ধর্মশালা, হিমাচল প্রদেশ (ভারত): সব রকমের প্রতিকূলতায় এমন একটি ম্যাচেও বাংলাদেশ আবার তার পরিণত ক্রিকেট শক্তি দেখালো ধর্মশালায়! এশিয়া কাপে দূর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ডাচদের হারিয়ে জোগাড় হয়েছে দুই পয়েন্ট! শুক্রবার বৃষ্টিস্নাত ধর্মশালার মাঠে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত আদৌ গড়াবে কিনা তা নিয়ে ছিল দীর্ঘ-সন্দেহ আর অপেক্ষার প্রহর!
ফেসবুকে বাংলাদেশ ছাড়াও দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে শতশত প্রবাসীর ইনবক্স আকুতি, ভাই বৃষ্টি কি থেমেছে? খেলা কি হবে? অতঃপর ১২ ওভারের ঠিক করা ম্যাচে টসে জিতে ফিল্ডিং নিয়ে আয়ারল্যান্ডের ভাবখানা এমন ছিল যেন তারা বাংলাদেশকে উড়িয়ে দিয়েই টিকে থাকতে চায় প্রতিযোগিতায়! শুক্রবারের টস জেতাও ছিল আয়ারল্যান্ডের জন্যে একটি লাইফ লাইন।
কারণ আগের ম্যাচে ওমানের বিরুদ্ধে তারা পর বল হাতে হেরেছে। কিন্তু আইরিশদের উড়িয়ে দিতে আমাদের তামিম-সৌম্য-সাব্বিরই যে এনাফ এর প্রমাণ তারা মাঠে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত খেলাটি পরিত্যক্ত হলেও ধর্মশালার মাঠের অল্পস্বল্প কয়েকশ দর্শকদের একদম আক্ষেপ করতে দেখা যায়নি।
তারা একবাক্যে বলেছেন, খেলাটি যে শেষ পর্যন্ত শুরু হতে পেরেছে, এমন একটা মারদাঙ্গা টি-টোয়েন্টি যে বাংলাদেশ খেলতে শিখেছে তা মাঠে উপস্থিত থেকে দেখতে পেরেই আমরা খুশি। অন্তত বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ডের কাছে নতজানু পয়েন্ট হারায়নি। পয়েন্ট হারিয়েছে বৃষ্টির কাছে। যেখানে কারো নেই।
গ্যালারির গল্পগুলো আজও বেশ আকর্ষণীয়।
বৃষ্টি থামার পর মাঠে যাবার পথে দেখি একদল বাংলাদেশী প্রিয় প্রজন্ম এক গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনের মুখে লাল-সবুজ পতাকা দিচ্ছে। আলাপে জানতে পারি এরা পাঞ্জাবের এলপি (লাভলি প্রফেশনাল) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দশ হাজার রুপিতে বাস ভাড়া করে দীর্ঘ গিরিপথ পাড়ি দিয়ে তারা এসেছেন দেশের খেলা দেখতে। কথায় কথায় আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম।
অস্ট্রেলিয়া থেকে খেলা দেখতে এসেছি শুনেতো তারা বেশ চমকিত! তারা অনুরোধ করেন আমি যেন তাদের গ্যালারিতে তাদের সঙ্গী হই। আইপ্যাড-ট্যাবলেট নিয়ে ঢুকতে আজও অনেক পুলিশি বাধা জয় করে গ্যালারিতে ঢুকতেই আবার বৃষ্টি! মাঠ শুকানোর দায়িত্বপ্রাপ্তরা একদিক সামাল দেনতো আরেকদিকে ভিজে যায় মাঠ! এরমাঝে ফেসবুকে শতশত ইনবক্স ম্যাসেজ! ভাই, খেলা কি হবে?
আপডেট দেন। বলাইবাহুল্য সবার জবাব দেয়া সম্ভব হয়নি। এরমাঝে মাঠের নানা অবস্থার পোস্টগুলো দেয়াতে অনেকে হয়তো খুশি হয়েছেন। প্রথম দিন ব্যাগ নিয়ে সমস্যা হওয়ায় বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে আজ পলিথিনের একটি ব্যাগে করে আইপ্যাড-ট্যাবলেট চার্জার এসব নিতে হয়েছে। পলিথিনের ব্যাগ জোগাড় করাও বড় কঠিন একটা কাজ ছিল! কারণ ধর্মশালা পলিথিনমুক্ত শহর।
এখানে দোকানে জিনিসপত্র পলিথিনের ব্যাগে দেবে না। কাগজে পেঁচিয়ে অথবা কাপড়-কাগজের ব্যাগে দেবে। সিডনি থেকে আনা একটা পলিথিনের ব্যাগ লাগেজে পাও্য়া যাওয়াতে রক্ষা হয়। নতুবা কাকভেজা বৃষ্টিতে আমার সম্বল-অবলম্বন আইপ্যাড-ট্যাবলেট সব যেতো।
ধর্মশালার মাঠের প্রথম ম্যাচে তামিমকে অনেক ধীরস্থির পরিণত মনে হয়েছে। শুক্রবার আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধের ম্যাচে আমরা আবার পেয়েছি ব্যাট হাতে খুনে স্বভাবের সেই পুরনো তামিমকে। বৃষ্টিতে ওভার কেটে দেয়া ম্যাচে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হতে তার এই ভূমিকাটি খুব দরকারি ছিল।
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সারারাত জার্নি করে আসা ঘুমহীন ছেলেগুলো তামিম-সৌম্যর চার-ছক্কায় যেভাবে উল্লাস করছিল তা দেখে মন ভরে যায়। তাদের একজন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ভাই কষ্ট সফল। না এলে মিস করতাম। এদের ভিড়ে উল্লাসরত এক যুবককে দেখে মনে নাড়া পড়ে। যুবকের নাম ফিরোজ খান। উর্দুভাষী ভারতীয় মুসলিম এই যুবক পাঁচশ কিঃমিঃ দূরের উত্তর প্রদেশের মিরাট থেকে এসেছেন বাংলাদেশের খেলা দেখতে!
এতদূর থেকে বাংলাদেশের খেলা দেখতে আসার কারণ জানতে চাইলে কোন রাখঢাক ছাড়াই যুবক বলেন, ভাই আমি আমার মুসলমান ভাইদের খেলা দেখতে এসেছি। তাদের জন্যে দোয়া করছি। এমন কতো রকম ভাবে এমন দেশকে মেলে ধরছে বাংলাদেশের ক্রিকেট!







