বাইগার নদীর কাকচক্ষু জল ছুটে চলেছে দূর দক্ষিণে। পশ্চিমের দিকটায় ঘন নিঝুম জঙ্গল। ভীষণ সবুজ। তাল তমাল হিজল সুপারির সারি। তার আড়ালে টুনি খাল। পুবের কোণায় আদিগন্ত শস্যক্ষেত। শিশির ভেজা ভোর রাতে জল জঙ্গলে হঠাৎ পাখির উড়াল। কাছে পিঠে ডেকে উঠল বিষণ্ণ ডাহুক। একরত্তি একটা রাঙা হালতি উজান আকাশ থেকে উড়ে এসে মাটিতে আছড়ে পড়ে গোঙাতে লাগলো। কী হল রাঙা হালতির! কয়েকটা ধানশালিক সেখানে কোত্থেকে হাজির। মৌন অচঞ্চল। বাইগার স্রোত কেমন উদাস, উচাটন। অশ্রুসজল ধারা শ্লথ ও শম্বুক।
ব্রাসেলস-এ তখন ভোর। মন তেমন একটা ভালো নেই। সোমবার কথা হয়েছিল মায়ের সঙ্গে। মা খুব কাঁদছিলেন। মাকে কখনোই এমন কাঁদতে দেখা যায় নি। মা, মাগো। মায়াবতী। দয়াবতী। ভীষণ নরম ও কোমল। একই সঙ্গে দৃঢ়, অবিচল। শত বিপদ বিপত্তির মুখেও কখনোই মাকে সামান্য ভেঙ্গে পড়তে দেখে নি কেউ। বাবার মাথার উপর তখন হুলিয়া। বাবা যখন জেলে, আম্মা এবং হাসুরা মগবাজারে, পল্টনে খুঁজে বেড়িয়েছে এক চিলতে আশ্রয়। কত কষ্ট। লাঞ্ছনা গঞ্জনা। ভয় উদ্বেগ আতঙ্ক। একটু দমে যাননি আম্মা। হাসুই তখন সামান্য যা একটু বড়। অন্যরা গুটুল-মুটুল, এতোটুকুন। মা সবাইকে এক রকম আঁচলে বেঁধে রেখে যাচ্ছে এ বাড়ি ও বাড়ি। কিন্তু বাড়ি ভাড়া দিতে বাড়িঅলাদের খুব ভয়। মা হাসিমুখে সয়েছে সব কষ্ট। দুঃখ-বেদনা তাকে কাবু করতে পারেনি। আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে পা পাথর। তরপরও ধৈর্য হারান নি তিনি। সন্তানদের গায়ে দুঃখকষ্টের কোন উত্তাপ লাগতে দেননি। সেই আম্মা সাত সাগর তের নদীর ওপার থেকে সন্ধ্যায় ফোনে ভেঙে পড়লেন কান্নায়; নাতি তার মায়ার বাঁধন থেকে দূর বিলাতে। নাতির জন্য সেকি আকুলি বিকুলি। মাত্র কয়েকটা দিন না দেখতে পেয়েই তার সেকি অভিমান। মায়ের কান্নায় হাসুুও বিচলিত হয়ে পড়েছিল। মাকে সে যতোই বোঝায়- মাত্র আর কয়েকটা দিন। তারপরই তো তোমার প্রাণের নাতিকে নিয়ে দেশে ফিরছি। কোন কাজ হয় না তাতে। মায়াবতীর মন কি সে শান্তনায় শান্ত হয়! তিনি আরো আকুল হয়ে পড়ছিলেন। আম্মার কেবলি এক কথা – জয়! আমার জয় সোনা। কোথায় আমার জয় সোনা।
সেকি আকুতি! মনে হচ্ছিল, হাসুরা বুঝি ধরা-ছোঁয়া, দেখা-শোনার জগৎ থেকে অনেক দূরে কোন অচিন বিভুঁইয়ে চলে এসেছে – জয়ের সঙ্গে আর বুঝি দেখা ও কথা হবে না। ফোনে জয়ের আদুল আদুল কথা শুনেও মন ভরেনি আম্মুর। নাতিকে তার বিশাল আঁচলের ওম-উত্তাপ দিতে মা ভীষণ উন্মুখ-
তাকে যথেষ্ট বোঝানো হচ্ছিল – কিন্তু উতলা-উচ্ছ্বাসে একটুও বাধ থামানো যায়নি। মা ভীষণ কাঁদছিলেন। খুব ছটফট করছিলেন। হাসুর মনটাও সেই থেকে ভালো নেই। আম্মার কান্না তার মন ভিজিয়ে রেখেছিল। মায়ের যেমন জয়, হাসুর মনটা তেমন রাসেলের জন্য টানছিল। সোনা ভাইটি তার খুব ছোট্ট। কী মিষ্টি। একদম বাবার মতোন দেখতে। জয় যখনই হাসুর কাছে, জয় যখনই হাসুর কোলে উঠছে; নামছে-ছুটছে নীল দিগন্তের দিকে; রাসেলকেও কাছে পেতে এবং আদর করতে তার মন খুব চাচ্ছিল। এই তো ক’দিন আগে কার্লোস রুয়েতে সুপার মার্কেটে গিয়েছিল ওরা। বেশ সময় নিয়ে ঘুরে ফিরে দেখছিল সবকিছু। কী সুন্দর। ভালোই লাগছিল। বাচ্চা কাচ্চা ভাই বোন ভাবী-সবার জন্য জামা কাপড় কিনল হাসু। ছিমছাম সাজানো এক জুতার দোকানে গিয়ে দেখে সেখানে ‘মূল্য হ্রাস’ চলছে। চমৎকার সুন্দর সব জুতো। দাম অবাক করা কম। সবার জন্য জুতা কেনা হল। কিনলো জয়ের জন্যও। রঙটা খুব উজ্জ্বল। চকমক করছিল। ডিজাইনও মনকাড়া। একই রঙ ও ডিজাইন মিলিয়ে রাসেলের জন্যও কিনলো একজোড়া। ক্ষণিকের জন্য বড্ড ভাবালুতা বুঝি পেয়ে বসেছিল তাকে। দিব্যি সে দেখতে পাচ্ছিলো – রঙিন সেই জুতা পরে রাসেল বিপণী বিতানে হাঁটছে। হাসছে। খুব খুশি। আপু আপু বলে সলাজ ভঙ্গিতে হাসুর হাতের সঙ্গেই যেন এতোটুকুন ভাইটি।
তার চোখ, চোখের চাউনি কী অপূর্ব উজ্জ্বল। শান্ত। শখ করেই নাম রাখা হয়েছিল রাসেল। নামটা হাসুরও খুব পছন্দ। দার্শনিকসুলভ দ্যুতি রাসেলের চোখের তারায় দেখে সবাই একটা স্বপ্ন মনের গভীরে পুষছে। ভাইটি একদিন পান্ডিত্য ও জ্ঞানে খ্যাতিমান হবে সারা দুনিয়ায়। রাসেলের মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে আব্বাকেও দেখা গেছে – তার মুখে প্রশান্তিময় হাসির আভা। আব্বার চোখেও মিষ্টি এক স্বপ্ন।
জুতো জোড়া রাসেলের বরাবর হয় কিনা; নাকি একটু বড়সড়ই যেন – দোনোমনা করছিল হাসু। শেষে ধারণার চেয়ে সামান্য বড়ই নিলো। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখলেও কখন যে বড় হয়ে যাচ্ছে ভাইটি। মাকে মার্কেটে কেনাকাটার কথা যখন বলছিলো; মা পাত্তাই দিলেন না তাতে। তিনি অবুঝ শিশুর মতো কেবলি কাঁদছিলেন।
মায়ের এই প্রচন্ড অভিমান, কান্না হাসুর কাছে অবাক রকম লাগছিলো। কোন সান্তনা দিয়েই শান্ত করা যাচ্ছিল না তাকে।
বিদেশে এসে হাসুরও বা কি হল! তার মনটাও উদাস উদাস লাগছে। এই তো মনমরা মায়ের মুখটা দেখতে পাচ্ছিল যেন চোখের সামনেই। এই তো বাবা বারান্দায়। লনে ইজিচেয়ারে আধশোয়া। মুখে চুরুট। গভীর চিন্তামগ্ন। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের লাল সবুজ একটা দেশ। সাড়ে সাত কোটি মানুষের বুকভরা ভালবাসা; তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন। তাদের আজকের বর্তমান ও ভবিষ্যতের শান্তিসুখ – আব্বা একা এবং একা তার বিশাল বুকের ভেতর সব কিছু ধারণ করে একান্ত ধ্যানে ঋষী। বাবার সেই ঋষি-ধ্যানী মৌন গম্ভীর মুখটা দেখতে পাচ্ছিল হাসু। বাংলা ও বাঙালির জন্য তিনি এমনই মগ্ন; হাজারো জটিল কর্মব্যস্ততার মাঝে একটু ফুরসৎ পেলেও তিনি নির্ঘুম। ওই তো দেখতে পাচ্ছে হাসু – বাবা পাঞ্জাবীটা গায়ে চড়িয়ে রাতের আলো আঁধারীতে বেরুলেন ৩২ নম্বর থেকে। একা রাস্তাটা চকিতে পেরুলেন। সামনের লেকের জল শান্ত। নিশ্চয়ই প্রিয় মাছগুলোর কথা মনে পড়েছে আব্বার। পাড়ে দাঁড়িয়ে খাবার বিলোচ্ছেন তিনি। লেকের পানিতে সাড়া পড়লো। পানি কেটে কেটে ছুটে এসেছে মাছেরা। ওরা মৃদু আনন্দ কলরব তুলে আদার খাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে ঋষির মুখে অনাবিল প্রশান্তি। তার চোখে উজ্জ্বল দ্যুতির বিচ্ছুরণ। তিনি এই প্রশান্তি দেখতে চান ছাপান্ন হাজার মাইল জুড়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের ক্লিষ্ট জীর্ণ মুখে।
হাসু দেখতে পাচ্ছে – বাবার চোখে ঘুম নেই। বাবার চোখে ও হৃদয়ে কেবলি বাংলা এবং বাংলা।
লেক পাড় থেকে ধীর পায়ে তিনি ফিরছেন সামনের আঙ্গিনা পেরিয়ে নীচতলার খোলা বারান্দায়। হঠাৎ কি একটা ডাক শুনে তিনি সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছেও উপরে উঠলেন না। বাগানের দিকে যাচ্ছেন। পা রাখছেন মাটিতে। বাগানের নানা ফুল, কামিনী গাছ; সামনে থেকে মালতি লতা লতানো ছন্দে লাফিয়ে উঠে গেছে ছাদে। বকুলগাছে দুধশাদা গন্ধফুল। পায়ের নিচে মাটির চিরচেনা আদিম গন্ধ। বুকভরে নিঃশ্বাস নিলেন বাবা। একি মালতির একটি লতা আশ্রয় আঁকড়ে ধরতে না পেরে গড়িয়ে যাচ্ছে মাটিতে। রমা কিংবা সেলিম আছে কাছে পিঠেই। বাবা কি ভাবছেন – অনুচ্চ কন্ঠে ওদেরকে ডাকবেন। না থাক। ওরা বিশ্রাম নিচ্ছে নিক। সারাদিন এটা সেটা খায়খাটুনি করে। ওদেরও তো আরাম বিশ্রাম দরকার। বাবা উপুর হয়ে পরম মমতায় তুলে নিলেন ধুলায় গড়ানো লতাটা। তারপর গোটা গোটা হাতে মাতৃলতার সঙ্গে জড়িয়ে দিলেন সেটিকে। ভালো করে জড়িয়ে দেয়া গেল কি? আবার গড়িয়ে লুটিয়ে পড়বে না তো? আবারও যত্ন নিলেন তিনি। কাছেই পড়ে থাকা এক টুকরা সুতলি মাটি থেকে তুলে এনে আলতো হাতে বেঁধে দিলেন লতাটিকে। নাহ। এবার পড়ার ভয় নেই।
বাবা যখন সে ব্যাপারে নিশ্চিত; তিনি ফের বাগানের চিলতে পথে হাঁটছেন। আবারও একটা ডাক শুনে বাবার কান সচকিত। কৈতরের সারি বাঁধা খোপগুলোর নিচে এসে দাঁড়াতেই প্রবল সাড়া পড়ে গেল পক্ষীকূলে। বাকবাকুম। বাকবাকুম। একসঙ্গে সবার সাদর সম্ভাষণ। এরা সবাই বাবার কবুতর। পোষা পক্ষীকূল। একটা খোপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পরখ করে দেখলেন গিরিবাজের গলার উত্তাপ। ওরা আবার কলরব করে বাবার আদরে উৎফুল্ল। হাসু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল – বাবা জলদগম্ভীর মৃদু কন্ঠে জানতে চাইলেন, কি রে দানাপানি ঠিক মতো খেয়েছিস?
বাকবাকুম। বাকবাকুম। জবাব শুনে বাবা ভীষণ তৃপ্ত।
একরকম নিঃশব্দে আব্বা আবার দোতলায়। ইজি চেয়ারে আধশোয়া।
বয়স হচ্ছে আব্বুর। কিন্তু কতটুকুই বা ঘুমুবার ফুরসত মিলছে তার। সারাদিন, সন্ধ্যা-রাত অবধি কাজ আর কাজ। তারপরও ঘুম কোথায়।
মা এখন কী করছেন। তিনি কি এখনো বিষণ্ণ ও ব্যাকুল?
এতক্ষণে রাসেল নিশ্চয়ই গভীর ঘুমে তলিয়ে। হাসুর জন্য, মানে বড় আপুর জন্য নিশ্চয়ই তার মন একদম আনচান। আপু কাছে নেই, জয় সঙ্গে নেই – হাসু জানে তার ভাইটিরও খুব মন খারাপ। ও কি সত্যিই ঘুমুচ্ছে? নাকি রাত জাগছে ছোট্ট মণিটি? আব্বুর পেছন পেছন সে ছায়ার মতন হাঁটছে। তাকে কখনো কখনো দেখা গেছে অমনটা করতে। সকালবেলা হলে সে বাবার সঙ্গে থাকবেই। কবুতর, মাছের ব্যাপারে তার সমান আগ্রহ। আব্বুর সফেদ লম্বা পাঞ্জাবীর সঙ্গে লেগে থেকে সেও পাখি ও মাছকে খাওয়াচ্ছে। রাসেলের মধ্যে নিজের অনির্বাণ অস্তিত্ব আস্তে আস্তে বাড়ছে – সেটা টের পাচ্ছিলেন বাবাও। জয়কে আদর করছেন আব্বু, হাসু তখন দেখেছে – রাসেলের মধ্যে তখন সেকি ঝলমলে আনন্দ।
ওই তো হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল ভাইটির। ঘুম ঘুম চোখে বাথরুমে গেল। বেরিয়ে চোখ কচলাল। বাবাকে খুঁজছে। আস্তে করে ডাইনিং করিডোরটা পেরিয়ে বারান্দার দরোজায় এসে চুপটি করে দাঁড়ালো। ধ্যানী মানুষটাকে সে দেখলো। টু শব্দটি করলো না। তারপর দুই তিন পা এগিয়ে একদম বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
বাবা কি ইজি চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়লেন? এতো কাছে আত্মজ এসে দাঁড়িয়ে গন্ধ ও উত্তাপ নিচ্ছে পিতার শরীরের। ঋজু-ঋষির সেদিকে একদম হুঁশ নেই।
এই বাবাকে রাসেলের খুব চেনা। আরও বেশ ক’বার এভাবেই সে বাবার সান্নিধ্য নিয়েছে। চোখ কচলে ঘুম ভাঙা শরীরে বাবার বুকের কাছটায় দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ। এবার বাবা টের পেলেন। ধ্যান সামান্য ভাঙলো। হঠাৎ একটু চমকেও উঠলেন বুঝি। আত্মজকে কাছে পেয়ে খুশি হলেন তিনি। এই ছোট্ট শিশুটি খুবই বুদ্ধিমান। বাবার নিবিষ্ট ধ্যানে সে মোটেই ব্যাঘাত ঘটায়নি।
আজকের রাতটি আর ইজি চেয়ারে শুয়ে থাকা হলো না। রাসেলের একরত্তি হাতটি ধরে বাবা ঘুমুতে গেলেন বিছানায়।
দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রের মতো হাসুর চোখের সামনে ভেসে ফিরছিলো। একতলা, দোতলা, তিনতলা ছাদঘর। বাড়িটা এভাবে হাসুর মনকে টানছে কেন! হাসু এভাবে ভাবালু হয়ে পড়ছে কেন!
কার্লসরুয়ে, বন, হেগ, আমস্টারডাম, ব্রাসেলস ভূস্বর্গ – ইউরোপের এইসব শহরের দৃশ্যাবলী জুলাই আগস্টে অপূর্ব। অতি মনোরম। আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুম ঘুম পাহাড় শ্রেণী। দূর নীল দিগন্তে সবকিছু তুলিতে আঁকা ছবি। যেন শিল্পীর নিপুণ কল্পনায় সাজানো। রূপকথার মতো সুন্দরের বুকে সুবিন্যস্ত পাথুরে শহর; অটল পাথর। লোহা, ইস্পাত, কাঠ ইটের কি অসাধারণ নির্মাণশৈলী। কালো পিচের রাস্তা – তাতে তীব্র ঘন নীলের আভাস। রাজপথ উঁচু নিচু টিলা ও পাহাড় পেরিয়ে অবিরাম নাক বরাবর ছুটে চলেছে। বিনয়াবনত গাছপালা জ্যামিতি কি পরিকল্পনা মেনে সযত্ন ছোঁয়ায় দাঁড়িয়ে। শহরের প্রান্ত ছাড়িয়ে বাইরে গেলে গাছপালার ভীড়টা বেশি। কিন্তু সবই যেন শিল্পীর মনোছবির প্রতিফলন। কোথাও দলছুট হওয়ার সুযোগ নেই। প্রাসাদোপম দূর্গ দূর্গ বাড়িগুলো যেন ইতিহাসের প্রামাণ্যচিত্র। কতকাল ধরে এমনটাই অক্ষয়, অক্ষত। লম্বা মজবুত বৃক্ষরাজির অদ্ভুত সব নাম – হর্সনাট ট্রি, মেপল। আরো কি সব গাছ; পাহাড়ের ঢালে, টিলার চূড়ায় কোথাও ঘন বন। কোথাও গুচ্ছ গুচ্ছ; পথের পাশে পাশে সারি বাঁধা। মেপল পাতায় হলুদ, ফিকে লালের নজরকাড়া বর্ণচ্ছটা। কিছু পাতা ঝরে পড়ছে এখনি। তারপরও সবুজও আছে দিব্যি উজ্জ্বল। মনভরে দেখার মত অপূর্ব প্রকৃতি।
কিন্তু মন টানছিল না কিছুতেই। হর্সচেস্ট নাট ট্রি – মানেটা কি ঘোড়া বুক বাদাম তরু? হাসু মনে মনে মিলিয়ে নিচ্ছিল বাংলার সবুজ শ্যামলিমার সঙ্গে। রুপসী বাংলায় আছে কাঠবাদাম। বিচ, রেড প্লেন ট্রি – কোনটির সঙ্গে দেবদারু, অখণ্ড আকাশমণির মিল খুঁজে পেয়ে চোখের পাতায় পরম আরাম। তারপরও কখনো মন ও চোখ কেমন ঝাপসা ঝাপসা; এই দূরন্ত ছুটে চলায় রাসেলও যদি সঙ্গে থাকতো।
ব্রাসেলস শহরটা সুদূরের পাথরের উপত্যকায় ঢেউ খেলানো সমতলের ভেলায় ভাসানো। শহরপ্রান্তে পথ যেখানে মৃদু বাঁকানো; এ্যামবাসাডার হাউস সেখানে। হাসুরা তিনতলায় সাময়িক অতিথি। পাথুরে বাড়ির ঢাল বেয়ে খানিকটা পেছনে ঝাঁকড়া পাতার বেশ কয়েকটি গাছ। পাতাগুলো হলুদ এবং লালচে।
ইউরোপের এই বৃক্ষপল্লব আর আকাশই বা এখন এমন লাল রং ধারণ করলো কেন! পাতাগুলো এখনি ঝরে পড়ছে কেন!
কী আশ্চর্য! বিচিত্র সব প্রশ্ন আঁকিবুকি কাটছে মনের মধ্যে। দিগন্তে ওই যে নীল সেকি আকাশের ওপারে আকাশ; নাকি ওই পাহাড় ছাড়িয়ে পাহাড়।
সবকিছুই কেমন যেন নীরব এবং নিষ্প্রাণ।
কেন হাসুর সবকিছু নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছে তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না সে।
অপূর্ব ইউরোপের মনোহর সুন্দর দেখে দেখে হাসুর চোখে মায়াঞ্জন লাগার কথা। তার আনন্দিত ও উৎফুল্ল হওয়ার কথা। কিন্তু সে আনন্দিত হতে পারছে না কেন! মায়ের মন খারাপ; মা তার অমন অঝোরে কাঁদল। ৩২ নম্বর বাড়ির ছোট্ট মাস্তুল ভাইটি বুঝি তার মনের অজান্তে কেবলই বড় আপুকে খুঁজছে।
হাসু মনকে কেমন করে ভালো রাখবে?
তারপরও উন্মনা মনকে পরবাসী মনের খেয়াল ভেবেই নিজেকে সামলে নিচ্ছিল হাসু। বিদেশে এমনটা হয়ই। কাল শুক্রবার প্যারিস যাওয়ার প্ল্যান পাকা। কাপড় চোপড় স্যুটকেস তো গোছানোই। এ্যামবাসেডর হাউসে আনুষ্ঠানিক ডিনার ছিল। গল্প আড্ডা চলছে। এক বাঙালি মহিলা বিজ্ঞানী তার বেলজীয় স্বামীকে নিয়ে এসেছিলেন। দু’জনেই বিজ্ঞান গবেষণায় খ্যাতিমান। বিভুঁইয়ে বাংলার শ্যামল নারীর সুখ্যাতি জেনে খুব ভালো লাগল। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকলো সাড়ে দশটার দিকে। ডিনারে হাসুর জন্য আরেক চমক ছিল। বাংলাদেশ এ্যামবাসির সেকেন্ড সেক্রেটারী আনোয়ার সাহেব, খুব অমায়িক। তিনি এসেছিলেন সস্ত্রীক। আনোয়ার-গিন্নিকে কোথায় যেন আগে দেখেছে! এমনটাই মনে হচ্ছে তার। এই মুখের আদলটা চেনা চেনা। এক সময় দু’জন এ গল্প সে গল্পে আবিষ্কার করলো – স্কুলে ওরা এক সঙ্গেই পড়েছে। মশগুল হয়ে পড়ল স্কুল দিনগুলোর স্মৃতিমালায়। দিদি ও বন্ধুরা কে কোথায় – কত গল্প। রাত গভীর হচ্ছে। প্যারিস গিয়ে আর এদিকটায় ফিরছে না হাসুরা। এটা জেনে আনোয়ার-গিন্নির জোর আবদার – ওদের বাসায় একবার যেতেই হবে। হাসু ফেলতে পারে না অনুরোধ। আনোয়ার সাহেবদের বাসাটাও সুন্দর। সেখানেও গল্প-আলাপে রাত বেশ গভীর। পরদিন প্যারিস রওনার তাড়া। মধ্যরাতে এ্যামবাসেডর হাউসে যখন ফিরছিল, অযাচিত এক দুর্ঘটনার মুখোমুখি। গাড়িতে সামনের আসনে বসেছিলেন ওয়াজেদ সাহেব। হাসু ও রেহানা পেছনের সিটে বসেছিল। দরোজা টেনে আটকাতে গিয়ে বিপত্তি। দরোজার ফাঁকে বাঁ হাত ছিল ওয়াজেদের। দরোজা টানতেই ফাঁকে আটকে গিয়ে তার সবক’টা আঙুল থেতলে যায়। মারাত্মক ইনজুরি। ব্যথায় একদিকে তিনি কাতর; সঙ্গে এটা সেটা দুশ্চিন্তাও পেয়ে বসলো তাকে।
তিনি বললেন, এটা কোন অমঙ্গল বার্তাবহ নয় তো!
হাসুর বিষণ্ণ মন আরও বিষণ্ণ হয়ে পড়ল।
ওয়াজেদ সাহেব প্যারিস যাত্রা বাতিলের কথা বললেন।
কেমন একটা উদ্বেগ পেয়ে বসলো হাসুকে। আম্মুর কান্না রাত জুড়েই তার কানে বাজছিল।
ইউরোপের এই ভূ-নিসর্গ, হালকা ঠান্ডা আরো শীতল হচ্ছিল। প্রকৃতিতে ডাক পড়েছে পাতা ঝরার। আর হাসু তখন ডাক শুনতে পাচ্ছিল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ মাতৃভূমির। কী এক চুম্বক আকর্ষণ তাকে অদ্ভূতভাবে টানছে। বাবা খুঁজছেন হাসুকে। রাসেল খুঁজছে আপুদের। আম্মা স্পর্শে আদরে ভরিয়ে তুলতে চাইছেন জয়কে। প্রাণপ্রিয় নাতিকে। কবে যে ফিরবে ওরা ঢাকায়।
হাসু তার মনের আকুতি কাউকেই বলতে পারছিল না।
আধকাঁচা ঘুমেই রাত কাটছিল। ছোট্ট জয় বুকের কাছেই। অবুঝ শিশুটিও শেষরাতে একবার অকারণ কান্না করে উঠলো। তারপর মায়ের আরও কাছে সেঁধিয়ে রইলো।
অপার রহস্য জগতের। অচ্ছেদ্য বন্ধন রক্ত পরম্পরার। রক্ত বন্ধনীর সেই অচিন আকুতির রহস্য কোনোদিন মানুষের জানা হবে না।
টেলিফোনে হাসুর মায়ের অবুঝ কান্না অবুঝ জয় কি অদৃশ্য ইথারে শুনতে পেয়েছিল!
অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন







