দেশের যেসব অঞ্চলে এখনও অতি দরিদ্রতা বা দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি,
চরাঞ্চল এর মধ্যে অন্যতম। চরাঞ্চলের মানুষ প্রায় সারা বছর ধরেই নদী
ভাঙ্গনসহ বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগ মোকাবিলা করে বেঁচে থাকে। চরাঞ্চলের মধ্যে
দ্বীপচরের অবস্থা আরও বেশি করুণ। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দ্বীপ
চরাঞ্চলের বাসিন্দারা প্রায় বিচ্ছিন্নই বলা যায়। মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে
অবস্থার কারণে সরকারি সুযোগ-সুবিধা এখানে বরাবরই অপ্রতুল।
চরের মানুষ বরাবরই বহুবিধ সমস্যায় পতিত। কর্মহীনতা, খাদ্যভাব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার অপর্যাপ্ততা, সুপেয় পানির অভাব-চরাঞ্চলে এসব সমস্যা বরাবরই দৃশ্যমান। খাদ্যের স্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য ক্রয়ের অক্ষমতার কারণে চরের হতদরিদ্র মানুষের একটি বড় অংশকে বছর ধরেই এক ধরনের খাদ্যবঞ্চনায় ভুগতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় খাদ্যচাহিদা কখনোই তারা পূরণ করতে পারে না। খাদ্যঘাটতি যেনো তাদের জীবনেরই অংশবিশেষ। এদিকে খরা মৌসুমে কখনও কখনও ক্ষুধাবঞ্চনা আরো কঠিন আকার ধারণ করে। এ সময় অতিদরিদ্র মানুষকে আরো বিপদাপন্ন অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়। ক্ষুধা নিবারণে ব্যর্থ হয়ে চরের অনেক মানুষ তাই শহরমুখী হয়ে পড়ে।
দেশ যখন উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য (?) গতিতে এগিয়ে চলেছে তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি চরের বঞ্চিত মানুষের উন্নয়নে সরকার খানিকটা নিরবই। চরের মানুষ আর চরাঞ্চলের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বড় দাগের কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ছে না। দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর কোনো চরাঞ্চলে বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এমনটি শোনাও যায়নি। ফলে চরের মানুষ ভীষণরকম উন্নয়ন বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। শুধু এই নয়, চরের মানুষের উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বরাদ্দকৃত এক টাকাও খরচ হয়নি। গত দুই অর্থবছরে চরের মানুষের উন্নয়নে বরাদ্দকৃত টাকা কেন খরচ হয়নি এ বিষয়ে সঠিক উত্তর কেউই দিতে পারেনি।
জাতীয় বাজেটে গত দুই অর্থবছরে (২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬) দেশের চরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা করে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই বরাদ্দকৃত অর্থের একটি টাকাও খরচ না হওয়ার কারণে বরাদ্দকৃত পুরো অর্থই অব্যবহৃত থেকে যায়। বাজেটে বলা হয়েছিল চরের মানুষের যোগাযোগ এবং অন্যান্য খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা হবে। কিন্তু সেই অর্থ চরের মানুষের কোনো উন্নয়নেই ব্যয় করা হয়নি। সর্বশেষ গত অর্থবছরের বাজেটে (২০১৫-১৬) চরের মানুষের উন্নয়নে ফের ৫০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়ার পর অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন ‘গত বছরের (২০১৪-১৫) বরাদ্দ অব্যবহৃত থাকা সত্ত্বেও এবারেও ৫০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করছি’।
কিন্তু গত দুই অর্থবছরের চরবাসীর উন্নয়নে বরাদ্দকৃত ১০০ কোটি টাকার একটি টাকাও খরচে করতে পারেনি সরকার। খুব সম্ভবত একারণেই এবারের অর্থবছরে (২০১৬-১৭) চরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে একটি টাকাও থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়নি। আবার কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে বড় কোনো প্রকল্পও গ্রহণও করা হয়নি। প্রশ্ন হলো গত দুই অর্থবছরে চরবাসীর উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা করে যে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো সেটি কেন খরচ হলো না? চরবাসী দেখলো তাদের উন্নয়নের জন্যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কিন্তু সেই বরাদ্দকৃত টাকার কোনো সুফলই তারা পেল না।
চরাঞ্চলে ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ মানুষ বসবাস করলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর বড় ধরনের খুব ভালো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। দাতা ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে চরে বসবাসরতদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচির মধ্যে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি জেলায় চরজীবিকায়ন কর্মসূচি (সিএলপি) চলমান থাকলেও সেটিরও মেয়াদ শেষ হবে এ বছরই। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড, অক্সফাম, কেয়ার বাংলাদেশসহ আরও কিছু উন্নয়ন সংগঠন যে সব দুর্গম চরে সরাসরি কাজ করছে সে সব চরে চরে সরকারের বিভিন্ন বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতো।
বলা যায়, এখন পর্যন্ত চরে যে উন্নয়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে যা হচ্ছে সেটা দাতা গোষ্ঠীর কারণেই। ফলে অনেক আগে থেকেই চর নিয়ে যেসব উন্নয়ন সংগঠন মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে তাদের একটি বড় দাবি ছিল চরের মানুষের উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ এবং তা সঠিকভাবে বাস্ততবায়ন করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কখনও কখনও বরাদ্দ দেওয়া হলেও বরাদ্দকৃত টাকা পড়ে থাকছে। তার সুফল কোনোভাবেই চরের মানুষের কাছে যাচ্ছে না।
চর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে শুধু বাজেটে বরাদ্দ নয়, একই সাথে তা বাস্তবায়নও করার দিকনির্দেশনাও থাকা আবশ্যক। একই সাথে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, পশুপালন-এ সব ক্ষেত্রে চরে বিশেষ ধরনের বিশেষ বিশেষ উন্নয়নমূলক কর্মসূচিও চালু করা প্রয়োজন। চরের নারীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্যেও এতদিনে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত ছিল। কিন্তু কিছুই করা হয়নি।
এটি সত্য, চরাঞ্চলে অনেক ধরনের রিসোর্স রয়েছে যেগুলো কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিশেষ চরের কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা গেলে খাদ্যনিরাপত্তায় বড় প্রভাব রাখতে পারে। এ ছাড়া চরে যে জনবল রয়েছে সেই জনবলকে যদি দক্ষ, আরও কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে চরাঞ্চলে এক ধরনের বৈপ্লাবিক পরিবর্তন আনা অসম্ভব কিছ্ইু নয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি একনেকে বড় বড় প্রকল্প অনুমোদন হচ্ছে এবং কাজও শুরু হচ্ছে। কিন্তু চরের উন্নয়নে কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে খবর নেই।
আগামী ৫ বছরের জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পরিকল্পনায় গড়ে ৭ দশমিক ৪ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও দারিদ্র্যের হার বর্তমানের ২৪ দশমিক ৮ ভাগ থেকে কমিয়ে ১৮.৬ ভাগে হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা করা হয়েছে। এজন্য প্রায় ৩২ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। যা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অংশ থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কিন্তু ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও চরের উন্নয়নে তেমন কোনো পরিকল্পনা সংযোজন করা হয়নি। চরবাসী যে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার নীতি নির্ধারকদের একটু সেদিকে মনোযোগ আকর্ষণের অনুরোধ করবো।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







