সন্দ্বীপের অর্থনীতিতে অনিবার্য শক্তি সন্দ্বীপের প্রবাসীরা। তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থ সন্দ্বীপের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকা্ণ্ডে ব্যবহার হলে বদলে যেতে পারে গোটা সন্দ্বীপ। পর্যটনসহ নানা দিক দিয়ে আধুনিক মালেশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো রূপ যৌবনে ভরে উঠা কোন ব্যাপার ছিল না সন্দ্বীপের জন্য। সেজন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন সন্দীপবাসী অনেকে।
উন্নয়নমুখী সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে পারলে আত্মীয়তার বন্ধনের পাশাপাশি যুতসই বিনিয়োগ নির্ভর সম্পর্ক সন্দ্বীপের পাশাপাশি দেশকেও আলোকিত করতে সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।
দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক প্রবাসে বসবাস করেন। এ সংখ্যা বিশেষত সন্দ্বীপের বেশি। দুই লাখেরও বেশি প্রবাসী সন্দ্বীপ অঞ্চলের। তাদের পাঠানো অর্থের বেশিরভাগ বলতে গেলে ব্যয় করা হয় অনুৎপাদনশীল খাতে। এছাড়া ব্যাংক টাকা জমিয়ে রাখাকে অনেকে শ্রেয় মনে করেন।
একাধিক যুক্তরাজ্য প্রবাসীর সাথে আলাপকালে তারা বলেন, দেশে বিনিয়োগ করলে এর বিপরীতে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নেই, সর্বক্ষেত্রে প্রবাসীদের ঠকানোর একটি প্রবণতা লক্ষণীয়। তাই বিনিয়োগ করার আগ্রহ নেই তাদের। বরং পৈতৃক বা পারিবারিকভাবে যে বিনিয়োগ রয়েছে তা গুটিয়ে নেওয়ার মনোভাব তাদের। অনেকে ভিটেমাটি বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ব্রুকলিন এর বাসিন্দা নাদিয়া আফরোজ বলেন, প্রবাসীদের অর্থের প্রতি আগ্রহ দেশের আত্মীয়স্বজন কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের। সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের রেমিটেন্সের ফলাও প্রকাশ হয়। কিন্তু এই প্রবাসীদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন দেখা যায় না।

সন্দ্বীপ উপজেলায় প্রবাসীদের আধিক্য। বাড়িঘর সাজানো গোছানো পরিপাটি। রাস্তাঘাট সবই উন্নত। প্রবাসীদের অর্থের বেশিরভাগ অংশ ক্রয় হয়, জমিজমা কিনে, এরপর সংসার প্রতিপালন ও দালান কোটার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে। সম্প্রতি মার্কেট, ব্যাংক, আবাসন খাতে বিনিয়োগর একটি প্রবণতা লক্ষ্যণীয় ছিল। কিন্তু এ খাতগুলো এখন মন্দা হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগের প্রতি তাদের সেই আগ্রহ নেই।
প্রবাসীরা দেশেমাতৃকার টানে ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে দেশে বিনিয়োগ করে একটি নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেই ধারা এখন ক্রমশ মুখ থুবড়ে পড়ছে। প্রবাসীদের অর্থনীতির পাশাপাশি তাদের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার সংযোগ ঘটাতে পারলে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটতে পারতো দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের। এর মধ্যদিয়ে নতুন প্রজন্মও উৎসাহ খুঁজে পেত বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
সন্দ্বীপের ‘নিশি গ্রিন ফিল্ডস’এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামিমুল ইসলাম বলেন, এখন প্রবাসীদের বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ দেখা যায় না। নানা পারিপার্শ্বিকতায় তাদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ খুবই দরকার।সন্দ্বীপ এর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কাসেম সাহেব বলেন, সরকার সন্দ্বীপকে উন্নয়নের একটি রোডম্যাপ নিয়ে প্রবাসীদের বিনিয়োগে নিয়ে আসতে পারলে বৈপ্লবিক একটি পরিবর্তন সূচিত হতো। সেই সাথে প্রবাসী ও দেশের মানুষের মধ্যে অর্থনীতির স্বার্থগত সম্পর্ক গড়ে উঠতো।
সন্দ্বীপের ব্যাংকগুলোতে প্রবাসী কয়েক হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। এ টাকা কোন উৎপাদনশীল খাতে পরিবেশ প্রতিবেশ নিশ্চিত হলে তারা বিনিয়োগ করতেন। কিন্তু সেই পরিবেশ তাদের সামনে নেই। বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে একমাত্র সরকার।
সেরকম কোন উদ্যোগ এখন পর্যন্ত বাস্তবিক অর্থে প্রকাশ পায়নি। সন্দ্বীপের উন্নয়ন পরিষদের এক জরিপে দেখা যায়, প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থেও দুই-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয় অনুৎপাদশীল খাতে এবং এর অধিকাংশ ব্যয় হয় ভোগ বিলাসে।প্রবাসীদের পাঠানো টাকার ৬৬.১ শতাংশ অনুৎপাদনশীল খাতে। এর মধ্যে ৫২.৪ শতাংশ আপ্যায়ন, অনুষ্ঠানাধি এবং ৯.২শতাংশ ঘর-বাড়ি ঠিক করার কাজে ব্যয় হয়।বিনিয়োগ খাতের মধ্যে রয়েছে দোকান ও গাড়ি ক্রয় ইত্যাদি।

১২.২শতাংশ অকৃষি খাতে, কৃষি জমি ক্রয় খাতে ১৫ শতাংশ, ০.৮ শতাংশ ভ্রমণ, ৩.৪ শতাংশ ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যয় হয়। প্রবাসী পরিবারের যেসব সদস্য দেশে বসবাস করেন তারা বেকার থাকেন। তাদের মধ্যে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োেগের কোন আগ্রহ নেই। তবে সামান্য একটি অংশ ব্যয় হয় ব্যবসা, পরিবহন ও অন্যান্য খাতে। এর মধ্যে কৃষি জমি ক্রয়, কৃষিকাজ, কাপড়ের দোকান, ইলেক্ট্রনিক্স’র দোকান, বেকারী প্রভৃতি।
মাত্র ২৯ শতাংশ পরিবার এসব খাতে বিনিয়োগ করছে। ৭৮ শতাংশ পরিবার কোন বিনিয়োগই করেনি। তথ্য নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে সহায়তামূলক কার্যক্রমের অভাবে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ যথাযথ ব্যবহৃত না হয়ে অনেকে উল্টাপাল্টা খাতে ব্যয় করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্টদের বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, বিনিয়োগের নির্দেশনা প্রশিক্ষণমূলক সহায়তামূলক কার্যক্রম বিস্তৃত করা, বিনিয়োগ প্রকল্পের সমর্থনে জরুরি ভৌত, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো তৈরির বিষয় চিহ্নিত করা।
পরবর্তীতে এ নিয়ে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে প্রবাসীরা বিভিন্ন পর্যায়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই অবস্থা এখন হুমকির মুখে। তারা বিনিয়োগ গুটানোর পাশাপাশি দেশের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক সীমিত করার চিন্তাধারায় ব্যস্ত।









