এবার একুশ নতুন বেদনা নিয়ে হাজির হলো। অগ্নিকাণ্ডে এভাবে প্রাণ হারানো, স্বজন হারানো, পুড়ে যাওয়া জীবনের প্রতি সমবেদনা জানাবার ভাষা আমি জানি না। এ বেদনা অনুধাবনের শক্তিও আমার নাই। শুধু অন্তর থেকে দোয়া করি বিদেহী আত্মার চির শান্তির।
একুশের সকাল থেকেই লিখব লিখব ভাবছিলাম। তবে আমার ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে আবেগের স্বাভাবিক বিস্ফোরণের মাঝে, যা বলতে চাচ্ছিলাম তা বলতে একটু দোটানায় ছিলাম। ঘটনাটি জটিল। অনেক পক্ষ এখানে জড়িত। পুরানো ঢাকাবাসীদের দুটো বড় পক্ষে ভাগ করা যায়; পুরানো ঢাকায় রাসায়নিক গুদাম ও কল-কারখানা টিকিয়ে রাখায় যাদের স্বার্থ আছে আর যাদের নেই। তারপর আছে, রাজনৈতিক দল (বিভিন্ন পর্যায়ে) এবং সরকার। তার বাইরে আছে সংবাদমাধ্যম, অ-রাজনৈতিক সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো।
আরেকটা বড় দল হলাম আমরা। এই ঘটনায় জড়িত কোনো পক্ষের সাথেই এদের লেনদেন নেই, যেমন নেই পুরানো ঢাকার নিরাপত্তার সাথে এদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ। আমি এ পর্যন্ত যে সব প্রতিক্রিয়া দেখেছি, তাদের বেশির ভাগই এই দলের সদস্য। তারা এই সব পোস্ট দিচ্ছেন নিতান্ত মানবিকতা, সহমর্মিতা বা ক্ষোভ থেকে। আমার দেখা বেশির ভাগ পোস্টই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত মূলক। অর্থাৎ, লেখক জানেন কেন এইরকম একটি ঘটনা পুনরাবৃত্তি হলো, কে দায়ী এবং উত্তরণের উপায়।
কোন গম্ভীর ও গভীর আলোচনা শুরুর জন্য এই ধরনের পোস্ট কাজে লাগলেও, সমস্যার সমাধানের পথ এভাবে খুঁজতে না যাওয়াই ভালো। একটা কথা আছে, সকল জটিল সমস্যারই একটা সোজা, অবশ্যম্ভাবী কিন্তু ভুল সমাধান আছে। আসলেই এরকম জটিল একটা সমস্যার সরলীকৃত সমাধান ভুল হবার সম্ভাবনা বেশি।
পৃথিবীতে কোন সমস্যাই ঝুলে থাকে না—সমস্যার সাথে জড়িতরা খুব দ্রুতই একটা সমাধান বের করে ফেলে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমস্যার বিভিন্ন মাত্রা যেমন, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ইত্যাদি বিবেচনায় একটি আপোষ-রফার মাধ্যমে একটা ‘সাধারণ ভারসাম্য’ (General Equilibrium) অবস্থায় পৌঁছায়। পক্ষগুলোর আপেক্ষিক ক্ষমতা ও অন্যান্য অভীষ্টের মধ্যে আপাত অগ্রাধিকার বিবেচনায় এই ‘সাধারণ ভারসাম্য’ একটি সামাজিক সন্ধি হিসাবে সমাজই রক্ষা করে।
উদাহরণ দেই। আমাদের জীবনকে ঘিরে আছে এরকম অসংখ্য সামাজিক সন্ধি—যার সবগুলি আবার তৈরি করে সামাজিক আদর্শ। যেমন, আমাদের রাস্তার পাশে দোকানের একেবারে বাইরে থাকে গ্যাসের সিলিন্ডারের চুলা, যেই সিলিন্ডারের মেয়াদ পরীক্ষা করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আমাদের লাখ টাকার গাড়ির মালিকদের উপর কোন চাপ নেই তাদের গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার নিয়মিত পরীক্ষা করাবার। আমাদের বাড়িওয়ালারা তাদের বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগে যেকোনো মানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারেন। ভারী যন্ত্রপাতি চালাবার জন্য বিশেষ বৈদ্যুতিক সংযোগ বা নিরাপত্তা গ্রহণ এদেশে ঐচ্ছিক। চোরা সংযোগে রাস্তার বৈদ্যুতিক তার থেকে ঝুঁকি নিয়ে বাসার মটর চালানো, বা রাস্তার মূল সংযোগে চোরা পদ্ধতিতে শিল্প কারখানার গ্যাসের চুলা জ্বালানো এখানে স্বাভাবিক। ঘর-বাড়ি নির্মাণের সময় আগুন নেভাবার ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। খোলা ট্রাকে করে দাহ্য গ্যাস পরিবহন কারো চোখে দৃষ্টি কটু লাগে না। এগুলো কিন্তু ‘সামাজিক অপরাধমূলক’ কাজ হিসাবে দেখা হয় না। আর যা কিছু সামাজিক অপরাধ নয় (কারণ সকল অংশীজন এই অবস্থায়ই ‘সাধারণ ভারসাম্য’ খুঁজে পেয়েছেন) সে সবকে সমাজই রক্ষা করে থাকে।
এই ফাঁকে বলে রাখি, যেকোনো অবস্থার সামাজিক, আইনগত, ও নৈতিক অবস্থান একই বিন্দুতে নাও হতে পারে। স্বল্প মেয়াদে, শক্তির বিচারে সমাজ, আইন, ও নীতির অবস্থানেও সমাজ সবচেয়ে এগিয়ে, তারপর আইন, এবং সবশেষে নীতি। দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য এর প্রতিটি অন্যটিকে প্রভাবিত করে।
যাই হোক, সামাজিক সন্ধির কোন বদল আনতে চাইলে, তা সে সন্ধির কোন পক্ষ বা সন্ধির বাইরের কোন পক্ষই চাক, আপেক্ষিক ক্ষমতা ও অভীষ্ঠ সমূহের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের মধ্যমে করাই শ্রেয়। তবে, সে ক্ষেত্রে সন্ধি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলেও তাদের প্রত্যেকের চাওয়া-না চাওয়া হিসাবে আনতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে যে, শুধু আইন করে কোন পক্ষের আপেক্ষিক ক্ষমতা পরিবর্তন করা যায় না।
আসলে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন কোন আইন দেশের যে কোন জনগোষ্ঠীটি সাধারণ মতামতের প্রতিফলন ঘটায় না, তখন তা বাস্তবায়ন করা যায় না। এ ধরনের আইন বাস্তবায়নে জবরদস্তি ও দুর্বৃত্তায়ন বাড়ায়। নিমতলীর ঘটনার পর আইন কড়া হয়েছে। তাতে কী হয়েছে? সেই আইন তো বাস্তবায়ন হয়নি বা করা যায়নি। নিমতলীর ঘটনার পর আইনটা কড়া হলো, বেশ কিছু ধর-পাকড়াও হলো, পত্রিকায় খবর এল অবৈধ রাসায়নিকের গুদামের, তার পর সব চুপচাপ। কেন এমন হলো। একটা কল্প চিত্র আকা যায়…।
যেহেতু বাড়িওয়ালা, ব্যবসায়ী, ভাড়াটিয়া, খেটে খাওয়া মানুষ এরা সবাই মনে করেছে, এখান থেকে গুদাম সরানোর চেয়ে বরং শিল্প পরিদর্শকের বখরা আরেকটু বাড়ানোই শ্রেয়, সংবাদমাধ্যম যেহেতু মনে করেছে যে এই ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশ করলে পত্রিকার কাটতিতে প্রভাব নেই, রাজনৈতিক দল যেহেতু মনে করেছে যে চুপ থাকাই কর্মীদের বেশির ভাগের জন্যই ভালো—তাই এই বিষয়টি সবাই গেল ভুলে।
অনেকে বলবেন, তো প্রশাসনের ভূমিকা ছিল কোথায়? আমাদের প্রশাসন যন্ত্রের মান বাড়ছে বটে, তবে এ ধরনের একটা জটিল সামাজিক সমস্যার মধ্যস্থতা করার জন্য যে সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন তা তারা অর্জন করতে পারেননি বলেই, তারা দূরে থেকেছেন। মধ্যস্থতায় ধর্মীয়, রাজনৈতিক, বা সামাজিক নেতাদের অনেক সময় ভূমিকা থাকে। তবে প্রশাসনের মত, এই সকল নেতাদের বেশির ভাগই সংকীর্ণ ব্যক্তিগত স্বার্থের উপরে উঠে ঝুঁকি সঙ্কুল মানুষদের দিকের পাল্লা ভারি করাবার কাজটি করবার অবস্থানে নেই। তারা বরং, এ রকম পরিস্থিতিতে, প্রায়ই বখরার বিনিময়ে নিজের অবস্থান নিলাম করেন। তো, শেষ পর্যন্ত কি হয়েছে? চাঁদা-বখরার ভাগ বেড়েছে, আর তার ফলে কারখানার আয় কমেছে, কারখানায় পুরনো যন্ত্র আর ঠিক করা হয় না, ঝুঁকি হয়ত আরেকটু বেড়েছে—আর কমেছে শ্রমিকের জীবন মান।
আমি বলছি না যে, গুদাম বা কল-কারখানার চালু রাখা সবার জন্য ভালো হয়েছে বা সবাই এইটাই চেয়েছিল–কিন্তু নিশ্চিত ভাবে জীবনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষগুলি বুঝেছিল যে, চুপ থাকাটাই ‘সব-দিক দিয়ে’ শ্রেয়। তারা বুঝেছিল যে, এইগুলি নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে তারা আরো বড় ঝুঁকিতে পড়বেন। তারা যে ঠিক বুঝেছিলেন, তাও আমি বলছি না। কিন্তু তারা যতটুকু বিপদ সর্ম্পকে জানতেন, তারা যতটুকু ঝুঁকি নিতে পারতেন, আর বিকল্প সমাধানের যা ধারণা তাদের ছিল, তাতে করে, হয়ত চুপ থাকাটাই তারা শ্রেয় মনে করেছেন।
নিমতলীর পর কঠোরতর আইন ও আমাদের মতা পরোক্ষ-পক্ষের সমর্থনকে পুঁজি করে পুরানো ঢাকার বাসিন্দারা রাসায়নিক গুদাম মালিকদের রুখে না দেবার জন্য পুরানো ঢাকার জীবনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের দায়ী করা ভুল হবে।
সমস্যায় যিনি থাকেন, তিনিই সমস্যার সেরা বিশেষজ্ঞ। শ্রদ্ধা রাখুন—তারা যা করেছেন ঠিকই করেছেন। এবং এবারও তাদেরকেই নেতৃত্ব দেবার সুযোগ দিতে হবে। তাদেরকেই বলতে হবে কি ভাবে তারা আপেক্ষিক ক্ষমতার পরিবর্তন চান (যদি আদৌ চান)। যাদের কারণে এই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তাদেরকেও এই আলোচনায় আনতে হবে—জানতে হবে কি হলে তারা তাদের অবস্থান বদল করবেন এবং এটাও করতে হবে ঝুঁকিতে থাকা মানুষজনকেই।
হ্যা, আমি সচেতনতা তৈরি, সংহতি বৃদ্ধি, সামাজিক আপোস-আলোচনার কথাই বলছি যাতে করে প্রতিটি পক্ষের জন্যই একটি গ্রহনযোগ্য উত্তম সমাধানে পৌঁছা যায়। আমরা যারা আছি তাদের ক্ষোভ, আক্ষেপ, আবেগ, সরকারী সংস্থা সমূহের নিরপেক্ষ মঞ্চ, সংবাদ মাধ্যমের অনুপ্রেরণা, ও অ-রাজনৈতিক সংগঠনের সহায়ক ভুমিকা সেই প্রক্রিয়ায় অনুঘটকের কাজ করতে পারে। তবে ওতটুকুই—এর বাইরে আমাদের ভুমিকা হয়ত অত কার্যকরী হবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








