মেয়েদের অধিকার নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় সচেতন ছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তিনি সবসময় একটা কথা বলতেন, আমরা ‘নারী অধিকার’ ‘নারী অধিকার’ করে যতই স্লোগান দেই, যতই বক্তব্য রাখি, অধিকার তো আর হেঁটে আসবে না। একটা মেয়ে যদি নিজে অর্থ উপার্জন করতে পারেন, আঁচলে বেঁধে যদি তিনি ১০ টাকা কামাই করে নিয়ে আসতে পারেন, তবে সংসারে এমনিই তার অবস্থান তৈরি হবে। কেউ তাকে অবহেলা করতে পারবে না।’
তাই নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মেয়েদের ঘরে বসে থাকলে চলবে না। তাদের নিজ দায়িত্বে লেখাপড়া শিখতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
‘সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা’ প্রতিপাদ্যে এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর প্রণীত সংবিধানের ১৯ ও ২৮ নং অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা নিশ্চিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই প্রথম প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করার পাশাপাশি নারী শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশে নারীশিক্ষাকে প্রথম গুরুত্ব দেন।
এছাড়াও সংবিধান রচনার সময় সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রেখেছিলেন তিনি। নারীদের সরাসরি নির্বাচন করার সুযোগ রাখার পাশাপাশি এই সংরক্ষিত কোটা রাখা হয়েছিল যেন নেতৃত্বে নারীরা নিশ্চিতভাবেই আসতে পারে।
বাংলাদেশের নারীরা এখন অনেক এগিয়ে গেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অবস্থানে আসতে নারীদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীর মেধাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা সমাজকে যদি গড়তে হয়, যে সমাজের প্রায় অর্ধেকই নারী, সেই অর্ধেককে বাদ রেখে সমাজ উন্নত হবে কীভাবে? সমাজকে উন্নত করতে হলে নারী-পুরুষ সবাইকে সমান সুযোগ করে দিতে হবে।’
তিনি বলেন, সমাজে নারী যদি পড়ে থাকে, সেই সমাজ কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সভ্য সমাজের মেয়েরা যা পারে না, বাংলাদেশের মেয়েরা এখন তা পারে। নারীকে বাইরের পাশাপাশি ঘরকেও মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জয় করতে হবে। কেননা ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার সরকার ঠিক করে, তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের রাখতে হবে। এ কারণেই ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে প্রথম স্থানীয় সরকার আইনের মাধ্যমে নারীদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছিল।
‘এর জন্য অনেক বাধা এসেছিল। মেয়েরা ঘরের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করবে! মেয়েদের ভাসুর-শ্বশুর অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। কিন্তু যখন নির্বাচন এসে গেল, মেয়েরা প্রার্থী হলো, দেখা গেল সেই ভাসুর-শ্বশুরও তাদের পাশে পাশে যাচ্ছেন ভোট চাইতে!’ প্রতিকূলতার মাঝেও একটু সাহস করে নারীদের এগিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘৯৬ সালে সরকার গঠনের সময় আমি দেখলাম সচিব পদে, আমাদের উচ্চ আদালতে কোনো নারী নেই। পাকিস্তান আমলে একটা আইন ছিল: জুডিশিয়ারিতে কোনো নারী ঢুকতে পারবে না। স্বাধীনতার পর সেই আইন বঙ্গবন্ধু সংশোধন করে দেন। সংশোধিত আইনে প্রথম নিয়োগ পেয়েছিলেন নাজমুন আরা। তিনিই ছিলেন প্রথম নারী বিচারক।
যখন আমি প্রথম নারী পুলিশ এসপি নিয়োগ করতে যাই তখন অনেক বাধা পেয়েছি। মেয়েরা আবার এসপি হবে কীভাবে? আমি জোর করে নিয়োগ দিয়েছিলাম। প্রথম নারী এসপি করলাম মুন্সিগঞ্জের রওশন আরাকে। যেই তিনি প্রথম নিজের পিস্তল উঁচিয়ে ডাকাত ধরলেন, গর্বে আমার বুকটা ভরে গেল।’
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জয়িতা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৫ সফল নারীকে জয়িতা সম্মাননা দেয়া হয়।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী ঢাকা বিভাগের বৃষ্টি, শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী খুলনা বিভাগের মোসাম্মাত নাসিমা খাতুন, সফল জননী হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগের হৃলাক্রাপ্রু মার্মা, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোগে জীবন শুরু করা ঢাকা বিভাগের ফিরোজা খাতুন, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখার জন্য রাজশাহী বিভাগের আমিনা বেগম প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে জয়িতা সম্মাননা গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব নারীকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানান তিনি।







