শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) আর্কিটেকচার বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সিলেট গণজাগরণ মঞ্চ কর্মী শাহরিয়ার মজুমদারের রহস্যজনক মৃত্যুর রহস্য যেন কাটছেই না। আত্মহত্যা, নাকি কৌশলী হত্যা এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে সবাই।
গত বৃহস্পতিবার আখালিয়ার একটি বাসা থেকে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহরিয়ার মজুমদারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বন্ধুদের দাবি শাহরিয়ারকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের ধারণা এটা ছিলো আত্মহত্যা।
কেমন ছিলো সে সময়কার পরিবেশ ও কীভাবে তাকে উদ্ধার করা হয়েছিলো এ নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন শাহরিয়ারের সাথে একই মেসে থাকা অনুপ দত্ত অনিক। অনিক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যাণ্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের ছাত্র।
অনিকের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু প্রকাশ করা হলো-
“অনেক কিছু মনে আসছিল তাও লিখতে পারছিলাম না… কী লিখব? তাও সারাদিন তাকে নিয়ে সবার অনুভূতিগুলো দেখছিলাম। তাকে নিয়ে আমার কি অনুভূতি হতে পারে সেটাই ত ভুলে গেছি। সবারই সে নিজের মানুষ ছিল বলে অভিব্যক্তিগুলো আদিখ্যেতা মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলে ত সে সবার কাছে এমনই ছিল। আমার সাথেও এমন… আড়াই বছরেও বেশি সময় একি সাথে এক মেসে থাকা ত কম নয়। আমিও সহজেই স্বীকার করছি যে আমিও ভাবছিলাম যে সবার থেকে আলাদা কি লিখা যায়। এইগুলো বাদ, ব্যাপার না… ব্যাপার হচ্ছে যে, ভুলভাল তথ্যে ভরা খবর এবং সেটা যাচাই না করে মাতামাতি। জানি সবার ই মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।
“খুন” বলে একটা সিদ্ধান্তে পৌছে যাওয়া সহজ কিন্তু আমরা যারা দরজা ভাঙা বা লাশ নামানোর সময় ছিলাম তাদের কাছে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আরো বেশি কঠিন। বার বার হিসেব মিলাতে না পেরে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
*কোনো জায়গায় বলা হয়েছে যে পুলিশ এসে নয়টায় দরজা ভাঙসে
* দরজা নিয়ে ধোঁয়াশা। এটা নাকি অটো লক। খুনি সহজেই খুন করে দরজা লক করে চলে যেতে পারে।
*চতুর্থ তলায় থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি…
কেন রে ভাই… এসব শেয়ার দেয়ার আগে তথ্যগুলো অথেনটিক কিনা সেটা যাচাই করার দরকার না?
যাই হোক, এইবার বলি…ওইদিন শাহরিয়ার সারাদিন তার রুমে একা ছিল। তার রুমেমেট দুইজনের মধ্যে বাধন সিলেট ছিল আর সেও সকাল ১১টায় রুমে থেকে বের হয়ে যায়। পাশের রুমে আমি আর চিসল থাকি। বিসিএস রিটেন পরীক্ষার জন্য সে সকাল নয়টায় বের হইয়ে যায় আর আমি বের হই ১১ টায়। আমাদের কারো সাথেই তার দেখা হয় নাই সেদিন বাকি যে দুই রুমের মেম্বার ছিল তাদের সাথেও না।
অনেকে বলসে মেসের খালা নাকি তাকে শেষ দেখেছে দুপুরে রান্না করার সময়। কই খবর পাইলো কে জানে!!!! আমি পরেরদিন খালাকে জিজ্ঞেস করার পর বলল যে উনি মেইন গেইট খোলা পাইসে আর রান্না করে চলে গেসে। খালার সাথেও তার দেখা হয় নি।
আমি মেসে ফিরি ৫টায়। এসে ঘুম দেই। চিসল রুমে আসে তারও পর। সন্ধ্যায় ৭টায় শাহরিয়ার এর রুমমেট বাধন যখন ভেতর থেকে কোন সাড়া না পেয়ে টানা জোরে জোরে নক করছিল তখন আমার ঘুম ভাঙে। গিয়ে দেখি দরজা ভিতর থেকে লাগানো। লাইট অফ। (এখানে বলে রাখি, ওই রুমে অটোলক আছে ঠিকই কিন্তু সেটা ঠিক ভাবে লাগে না আর মাঝে মাঝে কাজও করে না তাই ছিটকিনি ব্যবহার করে ওরা। মেসের বাকি রুমগুলোর ও একি অবস্থা) আমিও গিয়ে একটানা নক করতে থাকি। জোরে জোরে ডাকতে থাকি। তখনো ব্যাপার টা সিরিয়াসলি নেই নি। মনে করসি হয়ত ঘুমাচ্ছে। আরো মজা করে বলছিলাম যে, “হেতে মনে হয় মরসে”
টানা আধ ঘন্টা বিরতি দিয়ে দিয়ে নক করসি আমরা সবাই। তখন একটু সন্দেহ হলো… রঙ করার কাজে ব্যবহার করা হয় এমন উচু একটা কাঠের টেবিল টাইপ ছিল সেটা এনে ভেন্টিলেটর দিয়ে দেখার চেষ্টার করি। ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না। আবছা দেখা যাচ্ছিল যে ফ্যান চলছিল আর টেবিলে তার ল্যাপটপ অন করা।
তারপর বাধন তার দুই ব্যাচ মেট আর অরিয়নকে ফোন দিয়ে আনে। অরিয়ন আসে পৌনে ৮ টায়। এসে ভয়ংকর ভাবে ধাক্কা দিচ্ছিল দরজায়। দরজা নিচের থেকে খুলে যাচ্ছিল কিন্তু উপরে আটকে ছিল ছিটকিনি তে। অরিয়ন কে বললাম যে দরজা ভাঙিস না ভেন্টিলটর দিয়ে দেখ… তারপর হাতুরি দিয়ে ভেন্টিলেটর দিয়ে ভেঙে ভিতরে লাইট দিয়ে প্রথম দেখে অরিয়ন… দেখেই সে, ও মাই গড!!! শীট শীট বলতে থাকে। আমি বার বার জিজ্ঞেস করি কি হহইসে বলতে। ও কিছু না বলে নেমে যায়… তার পর আমি জীবনের অন্যতম বড় ভুল টা করি। আমি ভীতু মানুষ। এমন দৃশ্য দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমি। বডি টা কেমন ছিল তা সবাই হয়ত অরিয়নের স্ক্যাচেই দেখেছেন। আমি দেখে নেমে আসি আর সবাই কে বলি।
মাথায় আসছিল না কিছু। আমার এক বন্ধু কে ফোন দিলাম যে কি করব। প্রক্টর স্যার কে জানানো হল। তখনো রুম ভাঙার কথা মাথায় আসে নি।তখন বাজে ৮টা হঠাৎ বডির অবস্থানের কথা বলে কে জানি বলল যে এখনো বেঁচে থাকতে পারে। দরজা ভাঙা উচিৎ বলে দুইজন মিলে কয়েকবার জোরে ধাক্কা দিলে পরে দরজা খুলে যায়। দৌড়ে ঢুকে লাইট জ্বালাই আর কাঁচি দিয়ে বেল্ট কেটে শাহরিয়ার কে কয়েকজন মিলে নামাই।
শক্ত, ঠান্ডা শাহরিয়ার…ততক্ষণে অনেকেই চলে আসছে… প্রক্টর স্যার, শাহরিয়ারের ডিপার্ট্মান্টের স্যার বন্ধু জুনিয়র আশেপাশের মানুষ। ডাক্তার দিয়ে আর শাহরিয়ার কে পরীক্ষা করা গেলো না… সবাই ধরেই নিয়েছে সে নাই আর যা হইসে হইসে বডির আশেপাশে যেন কেউ না যায়। পুলিশ আসে তারো অনেক পরে প্রায় নয়টায়। তারপরে কি কি হইসে তা সবাই জানে। এইত……
আমি এত ভাল গুছিয়ে লিখতে পারি না। যতটুক পেরেছি বিস্তারিত বলেছি।
আমি যখন লিখছি তখনো আমি আমার রুম থেকে শাহরিয়ারের রুম দেখতে পারছি যেটা পুলিশ তালা মেরে রেখে গেছে। আমরা যারা তখন ছিলাম তারা এখনো কোন কিছুর হিসেব মিলাতে পারছি না। কেউ তাকে মেরে রেখে যাবে সেটা যেমন অসম্ভব মনে হচ্ছে আবার পার্শিয়াল হ্যাঙিং এ মৃত্যু হতে পারে এটাও অসম্ভব মনে হচ্ছে। জানি না তদন্ত ,পোস্টমর্টেম কত গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে। অন্তত, সত্যটা জানতে পারলে নিজেকে স্বান্তনা দিতে পারতাম।
আমার ১৭ তারিখ থিসিস ডিফেন্স হয়ার কথা… ভাবতে খুব অবাক লাগে যে এত সাহস কিভাবে এল যে মেসে এখনো আছি!!!! কাজ হচ্ছে না কিছুই… ঘুম হচ্ছে না। যত সম্ভব রুমের বাইরে বাইরে থাকি… ব্যস্ত থাকতে চেষ্টা করছি। পারছি না… জানি না কতদিন এই শক্ তাড়া করবে আমাকে।
শাহরিয়ার, এত এত মজার স্মৃতি ছাপিয়ে এই স্মৃতি টা দিয়ে গেলি তুই। বিশ্বাস করবি না, তোকে এই অবস্থায় দেখার পর তোর সুন্দর মুখ খানাইতো ভুলে গেছি। জানি না আমাদের ছেড়ে ভাল আছিস কিনা… পারলে থাকিস!!!!”
এভাবেই শাহরিয়ারের মৃত্যু দিনের ঘটনা ও আগে-পিছের কিছু কথা নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে অনিক। গত ৩ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরীর আখালিয়ার সুরমা আবাসিক এলাকা থেকে শাবি ছাত্র, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী শাহরিয়ারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।






