মুম্বাই (ভারত) থেকে: খুব বেশিই অপমানিত লাগছিলো নিজেকে। ক্ষণে ক্ষণে অসহায়ও মনে হয়েছে, কারণ এমন আচরণে মোটেও অভ্যস্ত নই। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ কাভার করতে গত তিন সপ্তাহে ভারতের যেখানে যেখানে গিয়েছি উষ্ণ অভ্যর্থনাই পেয়েছি সব জায়গায়।
কারণ সবাই বুঝতে পেরেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল আইসিসির অ্যাক্রিডিটেশন নিয়েই বিশ্বকাপের কাজে এখানে এসেছি। কিন্তু এখানে তার কোনো মূল্যই নেই আলাদা করে। দীর্ঘ ভ্রমণের পর মুম্বাইতে এসে এমন হয়রানি মেনে নেওয়া তাই আসলেই কষ্টকর।
অবশ্য শুধু আমি একা নই, আমার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপ কাভার করতে আসা আরও তিনটি টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরাও ছিলেন। আমরা সিএসটিতে (ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনালস) নেমে একটা ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সিচালক আমাদের নিয়ে গেলেন যে এলাকায় বেশি হোটেল সেখানে।
কিন্তু সেখানে গিয়ে আমরা আকাশ থেকে পড়লাম। হোটেলের সবকিছু ঠিক আছে, আমাদের সুবিধা অনুযায়ী স্টেডিয়ামও পাশে, শহরের মাঝামাঝি, রুমের তুলনায় ভাড়াও ঠিক আছে। তবে আমরা সেখানে উঠতে পারবো না। কারণ, আমাদের একটাই ‘অযোগ্যতা’ সেটা হলো আমরা সবাই বাংলাদেশী পাসপোর্ট হোল্ডার।
ওরা স্পষ্ট বলে দিলো কোনোভাবেই তারা আমাদের জায়গা দেবে না। কারণ এখানকার পুলিশ স্টেশনের কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ব্যাপারে। লাল-সবুজের পাসপোর্টধারীরাও ওই তালিকায়।
শুনে খুব মন খারাপ হলো। আর আমার কাছে ব্যাপারটা খুবই অপমানকরও মনে হলো। পাকিস্তান, আফগানিস্তান এসব দেশের নাগরিকদের ব্যাপারে বিশ্বেরও সব জায়গায়ও সতর্কতা থাকে। তাই বলে কেনো বাংলাদেশ। খেলা কাভার করার কাজে বিশ্বেও অনেক দেশেই ভ্রমণ করেছি এই পাসপোর্ট দিয়ে। বরং ক্রিকেটের সাফল্যে সবাই বাংলাদেশ শুনলে অন্যভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু এখানে বাড়াবাড়ি।
এরপর একে একে আরো ১০/১২টা হোটেল ঘুরেও একই অবস্থা পেলাম। বাংলাদেশী শুনেই না করে দেয় ওরা। শেষে ট্যাক্সি করে একটা এলাকায় পাঠানো হলো আমাদের। সেটা মুসলিম এলাকা বলেই পরিচিত। ডোংরি নামের ওই এলাকায় হোটেল জমজম এবং হোটেল শাদাব নাকি বাংলাদেশীদেরও রাখে, কিন্তু সেখানে গিয়েও হতাশ হলাম।
কারণ তারা গেষ্ট ওঠায় সিআইডি-এর একটা ফরম পূরণ করিয়ে। ওটা আবার সিআইডিই তাদের সরবরাহ করে থাকে। সেই ফরম শেষ হয়ে গেছে বলে আমাদেরও বিদায় করে দেওয়া হলো। আসলে বুঝতে পারলাম ওরা আসলে বাংলাদেশীদের না নিয়ে ঝামেলা এড়ানোর চেষ্টা করলো। 
পাক্কা আড়াই ঘন্টা ঘুরে শেষ পর্যন্ত ওই মুসলিম এলাকাতেই একটা হোটেল পেলাম আমরা। ওরা রাজি হলো, তবে সবার আলাদা আলাদা পাসপোর্টের ফটোকপি, ঠিকানা, ছবি এসব ডাটা কম্পিউটার বন্দী করলো। সন্ধ্যায় নাকি স্থানীয় থানা থেকে এসে এসব নিয়ে যাবে। হোটেলকর্মীরা এমনটা জানালেন।
এই হলো মুম্বাইতে ঢুকার মুহূর্ত। টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের দ্বিতীয় সেমিফাইনাল কাভার করতেই ভারতের অন্যতম প্রধান এই শহরে ঢুকেছি। দেখা যাক, কি আছে কপালে। থাকতে হবে আরও চারদিন। অবশ্য এমন কড়াকড়ি আগে ছিলো না। ২০০৮ এর ২৬ নভেম্বরে মুম্বাই অ্যাটাকের পর থেকেই এমন পরিবর্তন।
২০০৮ মুম্বাইতে জঙ্গি হামলা হয়। পাকিস্তান থেকে জলপথে অনুপ্রবেশকারী কয়েকজন ইসলামী জঙ্গি ভারতের এই বৃহত্তম শহরে ১০টিরও বেশি ধারাবাহিক গুলি ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এই হামলার জন্য যে সব জঙ্গিরা তথ্যসংগ্রহ করত, তারা পরে স্বীকার করেছে যে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিগেন্স (আইএসআই) তাদের মদদ জোগাত।
২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই হামলা চলে। ওই ঘটনায় ১৬৪ জন নিহত ও কমপক্ষে ৩০৮ জন আহত হন। সারা বিশ্বে এই ঘটনা তীব্রভাবে নিন্দিত হয়।






