চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
  • আরও
    • কর্পোরেট নিউজ
    • কৃষি
    • তথ্যপ্রযুক্তি
    • মতামত
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবা (পর্ব: চৌদ্দ)

মিলন ফারাবী মিলন ফারাবী
১২:৪৯ অপরাহ্ণ ১৬, মে ২০১৬
অন্যান্য, শিল্প সাহিত্য
A A

স্বাধীন বাংলাদেশকে খতম করার সবরকম ষড়যন্ত্র করে চলেছে গোলাম। খতম, ধর্ষণ-হত্যা-লুট আর খয়রাতবাজি ছাড়া কিছু বোঝে না সে। ধর্মের নামে লুট-খতম-খয়রাতবাজি – গোলাম বড় ধুরন্ধর আর মহাশয়তান। এখন গোলাম নতুন চাল-চতুরবাজি করছে। আরবদের ভজাতে তার মাথায় অনেক আগে থেকেই ঘোঁট পাকাচ্ছিল একটা মাস্টারপ্লান। এটির অবশ্যই মাস্টারমাইন্ড মদুদি। সেই বলেছিল, বিপদে পড়লে করবে সামাজিক ব্যবসা। সোশ্যাল বিজনেস। এটাকেই ঢাল বানাবে। তার আড়ালেই চলবে তোমার পলিটিক্স। মদুদি সুরসিকও ছিল বটে। পলিটিক্স শব্দটাকে বেশিরভাগ সময় বলত পলিট্রিকস। প্রথম প্রথম গোলাম ভাবত, সেকি ভুল শুনছে। হুজুরে আলা তো ইংরেজিতেও মাশাল্লাহ। তার তো ভুল করবার কথা নয়। একবার কথাচ্ছলে ভুলটা ধরিয়ে দিতে বলেছিল, হুজুর, পলিট্রিক্স নাকি পলিটিক্স?

মদুদির মজলিসে শূরায় তার ফরাশখানার ওপর সবসময় থাকে রুপার মনোহর পানদানি আর পিকদানি। পিকদানিটা বেশ বড়। সে পিচকি মেরে পানের পিক ফেলল সেখানে। বেশ খানিকটা ছিটকেও গেল চারপাশে। মুখ মুছে সে বলল, যাহাই পলিটিক্স কহ তোমরা – তাহাই আমি কহি পলিট্রিক্স। পলিটিক্স শব্দটা মুখে রাখবা। সব সময় বলবা জনসমক্ষে। আর বাস্তবিক মনে মনে পলিট্রিক্স করবা। পলিট্রিক্স না করলে এই মডার্ন জমানায় পলিটিক্সে পাইরা উঠতে পারবা না। মডার্ন দুনিয়ায় অন্য যারা ডেমোক্রেটিক পলিটিক্স করে তাদের হাতে আছে মডার্ন সাইন্স। তারা সেকুলারিজমের কথা বলে সব ধর্মমতের মানুষকে নিয়া আগাইয়া যাইতে চায়। গ্রহ-গ্রহান্তরে যাইতে চায়। কাজ জানলে, জ্ঞান থাকলে কাউকেই ফেলনা ভাবে না। তা সে যে ধর্মেরই হোক। সবাইকে কাজে লাগাইতে চায়। কে মুসলমান, কে মলাউন, কে ইয়াহুদি-নাসারা-খেরেস্তান-সেটা বিচার বিবেচনা করে না। মডার্ন গভর্নমেন্ট সকলের গুনের কদর করে। কওম মিল্লাত রিলিজিয়ন দেখে না। সাইয়েনটিস্ট সে জাতে হারাম ইয়াহুদি হলেও কাজে লাগানো হয়। মডার্ন গভর্নমেন্ট চলে জ্ঞানী-গুনীদের নিয়া। রিলিজিয়ন তাদের কাছে মুখ্য ব্যাপার না। ব্যাপার হইলো কাজ জানো কিনা। তোমার পেটে বিদ্যা-জ্ঞান-বুদ্ধি আছে কিনা।

এই জিনিসের মোকাবেলায় তুমি তোমার পলিটিক্সের পুঁজি বানাইছ ধর্মকে। একটা মাত্র ধর্মকে। তোমার অস্ত্র ধর্ম আছে হাজার খানেকেরও বেশি সময় পেছনে। এটা সেই ধর্ম যেটার তলে এখন আর জ্ঞানীগুণী বলে কিছু নাই। আছে সোনালি অতীত। একসময় তুমি বাদশা ছিলা। নবাব ছিলা। দুনিয়ার ওয়ান থার্ড ছিল আরব জাহানের অধীনে। ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন খোলাফা এন্ড খিলাফত। তুমি এই পুরানা অতীত বেচতে চাও। সেকুলার হিউম্যানিস্টরা – তারা অগ্রসর হইতেছে সামনে। তুমি আছ হাজার বছর পশ্চাতে। তুমি বেচতে চাইতেছ অতীতকে। তাদের টার্গেট হচ্ছে জ্ঞানীগুণী, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। তারা তাদের টার্গেট মজবুত করার জন্য এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়াইতে তৎপর।

Banglabid

উল্টা দিকে তোমার টার্গেট হইতেছে মূর্খ-গর্দভ জনগোষ্ঠী। এরা যত অন্ধ থাকে তত তোমার লাভ। তুমি তাদের মধ্যে ধর্ম ব্যবসা করে তোমার আখের-আখিরাত গুছাইতে চাও। কম্পোজিশনটা তো বুঝতে পারতেছ তো মেরে লাল। তোমার তো বলদ থাকলে চলবে না। তারাও পলিটিক্স করবে, তুমিও পলিটিক্স করবে – না না, তাইলে কিন্তু হবে না। তুমি কেমনে পারবা – তারা তো আরাম আয়েশ, জ্ঞানবিজ্ঞানের সব লোভ দেখাইয়া সবাইরে ভাগাইয়া নিয়া যাবে। বলবে দেশের জন্য দরকার; সব ধর্মের সরকার। তারা বলবে, দেশের জন্য দরকার; জ্ঞান বিজ্ঞানের সরকার।

মদুদি মিচকি মিচকি হাসে। তখন দেখবা মেরে লাল, কিসের ধর্ম; সবাই জাগতিক কর্মের পেছনে ছুটতেছে। লোকজন বলবে, ধর্ম লইয়া তুমি বাতাসা-জিলাপি খাও। তারা বাতাসা খাইতে চায় না।

সেইজন্য বলছিলাম, তোমার পলিটিক্স করলে চলবে না। তোমার করতে হবে পলিট্রিক্স। তোমার সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবসা যেহেতু ধর্ম লইয়া। তুমি ধর্ম লইয়া বাজনা দেবা। এইখানে ভুল করবা না। তারা যদি বলে, সেকুলারিজম মানে হইতেছে – সব ধর্মের মানুষকে এক প্লাটফর্মে এনে দেশ ও জাতিকে আগাইয়া নিয়া যাওয়া। তুমি সেইটা মানবা না। তুমি উল্টা প্রচার-প্রপাগান্ডা চালাবে। তুমি বলবা, সেকুলারিজম মানে কিসের সব ধর্মমত! এইটা কি আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহি। দ্বীন-ই-ইলাহি হারাম নাজায়েজ জিনিস। ওটা মানলে মুসলমানিত্ব থাকে না। মুসলমান কাফির হয়ে যায়। তুমি তোমার লাইনে বোঝাবা, সেকুলারিজম মানে ধর্ম্মহীনতা। নো রিলিজিয়ন। এটা নাস্তিক্য। এটা মালাউনি। এটা কুফরি। তুমি বলবা, মুসলমানের ইজম একটা – মুসলমানিজম। সেকুলারিজম হচ্ছে মুসলমানিজমের শত্রু। তুমি খাইতে বসতে উঠতে ঘুমাইতে খালি মুসলমানিজম টাইনা আনবা। তুমি এডভারটাইজমেন্ট করবা। কমার্শিয়াল সার্ভিস করবা।

Reneta

তুমি যদি তোমার পলিটিক্যাল বিজনেস কায়েম করতে কোনো খুনি বাহিনী কর – রাষ্ট্রে-দেশে দাঙ্গা ফ্যাসাদ ফেতনা ফেনাইয়া তুমি যদি তোমার মওকা হাসিলের কোশেশ কর – তুমি সেই সেই বাহিনীর নাম দেবে বদর বাহিনী। নাম রাখবা আলবদর-আল শামস। পারলে নাম দেবে আল্লাহর দল। এর চাইতে ভাল বিজ্ঞাপন আর হয় না। তুমি ধর্ম্মকে দিয়া মজবুত একশ পার্সেন্ট খাঁটি স্টিলের বর্ম বানাবা। খুন খারাপি ধর্ষণ দাঙ্গা ফ্যাসাদ যত কিছুই করো; কোনো সমস্যা নাই। সব ধর্মের ওপর দিয়ে যাবে। তুমি যে অপকর্মই করো না কেনো – ধর্মের সঙ্গে শরীয়ার সঙ্গে মিলাইয়া তালমিল করিয়া দেবা। সব সময় মনে রাখবা – মূর্খের অহঙ্কার তার পরম মূর্খতায়। সে যখন তার মূর্খতা-মূঢ়তার পক্ষে সমর্থন পাবে – দেখবা, পাগলার আনন্দ তখন দেখে কে। মূর্খ তখনই জ্ঞানের দিকে আগ্রহ দেখাইবে; যখন সে দেখবে জ্ঞান ছাড়া অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন। মূর্খ থেকে বাইচা থাকা অসম্ভব। তুমি যদি তারে এই আস্থা-ঈমান দিতে পার – মূর্খতা কোনো বিষয় না। ওইসব জ্ঞান হইতেছে ইয়াহুদি নাসারাদের বিভ্রম। ওইসব ভালো না। সত্য না। যদি বুঝাইতে পার ফতোয়ার দলিল দস্তাবেজ দিয়া যে, শেষ জমানায় দাজ্জাল আসার কথা রসুলুল্লাহ যে বলছেন। ওই সব হইতেছে সেই দজ্জালের শয়তানি। দেখবা মূর্খ পাবলিকের কি সুখ। সে ধর্ম নিয়া বুঁদ হয়ে থাকবে। এটা হইতেছে হিউম্যান সাইকোলজি। এই সাইকোলজি নিয়া তোমার পলিটিক্স জমবে না। তোমার করতে হবে পলিট্রিক্স। ধর্ম নিয়া তুমি এডভারটাইজমেন্ট বানাবা। কমার্শিয়াল সার্ভিস করবা। দেখবা তোমার লোকজনের অভাব হইতেছে না।

যখনই বিপদে পড়বা; স্কুল কলেজ খোলবা। হাসপাতাল খোলবা। সামাজিক কায়কারবারের অর্গানাইজেশন খুলবা। খেয়াল রাখবা তোমারে যেন কেউ চিনবার না পারে। যখন দেখবা বিপদ আপদ কাইটা গেছে – তখন আসল চেহারা সুরত নিয়া হাজির হবা। যখন স্কুল কলেজ বানাবা, তখন নাম দিবা ইমাম গাজ্জালি একাডেমি। নাম ইমাম শাফিঈ ক্যাডেট মাদরাসা। বেলাল ক্বিরাত একাডেমি। যখনই নাম রাখতে যাবা – মুসলিম গোল্ডেন এইজের কোনো না কোনো ইমাম-মুয়াজ্জিন-আল্লামার নামে রাখবা। রাষ্ট্র তোমাকে বাঁধা দিবার ক্ষেত্রে তিনবার চেষ্টা করবে। রাষ্ট্র যদি বাঁধা দেয় – তুমি শোরগোল তুলবা মসজিদ মাদরাসায়। বলবা, সরকার খোলাফা জমানার ইমাম-আল্লামার নামে কিছু হোক, সেটা চায় না। পাবলিক তখন তোমার পক্ষে দাঁড়াবে। বুঝলা এইটা হচ্ছে পলিট্রিক্স। যদি হাসপাতাল খুলবার চাও নাম দিবা আবি সিনা হাসপাতাল। ট্রাস্টি করবা। বিজনেস করবা। তুমি যদি পলিট্রিক্সের পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসাটা দাঁড় করিয়ে ফেলতে পার – তোমার তখন পোয়াবারো। তোমার সামাজিক ব্যবসায় তোমার আলবদর-আল শামস ক্যাডারদের চাকরি বাকরি দিবা। তোমার একটা আলাদা জামাত প্রতিষ্ঠা করবা।

আরেকটা মূল্যবান ফতোয়া – মদুদি মিটমিট হাসে। শোনো মেরে জান পেয়ারি লাল, যদি এইসব অর্গানাইজেশন মলাউনের সম্পদ দখল করে করতে পার – খুব ভালো হয়। মনে করবা জান্নাতের একটা খুঁটি হাতে পাইছ। প্রথমে নজর দেবে – মলাউনের মন্দির দখল করতে পার কিনা – পারলে সেটা হবে গাজীর কাজ। সেটা না পারলে খোঁজ-তালাশ করবে দেবোত্তর সম্পত্তি। তালাশ করবে এনিমি প্রোপারটি। মলাউনের ট্রাস্টি সম্পত্তি। তা না পাইলে তালাশ করবে মলাউনের ভেস্টেড প্রপারটি – পরিত্যাক্ত ভিটা। সেটার দখল নিবে। যদি কোন ফিলিম স্টার – পলিটিক্যাল স্টার – নামজাদা সোশ্যাল পারসনের ভিটা পাও খুব ভালো হয়। যেমন ধরো যদি দিলীপ কুমারের ভিটা পাও – থুক্কা, দিলীপ ব্যাটা তো আবার নাকি নামকাওয়াস্তে মোসলমান। ধরো যদি তোমার এলাকায় লতা মঙ্গেশকরের ফেলনা ভিটা পাও – লতা-আশার পূর্ব পুরুষের ভিটা পাও – ছলে বলে কৌশলে সেটার দখল নিবা। সিভিল সার্ভেন্টদের টাকাপয়সা ঘুষ দিয়া হইলেও সেইটার দখল নিবা। সেইখানে খুলবা মোহাম্মদী একাডেমি কিংবা ইমাম গাজ্জালি ট্রাস্ট। মানি ইজ নো প্রোবলেম। এই কাজের একটা সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট আছে। মূর্খ মানুষ কিন্তু দখলদারকে মনে মনে পছন্দ করে। আর খোয়াব দেখে – যদি সেও অমন কিছু একটা দখল করতে পারত। সেও যদি মলাউনের সম্পদ গ্রাস করতে পারত। সেও তালে তালে থাকবে। মলাউনের সম্পত্তিকে গনিমতের মাল বা বান্দির মতো জ্বেনার আহলাদে দেখবে। এতে তোমার একঢিলে দুই পাখি খতম করা হবে।

মদুদি মিচকি মিচকি হাসে। পিকদানিতে মুখ ভরা পিক ফেলে। তোমার পলিট্রিক্সে অবশ্যই মানুষের এই খোয়াবটা খেয়াল করবে। এটা ফরজ।

গোলাম পাকিস্তানি করিৎকর্ম্মা ও মহা ধুরন্ধর। সে কেবল ওস্তাদ মদুদির ফরমায়েশই মনে রাখে নাই – তার সঙ্গে নিজের বুদ্ধিও যোগবিয়োগ করেছে। আরব জাহান এখন আর পাকিস্তান রক্ষা তহবিলের চালবাজি খাচ্ছে না। বাংলাদেশ যে আর পাকিস্তানভুক্ত হবে না, সেটা বুঝতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে না। গোলাম তখন ঠিক করে এই বেদুঈন-বারবেরিয়ানদের অন্য কোন ডোজ খাওয়াতে হবে। সে তখন আরব-বাদশা-আমীর-ওমরাহদের দরবারে নতুন ধান্ধা নিয়ে ধরনা দেয়। হাঁটু গেড়ে বসে বলে বেড়াতে থাকে, শেখ মুজিবের বাংলাদেশে মসজিদ মাদ্রাসা সব ভাংচুর করা হয়েছে। সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে মসজিদ মাদরাসার আর অস্তিত্ব নাই। এখন নতুন করে মসজিদ মাদরাসা করা দরকার। গোলাম তাই তার জমাতি ভাইদের দিয়ে মুসল্লিদের একত্র করছে। তাদের মাধ্যমে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। নতুন মসজিদ মাদরাসা তৈরি করার তদবির চলছে পুরাদমে। এজন্য ব্যাপক ফান্ডিং দরকার।

এখানে সে মদুদির এডভারটাইজমেন্ট তত্ত্ব কাজে লাগাল। বলল, আরব বাদশাদের নামে মাদরাসা-ইসলামি স্কুল করতে চায়। ফান্ডিং দরকার। সে জানাল, দেশে ইমাম গাজ্জালি, ইবনে সিনা, বাদশা সৌদ, বাদশা ফয়সল – এনাদের নামে নানা স্কুল-মাদরাসা-সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। এজন্য দিরহাম-দিনার দরকার। লোকজন মুজিবরের হাতে ভাঙ্গা মসজিদ মাদরাসা সারাতে চায়। সেজন্য ফান্ডিং দরকার। মুজিবর দিন দিন আনপপুলার হয়ে পড়ছে। মানুষ এখন আর বাংলাদেশ চায় না। সেখানে এক হিন্দু মলাউনের গান ন্যাশনাল এনথেম করা হয়েছে। সে তারানা মলাউনি চিন্তাভাবনায় লেখা। হারাম সেই ন্যাশনাল এনথেম। জাতীয় পতাকায় চানতারা নাই। বরং সূর্য উপাসনা করা হচ্ছে। মাঝখানে বিরাট একটা সূর্য। এই সব মুসল্লিরা আর সহ্য করতে চায় না। তারা এইসব পরিবর্তন চায়। তারা আর হিন্দুস্তানের সঙ্গে ফেডারেশন করে থাকতে চায় না। পাবলিক মনে প্রাণে এখন পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন চায়। এখনই হচ্ছে সময়। ফান্ডিং দরকার। মিলিটারির মধ্যে নড়চড় হচ্ছে। ফান্ডিং দরকার। মিলিটারির মধ্যেও টাকা পয়সা বিলানো দরকার। যারা কনফেডারেশনের পক্ষে – তাদেরকে টাকাপয়সা দেয়া দরকার – তারা যেন বুক ফুলিয়ে বলতে পারে – মানি ইজ নো প্রবলেম। জোর-জবরদস্ত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিল গোলাম পাকিস্তানি। নিজের নামে যেমন টাকা পয়সা হাতাচ্ছিল; তেমনি কনফেডারেশনবাদী ফৌজীদের জন্যও ফান্ড কালেকশন করছিল।

বাবা কিছু কিছু টের পাচ্ছিলেন। দেশে বিদেশে নানামুখী পলিট্রিক্স আর ষড়যন্ত্র চলছে জোর-জবরদস্তভাবেই। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ যাতে এশিয়ার গৌরব হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলতে পারে – সেজন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। জ্ঞান-বুদ্ধি ছাড়া কিছু হবে না। সকল মানুষের কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। কার কী ধর্ম – কার কী জাত – সেটা বিবেচনা নয় – সকলের গুণ-দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত দেশ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে হবে। সেই স্বপ্ন তিনি দেখছিলেন। সেজন্যে একান্ত নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন। বাবার স্বপ্ন যেমন বিশাল, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রও চলেছে ভয়ঙ্করভাবে। বাবা দেশ ও মানুষকে ভালবাসেন, সেটা নিয়ে ষড়যন্ত্র; তিনি এশিয়ার সমৃদ্ধশালী দেশ হতে চান, তা নিয়ে ষড়যন্ত্র; বাবা একজাতি এক দেশ, অটুট ঐক্যবদ্ধ আত্মনির্ভর জাতি গড়তে চান – তার বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র আর ষড়যন্ত্র। তারই উদারতা-ভালবাসা-ক্ষমার আশ্রয় নিয়ে চক্রান্ত হবে – এটা বাবা মেনে নিতে পারছেন না। খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন।

মার্চের সেই অগ্নিক্ষরা দিনেও বাবা টের পেয়েছিলেন চারপাশের দুঃসহ বাস্তবতা। সব খবর তখনও পাচ্ছিলেন। কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্নময় সেই দিনগুলো। তাকে ঘিরে মৃত্যুজাল বিছাচ্ছিল ইয়াহিয়া-টিক্কা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করেও হত্যা করতে পারেনি। এবার নতুন হত্যার চাল-চক্রান্ত করছে। ইয়াহিয়া নতুন পথে হাঁটছে না। সে আইয়ুবের পুরানা পথেই হাঁটছে। সে বেলুচিস্তানের মত মৃত্যুপুরী বানাতে চায় বাংলাকে। কবরস্থান বানাবে বাংলাকে। খতম-ধ্বংস ছাড়া অন্য কিছুই ইয়াহিয়ারা বুঝত না। সেই জন্যই টিক্কা কসাইকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। কসাইরা দলে দলে আসছে। এবার তার লাশ চাইছে কসাইরা। তার আলামত পরিস্কার। বাবাকে বারবারই বলা হচ্ছিল কসাইদের সামনে বুক চিতিয়ে না দাঁড়াতে। কসাইরা গুলিতে গুলিতে ঝাঁঝরা করবে তার বুক। তার লাশের উপর দাঁড়িয়ে উন্মত্ত-নৃত্য করবে। কোনো কথাই শোনেননি বাবা। বললেন, মা গো, হায়াত মওত আল্লাহর হাতে। মরণ ললাটে লেখা থাকলে সাতচল্লিশ সালে মরতে পারতাম। তখন কতই বা বয়স আমার! তখনও তলোয়ার, খঞ্জর, গুলির সামনাসামনি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছি। ভয় পাইনি। দাঙ্গা ঠেকিয়েছি। মানুষেরে রক্ষায় পিছপা হইনি। কত রক্ত ঝরেছে কলকাতায়। হিংস্র তলোয়ারবাজ-খঞ্জরবাজের সামনে থেকে আহত মানুষকে বুক আগলে তুলে নিয়ে ছুটে গেছি হাসপাতালে। আমিও তলোয়ারের কোপে মারা পড়তে পারতাম। ওইসব ভয় পেলে চলে না।

আজও মা, বাংলার মানুষকে অরক্ষিত রেখে আমি অজ্ঞাতস্থানে যেতে পারি না। প্রতি পদে পদে ওরা চক্রান্ত আর শয়তানি করছে। আমি অজ্ঞাতস্থানে গেলে ওরা সেটাকেই ইস্যু বানাবে। তিলকে তাল করবে। সারা বাংলায় তন্ন তন্ন করে আমাকে খুঁজবে। ইয়াহিয়ার কসাইরা বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি করবে। মা-বোনের ইজ্জতে হাত দেবে। বলবে, মুজিবকে চাই। বল, মুজিব কোথায়! দে মুজিবকে বের করে দে। টর্চার করবে। যাকে ইচ্ছা ধরে নিয়ে যাবে। আমাকে খোঁজার নামে সারা বাংলাকে কসাইখানা বানাবে। বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে আইয়ুবকে চিনেছি। ইয়াহিয়াকে চিনতে বাকি নাই। পিন্ডির সব শয়তানই বাঙালি হাড়ে হাড়ে চিনতে পারছে। মাগো, ওরা আমার হত্যা করে করুক। গুলি করে মারুক। ফাঁসিতে ঝোলাক। ভয় পাইলে চলবে না। তাতে বাঙালির মুক্তি আসবে না। পিন্ডি আর ইয়াহিয়াকে সামনা সামনি বুক চিতিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। তোর বাপ অতীতে সবসময় যেটা করেছে – এবারও তাই করবে। তুই তো পড়েছিস মা, উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। রবিঠাকুর বড় সুন্দর করে বলে গেছে মাগো!

তোরা ভয় পাসনে মা গো। যদি আল্লাহ আমার মরণ লিখে রাখেন; ঠেকাতে কেউ পারবে না। আর আল্লাহ রক্ষা করলে ইয়াহিয়া পিন্ডির বাপের সাধ্য নেই, আমাকে হত্যা করবে। তোমাকে আগেও বলেছি আম্মা, আমাকে যদি ওরা হত্যা করে – দেশের প্রতিটি বাঙালি মুজিব হয়ে উঠবে। ঘরে ঘরে মুক্তিসেনা পয়দা হবে। বাঙালির মুক্তি কেউ ঠেকাতে পারবে না। পিন্ডির এই হারামশাহী বড়ই মূর্খ। ওরা জানে না, ওদের সামনে কোনো পথ খোলা নেই। ওদের সকল রাস্তা বন্ধ হতে চলেছে। আমাকে ধরে নিয়ে হত্যা করলে সারা বাংলা পিন্ডির জন্য আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হবে। বাংলার জলে, খালে বিলে নদীতে, বাংলার ঠাণ্ডা মাটিতে আগুন জ্বলবে। ওরা পালাবার পথ পাবে না। ওরা হাটে মাঠে ঘাটে পানিতে মরবে। ওদের সামনে একটাই পথ খোলা – বাংলাদেশের দাবি মেনে নেওয়া। বাঙালির ম্যান্ডেট মেনে নেওয়া। সেটা না করে যদি ওরা আমাকে নিয়ে আটকে রাখে – নিস্তার নেই ওদের। বাংলা অশান্ত হয়ে উঠবে। ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে উঠবে। সব বাঙালি মুক্তির মন্ত্রে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমাকে হত্যার চেষ্টা করবে ঠিক – কিন্তু আমাকে হত্যা করা মাত্রই বাংলাদেশ হাজার বছরের শৃঙ্খল ভেঙে বিশ্বের দরবারে নতুন স্বাধীন দেশ ও জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আমার জীবনের বিনিময়ে যদি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, বাঙালি হাজার বছরের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পায়, পৃথিবীর বুকে নতুন দেশ – বাঙালির দেশ বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে – আমি হাসিমুখে সেই মৃত্যুকে বরণ করে নিতে চাই। আমি এই মহান মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। বাঙালির মুক্তির জন্য আমার তুচ্ছপ্রাণ উৎসর্গ হলে আমি ধন্য হব মাগো।

হাসুর দুচোখ পানিতে ভরে গিয়েছিল – বাবার কণ্ঠ তখন ভারাক্রান্ত। তার চোখেও টল টল করছিল অশ্রু।

কালরাতে হত্যা আর হত্যা। রক্ত আর রক্ত। শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়মুখী রাস্তা – কার্জন হল, শহীদুল্লাহ হল – ক্যানভাসে সে ছবি আঁকতে গেলে গভীর কালো তুলির আচড়ে প্রথমে কৃষ্ণপ্রহর, তারপর তার ওপর লাল রক্তের স্রােত। হানাদার পাকিস্তানি সেনা-জান্তা অন্ধকারে ডাবলমার্চ ছুটতে ছুটতে অতর্কিতে ঘুমন্ত হলে ঢুকে পড়ল। রুমে রুমে দরোজায় লাথি। অবিরাম লাথি। দরজা ভেঙে ফেলল হিংস্র শ্বাপদকুল। তারপর গুলি আর গুলি। যাকেই সামনে পেল লাশ বানিয়ে ছাড়ল। মুখে তাদের কদর্য উর্দু গালি – আর একটাই অর্ডার। বাঙ্গাল কো খতম কর দো। যে ছাত্রটি ঘুমুচ্ছিল , তার নিদ্রামগ্ন শরীরে কাপুরুষ গুলি। যে ছেলেটি সদ্য জেগে উঠে ভয়ার্ত চিৎকার করল – তার শরীরও নিমিষেই ঝাঁঝরা করে দিল। হায়েনারা কী চাচ্ছিল সেই রাতে! বাঙালির প্রতি এত ঘৃণা। এত বর্বর হিংস্রতা। গুলি করেই ওরা খতম করবে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে।

কামান মর্টারের গুলি করতে করতে আরেকদল নিষ্ঠুর হায়েনা ঘুমন্ত ঢাকার রাস্তা গুড়িয়ে দিতে দিতে ঊর্ধশ্বাসে লম্বা রক্তলাল জিহ্বা ঝুলিয়ে ছুটছে বত্রিশ নম্বর বাড়ির দিকে। এই ডালকুত্তাদের মিশন – মুজিবকে চাই। জিন্দা বা মুর্দা। টিক্কা গজরাচ্ছে। মুজিবকে খতম করতেই হবে। যতক্ষণ না সে মুজিবকে না পাচ্ছে – উন্মাদের মত ঘুষির পর ঘুষি মেরে চলেছে বশংবদ বেলুচি সিপাহীকে। মুজিবকে না পেলে সে এই সিপাইকে ঘুষিয়ে হত্যা করবে। লাত্থি মারছে বেলুচির প্রায় নিথর শরীরে।

বত্রিশ নম্বর বাড়ির পরিবেশ সন্ধ্যার পর থেকেই থমথমে। সারাদিন আলাপ শলা-পরামর্শে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন বাবা। মনসুর কাকা, তাজকাকা, নজরুল কাকা আর কয়েকজন ছিলেন নিচতলায় লাইব্রেরিতে। সবাই উদ্বিগ্ন। উৎকণ্ঠিত। নেতাকর্মী ভক্তকুল অনেকেই দেখা করতে এসেছে । কাউকেই ফেরাননি বাবা। সাবধানে থাকবি – সতর্ক থাকিস – গম্ভীর চিন্তামগ্ন বাবা সবাইকে বিদায় দিয়েছেন। রাত বাড়ছিল। পুরো ধানমণ্ডি এলাকায় ক্রমশই অজানা অন্ধকারের প্রবল ছোবল। কী হয় – কী করছে টিক্কা ইয়াহিয়া। বেইলি রোডে প্রেসিডেন্ট হাউসে ছিল ইয়াহিয়া। খবর এলো সন্ধ্যার পর সে ফৌজীশালায় নাকি চলে গেছে। ঘোর মদ্যপ। তার কী মতিগতি বলা মুশকিল। টিক্কা এমনিতেই হিংস্র থাবা উঁচিয়ে অপেক্ষায়। ইয়াহিয়া নিশ্চয়ই আরও তাতিয়ে খেপিয়ে হুকুমদারি করে ডালকুত্তার লেজ মুচড়ে দিয়েছে।

অন্ধকার কেবলই ঘন ও তীব্র হচ্ছে। রাস্তাগুলোর বাতি বেশিরভাগ নেভানো। তাতে পরিবেশ ভীতিকর বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

হাসিনা বত্রিশ নম্বরের ছাদে ছিলেন সে রাতে। সঙ্গে ওয়াজেদ সাহেব ছিলেন। পায়চারি করছিলেন। অস্থির লাগছিল। বাবা এখনও খেতে ওপরে ওঠেননি। খাওয়ার ফুরসতই পাচ্ছেন না। বিকেলেও খাননি কিছু। আম্মা খুবই অসন্তুষ্ট। মানুষটা একদম অভুক্ত। রাত ন’টার দিকে অন্যরা অবশ্য খেয়ে নিয়েছে। কেবল বাবা আর আম্মা খাননি।

রাত তখন এগারটা ছাড়িয়ে গেছে। হাসিনা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ওয়াজেদকে বললেন, আমি নিচে যাচ্ছি। কী আশ্চর্য! আব্বা কি আজ না খেয়েই থাকবেন। তার কি এখনও ক্ষুধা লাগে নাই। নিশ্চয়ই খাওয়ার কথা ভুলে গেছেন। হাসিনা নিচে নামতেই সিঁড়ির গোড়ায় বাবার সঙ্গে দেখা। ছাত্রনেতারা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। শান্ত কণ্ঠে বাবা কিছু বলছিলেন। গম্ভীর মুখে সবাই তা শুনছিল। কথা শেষ করে বিদায় দিলেন তাদের। মুখ ঘুরতেই সামনে প্রিয় আত্মজা। কন্যার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা আর শুকনো অস্থির মুখ তার চোখে পড়েছে নিশ্চয়ই। কন্যাকে দেখে সামান্য হাসলেন। হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেন কাছে। বাবার অপত্য স্নেহ ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে। মা গো, সারাটাদিন তোকে দেখিনি।

আবেগ ভরা মায়াবী কণ্ঠ। কেবল সারাটা দিন কেন; গত কয়েকটা দিন কন্যাদের দিকে তাকানোর সময় পেলেন কোথায়! জেগেই আছেন দিনের পর দিন। ঘুম নেই। ছাদেও বসার ঘর; নীচতলার লাইব্রেরি। কোথাও না কোথাও বসেই কাটছে সময়। বেডরুমে দুয়েক বার গেছেন বৈকি। একটু চোখ বোজার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার ফুরসৎ মেলেনি। কেউ না কেউ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। মুজিব ভাই, দু’টি কথা আছে। বাবা কাউকে ফিরিয়ে দেননি। শোবার কক্ষেই মগ্ন হয়েছেন গভীর আলাপে। সেই থেকে নির্ঘুম। হাসিনা খেয়াল করলেন, বাবার চোখ টকটকে লাল। রক্তজবার মত। হাত বাড়িয়ে বাবা জড়িয়ে ধরায় টের পেলেন – অসম্ভব ক্লান্ত ও অবষণ্ন তিনি। দাঁড়িয়ে থাকার মত শক্তি দু’পায়ে নেই। এভাবে আর চলে না। মানুষটা নিঃশেষ হতে চলেছে। যে কোনো সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

এমন সময় পাগলা হঠাৎ এলো দৌঁড়ে। কী রে; কী হয়েছে! আবার কে এলোরে! জানতে চাইলেন বাবা!

বাবার বিশ্রাম বড় প্রয়োজন। কিন্তু তিনি আগন্তুককে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাকে বলে কয়ে কোনো লাভ নেই।

ঝন্টু এসেছে কাকা। আপনারে খুঁজতেছে।

তাই বল। আমি তো ঝন্টুর কথাই ভাবতেছিলাম। কই সে। তারে দোতলায় আসতে দে।

শশব্যস্ত হয়ে ঝন্টু ঢুকল। মনে হচ্ছে পাগলা কুকুরে তাকে তাড়া করেছে। ভীষণ হাঁপাচ্ছে। কাছে এসে বড্ড ব্যাকুল হয়ে পড়ল। বলা নেই কওয়া নেই। হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল সে। মুজিব ভাই। মুজিব ভাই।

কী হয়েছে! ধীরে সুস্থে বল। বাবার গলা প্রগাঢ় শান্ত।

মুজিব ভাই, মুজিবভাই, পাকিস্তান আর্মি আপনারে মারতে আসতেছে। ইয়াহিয়া টিক্কারে অর্ডার দিয়া ফেলছে। আপনি এক্ষুণি এই বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যান। তারা ট্যাঙ্ক কামান মর্টার নিয়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হইছে। কোনো কিছু আস্তা নাকি রাখবে না। হারামীদের প্লান প্রোগ্রাম ফাইনাল। মুজিব ভাই, ওরা আপনারে মারবেই। আপনার বাঁচন বড় দরকার। বাঙালির জন্য আপনার জান-বাচাঁনো ফরজ। ওরা আপনারে খতম করবেই। পাক্কা খবর পাইছি। ঝন্টুর কান্না থামছে না।

ধূসর দৃষ্টিতে বাবা বাইরে তাকালেন। সামান্য পায়চারী করলেন। জান কবচ করতে আসছে মূর্তিমান আজরাইল। সে খবর মোটেই বিচলিত করল না তাকে। তিনি বেশ ম্লান ও বিষণ্ন হয়ে পড়লেন।

আর কোনো খবর কি পেয়েছিস। ওরা কি কেবল আমাকেই খুন করতে আসতেছে! আমারে খুন করে কি বাঙালিরে দাবাইতে পারবে! ক্যান্টনমেন্টের আর কোনো খবর নাই!

ঝন্টু হাঁপাচ্ছে। আর কাঁদছে। ঘন ঘন নি:শ্বাস নিচ্ছে। অভয় দিলেন বাবা। আমার জানের জন্য কান্নাকাটি করিস না। হায়াত মওতের ওপর আমার তোমার হাত নাই। জীবনের পরোয়া মজিবর করে না।

ইয়াহিয়া-টিক্কার অন্য প্লান প্রোগ্রাম কী বল।

বাবা জড়িয়ে ধরলেন ঝন্টুকে। ভয় পাস নে ভাই। বাঙালি জাতির জীবন মরণ সন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়াইয়া আছি। এই সময়ে সাহস হারালে চলবে না। শত্রুরে সামনা সামনি মোকাবেলার সাহস রাখতে হবে। বুকে বল রাখতে হবে। টিক্কা-ইয়াহিয়া ক’জনরে মারবে! আমারে মারবে! আওয়ামী লীগের সেন্ট্রাল লিডারদের মারবে! তারপর ! তারপর তাদের ফিউচার কী – সেইটা কি তারা জানে! লিডারকে হত্যা করে একটা জাতির চেতনার মশাল নিভানো যায় না। মরতে তো আমাকে একদিন হবেই। আজকে নয়তো কাল! মৃত্যু হইতে পারে স্বাভাবিক। ঘুমাইয়া ছিলাম। আর উঠলাম না। মৃত্যু হইতে পারে অন্যরকমও। যেমন ধর, আমারে আজ তারা ধরে নিয়ে ফাঁসিতে ঝোলাল। ঘুমের মধ্যে মৃত্যুকে বা বিছানায় হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যু ধরতেছি আরামের। কিন্তু মানুষ মাত্রেই সব ধরণের মৃত্যুর প্রস্তুতি থাকলেই ভালো। আমার কাছে সেই মৃত্যুই পরম কাম্য – যা আমার বাঙালি জাতির কাজে লাগবে। যদি এমন মৃত্যু হয় – যা হাজার বছর ধরে জাতিকে জাগরুক রাখবে। তাদের চেতনার মশালকে সূর্যের মত প্রজ্জ্বলিত করবে। তখন আমি আল্লাহর কাছে শোকর গোজার থাকব। আমি সেই মৃত্যুকেই কামনা করি যা আমি সামনাসামনি মোকাবেলা করেছি। ভীরু হই নাই। কাপুরুষতা করি নাই। আমি ইয়াহিয়া টিক্কার গুলি ফাঁসির ভয়ে অন্যত্র ভাই যাব না।

ঝন্টুর কান্নাকাটি, পরম ভালবাসা আর প্রচণ্ড উদ্বেগ দেখে বাবা খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। হাসিনাও খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। তার চোখও ভরে গেছে পানিতে। একদমই ভালো লাগছে না। ক’দিন ধরেই সবাই বাবাকে কেবল তার জীবনাশঙ্কা ও মৃত্যুর কথা বলছেন। বাবা ভেঙে পড়েননি। কী অদ্ভুত দৃশ্য! সবাই আব্বার মৃত্যুর আশঙ্কায় কাঁদছেন। আর তিনি সবাইকে শান্ত্বনা দিচ্ছেন। শরশয্যায় শত মৃত্যুর যন্ত্রণা সহ্য করে সকলকে অভয়বাণী শোনাচ্ছেন – যদি সত্যিই কসাই পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করে, তখন কেমন করে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে মুক্তি ও বিজয়ের বন্দরে নিয়ে যেতে হবে? কন্যা হয়ে এই দৃশ্য মোটেই সহ্য করতে পারছে না হাসু।

আবেগঘন কণ্ঠকে সংযত করে বাবা আবার জানতে চাইলেন – অন্য কী ইনফরমেশন আছে বল। যাই ঘটুক, সময় বেশি পাওয়া যাবে না। ইয়াহিয়া এখন কোথায়!

সে শুনলাম, প্রেসিডেন্ট হাউসে নাই। ক্যান্টনমেন্টের দিকে গেছে। টিক্কারে অর্ডার পাস কইরা দিছে। আপনারে বত্রিশ নম্বর বাড়িতে হত্যা করা হবে। পরে সারা দুনিয়াতে জানাবে – আপনি পালাইতেছিলেন। পালানোর সময় গুলিতে খুন হইছেন। বাবা সামান্য হাসেন ঠিক বলেছিস। এইটাই ইয়াহিয়া-টিক্কার মাথায় খেলতেছে। ওরা চায় আমি আত্মগোপন করি। পালাইয়া যাই। তাইলে সারা বাংলা তন্ন তন্ন করে সার্চ দিয়া আমারে ব্রাশফায়ার দিবার পারে। দুনিয়ারে কৈফিয়ত দিতে তাদের আর ঝামেলা থাকে না। কি মাগো, তোমারে আমি আগেই বলছিলাম কিনা।  বুঝলে মা, টিক্কা-ইয়াহিয়া যে প্ল্যান মতো আগাইতেছে আমি তা হইতে দিতে পারি না।

এসব বাদ দে। ঝন্টু, কোনো ক্র্যাকডাউনের প্লান নিশ্চয়ই করছে। বাবা কিঞ্চিৎ গম্ভীর।

জ্বী, মুজিবভাই, ট্যাঙ্ক কামান মর্টার ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়া গোলন্দাজরা এক গ্রুপ আপনার বত্রিশ নম্বর আসতেছে। অন্য গ্রুপগুলা সারা ঢাকায় হায়েনার মতো ছড়াইয়া পড়ছে। ঢাকা ভার্সিটি, জগন্নাথ হল, কার্জন হল, ইকবাল হলে হামলা চালাবে। রাজারবাগ লাইন, পিলখানায় নিশ্চয়ই এতক্ষণে পৌছাইয়া গেছে। রাস্তায় দেইখা আসলাম ভয়ংকর অবস্থা। বাংকার কাটছে আর্মি। যারে পাইবে তারে গুলি কইরা মারবে। রেডিও-টিভি, টিএন্ডটি, ফুড গোডাউন সব জায়গায় ক্রাকডাউন করবে।

আব্বা প্রচন্ড গম্ভীর হয়ে গেলেন। ঝন্টুর কথা আর শুনলেন না। বিদায় দিলেন তাকে। বেচারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে এসেছে। ওর বিপদ বাড়িয়ে লাভ নেই। এবার তিনি ইস্পাতের মতো দৃঢ় হয়ে উঠলেন। হাসুর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলেন।

ততক্ষণে ঢাকা তাণ্ডবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। রোজ কেয়ামত যেন উপস্থিত। ট্যাঙ্কের চাকার ঘর্ঘর শব্দ সকল রাস্তায়। যন্ত্র যেন খুনের মচ্ছবে পিষতে চলেছে রাতের ঢাকাকে। গুলির শব্দ অবিশ্রাম। শব্দ কেবলই প্রবল হচ্ছে। আম্মা, হাসু, ওয়াজেদ, রেহানা সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ়। ওয়াজেদ বললেন, বাবা, এখন কি করবেন! আর্মি সত্যিই ক্র্যাকডাউনে নেমে গেছে। দে আর ইন অ্যাকশন। ঝন্টু যা বলে গেল সবই ফলে যাচ্ছে। আম্মা বাবার দিকে তাকাচ্ছেন। নিজে থেকে কিছু বলছেন না। বাবা ধীর-স্থির মাথায় ভাবতে চাইছেন। উদ্বিগ্ন জায়ার দিকে তাকালেন না। তাকে এখন দেখতে হবে বহুদূর। কালের পিঠে মহাকালের দিকে তার মগ্ন দৃষ্টি। সঙ্গীসাথী-বিশেষ করে তরুণ ছাত্রনেতারা চাইছিল বাবা নিরাপদ স্থানে আত্মগোপন করুন। তিনি যাতে নির্বিঘ্নে বাসা ত্যাগ করে যেতে পারেন। সেজন্য পরচুলাও তারা যোগাড় করে রেখে গেছে। ইয়াহিয়ার মরনগুহায় মাথা গলানো- এই দু:সাহস কারোরই মনোপূত নয়। সবার মনে ভয় আতঙ্ক, এবার ইয়াহিয়া ছুতানাতা করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবেই। তারা মরতে রাজি, কিন্তু মুজিবকে মরতে দিতে রাজি নয়। আর বাবা ঠিক উল্টোটা ভাবছিলেন। বাঙালিকে অরক্ষিত রেখে অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপনে তিনি যাবেন না। এক ফাঁকে মায়ের বকুনি খেয়ে কিছু খেয়ে নিলেন। পাখির মতো অল্প স্বল্প খাওয়া। ওটাকে খাওয়া বলে না। বাবা চটজলদি হাত ধুয়ে উঠলেন। গভীর চিন্তায় মুখটা থমথমে। হঠাৎ বেজে উঠল ফোন। হারুন নামে কেউ একজন কথা বলতে চাইছে। পরিচয় দিলেন- তিনি ডিসি অফিসের কর্মকর্তা। তার ভগ্নিপতিকে কিছুক্ষণ আগে আর্মি তুলে নিয়ে গেছে। কেন, কোথায় নিয়ে গেল কোনো বৃত্তান্ত দেয়নি। ভদ্রলোক জানালেন, সারা শহরে কারফিউ দেয়া হয়েছে। দেখামাত্র গুলির অর্ডার দেওয়া হয়েছে। নো মার্সি।

ফোনের কথা বাবা শুনলেন। বিশেষ কোনো ভাবান্তর হল না। হাসিনা আর ওয়াজেদকে বললেন রেহানাকে নিয়ে তোমাদের নিজের বাসায় চলে যাও।

বাসাটা বিশেষ দূরে নয়। কাছেই পনের নম্বরে।

আর বাবা, আপনি কি করবেন!

ওয়াজেদের দিকে তিনি তাকালেন। না, বাবা, আমি আন্ডারগ্রাউন্ডে যাচ্ছি না।  ওরা যদি আমায় মারতে চায়, এই বত্রিশ নম্বরেই মারতে হবে।

বাবার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুনে হাসিনা, রেহানা কাঁদতে লাগল রেহানা বড্ড জেদী। দুবোন জানাল, তারা বাবাকে ছেড়ে কিছুতেই অন্য কোথাও যাবে না।

বাবা  হাসুকে বিশেষ ভাবে বোঝালেন। হাসুমা অন্তস্বত্বা। ওর আর এখানে থাকা ঠিক নয়। ওকে এক্ষুনি নিজের বাসায় নিয়ে যাও। তোমার আম্মাকেও নিতে বলতাম। কিন্তু তিনি তো কোনো অবস্থাতেই আমাকে ছেড়ে এক পাও যাবেন না।

বাবার জোরাজুরিতে হাসু, রেহানা, রাসেল শেষ পর্যন্ত না গিয়ে পারল না।

ঢাকা মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড। আগরতলা মামলার আসামী রিটায়ার্ড কমান্ডার মোয়াজ্জেম। তার বাসায় হামলা করেছে হায়েনারা। অতর্কিতে। অন্ধকারে গুলি করতে করতে ঘুমন্ত বাড়িতে ঢুকেছে। ব্রাশফায়ার করে কমান্ডারকে স্পটেই হত্যা করেছে।  তারপর অয়্যারলেসে খতম খতম মেসেজ দিয়ে লাশ টেনেহিঁচড়ে ফৌজীশালায় নিয়ে গেছে। ইকবাল হলে লাশের স্তুপ। ছাত্র-কর্মচারি যাকেই পেয়েছে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। ফলা উঁচিয়ে ধাওয়া করে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরেছে। উল্লাসে ফেটে পড়েছে হল জুড়ে। লম্বা টানা বারান্দায় দৌড়ে ধাওয়া করেছে হঠাৎ ঘুম ভাঙা ছাত্রদের। হত্যাক্রীড়া চলে রাতভর। মধ্যরাত থেকে ভোরের আযান অব্দি। আযান তাদের থামাতে পারেনি। আল্লাহু আকবর বলে আওয়াজ দিয়ে মত্ত হয়েছে   নৃশংসতায়। সেখানেই শেষ নয়। কয়েকজন ছাত্রকে রাতেই বিরাট গর্ত খুঁড়তে  বাধ্য করে ফৌজী-কসাইরা। বন্দুকের নল ঠেকিয়ে চোস্ত উর্দুতে বলেছে, বাঁচতে চাস তো গর্ত খোঁড়।

তারপর বিভিন্ন রুম থেকে মরা লাশ টেনে এনে গর্তে ফেলতে বলে তারা। নিরস্ত্র নিরীহ ছাত্ররা বাঁচার অন্তিম আশায় কাজটা করতে বাধ্য হয়। শেষ রক্ষা হয় নি। তাদেরকেও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে, গুলি করে হত্যা করে উম্মত্ত জল্লাদরা। নিহত-আহতদের গর্তে ফেলে আকাশ বিদীর্ন করে হেসেছে। শ্লোগান দিয়েছে সমস্বরে পাকিস্তান জিন্দাবাদ। বাঙ্গাল নমরুদ মুর্দাবাদ। মালাউন খতমের অপারেশন চালিয়েছে জগন্নাথ হলে। মধুর কেন্টিনের মধুদা স্ত্রী কন্যা পুত্রসহ খতম। মালাউন শিক্ষকদের খুঁজে হন্যে হয়েছে হায়েনারা। যাকেই পেয়েছে খতম করেছে পাশবিক উল্লাসে। জগন্নাথ হলে হত্যা-উৎসব ছিল আরও বিচিত্র-বিকৃতিতে পূর্ণ। ভয়ার্ত ছাত্র-কর্মচারিদের যৌনাঙ্গ বরাবর বেয়োনেটের খোঁচা দিয়ে রক্তাক্ত করেছে। মালাউন কা বাচ্চা, হিন্দুস্থান কা নাপাক আদমী। আজ হাম তুমকো মুসলমান বানা দেগা।

মালাউন-খতমে কী এক অপরিসীম বিদ্বেষে ওদের লক্ষ্য ছিল শিশ্ন। ওই অঙ্গে খুন দরিয়ায় স্নাত হয়েছে পাকিস্তান।

বেয়োনেটের নির্মম নিষ্ঠুরতায় অনেকে রক্তক্ষরণে মারা গেছে। আর যারা বেঁচে কাতরাচ্ছিল, গোঙাচ্ছিল, তাদের বুকে ও তলপেটে গুলি ফুটিয়ে দিয়েছে। লাথির পর লাথি মেরে দেখেছে ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে কিনা।

বাঙালি-বধের ভয়ংকর সেই উৎসব।

বত্রিশ নম্বর বাড়ি ঘিরে ফেলল হায়েনারা। মুজিব কাহা হ্যায়! বাহার আও জলদি। নমরুদ, ফেরাউনকা বাচ্চে, বাহার আও।

ঘেউঘেউ জঘন্য শব্দে কলুষিত হয়ে উঠল চারপাশ। গুলি হচ্ছে রাস্তায়। তীব্র হেডলাইট জ্বালিয়ে সড়কের এমাথা থেকে ওমাথায় ছুটে যাচ্ছে কনভয়। কয়েক মুহুর্ত বাদেই হার্ডব্রেকের কর্কশ শব্দ। রাত্রি ভেঙে খান খান। কনভয় আবার অসম্ভব দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে এমাথায়। রক্ত ছলকানো ব্রাশ ফায়ারের শব্দ। বোঝাই যাচ্ছে, ফৌজীরা ভয়ংকর আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাইছে। তারই মহড়া চলছে। আম্মা হঠাৎ দেখতে পেলেন, বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে অন্ধকার আততায়ীরা ঢুকছে। মাথায় হেলমেট। এক এক করে ঢুকে যাচ্ছে তারা। সামনের রাস্তায় কনভয়ের চাকার শব্দ আর গুলি আরও তীব্র। বাড়ির জানালা কপাট লক্ষ্য করে গুলি হচ্ছে কিনা ভয় আতঙ্ক তৈরী হলো। সবাই গিয়ে তিনতলায় উঠলেন। আশ্রয় নিলেন কামালের রুমে।   অবিশ্রান্ত গুলি-গালাজ চলছে। বাড়িটা ঝাঁঝড়া করে দেবে, এমনই অবস্থা। কোথাও একটি শিশু সশব্দে কেঁদে উঠল। অসম্ভব ভয় পেয়েছে শিশুটি। কান্নার শব্দে ফৌজীরা নতুন দমে গুলি করতে লাগল। আব্বা আর অপেক্ষা করলেন না। বারান্দার দিকে তিনি জোর কদমে এগুচ্ছিলেন। আম্মা তাকে টেনে ধরলেন। বললেন, বারান্দার দিকে একদম যেও না। ওদের বিশ্বাস নেই। ব্রাশ ফায়ার করে মারতে পারে ওরা। 

গুলির তীব্রতায় বিরক্ত বাবা। তিনি ফিরে আম্মার হাতটা শক্ত করে ধরলেন। মাথা নাড়লেন। সত্যিই তো! তিনি বড় ধরণের ভুল করতে যাচ্ছিলেন। উম্মত্ত হায়েনার সামনে সাহস দেখানো বোকামি।

ফৌজীরা ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতরে। সিঁড়ির কাছে গুলির শব্দ। আব্বা এগিয়ে গেলেন সেদিকে। বললেন, কেন তোমরা বাড়ির মধ্যে ঢুকেছ? কী চাই? আমি বাড়িতেই আছি। এত গুলি করছো কেন। গুলি বন্ধ করো।

বাবার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই। ভয়ের লেশ মাত্র নেই। উচ্চকন্ঠেই বললেন, তোমরা শেখ মুজিবরের বাড়িতে এসেছ। কেন, কী বৃত্তান্ত খুলে বল।

ফৌজী অফিসার কয়েকজন, তাদের হাতে লোডেড পিস্তল। সঙ্গে বেয়োনেট-রাইফেল উদ্যত একদল সৈনিক। অফিসাররা নিজেদের মধ্যে কিছু একটা বলল। একজন ছুটে বেরিয়ে গেল বাইরে। চিৎকার করে খামোশ টামোশ কিছু একটা বলল। গুলির শব্দ থামল।

বাবা ধীর স্থির চিত্তে আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের আসার কারণ এখনও বলো নি। কে তোমাদের কমান্ডার! এগিয়ে এসো সামনে। আমরা সবাই নিরস্ত্র। এভাবে গুলির কোনো মানে নেই।

এক খাকি উর্দি বাবার সামনে এসে দাড়াল। সে জানাল, শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের জন্য তারা এসেছে। তার জন্য মার্শাল কনভয় মোতায়েন করা হয়েছে। তারা মুজিবকে এরেস্ট করতে না পারলে ম্যাসাকার করবে। নো ওয়ান উইল বি এলাইভ ইন দিস হাউজ।

বাবা জানতে চাইলেন,  গ্রেপ্তার করে কোথায় তাকে নেয়া হচ্ছে।

সংক্ষিপ্ত জবাব  এলো, ক্যান্টনমেন্ট।

জামাল এসে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছে। সেও সামরিক অফিসার। কিছু প্রশ্ন করল। বিশেষ সদুত্তর মিলল না।

বাইরে বিচ্ছিন্ন গুলির শব্দ। কনভয়-কার স্টার্টে রাখার যান্ত্রিক শব্দ। আম্মা অতি ক্ষিপ্র হাতে বাবার ছোট স্যুটকেসটি গুছিয়ে দিলেন। দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। ভোলেন নি। এটি বাবার জেলে যাওয়ার স্যুটকেস। পায়জামা, পেস্ট, ব্রাশ, চিরুনি, তোয়ালে, দরকারি জরুরি ওষুধপত্র। বাবা ফৌজীকে বললেন, চলো। কোথায় নেবে, আমি প্রস্তুত। আম্মার দিকে তাকালেন। তার চোখ ধুসর। বেদনার্ত কন্ঠে বললেন, রেনু, আসি।

আম্মা তখন নিষ্প্রাণ পাথর। শুভ্র শ্বেত-মর্মর। তাকিয়ে রইলেন প্রস্থানের দিকে।

বাবা বেরুতেই সশব্দে কনভয় চালু হল। প্রচন্ড গোলাগুলি আবারও। রাত ভেঙে চৌচির।

আম্মা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। জামালের হাতের ওপর ঢলে পড়লেন। জ্ঞান হারালেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো পাশেই সরায়ে খামে, ডা. সামাদ সাহেবের বাসাতে। 

পরদিন। ঢাকা ধ্বংসস্তুপ। কামানের গোলা, ব্রাশফায়ার,ট্যাংকের কবলে বিধ্বস্ত। কার্জন হল, জগন্নাথ হল-ইকবাল হল রক্তস্নাত রক্তলাল। এখানে সেখানে লাশ। গুলিবিদ্ধ। বেয়োনেট খোঁচানো। খুঁচিয়ে চোখ গালিয়ে দেয়া হয়েছে। কোনো লাশের নাড়িভুড়ি বেরিয়ে গেছে। বিভৎস। কুৎসিৎ নারকীয়তা চলেছে রাতভর। কঙ্কালসার নগরী তারই প্রাণহীন সেলুলয়েড। শেখ মুজিবকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অজ্ঞাত স্থানে। জীবিত না মৃত, কোনো হদিস মিলল না। আম্মা এতটা ভেঙে পড়েননি আগে।

ফৌজীশালার ওপর আকাশ থমথমে। শকুন উড়ছিল। বিশালাকার পাখা মেলে ভুবনচিলও টহল দিচ্ছে। শকুনের প্রলুব্ধ চোখ ।

টিক্কা খান চীফ কমান্ডার। ইয়াহিয়া সদরে পাকিস্তান। তারা জবর ভোজসভায় মত্ত। খোলা আম জাহান্নুমের অগ্নি জ্বলছে। লৌহদণ্ড লাল গনগনে। গলন্তপ্রায়। সেই লৌহশলায় টিক্কা ইয়াহিয়া আষ্টেপৃষ্ঠে বিদ্ধ করেছে ফৌজী-পাকিস্তানকে। শরাব পেয়ালা হাতে একবার উঠে যাচ্ছে টিক্কা। আরেকবার ইয়াহিয়া। নেড়ে দিচ্ছে লৌহশলাকা। তারা উল্লসিত আসন্ন ভোজের আনন্দে। কাবাব হচ্ছে পাকিস্তান। ওদের আনন্দ আর ধরে না।  ইয়াহিয়া  ছুটে এসে ছোঁ মেরে নিল নরলীর সুস্বাদু মাংস। হা হা করে আনন্দে হাসিতে লাস্যে মশগুল দুই জেনারেল।

দুপুর তখন দুপুর দেড়টা। অয়্যারলেস মেসেজে টিক্কা উদভ্রান্ত। চিৎকার করে বললো ইয়াহিয়া, হোয়ার ইজ শেখ মুজিব। ইজ হি নট আন্ডার কাস্টডি।  

টিক্কা স্যালুট ঠুকলো অকারনে। বললো, ইয়েস স্যার হি ইজ আন্ডার কাস্টডি। এভরিথিং আন্ডার আওয়ার কন্ট্রোল। মুজিব শুড বি হ্যাঙ্গড স্যার। নো মার্সি। নো মার্সি। মদ্য-মাতাল ইয়াহিয়া হাসে। ইয়েস জেনারেল, লেট টেক দ্য ব্লাডি মুজিব টু রাওয়ালপিন্ডি। দেয়ার হি উইল বি হ্যাঙ্গড। নো মার্সি । নো মার্সি।

টিক্কার অয়্যারলেসে আবার কাতর চিৎকার। ক্যায়া হুয়া। ধমকে ওঠে টিক্কা। ওভার ওভার। 

বিপন্ন বাংলায় হঠাৎ প্রাণের হিন্দোল। সারা বাংলায় বেজে উঠল, বাহান্নোর উদ্দীপনা।  আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী। প্রভাত ফেরীতে সারাবাংলায় সুরের অমর ঝরনাধারা। রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে জব্বার, শফিউর, রফিক, বরকত সালাম। গুলির পর গুলি চলল। তাদের শরীর শত বুলেটে ভরিয়ে দিল হায়েনার দল। সালাম বরকত তবুও এগোচ্ছে। রোখা যাচ্ছেনা। বাংলা বাংলা বলে তারা শ্লোগান দিচ্ছে। তাদের কন্ঠ চিরে গুলি আর গুলি।  কন্ঠনালি রক্তাক্ত। কিন্তু বাংলা বাংলা ধ্বনি বেরুচ্ছেই।

মোহাম্মদপুরের দিক থেকে হাজারও কিশোর তরুণ এলো দৌড়ে ছুটে। সবার সামনে এক কিশোর। আসাদ আসাদ বলে আকাশে আহাজারি। আসাদ নির্ভিক। ইসরাফিলের শিঙ্গার মতো তার কন্ঠে শ্লোগান, আইয়ুবশাহী নিপাত যাক, শেখ মুজিব মুক্তি পাক। আসাদের সঙ্গে তালে তালে সবাই বলছে, ইয়াহিয়ার দুই গালে। জুতা মার তালে তালে। ইয়াহিয়া নিপাত যাক। বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাক।  সব শ্লোগান সব কান্না আহাজারি, সব অমর সঙ্গীত গিয়ে মহাসাগরে মিলল। মহাসাগরের গভীর থেকে বজ্র নির্ঘোষ, এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

হায়েনা ফৌজীরা সারা ঢাকা শ্মশান বানিয়েও স্তব্ধ করতে পারল না, এই বাতাস হাওয়ায় উড়ে বেড়ানো শব্দগুলো। শব্দ তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে। তীক্ষ্ণ থেকে সুতীক্ষ্ণ।
টিক্কা ইয়াহিয়া উম্মাদ হয়ে পড়লো। গুলি বোমা হত্যা রক্তবন্যা দিয়ে কিছুতেই এই শব্দপ্রবাহ বন্ধই করা যাচ্ছে না।

ইথারে নতুন স্পন্দন। বেতারে এলো খবর। চট্টগ্রাম শহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে  বীর বাঙালি জনতা লড়ছে। সশস্ত্র লড়াই চলছে। বাঙালি বীরদর্পে লড়ছে। চট্টগ্রাম বেতারে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বার্তা দিলেন আনুষ্ঠানিক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার। হান্নান ঘোষণাপাঠের পর দীর্ঘক্ষণ সম্প্রচার বন্ধ। সন্ধ্যায় আবার সেটি পাঠ করেন আবুল কাশেম সন্দীপ।  সম্ভবত এটাই আমার শেষ নির্দেশ। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বিদেশী শত্রু সৈন্য বাংলাদেশ আক্রমণ করেছে রাতের অন্ধকারে। ঢাকায় তারা ঘুমন্ত লোককে হত্যা করছে। এই বর্বর আক্রমণ এবং অবাধ গণহত্যার কথা বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রকে জানিয়ে দিন। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের কাছে আমার নির্দেশ, আপনারা যেখানেই থাকুন না কেন, এবং আপনাদের হাতে যাই থাকুক তাই নিয়ে দখলদার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই করুন। বাংলাদেশের মাটি থেকে দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যকে বহিস্কার না করা পর্যন্ত আপনাদের লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। 

ইথারের অবিনাশী গান গুঞ্জরিত হলো সারা বাংলায়। বাংলাদেশ স্বাধীন, বাংলাদেশ স্বাধীন। আগুনের ফুল ফুটিয়ে চলল সর্বত্র। ইপিআর অয়্যারলেসে তোলপাড়। মেসেজে টেকনাফ তেতুলিয়া সর্বত্র ঝড়। বিপন্ন বাংলায় অভূতপূর্ব প্রাণের উচ্ছাস। মুজিব বলেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন। পিন্ডির পান্ডাগিরি থেকে মুক্তি, আলোয় আলোয় ভরে উঠল বাংলা-বসুন্ধরা। 

অয়্যারলেসে খবর পেয়ে ইয়াহিয়া-টিক্কা উম্মাদ। ছারখার জ্বালিয়ে দাও বাংলার প্রতিটি ইঞ্চি মিট্টি। মুজিবের রক্ষা নাই। তাকে লটকাতেই হবে। ফাঁসির দড়িতে তেলঘি মাখতে ইয়াহিয়া পশ্চাদ-পুচ্ছ পুড়িয়ে ফিরে গেল পিন্ডি।

এইসময়টায় উপদ্রুত চট্টগ্রামে প্রচন্ড প্রতিরোধ। সোয়াত জাহাজে করে করাচি থেকে এসেছিল অস্ত্র-গোলাবারুদ, ভারী-মাঝারি মরণাস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জাম। পিন্ডির ফৌজীশাহীরা তা জানতে দেয়নি কাউকে। অতি সঙ্গোপনে চালান চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস করার কথা। তারপর তা বাঙালি গণহত্যার কাজে বাংলা জুড়েই হানাদার সেনাদের হাতে হাতে বন্টন হবে। চুপিসারে কাজটি হচ্ছিল। কঠোর গোয়েন্দা নিরাপত্তার  চাদরে পুরো ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছিল। বলা হচ্ছিল করাচি থেকে খাদ্যদ্রব্য ফলমূলের চালান আনা হয়েছে। সেটির আড়ালেই বাংলা-খতমের অস্ত্রশস্ত্র। বন্দরশ্রমিকরা চালান খালাস করে দিলে ট্রাকে ভর্তি করে প্রথমে তা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে নেয়ার কথা ছিল। টিক্কা খান ঢাকা থেকেই ফরমান পাঠিয়েছিল চট্টগ্রামে। বিশ্বাসী এক বাঙাল  মেজরকে দায়িত্ব দেয়া হয় সুকৌশলে চালানটি ক্যান্টনমেন্টে ইনপুটের। এই মেজরটি বাঙালি হলেও অত্যন্ত মেধাবী, তীক্ষ্ণ, বুদ্ধি, প্রত্যুৎপন্নমতি। চৌকস বিশ্বস্ত অর্ডারলি। খুব কম সময়ে পেয়েছে সব পদোন্নতি। পাঞ্জাবি খানসেনারা তা আটকায়নি। খুবই বিশ্বাসী এবং খানখানান জেনারেলদের বড় আস্থাভাজন। অত্যন্ত স্বল্পভাষী, প্রতিটি অর্ডার অক্ষরে অক্ষরে পালন করে হুকুম-বরদার অফিসার হিসেবে সিনিয়রদের মধ্যে খুব  আলোচিত। অর্ডারলি কাজ বাদে প্রতিটি মুহূর্ত থাকে একা। সময় কাটায় নিরিবিলি। তার চোখে বেশীর ভাগ সময় থাকে কালো সানগ্লাস। তার চোখ, অভিব্যক্তি, রাগ অনুরাগ দেখতে পায় না কেউ। তার নামটি কোমল কমল হলেও ফরমানি কাজে অতি নিষ্ঠুর। হৃদয়হীন নিরাবেগ। ফরমান পেয়ে তথাস্তু আজ্ঞা শিরোধার্য করে সে গিয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর অভিমুখে। মেজরের জীপ ছুটছিল। ব্যাটন হাতে সানগ্লাস মেজর বন্দরে না পৌঁছাতেই অয়্যারলেসে খবর আসে বন্দর শ্রমিকরা বিদ্রোহ করেছে। চালানে অস্ত্র শস্ত্র আছে জেনে ধর্মঘটে চলে যায় শ্রমিকরা। কিছুতেই তারা অস্ত্র খালাস হতে দেবে না। মুজিবর সাফ বলেই দিয়েছেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে। যে যেখানে আছে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। শ্রমিক মজদুর কোনোভাবেই মুজিবের ফরমান পালন না করে পারে না। মুজিবের বাংলায় তারা এই অস্ত্র কোনোভাবেই খালাস হতে দেবে না। এই অস্ত্র হায়েনাদের হাতে দেবে না।

সানগ্লাস মেজর সঙ্গে সঙ্গে তা ঢাকায় জানায়। পরিস্থিতি বড় সঙ্গীন। বাঙালি শ্রমিক সব জেনে গেছে। বন্দর উত্তপ্ত। পলিটিক্যাল লিডাররা উস্কানি দিচ্ছে মজুরদের। সেখানে গোলাগুলি ধস্তাধস্তি হয়েছে। অস্ত্র এখন লুট হওয়ার আশঙ্কা। ব্লাডি লিডাররা মওকা খুঁজছে। টিক্কা খান কেবল কসাই প্রবৃত্তির নিষ্ঠুর খুনপিয়াসিই নয়। সুচতুর; শঠ; শৃগালমস্তিষ্কও বটে। নতুন প্লান কষে সে এত্তেলা পাঠায় সানগ্লাসকে। পরিস্থিতি প্রত্যুৎপন্নমতির সঙ্গে মোকাবেলা ও সামলানোর অর্ডার আসে। গগলসের আড়ালে সূক্ষ্ণ হাসির আভাস। মিশন বদলে যায়।

সানগ্লাস পরদিনও অস্ত্র দখলের নেবার প্লান এঁটেছিল। কিন্তু সময় বদলে গেছে। সানগ্লাসকে একদম বেখবর রেখে এক তরুণ বাঙালি ক্যাপ্টেন দলবল নিয়ে আক্রমণ করেছে জাহাজে। মাস্টারদা সূর্যসেন আর অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার চট্টগ্রাম। যুগন্ধর বিপ্লব ও বিদ্রোহের বন্দর। এখানে দ্রোহের মশাল জ্বলবেই। ক্যাপ্টেনের সাহসী বীরগাথার বুলেটিন মুখে মুখে শহরে ছড়িয়ে পড়ে হাওয়ার বেগে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় জনতা রাস্তায় নেমে আসে। জয় বাংলা ধ্বনি তাদের অনির্বাণ শক্তি।

সানগ্লাস কিংকর্তব্যবিমুঢ়। সিভিলিয়ান সম্পর্কে তার ধারণা কটু ও তিক্ত। দে আর গুড ফর নাথিং। তার নজরে, সিভিল লিডাররা ভেড়া বই কিছু নয়। ফৌজী ডান্ডায় সব ঠান্ডা। লাঠি মারো, ব্যাটন চালাও; বেয়োনেট চার্জ করো, গুলি মারো, সিভিলিয়ান আর তাদের অকর্ম্মার ধাড়ি লিডাররা তখন লেজ গুটিয়ে পাততাড়ি পালিয়ে বাঁচবে। এই মূল্যায়নই তার চুড়ান্ত। অত্যন্ত হিটলার ভক্ত। টর্চার +টর্চার+টর্চার= গুড গর্ভন্যান্স। তার আদর্শ হলো হের হিটলারের ডেজার্ট ফক্স জেনারেল রোমেল। ডেজার্ট ফক্স নামটাই প্রচন্ড আকর্ষণ তার। মরুশৃগাল। এই নাম তো তাকে এমনিতে দেয়া হয় নি। শিয়ালের মতো ধূর্ত। আফ্রিকা-লিবিয়ার ধুধু মরুভূমিতেই লুকিয়ে পালিয়ে লড়ে গেছে। বিনাশ করেছে ফরাসীদের। ফৌজী জেনারেল হবে রোমেলের মতো। এই আছে। এই নাই। সবাই তাকে দেখবে না। কিন্তু পরে জানবে, কমান্ডিং করেও সে ছিল নেপথ্যে। কাজ সারতে হবে চুপিসারে। কাজ সেরেই সটকে পড়তে হবে, কেউ যেন টের না পায়। খুনখারাপি-হত্যাবাজি সব করতে হবে সুকৌশলে। তার হাতে যেন রক্তের দাগ লেগে না থাকে। রক্তের দাগ থাকবে হাবিলদার-রিসালদারদের হাতে।

হিটলার সংক্রান্ত যাবতীয় লেখা তার সুখপাঠ্য ঘুম। তীব্র ঘৃনা নিয়ে লেখা হয়েছে; হিটলারকে ভয়ংকর দানব হিসেবে; নিষ্ঠুরতম মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেসব বই পড়ে সানগ্লাস মেজর তৃপ্তি পায় অপরিসীম। এদ্দিনে অনুসরণ করার মতো একটা লিডার পাওয়া গেছে। হের হিটলার। সেনানায়ক আবার ন্যাশনালিস্ট নাজি। এমন যুগলবন্দি তার কাছে আর হয় না। জেনারেল রোমেলের একটা কথা সে লিখেও রেখেছে তার ডায়েরীতে। সবাই চোখ কান খোলা রাখে। এটা যথেষ্ট নয়। খোলা রাখতে হবে নাকও। দেখলে শুনলেই চলে না। শুঁকতে হবে গন্ধ। বিপদকে অনেক সময় দেখা যায় না। শোনাও যায় না। কিন্তু বিপদের গন্ধ শোঁকা যায়। তাই নাক খোলা রাখা চাই।

মানুষটা বিচিত্র। নানা লেখা পড়ে। কাউকে বলে না। বন্ধুদের সঙ্গে হাসে না। সে হাসে অতি গোপনে। সানগ্লাস খোলার নাম নেই। বাথরুমে গেলেও সানগ্লাস। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক সময় খুলতেই হয়। তখন দেখতে পায় নিজের প্রতিবিম্ব। এক চিলতে বিদ্যুতের মতো হাসির রেখা ফুটে ওঠে মুখে। নিজেকে দেখে নিজের উদ্দেশে মোক্ষ আওড়ায়। উদ্দেশ্য হাসিলের মোক্ষম অস্ত্র হলো মওকা। এবং সেই মওকাকে সঠিক সময়ে সুচতুরভাবে কাজে লাগালে ভিক্টরি আসবেই। সাফল্য সুনিশ্চিত। একা একা হিটলার-লিটরেচার পড়ে। হিটলারের ভুল নিয়ে গবেষণা করে। তার অসম্ভব বেদনা, এমন মহান সেনানায়ক-ন্যাশনালিস্ট-বুদ্ধিবীর কেন বিশ্বযুদ্ধে হেরে গেল। কিছুতেই এই পরাজয় সে মেনে নিতে পারে না। তাই তার প্রানান্ত গবেষণা, হিটলারি ভুল নিয়ে। সানগ্লাস খুললেই  রহস্যময় হাসে, সে যদি কখনও মওকা পায়, ভুলগুলো করবেই না। সবকিছুর সে গন্ধ শোঁকে। বিপদ আঁচ করতে। আর মওকার সন্ধানে। 

অধস্তন ক্যাপ্টেনের পাক-অস্ত্রজাহাজে আক্রমণ একেবারেই তার মনোপুত হলো না। খুবই বিমর্ষ সে। এই কর্মটি ক্যাপ্টেন করবে, ব্যাপারটা তার মাথার ওপর দিয়ে গেছে। নাকখানা লম্বা করেও সে এই বিপদজনক কাজের গন্ধ শুঁকতে পারে নি। সূর্যসেন, প্রীতিলতা তার নজরে ডাকাত ছাড়া কিছু নয়। ওরা অস্ত্রলুন্ঠনকারী বর্গী দস্যু। আনসোশ্যাল এলিমেন্টস। যত্তোসব সমাজবিরোধী অপকর্ম।  চট্টগ্রামের লোকজন রাস্তাঘাটে পাকিস্তানি ফৌজীদের সাথে জঙ্গবাজি করবে, একেবারেই অবিশ্বাস্য তার কাছে। তার ধারণা ছিল, মুজিবের এইসব ভাষণটাষন; সাতই মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নিতান্তই আস্ফালন। এবারের  সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম; কোনো কেশদাম ছিন্ন করার সংগ্রাম। ব্লাডি সিভিলিয়ান; এন্টিসোশ্যাল পলিটিশিয়ানস। ফৌজীদের দেখলে সব উত্তেজনা-স্বাধীনতা সংগ্রাম গলে পানি হয়ে খালে বিলে জোয়ার ভাটায় মিশে সাগরে মিলিয়ে যাবে। মার্শাল শাসনের ওপর কোনো শাসন আছে নাকি। আইয়ুবি মার্শাল ডেমোক্রেসি হচ্ছে আদর্শ গণতন্ত্র। এরচেয়ে ভালো হচ্ছে ডান্ডা শাসন। মারো ডান্ডা, সব ঠান্ডা। ভালোভাবে দেশ শাসন ও জনশাসনের জন্য সামরিকবাহিনী নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম। পলিটিক্যাল পার্টির সুতিকাগার হবে ক্যান্টনমেন্ট। ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেবে ডেমোক্রেসি; ডেমোক্রেটিক পার্টি। ফৌজীদের হাতেই পার্টি খোলা ও বন্ধ করার চাবি থাকবে। নইলে দেশ ও কওম রসাতলে যাবে।

কিন্তু জিপ নিয়ে বন্দর শহরে বেরিয়ে যে চিত্র সে দেখতে পেল তা মোটেই তার ধারণা ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলছে না। অবিশ্বাস্য ঠেকল সবকিছু। না, এটা হতেই পারে না। তার কপালে ভাঁজ। সানগ্লাসের আড়ালে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল সে। কোথাও না কোথাও সামথিং ইজ গ্রেট রং।

চোখ তার গগলসের আড়ালে। কান খোলা। তদুপরি গন্ধ শুঁকে শুকে সে এগোচ্ছিল। শুকতে শুকতে একটা আঁচ সে পেল, এই অবস্থায় বন্দরে গিয়ে আর লাভ নেই। ওখানে গেলে উল্টোরাম অবস্থা হতে পারে। তার চেয়ে বরং হাওয়া কোনদিকে সেটা বোঝা দরকার। হাওয়া বুঝে মওকা মতো কাজ করতে হবে। মেজর জিপ ঘোরালো। বন্দরে গিয়ে আর কাজ নেই।  বরং শহরটা ঘুরে দেখা যাক। ব্লাডি সিভিলিয়ানরা কি করছে, জানা যাক। দেখা যাক। ব্লাডি সিভিলিয়ানদের কর্মকাণ্ড দেখে সে অবাক হয়ে জানতে দেখতে লাগল। আর শুকতে লাগল গন্ধ, মওকা কোন দিকে। তার যে থাকা চাই সেদিকেই। নিজ বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্য ধর্মবিশ্বাসীর; যোদ্ধার কখনওই নয়। তাকে থাকতে হবে সুযোগের অপেক্ষায় । নিরাবেগ নিরাসক্ত চিত্তে। 

(চলবে…)

অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন

Channel-i-Tv-Live-Motiom

শেয়ারTweetPin
পূর্ববর্তী

সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে পাক-ভারত উত্তেজনা

পরবর্তী

আসলাম চৌধুরীকে ১০ দিনের রিমান্ডে চায় ডিবি

পরবর্তী

আসলাম চৌধুরীকে ১০ দিনের রিমান্ডে চায় ডিবি

না.গঞ্জের ঘটনায় প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি হবে: শিক্ষামন্ত্রী

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

আজ স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

আগস্ট ২২, ২০২৬

মির্জা ফখরুলকে নেপালের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন

আগস্ট ২২, ২০২৬

রাজধানীতে মেঘলা আকাশ, কমবে দিনের তাপমাত্রা

আগস্ট ২২, ২০২৬

নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ও রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি

আগস্ট ২২, ২০২৬

সরাসরি ম্যাকাই: বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্ট

আগস্ট ২২, ২০২৬
iscreenads
চ্যানেল আই অনলাইন লোগো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংবাদ পোর্টাল. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT