প্রহর জুড়ে চৈত্রের খরতাপ আবাহন। তার প্রস্থানে প্রকৃতিও উত্তপ্ত-বিরূপ। তবুও সময়ের নিয়মে চলে গেলেন বীর নারী, আজন্ম শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসলেন কফিনে। সে কফিন ঢাকা পড়ে জাতীয় পতাকায়। বাজে বিদায়ের করুণ বিউগেল। নমিত হয় সঙ্গিন সম্মানে। প্রতি মনে জাগ্রত হলেন শোকে আর বিদায় নিলেন শেষ শ্রদ্ধায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অসংখ্য মানুষের জানাজা। তারপর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শহীদ জননী জাহানার ইমামের পাশে নিলেন চির শয্যা।
তাকে বিদায় জানান সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাকে বিদায় জানায় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাকে বিদায় জানায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই। বিদায় কালে তার মেয়ে ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনীর ভাষ্য, ‘মা গত চার মাস ঘর থেকে বের হতে পারেননি। ফাল্গুন দেখার খুব আগ্রহ ছিল। পারেননি। তবে বিদায়ের সময় আপনারা মাকে অসংখ্য ফুলে বিদায়ী ফাল্গুন উপহার দিলেন। দাফন শেষে ফুলেশ্বরী বলেন, ‘আজ থেকে মা জাহানারা ইমামের পাশে ঘুমাবেন। আমরা গর্বিত।’
মহাখালি থেকে দশম শ্রেণীর তিন ছাত্রী আনিতা, আরিফা এবং সুরাইয়া এসেছে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে শ্রদ্ধা জানাতে। চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে সুরাইয়ার ভাষ্য, ‘তার কথা পত্রিকা পড়ে আর টেলিভিশনে জেনেছি। তিনজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার মত সংগ্রামী নারীকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাব। বাবা-মাকে না জানিয়েই এসেছি।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় তার কফিনবাহী গাড়িতে করে বেলা ১১.১০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসে মুক্তিযোদ্ধা-ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মরদেহ। নিয়ে আসা হলে ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদের নেতৃত্বে এই মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
এরপর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে শুরু হয় শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন পর্ব। বন্ধু, স্বজন, সহযোদ্ধা আর ভক্তদের শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কফিন।
শ্রদ্ধা জানানো শেষে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘নারী আন্দোলনের সকল পর্যায়ে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার এ কণ্ঠস্বর কখনো পিছপা হননি। একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতির জন্য ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী যে লড়াই করে গেছেন, সরকার তা এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
কিডনি ও হৃদরোগের জটিলতা নিয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার মৃত্যু হয় প্রিয়ভাষিণীর। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত এই মুক্তিযোদ্ধার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রিয়ভাষিণীর মৃতদেহ মঙ্গল ও বুধবার রাখা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেলের হিমঘরে। তার ছোট ছেলে কাজী মহম্মদ শাকের তূর্য অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরলে বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হয় শেষযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা।
আগামী ১৩ মার্চ বিকাল সাড়ে ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর স্মরণে নাগরিক শোকসভা আয়োজন করবে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।
ছবি: ওবায়দুল হক তুহিন







