কম্পিউটারে বাংলা বর্ণলিপির জনককে আজ থেকে ৫২ বছর আগে বাংলা লিখতে হয়েছিল লুকিয়ে। ১৯৬৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদেরকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়েছিল সবার চোখ এড়িয়ে ফৌজদারহাটের এক পাহাড়ে বসে, একান্তে।
তিনি সাইফুদ্দাহার শহীদ, বেশি পরিচিত সাইফ শহীদ নামে। কম্পিউটারে প্রথম বাংলা বর্ণমালা শহীদলিপি তার তৈরি। ১৯৮৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কম্পিউটারে মায়ের ভাষার প্রথম লিপি ব্যবহার করে প্রথম তিনি তার মা-কে চিঠি লিখেছিলেন।
সেই শহীদলিপির পর এসেছে বিজয়, অনলাইনে বিজয়যুগ পেরিয়ে এখন ইউনিকোড। কিন্তু শুরুটা অতো সহজ ছিল না।
ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে সাইফুদ্দাহার শহীদের অনেক পরের ছাত্র সাংবাদিক সানাউল্লাহ বলছেন: প্রবাসী শুধু নয়, দেশেও একটা প্রজন্ম গড়ে ওঠেছে যারা বাংলা লিখতে বা পড়তে পারে না, কিন্তু বলতে পারে। কম্পিউটারে বাংলা সফটওয়্যার তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে। কিন্তু এর সূচনাটা এতো সহজ ছিল না।
‘শহীদলিপির ইতিহাস পড়লে যে কেউ বুঝবে কি অকল্পনীয় সৃজনশীলতা, পরিশ্রম আর সাহসের সময় ছিল সেটা। আর সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন সাইফ ভাই। তার লেখা পড়লে কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহারের প্রথম দিককার দিনগুলোর কথা ভাবলে- এর প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। বাংলার প্রতিটি অক্ষরকে কি-বোর্ডে প্রকাশ করা, স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, যুক্তাক্ষর- এর কতো জটিলতা; এইসব ভাবনা সেই সময়ে কতো যে কঠিন ছিল তা ইতিহাস না পড়লে না জানলে বোঝা যাবে না,’ বলে লিখেছেন সানাউল্লাহ।
ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করার পর বুয়েটে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে লেখাপড়া করে পেশা হিসেবে তথ্য-প্রযুক্তিকে বেছে নেন সাইফুদ্দাহার শহীদ। পাশাপাশি তৈরি করেন কম্পিউটারের প্রথম বাংলালিপি।
এবারের একুশে ফেব্রুয়ারিতে তিনি ১৯৬৫ সালে ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় সেই সময়ের কথা মনে করেছেন যখন বাংলায় লিখতে বা কথা বলতে পারতেন না। ৫২ বছর আগের ওই একুশে ফেব্রুয়ারিতে তিনি তাই লুকিয়ে বাইরে চলে গিয়েছিলেন, একা একাই ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছিলেন আর তা লিখে রেখেছিলেন দিনপঞ্জির পাতায়।
ফেসবুকে ১৯৬৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ডায়েরির পাতার একটি ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন: ৫০ বছরের বেশী আগের কথা। পাকিস্তানী আমল। দেশের একমাত্র ক্যাডেট কলেজে পড়ি। বাংলায় কথা বলা শাস্তি পাবার মত অপরাধ ছিল তখন। খুঁজে বের করলাম তখনকার দিনে ডায়েরীর পাতায় কি লিখেছিলাম এই ২১শে ফেব্রুয়ারীর দিনে।

সাইফুদ্দাহার শহীদ সেদিন তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন:
“TO LIVE IN THE HEARTS WE LEAVE BEHIND IS NOT TO DIE”
আজ শহীদ দিবস। যাদের আত্মদানের বিনিময়ে মাকে মা বলে ডাকার অধিকার পেয়েছি তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে রইল আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। লুকিয়ে পাহাড়ে গিয়েছিলাম সকালে। দূরে, অনেক দূরে, কলেজের সীমানা ছাড়িয়ে, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে খোলা আকাশের তলে সবুজ ঘাসের উপর বসে হাটুর মধ্যে মাথা গুজে চোখ বন্ধ করে রইলাম খানিকক্ষণ শহীদদের আত্মার প্রতি সম্মান দেখিয়ে। খুব ভাল লাগছিলো যতক্ষণ পাহাড়ে ছিলাম।







