‘ক্যানসারের সাথে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু সাহসী যুদ্ধের পর চিরবিদায় নিলেন তিনি।’ গতকাল মঙ্গলবার কিংবদন্তি ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার রজার মুরের মৃত্যু সংবাদটা সামাজিক মাধ্যমে এভাবেই জানালেন তার সন্তানরা।
জেমস বন্ড সিরিজে অভিনয়ের জন্যই স্যার রজার মুর বেশি জনপ্রিয়। এ ছাড়াও টিভি সিরিজ ‘দ্য সেইন্ট’–এ সায়মন টেম্পলার চরিত্রে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এ সিরিজে তিনি অভিনয় করেন। এছাড়াও তিনি পারসুয়েডরস এর জন্যও জনপ্রিয়। ১৯৭৩ সাল থেকে ‘জেমস বন্ড’ সিরিজে অভিনয় শুরু করেছিলেন তিনি। শুধু অভিনয় নয়, তিনি মানবতার সেবায়ও নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি ইউনিসেফ-এর গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োজিত হয়েছিলেন স্যার রজার মুর।
১৯২৭ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন রজার মুর। গত শতকের পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে মডেল হিসেবে কাজ করার পর তিনি এমজিএম-এর সাথে সাত বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তাঁর প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলো তেমন জনপ্রিয় ছিল না। বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দায় এসে রজার মুরের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। তিনি সফলতার মুখ দেখেন। গার্ডিয়ানকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে ২০১৪ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘ক্যারিয়ারের শুরুতে আমাকে বলা হয়েছিল সফল হতে ব্যক্তিত্ব, মেধা এবং ভাগ্য প্রয়োজন সমান অনুপাতে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ৯৯ ভাগই সৌভাগ্য।’

স্যার রজার মুরকে যখন জেমস বন্ড চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়, তখন তিনি টিভি অভিনয়ের ব্যস্ততা দেখিয়ে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। পরে শন কনারি জেমস বন্ড চরিত্র থেকে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার পর আবার প্রস্তাব দেওয়া হয় স্যার রজার মুরকে। তখন তিনি চুক্তিবদ্ধ হন এবং জনপ্রিয়তা লাভ করেন জেমস বন্ড হিসেবে। জনপ্রিয় এই ব্রিটিশ গুপ্তচরের চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত। মোট সাতটি ছবিতে তিনি জেমস বন্ড হয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ৫৮ বছর বয়সে জেমস বন্ড চরিত্র থেকে অবসর নেন তিনি। নিজের বন্ড পরিচয় খুব পছন্দ ছিল স্যার রজার মুরের। তার অভিনীত ‘জেমস বন্ড’ সিরিজের ছবিগুলো হলো— ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’ (১৯৭৩), ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান’ (১৯৭৪), ‘দ্য স্পাই হু লাভড মি’ (১৯৭৭), ‘মুনরেকার’ (১৯৭৯), ‘ফর ইয়োর আউজ অনলি’ (১৯৮১), ‘অক্টোপুসি’ (১৯৮৩) এবং ‘এ ভিউ টু এ কিল’ (১৯৮৫)।

জেমস বন্ড থেকে অবসর নেওয়ার পর ৫ বছর বিরতি নেন স্যার রজার মুর। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আর কোনো ছবিই করেননি এই তারকা। বলা যায় অভিনয় ক্যারিয়ারের দাপুটে সমাপ্তি সেখানেই টেনেছেন এই তারকা। ‘স্পাইস ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘বোট ট্রিপ’ ছবিতে ছোট চরিত্রে তাকে দেখা যায় পরবর্তীতে।
রজার মুর ২০০৩ সালে ‘স্যার’ উপাধি পান। তিনি এই সম্মান পেয়েছেন তার দাতব্য কার্যক্রমের জন্য। অভিনেত্রী অড্যে হেপবার্নের সঙ্গে তার চমৎকার বন্ধুত্ব ছিল। অড্রেকে দেখেই অনুপ্রাণিত হয়ে রজার মুর ইউনিসেফের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এরপর লম্বা সময় ধরে তিনি ইউনিসেফের অ্যাম্বাসেডরের দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্যার রজার মুরের আরেকটি গুণ ছিল। অসাধারণ লেখার হাত ছিল তার। তিনি জেমস বন্ড হিসেবে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে দুটি বই লিখেছেন তিনি। বইগুলো পড়লে বন্ড-সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়। বিশেষ করে ‘বন্ড অন বন্ড’ বইটিতে আছে মার্টিনি এবং সেক তৈরির রেসিপি, কোথায় বন্ডের পোশাক কিনতে পাওয়া যায়, মুরের সবচেয়ে প্রিয় বন্ড গার্ল কে, বন্ড ছবির খলনায়ক, লোকেশন, গাড়ি থেকে শুরু করে বন্ডের ব্যবহার করা বিভিন্ন যন্ত্র সম্পর্কে বিস্ময়কর অনেক তথ্য। এছাড়াও দুটি আত্মজীবনী লিখেছেন এই কিংবদন্তি তারকা।
ক্যানসারের কাছে হেরে সুইজারল্যান্ডে মঙ্গলবার পরলোকগমন করেন এই কিংবদন্তী অভিনেতা। তার বয়স হয়েছিল ৮৯। স্যার রজার মুরের মৃত্যু সংবাদ, তার সন্তানেরা নিশ্চিত করেছেন। স্যার রজার মুরের ইচ্ছায় মোনাকোতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। মৃত্যুকালে স্যার রজার মুর তার তিন সন্তান-ডেবোরাহ, জিওফ্রি ও ক্রিস্টিয়ান এবং স্ত্রী ক্রিস্টিনা থলস্ট্রাপকে রেখে গেছেন। তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন জেমস বন্ড হয়ে। দ্য গার্ডিয়ান।










