চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবা (পর্ব: চার)

মিলন ফারাবীমিলন ফারাবী
১:৪৮ অপরাহ্ণ ০৫, মে ২০১৬
অন্যান্য, শিল্প সাহিত্য
A A

কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র নানাভাবেই মৃদু চাপ দিচ্ছিল। নিরাপত্তার কথা; প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী বলে কথা।

সে সব কথা কানেই তোলেননি আম্মা। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শেখ সাহেব। কিন্তু তার বউ ছেলেমেয়েরা আমমানুষ। তারা সবাই আমমানুষ কাতারে থাকবে।

সাধারণ ছিমছাম জীবনের সুখ উন্নাসিক প্রাসাদে কখনো আসবে না। তিনি আলীশান গণভবন, বঙ্গভবন কোথাও যাবেন না। ঢাকায় বত্রিশ নম্বর; গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ার সবুজ গালিচা – এই তার নিশ্চিন্ত আরাম। নিশ্চিন্ত ঠিকানা।

সংসার, সন্তান, ৩২ নম্বর সব আগের মতোই থাকল। আম্মা যেমনটা চাইলেন, বাবা দ্বিমত হননি। হাসুদের কখনোই বুঝতে ধাঁধা লাগেনি – তারা দু’জন সব সময় ছিলেন অপূর্ব মেলবন্ধনে একে অপরের সঙ্গী। বাবাও মনে মনে ৩২ নম্বর ছাড়তে চাননি কখনোই।

মিন্টো রোডের মন্ত্রীপুরীর বাড়ি; সেসব মায়ের কম চেনা নয়। অনেক চেনা। অতিথিশালার মতো সাময়িক; এই আছি – এই নাই। পাকিস্তান আমলেই মিন্টো রোডের মন্ত্রী প্রাসাদ বাবার চেয়ে আম্মার, হাসুর অনেক বেশি চেনা। ঝক্কি ঝামেলা যন্ত্রণা যা কিছু – আম্মা একাই সহ্য করে গেছেন বছরের পর বছর। সেই স্মৃতি কখনোই হাসুদের জীবন-অ্যালবাম থেকে মোছা যাবে না। মন্ত্রী-বেগম, মন্ত্রী-কন্যাপুত্র হয়ে ওরা ঢাকাতেই খুঁজে ফিরেছে ভাড়া বাসা। কী কষ্ট! কী ভোগান্তি।

৩২ নম্বর ঠিকানা একান্ত নিজস্ব। আম্মা সেখানে বাইগার তীরের প্রশান্তি ও স্বস্তি টুকরো টুকরো হলেও পাচ্ছেন। এই ঠাঁই মায়ের কাছে অতি মহার্ঘ্য।

Reneta

ঠাঁই-ছাড়া হয়ে ওরা দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হয়েছে অনেকবার। সেই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি দিয়েছে যে বাড়ি – আমৃত্যু তা আঁকড়ে থাকবেন – সেই মায়ের শেষ কথা।

সেই স্বপ্নসুখ-স্বস্তি-প্রশান্তি মোড়ানো গরীব রাজার পর্ণকুটিরে তবে কি কিছু হল?

হাজারো মাইল দূরে ব্রাসেলস-এ এ্যামবাসেডর হাউসে বসে কিছুই আন্দাজ করতে পারছে না হাসু। মন জুড়ে হু হু হাহাকার। কেবল একটা ব্যাপার ধারণা করতে পারছে – ওদের পরবর্তী গন্তব্য অজানা ও অনিশ্চিত। এটা কি অমূলক কিছু ভাবছে সে?

হয়তো কিছুই হয়নি। নিশ্চয়ই তাই হবে। ও আল্লাহ-তাই হোক। সবাই সুস্থ থাক। হাসুর দাদী শৈশবে বাবার জন্য অনেক দোয়া করতেন – সন্তান যেন তার ঘন চুলের মতো অগণন পরমায়ু পায়। তিনি নিজের আয়ুও সর্বদা যুক্ত করেছেন প্রিয়পুত্রের আয়ু ভাণ্ডারে। হাসুও বাবার কন্যা। হাসুও আকুল কান্নায় চাইছিল বাবার দীর্ঘ আয়ু। হাসু তার নিজের আয়ুও সদকা করল বাবার জন্য।

হাসু তার বাবার জন্য কেনো এমন অস্থির? তাকে ঘিরে ভয়ংকর কোনো বিপদাশঙ্কা তার মনে গেঁথে যাচ্ছে কেনো!

বিগ্রেডিয়ারের সেই রেড এলার্ট চিঠি বাবা স্মিত হাসিতে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। হাসুরাও বড় কোনো গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। কিন্তু এখন পত্রটি বড় বড় অক্ষরে দেখতে পাচ্ছে। অক্ষরগুলো ভেসে ফিরছে চারপাশে। উড়ছে। লাফাচ্ছে।

অক্ষরগুলো জীবন্ত হয়ে উঠলো কোন মায়াবলে। হায় অক্ষরগুলো তো কালো ছিল। কিন্তু লাল রঙ দেখছে কেনো সে! দুই/চারটি অক্ষর রক্তঝরা। বাবার ফুসফুস, শ্বাসনালী। রক্ত ঝরার দৃশ্য মানসপটে এমন জ্বলজ্বলে কেনো! বাবার সেই কষ্টের দিনগুলোয় হাসুও কষ্ট পেয়েছিল প্রচণ্ড। বাবার কষ্ট, বেদনা কন্যার অসহ্য। কিন্তু এখন দুঃস্বপ্নের মতো দৃশ্যগুলো অশ্রুভেজা চোখের সামনে ধূসর মেঘের মতন ভাসছে। নীল বেদনার অতল কুয়াশায় হাসু তলিয়ে যাচ্ছে। মাগো!

ছদ্মবেশী, বহুরূপী আততায়ীরা হাতের তালুতে, আঙুলে অতিক্ষুদ্র সূচ-অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে। সূচে বিষ ও নিঃশব্দ মৃত্যুর ভাইরাস। অদৃশ্য ছোবল। আততায়ীরা হাসছে। ওরা করদর্মন করতে, আলিঙ্গন করতে এগিয়ে যাচ্ছে আব্বুর দিকে। সরল মানুষটা নির্ভীক। কোমল নীল আকাশের উদার চিত্ত-নিষ্কলুষ। তিনি আমলে নিচ্ছেন না মৃত্যুভয়কে। হাসু চলচ্চিত্রের মতো দেখছিল যেন সবকিছু। বাবাকে বারণ করা দরকার। সে চিৎকার করে উঠলো, আব্বা সাবধান! ওই করমর্দন ও আলিঙ্গনে মৃত্যুফাঁদ।

হাসু হাহাকার করে উঠলো। আব্বু কিন্তু শুনতে পাচ্ছেন না। ঋষিশিশুটি নিষ্পাপ হাসছে।

এ্যামবাসেডর হাউসের গুমোট কাটছে না। দূরে ভ্যালির ঢেউয়ে লাল হলুদ পাতার অরণ্যে হালকা হাওয়া। পাতার কম্পনের শব্দ এত দূর থেকে শুনতে পাওয়ার কথা নয়। হাসু হঠাৎ শুনতে পেল শিরশির আওয়াজ। ঝরে পড়ছে দুইচারটি পাতা। বোটা ছেঁড়ার শব্দও শুনছিল। চারপাশ এখন বড্ড নীরব। বোবা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দু’বোন। চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে উষ্ণ জলে।

হাওয়ায় ভেসে এলো বিচিত্র এক শব্দ। খুব চেনা লাগছে। নৈঃশব্দ ও ব্যাকুল আকুতি – তার সঙ্গে শব্দটা যেন একাকার। শব্দটা কি আসছে বৃক্ষরাজির ঝরাইপত্র থেকে!

হাসু কি শব্দটাকে মিলিয়ে ফেলছিল শাদা সুপারি ফুল, নারিকেল কুঁড়ির সঙ্গে! দোতলা বাড়ির সমান লম্বা নারকেল বীথি; ব্যালকনি থেকে কাছেই দেয়াল ঘেঁষা তরুণ গাছটি উড়তে চাইছে আকাশ পানে। সুপারি তরুও বারান্দার সঙ্গেই। পরিচিত সেই শব্দ। সুপারি ফুল ফোটার শব্দ। মনোছবির সেই বাড়ি হাসুর চিরচেনা।

মনটা খুব আকুপাকু করছে – কোনো অলৌকিক শক্তিতে যদি এখন পৌঁছাতে পারত বত্রিশ নম্বর বাড়িটাতে।

বাবা কেমন আছেন, কি করছেন! মা , মাগো। রাসেল, ভাইটি হাসুর জান। কই আম্মা তো দিব্যি সুস্থ। শয়ন কক্ষ থেকে বেরিয়ে খাবার ঘরে এসে দাঁড়ালেন। আবদুল, সেলিম.. .. .. ফালতু মিয়া – কাউকে ডাকলেন। তার হাতে পানের বাটাও তো দেখা যাচ্ছে। কয়েক খিলি পান সাজিয়ে নিয়েছেন নিজ হাতেই। এক খিলি নিজের মুখের মধ্যে রয়েছে। চিবুচ্ছেন। পান মায়ের একমাত্র আনন্দ। একটু আলগা জর্দা আঙুলে নিয়ে মা এক টিপে মুখে পুরে নিলেন। আহ কি চমৎকার গন্ধ। পান, জর্দা হাসুর কিন্তু একদম পছন্দ নয়। তারপরও বাহারি জর্দার বাহারি গন্ধে সে এখন বিমোহিত। এমনটা আগে কখনো অনুভব করেনি।

পুরো বাড়িময় আলো আলো। এত আলো কোত্থেকে এলো? সময়টা ঠিক ঠাউর করতে পারছে না।

এই সময়ে মা কোথায় আছেন? রান্নাবান্নার কোনো আয়োজন! আব্বার কি কোনো বিশেষ ফরমাশ? আম্মার রান্না তার অসম্ভব পছন্দ। তার স্পেশাল ফরমাশ আছে কিছু! অবশ্য তা এমন জটিল কী! শোল, মাগুর, কই মাছের ঝোল; সর্ষে বাটা দিয়ে ইলিশ; সবজি, ভর্তা কিছু একটা পাতে থাকলে খুব ভালো। সঙ্গে শাদা ভাত। আটপৌরে আব্বার আবদার।

মা আজ কইয়ের ঝোল করবেন; বাইগার-মধুমতির অথৈ জলের কই। আর বিলের কইয়ের যেমন সাইজ, তেমনি সুস্বাদ। বাড়ি থেকে কেউ রামকই নিয়ে এসেছে বুঝি! আম্মু তাই দারুণ ব্যস্ত।

আশ্চর্য। হাসু এতক্ষণ খেয়াল করে উঠতে পারেনি – খাবার ঘরের পূব দিকটায় আব্বু মোড়ায় বসে। পরনে লুঙ্গি। গায়ে হাতাঅলা গেঞ্জি। কী করছেন? তার সামনে ট্রলি ট্রে। তাতে খাবার। গ্লাসে পানি; চুপচাপ তিনি কী খাচ্ছেন? মিষ্টি!

মিষ্টি নয় দুধভাত। কলাটা ছিলে দিলেন পাশে দাঁড়ানো আম্মু। খেজুর গুড়ের গোল ছোট্ট চাকাটিতে কামড় দিলেন তিনি। দুধকলা গুড় ভাতে বাবার প্রিয় রসনা।

মা কী যেন বললেন! কাকে কী বললেন শুনতে পেলো না হাসু। দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু কিছু শুনছে না। মায়ের পরণে সূতি শাড়ি। পাড়ের দিকটা হালকা কাজ। মা মানেই তো হালকা রঙের সুতি শাড়ি। আর তাতেই কি উজ্জ্বল মায়াবতী।

কামাল কোথায়! ওর ঘুম ভেঙেছে নিশ্চয়ই। তবে চারপাশে এখন যতো আলোÑকামালের এখন স্থির থাকার কথা নয়। এতক্ষণে ছুটে গেছে সংগঠনের কাজে। প্রতিদিনই সে কষ্টে হিমশিম। দিনরাত পাল্লা দিয়ে খেটে চলেছে। বৌকে সময় দিতেও বিশেষ পারছে না। কামাল হাসুর কমল কোমল বাল্যদিনের সঙ্গী। ওরা দু’জন গুটি পায়ে টুঙ্গিপাড়ার উঠানে, মাঠে কত ছুটাছুটি করেছে। প্রজাপতি ধরতে ছুটেছে। হাসু ডাঙ্গায় ওঠা হাঁসের পেছনে দৌঁড়েও ধরতে পারেনি সেটি। তই তই শব্দ করেছিল। মুক্তো উন্নত গ্রীবা নাচিয়ে হাঁস তবু নেমে গেছে জলে। কামালের তুলতুলে কোমল হাতের তালি। ক্ষেপে গিয়ে আপু বকুনি দিল। পরক্ষণেই বিলের বুকের পদ্ম দেখতে গেছে। পদ্ম, শাপলা ফুলরাশি দেখে কামাল খুব খুশি। আপুর কাছে এবার আবদার – একটা শাপলা ফুল তার চাই-ই।

আপু ভাইটিকে কেমন করে খুশি করে! ঝিলে নামবে কে! কাছে পিঠে বড় কাউকে দেখছে না। বাড়ি জুড়ে এত মানুষজন! তারা গেল কোথায়!

হাসু নিজে পানিতে নামবে, সাহস হচ্ছে না। নিরাশই করতে হল ভাইকে।

কিন্তু কামাল সামান্য যখন বড় হলো, হাসু আপুর যা চাই সে তা এনে দেবেই। আপুকে খুশি করতে সে প্রাণান্ত।

বাড়ি সামনেই উঠোন। দূর্বাঘাস। শাদা-সবুজ দূর্বাফুল। পাশেই ছোট বাগান, ঝোঁপ। নীল, শুভ্র, লাল গোলাপি, সবুজ ফুল ও পাতার কত রঙ। এই তো চোখের সামনে সেই দিনের উৎসব উৎসব কত ছবি। এবাড়ি ওবাড়ি। হাসুরা হরিণ পায়ে ছুটে হয়রান। বাইগার তীরের সেই ছবিগুলোয় আনন্দের শেষ নাই।

কামাল ছুটছে। দু’জনে যা-ই দেখছিল তাতেই অসীম খুশি। কামাল যা-ই পাচ্ছে হাতের কাছে, সব আপুর কাছে এনে রাখছে। চারদিকে গুন গুন করছে ফাল্গুন। উষ্ণ ফেলালিন কিংবা উল-সুয়েটারের মিঠে ঠাণ্ডা সেই দিনগুলি কেবলই বসন্ত। অনন্ত বসন্ত।

বাড়ির পাশেই আম বন। গোলাপজামের ফুল তো নয় শন পাপড়ি। পলাশ শিমুল-তুলা গাছে লাল ফুল। কাছে কোথাও রক্ত কাঞ্চনের ডালে কোকিলের কুহু কেকা। দুলুনি। সবকিছু আপু ও ভাইটি দৌঁড়ে দেখছে, জানছে। নারকেল গাছে কাঠঠোকরার আওয়াজে কামালের কানখাড়া। কোত্থেকে শব্দটা আসছে? এই খুঁজি। সেই খুঁজি। এ গাছে ও গাছে। কাঠঠোকরার খোঁজ পায় না ওরা। অথচ আওয়াজ শুনছে ঢের। কানের কাছেই, অথচ চোখের সামনে ঠক্কুরে ঠোঁট দেখে না।

হাসু কিন্তু পাখিটাকে চিনে রেখেছিল। কাকা তাকে দুই/তিন বার দেখিয়েছেন। সেই দেখার আনন্দ কামালকে দিতে না পেরে ওর বড্ড মন খারাপ। হাসু শিমুল, পলাশ গাছ চেনে। অশোক, রক্তকাঞ্চন ফুল চেনে। কদম গাছের ফুল দেখে কতই উৎফুল্ল। টিয়া, কোকিল, মৌটুসি, রাঙা হালতি, শালিক পাখি চেনে।

কামালকে সে সব দেখাচ্ছিল, চেনাচ্ছিল। শালিক দেখলেই সে ধরতে চায়। নিশ্চয়ই চড়ুইটিকে ধরে আপুকে দিতে চায়। আপু তাকে কাঠঠোকরা দেখাতে না পারলেও সে বোনের জন্য ঝরে পড়া উড়ে আসা রক্ত কাঞ্চনের পাপড়ি, লাল শিমুলের উপহার মুঠোয় করে নিয়ে আসে। মুক্তো গ্রীবা রাজহাঁসের পেছনে আপুকে ছুটতে দেখেছে অনেকবার। হাঁস নিশ্চয়ই আপুর বড় পছন্দ। ছোট্ট বাবুটা হাঁসের কাছে ছুটে গেলেও ওরা পানিতে পালায় না। কামালের সঙ্গে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। কামাল দু’হাতে বেড় দিয়ে ধরতে চায়। হাসু আপুকে দিবে বলে।

হাসু আপুকে কামাল হাঁস দেবে। টিয়ার লাল ঠোঁট দেবে। শালিক চড়ুই সব দেবে। যে জিনিসটা আপু দেখাতে পারল না, সেই কাঠঠোকরা ধরে তাও দেবে।

কাঠঠোকরা তুই আমাকে কেমন করে ধরে দিবি রে কামাল!

সে তো মাটিতে হাঁটে না। নামে না। নারকেল গাছের মগডালের কাছে কেবল ঠক ঠক। টুক টুক। এত উপরে থাকে যে খালি চোখে সেটির দেখা পাওয়াই ভার।

কিন্তু কামাল পিছ পা হওয়ার নয়। তার মাঝে উৎসাহ অদম্য। নারকেল গাছের গোড়ায় ছুটে যায়। গাছে উঠতে বাবুটির অক্লান্ত চেষ্টা।

আপু ভীষণ খুশি। ভাইকে সে অনেক কষ্টে থামায়। ততক্ষণে কামালের কোমল বুকে গাছ-বাকলের আঁচড়ের লাল দাগ।

কামাল আপুর জন্য এত এত করতে চায় কেনো! তার আপুর এমন একটা জিনিস আছে যা তার নেই। কেমন করে যেন সে জেনেছে হাসু আপুর একটা আব্বু আছে। কামালের আব্বু নেই।

কী ভয়ঙ্কর! এমন আশ্চর্য ধারণা কেনো কামালের!

আব্বু কী জিনিস, তা তো কামাল জানে না। আব্বাকে সে জন্মের পর এখনো দেখেনি। হাসুর এই ভাইটি রাম সরল। আব্বু যদি সত্যিই থাকত – নিশ্চয়ই দেখতে পেত।

হাসু তাকে বোঝায়, তার আব্বা যে কামালেরও।

-কই সে! কোথায়! কামাল জানতে চায়। আব্বু কেমন হয়, কামাল যে দেখেইনি।

ওদের আব্বু কোথায় – কেমন আছেন তিনি – কী খাচ্ছেন – সেটা ক্ষুদে হাসুর কাছেও পরিষ্কার নয়।

তবে তিনি আছেন, হাসু নিশ্চিত। নিশ্চিত না হয়েই বা উপায় কী! হাসু যে তাকে দেখেছে। আদর নিয়েছে। চকলেট, মিষ্টি, কলা-গুড় মাখানো দুধভাতের লোকমা খেয়েছে বাবার হাতে।

উঁচা লম্বা – কী সুন্দর দেখতে আব্বুটা। তার গলার আওয়াজ গম গম। এমনও মনে হয়েছে – আব্বু কি একটা মাইক!

আব্বু মানেই বাড়িতে অনেক লোকজন। মায়ের হাতের অপূর্ব সব তরকারি। আব্বু মানেই বাইগার ঘাটে বাঁধা সারি নৌকা।

কামালকে সব বলে সে। প্রবল কৌতুহলে চোখ বড় বড় করে সব শোনে। আপুর গল্প যখন শেষ, কামালের মুখ শুকনো।

মন খারাপ।

আব্বু কি সত্যি সত্যিই আছে, কই সে?

হাসু আপুকে দুধ কলা ভাত খাইয়েছে – সে কি সত্যি!

দেখতে সে উঁচা লম্বা; তালগাছের চেয়েও বড় কি!

হাসু কামালকে অবাক ও চমকে দিতে জানায় – তালগাছের চেয়েও অনেক বড়। হাত দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে দেখায়।

তারপর খিলখিল হাসে নিজের কথায়। অমন বড় গাছটা ছোট হয়ে না এলে কেমনে দেখায় – তার চেয়েও কত বড়।

বাবা কাছে থাকলে ঠিকই তার মাথার উপর, চুলে হাত রেখে দেখাতে পারত ঠিক।

বাবা দাঁড়ালে পাঞ্জাবী পর্যন্ত হাতে পায়। তার উপরে বাবার মুখটা যে আকাশের নীল জমিনে হাসছে।

হাসুর কাছেও কি বাবা অনেক দূরের তারা?

না, বাবার কাঁধে সে চড়েছে। বাবার কোলে বসেছে। বাবার হাঁটুর ওপর শুয়ে থেকেছে। বাবার গলায় আমার সোনার বাংলা কলি শুনেছে। বাবা বসলে চুলে হাত বুলিয়ে দেখেছে। সত্যিই কি সে ধরাছোঁয়ার মতো মানুষ তো!

তাকে নিয়ে হাসুরও তো সংশয়। বাবাকে কাছে কই পায়!

সেই বালককে তখন কেমন করে বোঝায় – ওদের সত্যিই একটা বাবা আছে। সেই বাবা খুব খুব বেশি ভালো। সেই বাবা কখনো বকা-শাসানি দেয় না। কেবল আদর করে।

কিন্তু কামালের কাছে তিনি রূপকথার ঘোড়সওয়ার। তার কাছে সবই বিস্ময়। হাসুর মনেও প্রতিজ্ঞা। ভাইকে সে বাবা দেখিয়ে ছাড়বেই। তার যা আছে, ভাইটির তা নেই – সেকি হয়!

সত্যি বলতে কি, আব্বা তখন তার কাছেও যেন সফেদ পাঞ্জাবীর স্পর্শ। তার জন্ম নেয়ার দিনগুলোয় কাছে ছিলেন না। কলকাতায়। সদ্য মুক্ত ভারতবর্ষে দু-দু’টি নতুন সূর্য। কলকাতায় নানা গণ্ডগোল। রক্তপাত। দাঙ্গা। বাবার শাদা পাঞ্জাবী শান্তি-অহিংসার পক্ষে। তিনি মানুষের পক্ষে। জীবনের পক্ষে। তিনি রুখে চলেছেন দাঙ্গা-সংঘাত সম্প্রদায়গত হানাহানির হিংস্র থাবাগুলো।

স্নেহ-কন্যার জন্ম নেয়ার সুখবর তিনি পেয়েছেন। কিন্তু মানবতার শিখা জ্বালানোর মিশন ছেড়ে তার আসার ফুরসৎ কই!

তারপরও বাবাকে ছোট্ট হাসু কাছে পেয়েছে। বেশ ক’বার। যদিও আঙুল গুনেই সেই সুখানুভূতির বিবরণ দেয়া সম্ভব। কিন্তু কামাল কিস্যুটি পায়নি।

সুযোগটা এলো। আব্বু আসবে। দেখতে পাবে হাসুরা। তাদের প্রাণভোমরা পাখিটিকে আইয়ুব শাহী আটকে রেখেছে জেলের মধ্যে। তখন জেল কী জিনিস, একদম বুঝতো না ছোট্ট বালিকাটি। তবে সুখের জায়গা নয়, সেটা জেনে কষ্ট পাচ্ছিল। ওরা ভালোমন্দ প্রতিদিন খাচ্ছে; আব্বুর পাতে ভালো খাবারটা দেয়া যাচ্ছে না; মাকে দেখেছে, সেজন্য খুব মন খারাপ। কখনো তিনি নীরবে কাঁদছেন। তখন বুঝলো, জেলে আব্বার খাওয়ার নিশ্চয় খুব অসুবিধা। খুব কষ্ট।

সেই দুঃখী আব্বাকে দেখতে ওরা দূরের ঢাকায় যাচ্ছিল।

বাইগার তীরের সবুজ শ্যামল বাড়ি থেকে ঢাকা অনেক দূরের অচিনপুর। দাদা যোগাড় যন্ত্র করলেন। বড় একটা নৌকা নেয়া হলো। তাতে দাদা-দাদী আম্মার সঙ্গে ওরাও চড়ল। মাঝি ও দাঁড়ির নাম মুহাম্মদ না সেকান্দর। কালো কুচকুচে তেলতেলে গায়ের রং। ওরা ভেসে বেড়াচ্ছিল। বৈঠার ছপাত ছপাত শব্দ। লগি ঠেলা। আরও চমৎকার সেই গুণটানা। কালা সেকান্দার নদীর তীরে তীরে একটা দড়ির মাথায় নৌকাটাকে বেঁধে নিয়ে টেনে নিচ্ছে একাই। ওমা! কি শক্তি! নদীর আকাশে ও তীরে নানা পাখি – বক, বলাকা, গাঙচিল। আঙুল উঁচিয়ে চিল চিল বলে কামালের উল্লাস। ওরা নৌকার পাটাতনে খুব উত্তেজিত। বাবাকে দেখবে – কখন দেখবে – অপেক্ষার তর আর সয় না। বাবার মুখের ছবি মনের মধ্যে এঁকে জেগে আছে – আবার পাটাতনে ঘুমাচ্ছে।

এই ছবি বড় সত্য। এই ছবি কখনো মুছে যাবে না। বাইগার, মধুমতী, পদ্মা নদীর সঙ্গে সঙ্গে ওরা বাবার ঠিকানার খোঁজে ভেসে চলেছিল।

ঢাকার ঘাটে অন্য পৃথিবী। দর দালান, রাস্তাঘাট, লাইট; কুয়াশার মধ্যে ঘুমন্ত এক শহর মনের মধ্যে এখনো উঁকি দিচ্ছে হাসুর। কী সুন্দর সেই নদী – যার তীরে কত বাড়িঘর।

কিন্তু এই ঢাকা মোটেই ভালো না। সেবার বাবার সঙ্গে দেখা সেখানে মিললো না। ওই শহরে তাদের বাবা নেই। ওরা তার খোঁজে রাত দিন ভাসতে ভাসতে এলো – মানুষটাকে দেখাবে কামালকে। সে কত্ত আনন্দ পাবে বাবাকে দেখে। কত বড় একটা বড় ঘটনা – অথচ তিনি সেই শহর থেকে কোথায় হারিয়ে গেছেন।

বাবাকে দেখতে আজ পাচ্ছে না – মর্মে মর্মে বেদনা পাচ্ছিল। ওরা দু’জন ভীষণ মনমরা। দাদাজী নাতীদের কষ্ট বেশ বুঝেছিলেন। তিনি যখন বললেন, তোর আব্বা গোপালগঞ্জ সদরে। বাড়ির কাছেই সে যাচ্ছে। কোথায় যে মনের কষ্ট উবে গেল। কেনো এমন হয় – আব্বু ওদের বাড়ি গেছেন, আর তারা কিছু জানে না। কী আশ্চর্য!

আবার নৌকায় ভেসে চলেছে। নৌকার দু’চোখ থেকে নদীর তীরের দৃশ্য অদ্ভুত। অনেক দূরে দিগন্ত। নীল আকাশে তুলা তুলা মেঘেরা। আকাশ যেখানে শেষ – সেখানে নারকেল সুপারি তাল-হাজারো গাছপালার ঘনজঙ্গল। সবুজ, কালচে ভরা সবুজ। তার পেছনে কোথাও কোথাও দূরে ঘন নীল, কালো জঙ্গলের সারি।

নৌকায় ভেসে চলেছে। আকাশ ও গাছেরা সঙ্গে সঙ্গে উল্টো পথে ছুটে চলেছে। গোপালগঞ্জ সদর মহকুমা শহর। সদ্য দেখে আসা ঢাকার তুলনায় কিস্যু না। ওই রকম স্বপ্নে দেখা উঁচু বাড়িঘর এখানে তেমন নেই।

তবে ইটের ঘর, টিনের ঘর, সরু রাস্তা ধরে ওরা হাঁটছিল। মন আশ্চর্য আনন্দে ভরে গেল।

লোকাল থানা চত্বরে বাবার অপেক্ষায়। বড় একটা পুকুর। ওপাশে বিরাট খোলা মাঠ। বাবাকে দেখার সোনালি মুহূর্তটি তখনও আসেনি। কিন্তু মনের আনন্দ ধরে রাখতে পারছিল না। ফড়িং এর পেছনে ছুটছিল। আর আব্বা আব্বা গুঞ্জন তুলে চলছিল। কামালের মুখেও বোল ফুটছে। সেও আব্বা আব্বা বলে চলেছে।

অবশেষে বাবাকে দেখতে পেলো। তখন; হাসুর সারা মুখে ঝরনাধারার খুশি বইছে। তিনি আদরে আদরে ভরিয়ে দিলেন প্রিয় কন্যাকে। পুত্রকে দেখে তার চোখে পলক নেই। কে এই ভাবুক শিশুটি? তার মতোই মুখ – তার মতো গড়ন চেহারা।

দু’আত্মজকে অনেকক্ষণ বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন। হাসুদের ঘিরে এমন আষ্টেপৃষ্টে বাবার হাতের বাঁধন; কেউ যেন তার কাছ থেকে ওদেরকে আর দূরে নিয়ে যেতে পারবে না। আব্বার চোখে পানি। হাসুকে, কামালকে আব্বা প্রাণ ভরে দেখছেন; মনে হচ্ছিল মস্ত আরেক শিশুর বুকে ওরা ভাইবোন চড়ে বসেছে।

বাবার অঢেল আদরে কামাল গেল থমকে। আব্বা তাকে আব্বু বলে ডাকছেন। সে কোনো জবাব দিতে পারছে না।

আব্বা আছেন কাছেই। থানা কম্পাউন্ডে, মাঠে, পুকুর পাড়ে ওরা ছুটে বেড়াচ্ছিল। আব্বার কাছে যাচ্ছে, আবার খেলতে ছুটছে। তিনি দাদা-দাদী, মায়ের সঙ্গে কথা বলছেন।

কামালের সঙ্গে হাসু ফুল, পাখি, ফড়িং নিয়ে মত্ত। তার মুখে শ্লোগানের মতো অনবরত ‘আব্বা আব্বা’ শব্দ ফুটছে।

তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে না। তিনি ওদের সঙ্গে যাবেন না। তাই যতোটা পারে প্রাণ ভরে চোখের সামনে জীবন্ত হাসিখুশি বাবাকে চাতক পাখির মতো দেখে চলেছে।

কামাল কিন্তু এখন বেশ গম্ভীর। অত্তটুকুন বাচ্চাটার কেনো মন খারাপ? কি হল! আগে তো হাসুর সঙ্গে আব্বা আব্বা তাল দিচ্ছিল।

এখন ওর সঙ্গে খেলছে-ছুটছে বটে। কিন্তু বোল ফুটছে না।

কী ব্যাপার ভাই, কী হলো!

কামাল কিছু বলে না।

বেশ জড়োসড়ো। কিছু একটা সে বলতে চায়। বলবে কি বলবে না তাই ভাবছে। শেষে আধো আধো বোলে বললো, হাসু আপু,ও হাসু আপু! (চলবে…)

অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন

Channel-i-Tv-Live-Motiom

শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

অযু করার সময় বজ্রপাতে মাদ্রাসার ৩ ছাত্র নিহত

জুন ২১, ২০২৬

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব ভৈরবের নতুন কমিটি, পরিবেশ রক্ষায় কর্মপরিকল্পনা

জুন ২১, ২০২৬

শাইখ সিরাজের সাথে ইরির বাংলাদেশ প্রধানের সাক্ষাত

জুন ২১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বিদেশগামীদের দক্ষ করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী

জুন ২১, ২০২৬

প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জুন ২১, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT