টানা ২০ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ৭ অক্টোবর দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সফরে তিনি জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ পরিষদে ভাষণ এবং রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাই তার দেশে ফেরাকে সামনে রেখে ব্যাপক গণসংবর্ধনার প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। এজন্য মঙ্গলবার দলীয় সভাপতির ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক যৌথসভার আয়োজন করা হয়েছে।
যৌথসভায় উপস্থিত হতে দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগরীর আওতাধীন সকল সংসদ সদস্যদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
এবারের সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যা অধিবেশন শুরুর আগে থেকেই ছিলো আলোচনায়। বিশ্বনেতাদের থেকে শুরু করে সকলের আগ্রহ ছিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কী বলবেন আর সমাধানেরই বা কী পথ দেখাবেন।
শেখ হাসিনা তার ভাষণে মিয়ানমার থেকে সেনা নিপীড়নের মুখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দুঃখ- দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে বাস্তব সম্মত ৫ দফা প্রস্তাব বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
এছাড়া, দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো এবং বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন বিশ্ব নেতারা। রাষ্ট্রনেতার নেতৃত্বগুণের পাশাপাশি মানবিকতার পরিচয় দিয়ে এরই মধ্যে তিনি অর্জন করে নিয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি।
সাধারণ পরিষদে ভাষণের পাশাপাশি, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুটারেস-সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে দ্বি-পক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তাদের রোহিঙ্গা সংকট পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া দৃঢ় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে ২৮ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৈঠকে বসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ৯ সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সসহ ৭ সদস্যই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদের অবস্থানকে সমর্থন করে বক্তব্য দেয়। এসময় যুক্তরাজ্য মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানায়। যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমারকে সংযত হতে কঠোর ভাষা উচ্চারণ করে। শুধু চীন ও রাশিয়া সরাসরি মিয়ানমারের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকে। তবে তারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার দুই সরকারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পক্ষে মত দেয়।
নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক থেকে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাবনা কিংবা যৌথ বিবৃতি না আসলেও শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সফলতা এখন দৃশ্যমান। এরই মধ্যে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আলোচনা শুরু করার জন্য ঢাকা সফরে এসেছেন মিয়ানমার স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির দপ্তরের মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে।
সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। রোহিঙ্গারা যেন স্বদেশে ফিরে যেতে পারে; সেজন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে।
সবমিলিয়ে জাতিসংঘে শেখ হাসিনার এবারের উপস্থিতি অন্য যেকোন বারের চেয়ে তুলনায় ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তিনি তার সহজাত নেতৃত্বগুণে সফল ভাবে সম্পন্ন করেছেন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের এ সফল্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া জানিয়েছেন: যৌথসভা উপলক্ষ্যে কেন্দ্রে থেকে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বরাবর চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সংশ্লিষ্ট সকলকে যথা সময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।
অবশ্য শেষ মুহূর্তে গণসংবর্ধনা বাতিলের সম্ভবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চলতি বছর এপ্রিলে সফল ভারত সফর শেষে দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখনও তাকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে গণসংবর্ধনার বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নগরবাসীর দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে শেখ হাসিনার নির্দেশে সংবর্ধনার আয়োজন বাতিল করে দলটির নেতাকর্মীরা।
এবারের পরিস্থিতি বিবেচনায়; আবারও নেত্রী গণসংবর্ধনার আয়োজন বাতিলের মতো আদেশ দিতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দলটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। এমনিতেই ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার জন্মদিনের অনুষ্ঠান জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালনের আর্জি জানিয়েও ফিরে আসতে হয়ছে আওয়ামী লীগ নেতাদের। তিনি নেতাকর্মীদের জন্মদিন আয়োজনের টাকা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ভাণ্ডারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আবার কোরবানি ঈদের আগে ব্যাপক বন্যায় আক্রান্ত হওয়া উত্তরাঞ্চলের জনপদ এখনও স্বাভাবিক জীবন ফিরতে পারেনি। পানি নেমে গেলেও পুনঃর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও অনেকটা সময় লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা আবারও গণসংবর্ধনা বাতিলে আদেশ দিতে পারে বলে মনে করছেন নেতারা। তবে শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন; প্রস্তুতি এগিয়ে রাখতেই আজকের এ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
গণসংবর্ধনায় পরিকল্পনা হিসেবে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন পর্যন্ত পুরো রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানাবে নেতা-কর্মীরা। নিজ দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনায় সর্বসাধারণের উপস্থিতিও আশা করছে আওয়ামী লীগ। এছাড়া সমাজের বিশিষ্ট ও গুণীজনদের গণসংবর্ধনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে চমক দেখাতে চাইছে দলটি।
এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২১ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানকার কর্মসূচি শেষে ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে ভার্জিনিয়ায় যান তিনি। সেখানে ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও তার পরিবারের সঙ্গে এক সপ্তাহ কাটানো শেষে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র থেকে রওনা হয়ে লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল। লন্ডন আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে আসার কথা ছিল।
কিন্তু হঠাৎ পেটে ব্যথা অনুভব করায় তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে-গলব্লাডারে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। ২৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত ৮টায় সফল অস্ত্রোপচার হয় তার।







