আমি একজন মানুষকে প্রায় সাতাশ বছর ধরে একইরকম দেখে আসছি। তিনি সব সময়ই তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, কাছের-দূরের সবাইকে নিয়ে সমানভাবে ভালো থাকার একতরফা পক্ষপাতী। তার মুখে সবসময় হাসি লেগেই আছে। তাকে দেখে তার শত্রুপক্ষও ঘূণাক্ষরেও বুঝে উঠতে পারবেন না যে এই মানুষটা কি বিপদে আছেন, না তৃপ্তিতচিত্তে আছেন, না বিষণ্ণতায় আছেন, নাকি নতুন কোন রঙিন স্বপ্ন বুনে চলেছেন বুকের ভেতর।
সবসময় নিজের মধ্যে, নিজের মতো করে থাকতে স্বর্গীয় সন্তুষ্টি খুঁজে পান। নিত্য নতুন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে বিভোর থাকতে পছন্দ করেন। মেধা, মনন, প্রজ্ঞার সঙ্গে মিতালি করে নিয়েছেন হাজার বছরের আবহমান বাঙালি সংস্কৃতিকে। তিনি ফরিদুর রেজা সাগর। তাঁর পরিচিতি লিখতে গেলে হয়ত আপনাআপনি অনেক বিশেষণ এসে যাবে। তবে সব পরিচয় ছাপিয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান শিশুসাহিত্যিক। সাহিত্যের প্রায় সব উল্লেখযোগ্য পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। দেশের বাইরেও রয়েছে তার পাঠকশ্রেণি। তার অজস্র রচনা এদেশের শিশু-কিশোরদের মনের জগতকে বহু রঙে বর্ণিল করেছে। তাদের স্বপ্নের জগতকে করেছে বিস্তৃত যেখানে আমরা সবাই রাজা। ফরিদুর রেজা সাগর আমাদের দেশের অগণিত শিশু-কিশোরের বুকের ভেতর তৈরি করে দিয়েছেন রঙিন জগত, বড় হওয়ার দুর্নিবার স্বপ্ন।
আমাদের এই মরার দেশে এক জীবনে জীবনের সব প্রাপ্তিকে, সব না পাওয়াকে আনন্দের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারার দুঃসাহস দেখানো অনেক ঝক্কির ব্যাপার। সবাই এই দুঃসাহস দেখাতে পারেন না। কিন্তু ফরিদুর রেজা সাগর সেই দুঃসাহস অনায়াসে, অবলীলায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। পারিবারিক আবহ ছিল অনুকূলে। মা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, বাবা খ্যাতিমান চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ফজলুল হকের কল্যাণে শিশু বয়স থেকে এদেশের শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন, এখনও আছেন আগের মতই। লেখালেখির শুরু ছোটবেলা থেকেই। তারপর জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে জীবনকে নানাভাবে দেখেছেন। জীবনের অনুকূল পরিস্থিতিকে নিজের আশ্চর্য সূত্র আর বিবেচনায় জয় করে দেখিয়ে দিয়েছেন জীবনে বড় হওয়ার সাহস আর স্বপ্ন থাকলে কোনোকিছুই আর প্রতিবন্ধক হয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে না।
ফরিদুর রেজা সাগরের কাছের মানুষজনরাও শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও জীবনের সবকিছুকে উজিয়ে সামনে চলার তার এই অভিযাত্রায় বিস্ময় মানেন। তার কাছের মানুষরা আরও একটা কথা করজোড়ে কবুল করেন, সেটা হলো তার অসহ্য মাত্রার ধৈর্য ক্ষমতা। এ ব্যাপারে ফরিদুর রেজা সাগরকে কেউ জিজ্ঞেস করলে তিনি সব সময়ই তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলেন, আমার আর ধৈর্য ক্ষমতা কই!
ফরিদুর রেজা সাগরের বন্ধুভাগ্য বলে কয়ে শেষ করা যাবে না। এদেশের সাহিত্য, নাটক , সাংবাদিকতা, শিল্প-সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রে রয়েছে তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। স্বাধীনতার আগে থেকে শিশুশিল্পী হিসেবে তিনি এ জগতে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তার সামনে চলার পথ তাকেই করে নিতে হয়েছে। এই সামনে চলার পথে তিনি সব সময় তার মা রাবেয়া খাতুনের শরণাপন্ন হয়েছেন- আর সব মা যেমন তার সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে আশীর্বাদ করেন, আগলে রাখেন তার মাও তাকে তাই করেছেন। সন্তান মাত্রই মা ভক্ত এ কথা না বললেও চলে। তবে আজ ৬৩ বছরে পা দেয়া ফরিদুর রেজা সাগরের ক্ষেত্রে বোধ করি একটু বাড়িয়ে বললে ভুল বলা হবে না যে, তিনি অসম্ভব মা ভক্ত, বিক্রমপুর অঞ্চলের ভাষায় যাকে বলে ‘মা-নেওটা’ ।
দুই.
আজ আমাদের প্রিয় মানুষ ফরিদুর রেজা সাগরের জন্মদিন। বিচিত্র স্বাদের মানুষের কথা তার লেখায় ঘুরে ফিরে আসে। আসে জীবনের বিচিত্র আখ্যান। ইতিমধ্যে তিনি তাঁর লেখা দিয়ে পাঠকের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। সামনের দিনেও ফরিদুর রেজা সাগর এমন করে পাঠকের অন্তরের জায়গার দখল-সীমানাকে আরও বহুগুণে বাড়াবেন। আপনার জন্মদিনে চাওয়া- আপনি আপনার স্বপ্নের চেয়ে আরও দীর্ঘ হয়ে উঠুন।








