দুতে ভাবনাচিন্তা করতে। পারল না। চিন্তাগুলো বার বারই হারামী বাংলায় হয়ে যাচ্ছে। ছি! সে উর্দুতে বড্ড কমজোর। তওবা! তওবা! ডায়রিতে বড় বড় উর্দু হরফে গোলাম লিখল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। জিও জিন্দা-পাকিস্তান। বুকের মধ্যে চেপে ধরে রাখল ডায়েরীখানা। অনেকক্ষণ ধরে।

বাবাকে খতম করার নানা চক্রান্তই হচ্ছিল। বাবা যে টের পাচ্ছিলেন না, তাও নয়। বাবার যারা একান্ত কাছের রাজনৈতিক সঙ্গী তারাও বিপদের গন্ধ বেশ টের পাচ্ছিলেন। আত্মীয়-পরিজন-আম্মা- হাসিনা সবাই ছিলেন উদ্বিগ্ন। বাবা পিন্ডির চরম চক্ষুশূল। বাংলাদেশ ও বাঙালির লড়াইয়ে মধ্যমনি হওয়াই তার কাল হয়েছে। সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করে কোন লাভ হয় নি। আসাদকে হত্যা করেও ভয় খাওয়ানো যায় নি। খতমের রাস্তা থেকে ফৌজী-বুদ্ধিরও নিস্তার নেই। তাদের চিন্তাচেতনা এক চোখা। খতম করে দিলেই শত্রুতা চুকেবুকে গেল। এই গাড়লনীতিতে আবার ঘি ঢালছে গোলাম-খুনে চক্র। নানা জায়গা থেকে উড়ো খবর আসছিল রাওয়ালপিন্ডি খতম অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাঞ্জাবী ফৌজ ধীরে ধীরে মোতায়েন হচ্ছিল। বাঙালি যাতে টের না পায়, সেজন্য ইয়াহিয়ার নাটকবাজিও চলছিল। বাংলা কার্যত অচল, স্থবির। পিন্ডির পান্ডাবাজি এখানে চলছে না। অসহযোগ কেবল অসহযোগ। মওলানা ভাসানীও পল্টনে খতমে পাকিস্তানের অন্তিম দোয়া পড়ে দিলেন। বললেন, ইয়াহিয়া, অনেক হয়েছে। আর নয়। লা কুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়া দ্বীন। তিক্ততা আর বাড়াইও না। মুজিবরের নির্দেশ মানিয়া লও। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও। খামকা মুজিবকে অবিশ্বাস করিও না। মুজিবকে আমি ভাল করিয়া চিনি। ২৫ তারিখের মধ্যে মুজিবরের অর্ডার মত কাজ না করিলে আমিও মুজিবরের সঙ্গে হাত মিলাইয়া বাহান্ন সালের মত তুমুল আন্দোলন শুরু করিব।

ইয়াহিয়া-টিক্কা-ভুট্টো-গোলামের যথাবুদ্ধি। তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হল না। মওলানা কোনদিকে পানি গড়াচ্ছে – দিব্য দেখতে পেলেন। হুঁশিয়ারও করলেন। কিন্তু ইবলিশ-ইয়াহিয়ার হুশ হল না। বেলুচিস্তানের কসাই-নিশানে পাকিস্তান টিক্কাকে পাঠিয়েছে সে বাঙালি শায়েস্তা করতে। গোলামরাও আছে সঙ্গে। জেনারেল রানীর সঙ্গে সারারাত মৌঁতাত করে স্ফুর্তির সে তুঙ্গে। বাংলার পাকিস্তানিকনের স্বপ্নে সে বেহুশ।

স্কুলকলেজ মাদ্রাসা বন্ধ হতে লাগল। অফিস আদালতে পিন্ডির অর্ডার চলছে না। ব্যাঙ্কবীমাও স্বতস্ফুর্তভাবে অসহযোগিতা করতে লাগল। বাংলা জুড়ে স্বাধীকারের তীব্র তেজ। ইয়াহিয়া, ভুট্টোর নষ্টামির শেষ নেই। তারা নানা সংলাপ-বৈঠক চালিয়ে যেতে লাগল। বাবাকে বিপজ্জনক রজ্জুপথে হাঁটতে হচ্ছে। তার প্রানসংশয় নিয়ে অনেকেই তাকে হুশিয়ার করছেন। কিন্তু তিনি নিজের ব্যাপারটা মোটেই ভাবছেন না। আম্মাও ভয়ংকর বিপদের আশঙ্কা টের পাচ্ছিলেন। বাবাকে তিনি বললেন, ইয়াহিয়ার এই সংলাপ-সমঝোতা সবই ভাওতাবাজি। সবই ভন্ডামি। ইয়াহিয়া তোর বাপকে বোকা বানানোর চক্রান্ত করছে। সে মওকা খুঁজছে। মওকা পেলেই সে মিলিটারি দিয়ে তোর বাপকে হত্যা করবে। আইয়ুব বারংবার চেষ্টা করে যা পারে নি। ইয়াহিয়া সেই তালই খুঁজতেছে।

বাবার বুঝতে মোটেই বাকি রইল না – তাকে ঘিরে, বাংলাকে ঘিরে খতম-ব্যুহ তৈরী করছে পিন্ডি। তারা শেষ মরন-মারন কামড়টা দেবে। বাঙালিরও সর্বাত্মক প্রস্তুতি দরকার। খবর আসছিল – প্লেনে ও জাহাজে কওে করাচি থেকে অস্ত্র গোলা বারুদ আসছিল। চট্টগ্রামে খালাস হচ্ছে। তেজগাঁও এরোড্রামে অস্ত্র খালাস করে ক্যান্টনমেন্টে নেয়া হচ্ছে। বাঙালি কোন বাধাঁই মানছে না। চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র খালাসে বিদ্রোহ করে বসল বন্দরশ্রমিক-কর্মচারিরা। শ্রমিকদের এই তুমুল সাহস বাঙালি সেনাদের উজ্জিবীত করল। পিন্ডির খতমের প্রস্তুতির বিরুদ্ধে বাঙালিও ঘুম ভাঙা গানে নব জাগরণে উদ্দীপ্ত। দিকে মুজিবের আওয়াজ – এবারের সংগ্রাম,স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। শৃঙ্খল ভাঙার এই বজ্রঘোষনা সারা বাংলায় প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়ে দিল। স্বাধীন বাংলার পতাকাও তৈরী হয়ে গেল। শিব লাল বানাল সেই রক্তের আখরের লাল সবুজ পতাকা। সেটির মাঝখানে সোনায় অঙ্কিত বাংলাদেশের মানচিত্র। পতাকাটি মানুষের কাছে যেতেই চুম্বন আর চুম্বন।

ইয়াহিয়ার কাজ ইয়াহিয়া করল। ইবলিশের কাজ ইবলিশই করল। ২৫ শে মার্চেও গভীর রাতে সব ভন্ডামি-শঠতা-শয়তানির অবগুন্ঠণ ভেঙে সে শয়তানুল আজিমের চেহারায় ভয়ংকর হয়ে উঠল। মধ্যরাতে তার ডাল কুত্তারা নেমে পড়েছে সারা ঢাকায়। বাঙালি নিরস্ত্র। ফৌজী-ডালকুত্তারা রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়াতে লাগল। ছুটছে আর ছুটছে। রক্তপায়ী জিহ্বা ব্যাদান করে ছুটছে। গুলির পর গুলি ছুড়ছে। মর্টার কামান দাগছে। যাকেই পাচ্ছে খুন করতে লাগল। হায়েনার মত হিংস্র বাহিনী। হত্যা আর হত্যা। রক্ত আর রক্ত। লাশ আর লাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে গুলির বন্যা বইয়ে দিল। হলে যাকেই পেয়েছে – খুন করল। পঁচিশের সেই রাত ভয়ংকর বিভীষিকা। সে রাত ভয়ংকর দু:স্বপ্ন। হাসিনার চোখের সামনে সেই বিভীষিকার নানা চিত্র ভেসে উঠছে। কেমন করে সেইসব দিন তিনি ভুলবেন। ট্যাংক নিয়ে হায়েনারা এগুচ্ছে। পিচঢালা রাস্তা গুড়িয়ে দিচ্ছে। লাশের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছে চাকা। থেঁতলে যাচ্ছে মানুষ। আর্তনাদ আর অর্তনাদ। কান্না আর কান্না। মধ্যরাতে ঢাকা গুলি হত্যা আর আহাজারিতে বিপন্ন বিভৎস শহর হয়ে উঠেছিল। ফৌজীশালা থেকে ডালকুত্তা-নেকড়ে-হায়েনার দল সারা ঢাকায় খুন আর রক্তপাতের উৎসব বইয়ে দিল। তারা খুঁজছে বাঙালিদের। হত্যা করছে। খুঁজছে শেখ মুজিবকে। টিক্কা-ইয়াহিয়ার জঙ্গী-ফরমান তাদের হাতে। খতম কর সবাইকে। খতম করো মুজিবকে।

বাবা সেদিন পালিয়ে যান নি। তিনি ছিলেন গম্ভীর-অচঞ্চল-মৌনধ্যানী। মৃত্যুর আতঙ্ক তাকে এক মুহুর্তেরও জন্য কাবু করতে পারে নি। অনেকেই তাকে আত্মগোপন করার পরামর্শ দিয়েছিল। পলায়ন তো কাপুরুষের। ভীরুর। তিনি কেন পালাবেন। কার ভয়ে আত্মগোপণ করবেন। বাবার চিন্তা ছিল পরিষ্কার এবং স্বচ্ছ। তিনি স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের বজ্রঘোষনা দিয়েছেন মহাজনতার সামনে দাঁড়িয়ে। লুকিয়ে গোপন স্থান থেকে দেন নি। লাখোকোটি বাঙালির সামনে মহাবীর কন্ঠে বলেছেন, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। যা ও যা কিছু আছে। তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।

তিনি জনগনদেবতার সামনে দাঁড়িয়েই দিয়েছেন এই অমোঘ হুকুম। তিনি আত্মগোপন কেন করবেন। প্রকাশ্যে বীরদর্পে জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের হুকুম দিয়ে তিনি অঅত্মগোপণ করে কেন আত্মরক্ষার কাপুরুষ পথ বেছে নেবেন। মরন তো হবে একবারই। মৃত্যু যদি আসে, ফাসিঁর কাষ্ঠে যদি ইয়াহিয়া ঝোলায় – যদি হায়েনা ডালকুত্তারা তাকে মধ্যরাতে বত্রিশ নম্বর বাড়িতেই গুলি করে মারে – তিনি ভয় পাওয়ার মানুষ নন। ভীরু কাপুরুষ নেতার ঔরসে কখনওই সাহসী জাতির জন্ম হতে পারে না। বাঙালির মুক্তির জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি মরণকে হাসিমুখে বরণ করে নেবেন। তার শরীর যদি গুলিতে ঝাঁঝড়া হয় – হোক – তবুও বাঙালি মুক্তি পাক। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। বাবা ফরমান তো দিয়েছেনই – মনে রাখবা, রক্ত যখন দিতে শিখেছি, রক্ত আরও দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।

বাবা পাত্তাই দেন নি হায়েনাদের। ওরা যদি মুজিবকে হত্যা করে লাখো কোটি মুজিবের জন্ম হবে সেই মৃত্যুতে। কত মানুষকে হত্যা করবে ওরা। বাহান্ন থেকেই ওরা অবিরাম রক্ত ঝরিয়ে চলেছে। জব্বার, সালাম বরকতের রক্ত ওরা পান করেছে। আসাদ-জহুরুলের রক্ত আকন্ঠ পান করেও স্বাদ মেটে নি। এবার যদি মুজিবের রক্ত পান করতে চায় – মুজিব নি:শঙ্ক। নির্ভিক। মুজিবের রক্তেই লেখা হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাবা তার একান্ত নিজস্ব কথাগুলো হাসুকে বলতেন। খুব আবেগ আক্রান্ত হয়ে পড়তেন তখন। হাসিনাও নিজেকে সামলাতে পারতেন না। তার দুচোখ ভরে উঠত অনিরুদ্ধ জলে।

সেইসব দিন ছবির মত ভেসে উঠছে চোখের সামনে।

ইয়াহিয়া রক্তপানের ভয় দেখিয়ে বাঙালিতে দমন ও খতম করতে চেয়েছিল। আর বাবা বাঙালির মুক্তির জন্য তার নিজদেহের তাজা রক্ত ঢেলে মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ দিয়েই ইয়াহিয়ার রক্তপিপাসা চিরতরে মিটিয়ে দেয়ার শপথ নিয়েছিলেন।

কি হয়েছে সেই বাবার!বেঁচে আছেন তো তিনি! হুমায়ুনচাচা, চাচী, বাড়ির অন্য মানুষগুলোর এই ভয়ংকর নীরবতা কিছুতেই সহ্য করা যাচ্ছে না। কি হয়েছে ঢাকায়! পাকিস্তানি রক্তচোষা হায়েনারা কি আবার হামলা করেছে। সে কি করে সম্ভব। তবে কি রাজাকার আলবদর আলশামস ওরা হামলা করেছে বাবার ওপর! গোলামে পাকিস্তানের পান্ডা-গুন্ডারা দেশ ছেড়ে কখনওই যায় নি! নিজামী-সাউদী কসাই কাদের মোল্লা – ঘাপটি মেরে ছিল দেশের মধ্যেই। আব্বা মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমাশীল। তার দয়ার শরীরই কি তবে কাল হল। নানা আশঙ্কা কুডাক দিচ্ছে হাসুর মনের মধ্যে। কতভাবেই না সাবধান করা হচ্ছিল বাবাকে। তিনি কি শুনবার লোক। শিশুর মত সরল হাসিতে বলতেন, বল না, ওরা যাবে কোথায়!

কাউকে খতম কোন সমাধান নয়। খতম-হত্যা হচ্ছে উগ্রপন্থী নকশালিস্টদের কাজ। আলবদর আলশামসদের কাজ। আমি জনগন-জনমানুষকে নিয়ে কাজ করি। সবাইকে যাতে মানুষ হিসেবে বাঁচার রাস্তা করে দেয়া যায় – সেই লক্ষ্যেই আমরা এগোচ্ছি। আমি জীবনের গান গাই। খতম-মৃত্যুকারবারী আমি নই। ক্ষমাই তো মানুষের মহত্ত্ব। ওদের প্রতি যদি আমি দয়া না করতাম, ক্ষমা না করতাম, মুক্তিবাহিনী সেই কবে ওদের পিষে মারত। সারা বাংলায় তাদের হাড্ডিগুড্ডিও খুঁজে পাওয়া যেত না। কাউকে খতমের হুকুম আমি দেই নাই। এই বাংলায় যারা আছে – বাঙালি-বিহারী- সবাইকে সুরক্ষার অর্ডার দিয়েছি। সাড়ে সাতকোটি মানুষ আমাকে বন্ধু মেনেছে বলেই কেউ ভাই, কেউ বাবা, কেউ বঙ্গবন্ধু বলে সম্বোধন করে। তাই বলে বাংলায় যে বাঙালির শত্রু নাই তা বলি না। আছে। গুটিকতক আছে। ঘাপটি মেরে আছে। গর্তে খোঁড়লে আছে। রাজাকার আলবদর আলশামস যারা হত্যা, লুট, ধর্ষণ করেছে – দেশে আইন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আইন তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেবে। রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক গতিতে শাস্তি দেবে। তাই বলে কেউ আইন হাতে তুলে নেবে, তা হবে না। শান্তি-শৃঙ্খলা পূন:প্রতিষ্ঠা কাজটা সহজ নয়। সময় লাগবে। তারপর একদিন ইউরোপ আমেরিকা-উন্নত বিশ্বের মত আইন শৃঙ্খলা বাংলাদেশেও নিশ্চিত হবে। কয়েকটা বছর হাতে যদি সময় পাই, ইনশাল্লাহ – সেই লক্ষ্য হাসিল করবোই। কে শত্রুতা করেছে – প্রতিশোধ নয় – হিংসা নয় – ওদেরকে মানুষ হওয়ার সুযোগ দিয়েছি। আমি সবসময় আশাবাদী মানুষ। ওরা মানুষ হবে আশা করি। তারপরও যদি মানুষ হওয়ার এই সুযোগ ওরা কাজে না লাগায়, স্বাধীন দেশে আলবদর ও আলশামসগিরি করে বেড়ায়, খুনখারাপি করে, উগ্রতা করে – আমার আর হুকুম দেয়া লাগবে না – একদিন বাংলার মাটিতে ওদের চিরকবর রচনা হবেই। বাংলার ছাত্রজনতা শ্রমিক কৃষক-মজুর-শিশু-কিশোরযুবক-বৃদ্ধকে আমি চিনি। বাঙালিকে আমি চিনি। ওরা মানুষ না হলে একদিন ওদের ফাসিঁকাষ্ঠে ঝোলানো হবেই। বাঙালি বড় ক্ষমাশীল জাতি। দয়াশীল; সকলের হৃদয়ভর্তি মায়ামমতা ভালবাসা। কিন্তু যখন ফুঁসে ওঠে – তখন বাঙালি প্রলয়ংকরী কম নয়।

বাবা সবই টের পাচ্ছিলেন। দেশে বিদেশে বন্ধু তার কম নয়।

বিশ্বেও সব সংগ্রামী নেতা – গনমানুষের নেতার সঙ্গে তার গভীর হৃদ্যতা ছিল। সব খবরই পাচ্ছিলেন। গোলামে পাকিস্তানি আর স্বাধীন বাংলাদেশে থাকার সাহস নিজে থেকে দেখায় নাই। তার পাপের বস্তা দোজখের চেয়েও ভারী হয়ে পড়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ কখনওই সে মেনে নেয় নি। পাকিস্তানেই পিন্ডির সেবাদাস হয়ে গুজরান করছিল। সে এখন খুব ছুটছে। বখতিয়ারের পাগলা ঘোড়ার মত ছুটছে। পিন্ডির এজেন্ডা নিয়ে অনেকদিন লন্ডনে পালিয়ে ছিল। সেখান থেকে মিডলইস্টে ধর্না দিয়ে বেড়াচ্ছিল। গোলাম পাকিস্তান রক্ষা তহবিল করে অজস্র টাকা পয়সা বানিয়েছে। এত পাপ, এত হত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা করেও তার পাপাত্মা শান্ত হয় নাই। এখনও সৌদী আরব, কুয়েত-কাতার-মিডল ইস্টে দৌড়ঝাঁপ করে বাংলাদেশ বিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ যাতে আরবদের স্বীকৃতি না পায় – সেজন্য আরব বাদশা , আমীর ও শেখদের দরবারে ধর্না দিচ্ছে। পাকিস্তানি এজেন্ডা নিয়ে পেট্রোডলার যোগাড় করেছে কম নয়। তা দিয়ে লন্ডনে নিজ পরিবার-সন্তানদের ব্যাবসা বানিজ্য করে দিয়েছে। লন্ডনে বসে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচার প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। বাংলাদেশকে আরববিশ্ব যাতে সাহায্য সহযোগিতা না করে , সেজন্য জোরদার লবিং করছে। আরব শেখদের গিয়ে হাতপা ধরে বোঝাচ্ছে – বাংলাদেশ স্বাধীন হয় নাই। সেখানে হিন্দুস্থানী দখলদারি কায়েম হয়েছে। মানুষ নাকি পাকিস্তানকে চায়। তাই মুজিব আর হিন্দুস্থানি দখলদারদের খতম করার জোর কোশেশ চলতেছে। হিন্দুস্থানি দখলের বিরুদ্ধে জেহাদের ডাক দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকে আরবরা স্বীকৃতি দিলে সব কোশেশ পন্ড হয়ে যাবে। (চলবে…)

অলংকরণ: শিল্পী শাহাবুদ্দিন ও উত্তম সেন

Channel-i-Tv-Live-Motiom

শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

অযু করার সময় বজ্রপাতে মাদ্রাসার ৩ ছাত্র নিহত

জুন ২১, ২০২৬

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব ভৈরবের নতুন কমিটি, পরিবেশ রক্ষায় কর্মপরিকল্পনা

জুন ২১, ২০২৬

শাইখ সিরাজের সাথে ইরির বাংলাদেশ প্রধানের সাক্ষাত

জুন ২১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বিদেশগামীদের দক্ষ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী

জুন ২১, ২০২৬

প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জুন ২১, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT