২৫ জুলাই, ১৯৭১। ভারতের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়াম। মানুষের উপচে পড়া ভিড়। গ্যালারিতে জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ উঠে গেলেন মাঠের চারপাশের বড় বড় গাছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের একটি দলের বিপক্ষে খেলা হবে নদীয়া জেলা একাদশের। বাঙালি খেলোয়াড়রা লাল-সবুজের পতাকা ওড়াবেন। গাইবেন আমার সোনার বাংলা। আয়োজকদের তাতে সায় নেই। ‘পরাধীন’ একটি দেশের পতাকা ওড়াতে তারা ভয় পাচ্ছেন। তাই নিয়ে খেলা শুরু হতে দেরি।
পরের গল্পটা ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের। যার পুরোটা জুড়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ভারতজুড়ে ১৬টি ম্যাচ খেলে যারা। খেলায় খেলায় গড়ে ওঠে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত। এখনো সেই দিনগুলো চোখে ভাসে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের স্বপ্নদ্রষ্টা সাঈদুর রহমান প্যাটেলের। চ্যানেল আই অনলাইনকে শুনিয়েছেন দল গঠনের পেছনের আর পরের কথা।

‘যতদিন জ্ঞান আছে, সেইসব দিন কী আর ভোলা যায়। এখনো মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি, আমরা ফুটবল খেলছি। মানুষ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলছে,’ প্যাটেল বলেন আর শিহরিত হন, ‘২৫ জুলাই সেই ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়ায়। নদীয়ার ডিসি ডিকে ঘোষ না থাকলে হয়ত আমাদের পতাকা ওড়ানো হতো না। তিনি বলেন, ‘আমাদের পুরো দেশ আপনাদের স্বাধীনতার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। আমি তো সামান্য এক ডিসি। অনেক বছর চাকরি করেছি, এবার না হয় বাংলাদেশের জন্য চাকরিটা গেলই। তবু আমি অনুমতি দিলাম।’ -বেজে ওঠে আমাদের জাতীয় সংগীত। বিরাট পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করি সবাই। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। গোল করেন শাহজাহান ভাই ও এনায়েত।’’
কীভাবে দল গঠনের কথা মাথায় আসে, সেই গল্পও শোনালেন তিনি, ‘আমি, মহসিন সাহেব, লুত্ফর রহমান ও মুজিবর রহমান ভুঁইয়া একসঙ্গে কলকাতা যাই। কলকাতায় অমৃত বস্ত্রালয়ের মালিক সুবোধ সাহা কাকা একসময় ছিলেন আমাদের গেন্ডারিয়া এলাকার বাসিন্দা। আমরা তার বালিগঞ্জের পণ্ডিতিয়া রোডের বাসায় উঠি। রাত দেড়টা পর্যন্ত আমরা তার সঙ্গে গল্প করি। দেশের অবস্থা জানাই। এরপর আমাদের আর ঘুম হয় না। শুয়ে এ-পাশ ও-পাশ করতে করতে হঠাৎ মাথায় আসে ব্যাপারটা। ফুটবল খেলে জনমত গঠন করার কথা ভাবি। যে টাকা আয় হবে, সেটাও দেশের কাজে লাগানো যাবে।’
‘সকালে অন্য তিনজনকে বলি। লুৎফর রহমান খুব রাগ করেন। দেশে গণহত্যা চলছে আর আমি ফুটবল খেলার কথা ভাবছি। তিনি প্রথমে এটি মেনে নিতে পারেননি। মহসিন সাহেব তাকে থামিয়ে দেন। আমার কথা শুনতে চান। পুরো ধারণাটা গুছিয়ে বলি। ওই তিনজন ফুটবল খুব একটা বুঝতেন না। কিন্তু উপলব্ধি করেন, এটি অন্যরকম এক যুদ্ধ হতে পারে।’

সঙ্গীদের নিয়ে প্যাটেল তাজউদ্দীন আহমদের কাছে যান। তিনি খুশি হয়ে স্বাধীন বাংলা সরকারের ফান্ড থেকে ১৪ হাজার রুপি দেন প্রাথমিক খরচ হিসেবে।
প্যাটেল এক সময় নিজ হাতে গড়া দল থেকে সরে আসেন! কিন্তু কেন? ‘আমরা যে ঘরে থাকতাম, ওই ঘরটিতে কে যেন পানি দিয়ে সব নষ্ট করে দেয়। লেপ-তোষক, কাপড়-চোপড় সব ভিজে যায়। দোষ পড়ে আমার উপর। আমি বুঝতে পারি আমার সঙ্গে ঝামেলা করার জন্য ওরা এটা করছে। পিন্টু ভাই, প্রতাপ দা, সুভাষ, সুরুজ এমন কয়েকজন অভিযোগ করে, আমি নাকি ঘরে পানি দিয়েছি। কিন্তু আমি তো সবার সঙ্গেই মাঠে গেছি, সবার সঙ্গে ফিরেছি, তাহলে কখন পানি দিলাম? আর নিজের বানানো ঘরে কেনই-বা পানি দেব?’
‘এনিয়ে তদন্ত কমিটি হয়। পাঁচজনের সেই কমিটি অনুসন্ধান করে দেখেন, আমি নির্দোষ। বরং আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য ওই চার-পাঁচজনের শাস্তির সুপারিশ করা হয়। এক সময় দল ছেড়ে বেরিয়ে আসি।’
প্যাটেলের অভিযোগ, ‘হিংসা থেকেই তারা অমন করে। আমি অল্প বয়সী একটা ছেলে বিদেশের মাটিতে দল করে ফেললাম, এটা তারা কিছুতেই মানতে পারছিল না। আমাকে সরাতেই তারা এগুলো করে।’
কিছুদিন আগে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ফরোয়ার্ড শেখ তসলিম উদ্দিনের মানবেতর জীবন-যাপনের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র এবং বাড়ি মেরামতের জন্য পাঁচ লাখ টাকা পান। সাঈদুর রহমান প্যাটেল এই খবরে আপ্লুত। সতীর্থের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তবে আক্ষেপও করেছেন, ‘আমাদের আরও অনেকে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আবদুল খালেক হাসপাতালে। তার অবস্থাও খারাপ। আমাদের আশা প্রধানমন্ত্রী তাকেও সাহায্য করবেন। আমাদের দলটাকে এখনো জাতীয়ভাবে কোনো পুরষ্কার দেয়া হয়নি। জীবদ্দশায় সেটি দেখে যেতে যাই।’
সেই দলে যারা ছিলেন
জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), শেখ মোহাম্মদ আইনুল হক (ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক), প্রতাপ শংকর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), শাহাজাহান আলম, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, মোহাম্মদ শেখ তসলিম উদ্দিন, আলী ইমাম, সাইদুর রহমান প্যাটেল, শেখ আশরাফ আলী, খোন্দকার নুরুন্নবী, এ কে এম নওশেরুজ্জামান, এনায়েতুর রহমান খান, কাজী সালাউদ্দিন, মনসুর আলী লালু, অমলেশ সেন, বিমল কর, আবদুল হাকিম, ফজলে সাদাইন মৃধা খোকন, সুভাষ চন্দ্র সাহা, লুৎফর রহমান, মজিবর রহমান, দেওয়ান সিরাজউদ্দিন সিরু, সাঈদ, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, নিহারকান্তি দাস, প্রাণগোবিন্দ কুন্ডু, অনিরুদ্ধ চট্টোপাধ্যায়, আবদুস সাত্তার মিয়া, বীরেন দাস বীরু, আবদুল মোমিন জোয়ার্দার, আমিনুল ইসলাম সুরুজ, মাহমুদ, সনজিৎ কুমার দে, আবদুল খালেক ও মোজাম্মেল হক।
কোচ: ননী বশাক। ম্যানেজার: তানভীর মাজহার তান্না। প্রস্তাবক ও সংগঠক: সাঈদুর রহমান প্যাটেল।
ছবি: সাঈদুর রহমান প্যাটেলের ফেসবুক থেকে নেওয়া।







