রাজশাহীর দুর্গাপুরের মেয়ে খাদিজা খাতুন। বাংলাদেশ রেলওয়ের জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরের স্টেশন মাস্টার তিনি। বাবা ও স্বামীর অনুৃপ্রেরণায় স্টেশন মাস্টারের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশাকে বেছে নিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছেন সফল এ নারী।
চ্যানেল আই অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শুনিয়েছেন তার উঠে আসার গল্প।
চার ভাইবোনের মধ্যে খাদিজা দ্বিতীয়। খাদিজারা পরপর দু’বোন। বাবা নাজিমউদ্দিন ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কৃষিজীবি এই বাবা তার দু’কন্যা সন্তানকেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ছেলের মতো করে। আর তাই পথ চলাটা সহজ হয়ে যায় খাদিজা খাতুনের।
দুর্গাপুরের হাটকান বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও রাজশাহী মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশের পর ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। স্নাতক পড়াকালেই বিয়ে হয় সহপাঠী হারুনুর রশিদের সঙ্গে। হারুনুর রশীদ সবসময় চাইতেন তার স্ত্রী স্বাবলম্বী হোক। তাই নিজেই গিয়েছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার পরীক্ষার পদে স্ত্রীর জন ফরম কিনতে। এরপর স্বামীর কথামতোই দিয়েছিলেন লিখিত পরীক্ষা। সেখানে উত্তীর্ণ হলে ভাইভার জন্য খাদিজার ডাক আসে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় রেল ভবন থেকে।
তবে এবার স্বামী হারুনুর রশীদ কিছুটা পিছিয়ে যান। বলতে থাকেন, এতো দুরে শুধু শুধু কষ্ট করে যাবার দরকার নেই। সেখানে চাকুরি হবে মাত্র দু’একজনের। বিষয়টা খাদিজা তার বাবা নাজিমউদ্দিনকে জানালে বাবা দৃঢ় কণ্ঠে খাদিজাকে সেদিন একটি কথাই বলেছিলেন, ‘তুমি যদি ভাইভাতে অংশগ্রহণ করতে চাও, তাহলে আমাকে বলো; আমি তোমাকে নিয়ে যাবো, সেটা যতো দুরেই হোক না কেন!’
এরপর বাবার হাত ধরে পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। ভাইভাতে অংশ নেয়ার ঠিক তিন মাস পরই চাকুরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসে বাড়িতে। সেদিন খাদিজা ও তার স্বামী তার বাবার বাড়ি দুর্গাপুরেই ছিলেন। চাকুরিটা পেয়ে অনেক খুশি হয়েছিলেন সবাই। কিন্তু স্টেশন মাস্টারের দায়িত্ব কী? বা তাকে কী কী কাজ করতে হয় সে সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল তাদের। তাই স্বামী হারুনুর রশীদকে পাঠিয়েছিলেন স্টেশনে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আসতে।
স্টেশনে খোঁজ নিতে গেলে সেখানে কর্মরতরা যখন জানতে পারেন যে হারুনুর রশীদের স্ত্রী স্টেশন মাস্টার পদে চাকুরি পেয়েছেন তখন সবাই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে থাকে। বলতে থাকে: এটা কীভাবে সম্ভব! মহিলারা কীভাবে স্টেশন মাস্টারের চাকুরি করবে? স্টেশন মাস্টার হতে হলে নাইট ডিউটি করতে হয়, সংসার থাকা চলবে না। রাত দিন যেকোন সময় কোথাও অ্যাক্সিডেন্ট হলে দৌড়ে যেতে হবে। ট্রেনে কাটা পড়ে কারও মৃত্যু হলে ছুটে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে ডেড বডি দেখে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে হবে। মেয়েরা এ পদে চাকুরি করতে পারবে না। চাকুরি পেলেও চলে যেতে হবে চাকুরি ছেড়ে।
তবে না, চাকুরি ছেড়ে যাননি খাদিজা খাতুন। খাদিজার সঙ্গে যোগ দেয়া অপর তিন নারী চলে গেলেও দীর্ঘ সাড়ে ১৩ বছর ধরে তৃণমূল পর্যায়ে থেকে কাজ করে চলেছেন তিনি। সফলতার সাথে পালন করছেন দায়িত্ব। ২০০৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জয়পুরহাটে সহকারি স্টেশন মাস্টার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে আড়াই বছর দায়িত্ব পালনের পর ১০ বছর যাবৎ তিনি জয়পরেহাটের আক্কেলপুরের স্টেশন মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দুই সন্তানের জননী এ নারীর চাকুরি জীবনের শুরুতে বাড়ির বউয়ের স্টেশনে থাকার বিষয়টা মেনে নিতে কষ্ট হতো শ্বশুরবাড়ির লোকজনের। তবে স্বামীর সহযোগিতা আর রাত জেগে খাদিজার সঙ্গে কর্মস্থলে থাকায় অনেকটাই সহজ হয়েছে তার পথচলা। গর্ভাবস্থায়ও এই নারী দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। প্রথম সন্তান গর্ভে থাকাকালে সন্তান যেদিন পৃথিবীর অালো দেখেছে সেদিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। অনেক সময় ছোট শিশুটিকে নিয়েই করেছেন অফিস।
স্টেশন মাস্টারের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় খাদিজাকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে বহু। মৃত্যর খুব কাছ থেকেও ফিরে এসেছেন তিনি। অল্পের জন্য বেঁচে যান প্রাণে।
দিনটির স্মৃতিচারণ করে খাদিজা বলেন, ঢাকাগামী এক ট্রেনে সেদিন অনেক যাত্রী ওঠার চেষ্টা করছিল। খোদ স্ট্যান্ডিং টিকিটই ছিলো ২৫০ জনের। আর তাই দেরি না করে নির্দিষ্ট সময়ের ১০ মিনিট পরই ট্রেন ছেড়ে দিই। কিন্তু সেদিনে ট্রেনে এলাকার মেয়রের যাবার কথা ছিলো।
মেয়র স্টেশনে আসার আগেই ট্রেন ছেড়ে যাওয়ায় তিনি ট্রেনে উঠতে পারেন না। মেয়র রাগ সামলাতে না পেরে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন আমার অফিসে এসে। সেসময় মেয়র হাতে থাকা বড় বড় দু’টো পাথরও ছুঁড়ে মারেন আমার দিকে। একটা এসে লাগে আমার পেছনে থাকা হারিকেনে। ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় হারিকেনটি। আরেকটি এসে লাগে টেবিল ক্লথে। মোটা টেবিল ক্লথটা সেদিন ফুটো হয়ে যায় পাথরের আঘাতে।
এই ঘটনা এখনো গভীরভাবে নাড়া দেয় স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুনকে।
কর্মজীবনের আরও একটি অভিজ্ঞতা ভাবিয়ে তোলে খাদিজাকে। তখন খাদিজার চাকুরির প্রথম দিকের ঘটনা। খবর আসে স্টেশন থেকে কিছু দুরে রাস্তা পারাপারের সময় ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়েছে একজন। অনেক সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে খাদিজা সেদিন যান। গিয়ে প্রথমেই খাদিজার চোখে পড়ে একটি ছিন্ন ভিন্ন মানুষের হাত। তার কিছু দুরে পড়ে থাকতে দেখেন একটি মাথা। সেখান থেকে একটু দুরে দু’পা। ঘটনার ভয়াবহতায় চমকে যান খাদিজা। ভেতরে বাসা বাঁধে ভয়। আর সেই আতঙ্ক নিয়ে দীর্ঘদিন পার হয় তার।
তবে এখন আর কোন কিছুতেই ভয় নেই খাদিজার। গত ১৩ বছর ৬ মাসের অভিজ্ঞতায় খাদিজা এখন অনেক বেশি চৌকষ। খাদিজা বলেন, ‘আমার মনে হয় আমার চোখ দুইটা না দশটা।’
স্টেশনে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ ছাড়া ভুলে যান সবকিছু। কারণ তিনি একটু অন্যমনস্ক হলেই ঘটে যেতে পারে বড় কোন দুর্ঘটনা। সফলতা ও দক্ষতার সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে দায়িত্ব পালন করে চলা এ নারী এগিয়ে যেতে চান বহুদূর।








