প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন এমনই এক জাতীয় রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে হাতে গোণা কিছু ভয়ঙ্কর রোগের মতো যার এখনও প্রতিষেধক আবিষ্কার করা যায়নি। তবে এই রোগের একটা প্রতিষেধক যাও আশার আলো হয়ে জ্বলছিল, প্রধানমন্ত্রীর ইটালি সফর শেষে করা সংবাদ সম্মেলনে সেটারও ইতি ঘটেছে।
সেই সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের পর প্রধানমন্ত্রীর যেই জবাব দিয়েছেন তাতে আশাহত হয়েছে দেশের অনেক মানুষ, আমিও। আশা করেছিলাম, এবার যেহেতু বিষয়টা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছে করা হয়েছে; তিনি হয়তো বলবেন- এ বিষয়ে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। যদিও এই মহামারী রুখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার কোন ঘাটতি দেখাচ্ছে না। অনেক পরীক্ষা বাতিলও হয়েছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেহেতু এই সমস্যা দমন করতে না পারার অভিযোগ, তাই তাকে আরও উদ্যোগী হতে পরামর্শ দেওয়ার আশা ছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
কিন্তু এর বদলে তিনি সাংবাদিকদের বললেন, আপনারা প্রশ্নফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিন, আমরা কঠোর শাস্তি দেবো। সরকার যেকান সমস্যা মোকাবেলায় জনগণের সহায়তা চাইতেই পারে, তবে এক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার। অবশ্য ইতোমধ্যে প্রশ্নফাঁসের আখড়া হিসেবে পরিচিত ফেসবুক-মেসেঞ্জার এবং হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন গ্রুপে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি এসব বিষয়গুলো তুলে ধরলে অপরাধী চক্রের মনে আরও বেশী কাঁপন ধরতো বলে মনে হয়।
এর বদলে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন অপরাধীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোন অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়া কি সাংবাদিকের কাজ, নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর? এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা সাংবাদিকদের প্রতিবেদন কিংবা তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য নিতে পারে। তাই বলে সাংবাদিকরা অপরাধীদের পুলিশ কিংবা অন্যান্য বাহিনীর হাতে সরাসরি তুলে দিতে পারে না। কারণ, প্রথমত: এটা তাদের কাজ না। দ্বিতীয়ত: এক্ষেত্রে তাদের নানা সীমাবদ্ধতা এবং আরও নানাবিধ সমস্যা রয়েছে, যেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোকাবেলা করতে হয় না।
প্রশ্নপত্র কিংবা পরীক্ষার ধরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি যার কাজ তাকেই করার কথা বলতে হবে। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স এবং অপরাধীদের কোনক্রমেই ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। আশা করি, এই মানসিকতা প্রধানমন্ত্রীর অবশ্যই রয়েছে। কারণ, তিনি চান না এই ইস্যুতে তার সরকারের কোন বদনাম হোক। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রী কিংবা সচিবের দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই।
উন্নত বিশ্বে সাধারণত রেল দুর্ঘটনা কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনা বা ব্যর্থতার দায় সর্বোচ্চ পর্যায়েই আসে। এমনকি সম্প্রতি প্রশ্নপত্রে ভুলের কারণে দু:খপ্রকাশ করে সাউথ কোরিয়ার শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বলেও খবরে জানা যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী কিংবা সচিব প্রশ্নফাঁস করেছেন এটা কেউ মনে করে না, সাধারণ মানুষের অভিযোগ এই বিষয়ে তাদের কঠোর ভূমিকা না নেওয়ার কারণে।
প্রশ্নফাঁসের এই মহামারী বৃদ্ধির মূল কারণ ছিল, শুরুর দিকে এটাকে সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে অস্বীকার করার মানসিকতা। যার খেসারত এখন পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে। প্রথমদিকে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে না বলে একে অস্বীকার না করে যদি তখন থেকেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হতো, তাহলে এই রোগ তখনই নির্মূল হতো। আর এখন এই যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাজ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তাতে মহামারীতে সবকিছু শেষ হওয়া ছাড়া কোন উপকার হবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







