বাংলাদেশের ক্রিকেট থেকে গর্ডন গ্রিনিজ নামটি কী কখনো মুছে ফেলা সম্ভব? অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হলেও মেহরাব হোসেন অপি অন্তত সেটা পারবেন না। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে চলা একটি দলকে জাদুমন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন যে কোচ তাকে বেশ যত্নের সঙ্গেই হৃদয়ে লালন করেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লাল-সবুজদের হয়ে প্রথম শতক হাঁকানো ব্যাটসম্যান।
বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনার স্মৃতিরচারণ করেছেন অপি। তাতে যেমন মিশে থাকল মজার মজার সব কাহিনী, তেমনি আবার আবেগে ভেসে গেলেন নানা বিষাদময় স্মৃতিতেও।
সাক্ষাতকারের একটি বড় অংশই গর্ডন গ্রিনিজের জন্য বরাদ্দ রাখলেন অপি। ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, উজ্জীবিত করার শক্তি দিয়ে যিনি প্রথমবারের মত বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে গেছেন বিশ্বমঞ্চে। সর্বকালের সেরা অন্যতম ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যান কোচ হয়েই বাংলাদেশকে জিতিয়েছেন ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি। যার পুরষ্কার হিসেবে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পান টাইগার ক্রিকেটাররা।
অন্যদের মধ্যে সাহস ছড়িয়ে দেয়ার সামর্থ্য কতটুকু ছিল গ্রিনিজের তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন অপি, ‘১৯৯৯ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমাদের একটা ম্যাচ ছিল। সেসময় আমার সবচেয়ে প্রিয় দলটাই ছিল অস্ট্রেলিয়া। মাঠে ওয়ার্ম-আপ করতাম আর ওদের খালি দেখতাম। মার্ক ওয়াহ, স্টিভ ওয়াহ, শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রাদের মত সব সেরা খেলোয়াড় ছিলেন ওই দলে।’
‘আমি ড্রেসিংরুমে বসে বসে এ নিয়ে ভাবছি আর উত্তেজনায় একা একা হাসছি। সেসময় আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কাছে ডাকলেন গ্রিনিজ। জিজ্ঞেস করলেন, বলো- অস্ট্রেলিয়া দলে কয়জন খেলোয়াড়? আমি বললাম ১১ জন। তুমি আর বিদ্যুৎ মিলে মাঠে, তাহলে কয়জন থাকবে? উত্তর দিলাম, ১৩ জন। তখন গ্রিনিজ আমাকে অবাক করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী আমাকে বিশ্বাস করো। আমি বললাম, হ্যাঁ করি। তখন তিনি আমার বুকে টোকা মেরে বললেন, বিশ্বাস করো মাঠে যে ১৩ জন খেলবে তার মধ্যে তুমিই সেরা। তার কথা শুনে আমি এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলাম যে সেই বড় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪২ রান করি এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই।’
সেই বিশ্বকাপেই পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দেয় বাংলাদেশ। আনন্দে মেতে ওঠে পুরো দেশ। ক্রিকেটাররাও উল্লাস করেছেন। তবে তাতে মিশে ছিল চাপা কষ্টও। পাকিস্তান ম্যাচে মাঠে থাকা খেলোয়াড়রা জানতেন না যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ততক্ষণে বরখাস্ত করেছে গর্ডন গ্রিনিজকে! মাঠে শিষ্যরা যখন খেলায় ব্যস্ত তখন দুঃখ নিয়ে বিদায়ের প্রস্তুতি সারছেন ক্যারিবীয় গ্রেট। গ্রিনিজের এমন বিদায়টা এখনও মানতে পারেন না অপি।
‘পাকিস্তানের বিপক্ষে জেতার পর উল্লাস ছিল, বাধভাঙ্গা উল্লাস। এরপরও একটা কষ্ট সবার মাঝে লুকিয়ে ছিল। কিন্তু কেউ প্রকাশ করতে পারছিল না। আমরা যখন মাঠে ফিল্ডিং করছিলাম, তখন আমাদের কোচ গর্ডন গ্রিনিজ ব্যাগ গুছিয়ে চলে যান। আসলে ওনাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এটা ছিল আমার কাছে ভীষণ কষ্টের বিষয়। কারণ জাতীয় দলে থাকা অবস্থায় আমি যত কোচ পেয়েছি তাদের মধ্যে আমার চোখে গর্ডন গ্রিনিজই সেরা।’
অন্যদের মধ্যে সাহস ছড়িয়ে দেয়ার দারুণ সামর্থ্য ছিল গ্রিনিজের। মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে, শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুতের সঙ্গে অপির রসায়নটা ছিল অসাধারণ। ওয়ারি ক্লাবের হয়ে শুরু, জাতীয় দলের হয়েও একসঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের উদ্বোধন করেছেন সাবেক দুই তারকা। ১৯৯৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডেতে উদ্বোধনী জুটিতে অপি-বিদ্যুৎ তোলেন ১৭১ রান। সেই ম্যাচেই বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম শতক হাঁকান অপি।

প্রিয় বন্ধু বিদ্যুৎকে নিয়ে বলতে গিয়ে মজার এক ঘটনা জানালেন অপি, ‘বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচে আমরা একটা মোটামুটি রান পেয়েছিলাম। যদিও আমি ৯ রান করেছিলাম, অন্যপ্রান্তে বিদ্যুৎ বেশ ভাল খেলছিল। ও স্ট্রাইকে থাকার সময় বোলিংয়ে এলেন ওয়াকার ইউনুস। ও প্রথম বলে ডিফেন্স করে পরের বলে দারুণ এক চার মারে। আমি গিয়ে ওকে সাহস দিলাম। তৃতীয় বলে ডিফেন্স করে চতুর্থ বলে আবারও চার। আমি আবারও ওকে সাহস দিলাম। পঞ্চম বলে ডিফেন্স করেই শেষ বলে আবারও চার মারল বিদ্যুৎ। ওয়াকার ইউনুসের মত বোলারের ওভারে তিন চার! আমি কাছে যেতেই ও হাসতে হাসতে বলল, দোস্ত এই মোয়া বোলারটা কে রে?’
নানা কারণে সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারটা লম্বা হয়নি অপির। ৯ টেস্ট ও ১৮ ওয়ানডেতে থেমে গেছে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। খেলোয়াড় থেকে বর্তমানে স্পেশালাইজড ব্যাটিং কোচ বনে যাওয়া সাবেক তারকা আক্ষেপের সঙ্গেই জানালেন তার শিষ্যরা যেন কোনদিন তার মত না হয়। প্রতিভার প্রতি অবিচার করে ক্যারিয়ারকে লম্বা না করতে পারার পেছনে দায়টা নিজেরই বেশি বলে মনে করেন অপি।
‘আমি ক্যারিয়ারের পেছনে ফিরে তাকাতে চাই না। তাহলে নিজেরই কষ্ট লাগে। এটা সত্যি যে আমি আমার প্রতিভার প্রতি একটু বেশিই অবহেলা করে ফেলেছি। যে কারণে আমার ক্যারিয়ার ছোট হয়ে গেছে। এখন আবার ক্রিকেটে ফিরেছি। ব্যাটিং কোচ হয়েছি। কিন্তু আমি চাই না আমার ছাত্ররা যেন আরেকজন অপি না হয়ে উঠে। সবাইকে নিয়মানুবর্তিতা আর কঠিন পরিশ্রম করার পরামর্শ দেই সব সময়। আসলে আমার সামর্থ্যের প্রতি অনেক অনেক বেশি অবিচার করেছি।’







