দেশে আইনের শাসন নেই, গণতন্ত্র নেই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই; নাগরিক সমাজের একটি অংশ থেকে জোরেশোরে এরকম উচ্চারিত হলেও সরকারের তাতে কোন ভাবান্তর নেই। সরকার তাদের এজেন্ডা নিজের মতো করেই বাস্তবায়ন করে চলেছে। কারও কোন সমালোচনাকে গায়ে মাখছে না। বরং সমালোচনাকারীদের কঠোর সমালোচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি দুজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে তো দেখিয়েই দেয়া হয়েছে, সমালোচনার পরিণাম কী হতে পারে!
কথা হলো, এতে কী দেশের কল্যাণ হবে? শাসকদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়বে? তারা নিশ্চিন্তে তাদের এজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে? কিন্তু যদি গণেশ উল্টে যায়? আসলে রাজনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতাসীন হন, তখন বোধহয় তাঁদের মধ্যে ঘুমন্ত একনায়কতন্ত্র জেগে ওঠে।
হিটলারের মনস্তত্ত্ব নিয়ে সম্প্রতি একটি বই পড়ছিলাম। মনস্তাত্ত্বিক লেখক ওয়াল্টার সি লেঙ্গার তাতে দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রবল জনসমর্থন হিটলারকে হিটলার করে তোলে। একটা জনসমর্থনপুষ্ট দেবতা হয়ে তখন হিটলাররা মনে করতে শুরু করেন, তিনি যেটা বলবেন, সেটাই আইন। তিনি যা করবেন, যেভাবে করবেন, সেটাই সবচেয়ে ভালো। তিনিই কেবল দেশের কল্যাণ কামনা করেন, আর কেউ না! যারা তার সঙ্গে নেই, সবাই তার বিপক্ষে! যারা ক্ষমতায় থাকেন তারা একটি সাংবিধানিক চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন। এক ধরনের মিথ্যে স্তুতি ও তোষামুদির মধ্যে বাস করেন হিটলাররা। সেখানে খারাপ কিছু নেই, ভুল নেই, ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার কোনো উপলক্ষ নেই। তারা গণতন্ত্রের পচনও দেখেন না, দেখেন না ক্ষমতার অপব্যবহার আর দুর্নীতি।
আমাদের দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র বিকশিত হয়নি। বিকশিত হওয়ার জন্য ন্যূনতম যে শর্ত, তা পূরণ করা হয়নি। এ জন্য অবশ্য সংসদীয় ব্যবস্থাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
গায়কের ব্যর্থতার জন্য তো আর গানকে দোষারোপ করা যায় না। সংসদ কতোটা শক্তিশালী বা কতোটা দুর্বল হবে, সেটা নির্ভর করে প্রশাসনিক প্রভুরা তাকে কতোটা মান্য করবে, তার উপরে। আমাদের দেশে সেটা করা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ ব্যর্থতার দায় গোটা জাতিকে শোধ করতে হচ্ছে। আমাদের দেশে দলীয় স্বেচ্ছাচারিতা, উৎকোচ আর অযোগ্যতা গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী!
জন স্টুয়ার্ট মিল ছিলেন উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সমর্থক। তিনিও অবিরত প্রশ্ন করে গেছেন পারিপার্শ্বিক কাঠামোগত ব্যবস্থাদির সীমাবদ্ধতাকে। উদার গণতন্ত্রকে দু’হাত তুলে সমর্থন করলেও বারংবার সচেতন করেছেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবনাকে নিরন্তর প্রশ্নবিদ্ধ না করলে তা কালক্রমে স্বৈরাচারের জন্ম দেবে। ‘টাইরানি অব দ্য মেজরিটি’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার যে উদার গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা, সে কথা উল্লেখ করে গেছেন প্রায় তাঁর সমস্ত রচনাতে। অন্যের শুভ চিন্তার দ্বারা সতত নিয়ন্ত্রিত জীবন অপেক্ষা নিজের ভুল চিন্তার দ্বারা অতিবাহিত জীবন যে অধিকতর মূল্যবান, উল্লেখ করেছেন সে কথা। নির্বোধের সন্তুষ্টির চাইতে সক্রেটিসের অসন্তুষ্টি যে মানবসভ্যতাকে অধিকতর সমৃদ্ধ করে, সে কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আমাদের দেশে শাসকশ্রেণী আপাত উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোকে গ্রহণ করলেও প্রায়শই তাদের রক্তের মধ্যে এক ভিন্নতর আধিপত্যের জীবাণু মাথাচাড়া দেয়। যে আধিপত্য তাকে জন্মলাভে বাধ্য করেছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে সে। তার কাছ থেকে শিখে নেয় কীভাবে প্রভাব ধরে রাখতে হয়, কীভাবে প্রশ্নবাণকে প্রতিহত করতে হয়। সমাজ নেতা তৈরি করে। সামাজিক জীবন যদি বিশ্বাসে স্থির থাকে, সংশয়ে ব্যাকুল না হয়, তবে নেতার কী দায় সেই সমাজকে পাল্টানোর! তাই ক্ষমতার যতোই রং পাল্টাক, ধরন একই থাকে।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দায় ক্রমাগত প্রশ্ন করে ক্ষমতার অচলায়তনকে ভেঙে দেওয়া, যাতে সেখানে মুক্ত বাতাস ঢুকে শাসকের কর্মকুশলতাকে সমৃদ্ধ করে। সে দায় আমাদের সবার। সমাজের। সাধারণত কাল প্রবহমান। মানুষ যা করে, করে তার উত্তর-প্রজন্মের জন্য। তবে ক্ষেত্রবিশেষে পূর্বপ্রজন্মের জন্যও কিছু করা যায়।
প্রশ্ন করতে হবে, প্রশ্ন করার পরিসরও উন্মুক্ত রাখতে হবে। বাস্তবতার দোহাই দিয়ে নিরাশাবাদ ছড়ানো কি কোনো ব্যক্তির জন্য অন্যায়? না কি মিথ্যা আশার বাণীকে বাধ্যতামূলক উপসংহার করা পাঠকের সঙ্গে মিথ্যাচার? এসব প্রশ্নের জবাব কে দেবে? প্রশ্নে-প্রশ্নেই খুঁজে পেতে হবে লাগসই উত্তর। ক্ষমতাবানরা যদি কেবল প্রশ্নহীন উত্তরের সমাজ তৈরি করে খুশি থাকেন, তবে তা সবার জন্যই বিপদ!
পাদটিকা: এক প্রবল অত্যাচারী জমিদারের ইন্তেকাল আসন্ন। তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে ডেকে বললেন, ‘‘শোনো বাবুসোনা, আমি চলে গেলে তুমি জমিদার হবে। পিতার ঋণ শোধ কোরো। আমি জীবনে কোনও প্রশংসাই পাইনি। তুমি প্রথম থেকেই এমন বিচিত্র অত্যাচার শুরু করবে যে লোকে দু’হাত তুলে বলবে ‘এর বাপটা ভাল ছিল’, তবেই আমার আত্মার শান্তি হবে।’’ আমাদেরও কী এমন ‘ভালো’ জমিদার-ই দেখে যেতে হবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







