সান ডিয়েগো, ক্যালিফোর্নিয়া: গত ২৫ সেপ্টেম্বর বসনিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি রেফারেন্ডামের সংবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমহলে খুব একটা হৈ-চৈ না হলেও বসনিয়া সম্পর্কে কিছুটা ওয়াকিবহাল থাকায় আমি রীতিমতো চমকে উঠি। এই রেফারেন্ডামটি অনুষ্ঠিত হয় বসনিয়ার সার্বপ্রধান অঞ্চল রিপাবলিক অফ সার্বস্কায়। কি ছিল সে রেফারেন্ডামে?
বস্তুত ৯ই জানুয়ারিকে বসনিয়ার একটি জাতীয় ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হবে কি হবে না সে নিয়ে জনমতের প্রতিফলন জানতেই এই রেফারেন্ডামের আয়োজন। প্রায় ৫৬ শতাংশ সার্ব ভোটার উপস্থিত হন ভোটকেন্দ্রে, যাদের শতকরা ৯৯ ভাগই হ্যাঁ ভোটকে জয়যুক্ত করেন। প্রস্তাবটিকে আপাতদৃষ্টিতে বেশ সরল মনে হলেও জাতিগত বিভেদে আক্রান্ত বসনিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি মোটেও সরল নয়। কেন নয়, সেটিই বলছি।
১৯৯২ সালের ৯ই জানুয়ারি বসনিয়া ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে গিয়ে সার্বরা নতুন এক প্রজাতন্ত্র গঠন করার ঘোষণা দেয়(ধর্মীয় কারণেও কিন্তু ৯ই জানুয়ারি সার্ব অর্থোডক্স গোষ্ঠীর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন)। আর সেই থেকেই পরবর্তীতে সূচনা হয় প্রায় পাঁচ বছরব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের, যে যুদ্ধে প্রায় হারায় প্রায় এক লক্ষ মানুষ।
১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ডেটনে একটি বিমানঘাঁটিতে নানা পক্ষের মাঝে আলোচনা শেষে একটি কার্যকরী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে চুক্তিতে পরিষ্কার উল্লেখ ছিল বিবাদমান তিনটি গ্রুপের কোন গ্রুপের নেতাই ভবিষ্যতে এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেবন না যেটি এই প্রস্তাবিত ফেডারেশনের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, আর যদি নেন তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল এবং সারায়েভোতে অবস্থিত ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা থাকবে তাকে অপসারণ করবার। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ডেটন চুক্তির সেই ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্তমান সার্ব অংশের রাষ্ট্রপতি এই রেফারেন্ডামের আয়োজন করেছেন।
ডেটন চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী যে বসনিয়ান ফেডারেশন গঠিত হয়েছিলো, তাতে প্রজাতন্ত্র ছিল মোট তিনটি। পূবের অর্থোডক্স সার্বপ্রধান অঞ্চলটি পরিচিতি পায় রিপাবলিক অফ সার্বস্কা হিসেবে, মাঝের বসনিয়ান মুসলিমপ্রধান অঞ্চলটি বসনিয়া আর পশ্চিমের ক্যাথলিক ক্রোয়াটপ্রধান অঞ্চলটি পরিচিতি পায় হার্জেগোভিনা হিসেবে- আর তিনটি অঞ্চল নিয়েই বসনিয়া–হার্জেগোভিনা ফেডারেশন। এ ফেডারেশনের তিনটি পৃথক অঞ্চল থেকেই তিনজন রাষ্ট্রপতি প্রতি চার বছর অন্তর নির্বাচিত হন, পালাক্রমে এই তিনজনের প্রত্যেকেই আট মাসের জন্যে রাষ্ট্রপতি- সভাপতির পদটি অলংকৃত করেন।
কিন্তু সমস্যা হল যেকোন সিদ্ধান্ত নেবার বেলায় এ তিনজন রাষ্ট্রপতির প্রত্যেকের সম্মতি প্রয়োজন হয়, ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় অযাচিত আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা। এসব কারণেই গৃহযুদ্ধের পর প্রায় দু দশক পেরিয়ে গেলেও বসনিয়ার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রবৃদ্ধির হার এখনও বেশ শ্লথ।
তবে উন্নয়ন এবং প্রগতির বাইরে বসনিয়ার জন্যে প্রধানত যেটি প্রয়োজন সেটি হল এই তিনটি জাতিগোষ্ঠীর মাঝে সাম্যাবস্থা ধরে রাখা এবং যেকোনো অন্তর্কলহ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখা। বিগত যুদ্ধের স্মৃতি এখনও এ অঞ্চলের মানুষের মন থেকে একেবারে মুছে যায়নি। যে মানুষগুলো একসময় মিলেমিশে একই শহরের একই পাড়ায় বাস করতেন, তারাই এখন জাতিভিত্তিক অঞ্চল-শহর অথবা পাড়ায় বাস করেন। তাই সার্ব রাষ্ট্রপতি মিলোরাদ দদিকের নেয়া এই রেফারেন্ডামের সিদ্ধান্ত সেই অবিশ্বাসের আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিতে পারে।
ক্রোয়াট আর বসনিয়ান মুসলিম এ দু পক্ষই তাতে করে ভেবে বসতে পারে সার্বরা হয়তো ধীরে ধীরে ক্ষমতা আরও সুসংহত করবার ফন্দি আঁটছে। ওদিকে যুদ্ধের পর বসনিয়া অঞ্চলে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশের সাহায্যের বাতাবরণে বিস্তার ঘটেছে ধর্মীয় মৌলবাদের, সেই অংশটিও ৯ই জানুয়ারিকে ছুটি ঘোষণার ইস্যুকে সামনে এনে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে পারে, আর সেটি হলে পুরনো বিবাদের দামামা নতুন করে বেজে উঠতে দেরী হবে না।
গত অগাস্ট মাসে সারায়েভোতে যে ট্যাক্সি-ড্রাইভার আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিল, জাতিগতভাবে সে সার্ব, এখন তার নিবাস পূর্ব সারায়েভোর সার্বপ্রধান শহরে। আমাকে পৌঁছে দেবার পথে নিজে থেকেই বলছিল, “তোমার এই হোটেল পাড়াতেই এক সময় ছিল আমার পৈতৃক বাড়ি। যুদ্ধের পর পর আমি ও বাড়ি বেচে ওই সার্ব শহরে চলে গেছি। এখনও এদিকটায় এলে বুকের মাঝে কেমন যেন খাঁ খাঁ করে, পুরনো দিনের কথা মনের মাঝে ভেসে ওঠে।
অথচ দেখো এই আমি যখন সারায়েভোর বাসস্ট্যান্ডে যাই, সেখানে অন্তত দশ কি পনের জন মুসলিমবন্ধু আমাকে পেলে ছেঁকে ধরে বলে, চল রাস্কো এক কাপ কফি খাই। আমাদের মাঝে তো বিভেদ ছিল না কোন কালে! এই রাজনীতিবিদরাই তো ওদের সুবিধায় এই বিভেদগুলো ঢুকাল আমাদের মাঝে”। হয়তো রাস্কোর সেই কথাগুলোই ঠিক, সাধারণ মানুষেরা অধিকাংশ সময়েই শান্তির স্বপক্ষেই থাকে, কিন্তু রাজনীতিবিদরা অনেক সময়েই কিছু বিভেদ আর পুরনো ক্ষতকে উস্কে দিয়ে নিজেদের ফায়দা হাসিলের পথ প্রস্তুত করে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








