দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিক কাজ করে এই শিল্পে। কিন্তু যেসব শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে দেশ এই রপ্তানি আয় অর্জন করে সেসব শ্রমিকের অধিকাংশেরই নেই কর্মস্থলের নিয়োগপত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেয়ার বিধান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগপত্রের জন্য আন্দোলনও করে আসছেন তারা। এরপরও তাদের নিয়োগপত্র না দেয়া শ্রম আইনের লঙ্ঘন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারখানাগুলো যদি প্রাতিষ্ঠানিক হয় তাহলে শ্রমিকদের নিয়োগপত্র না থাকা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাদের মতে, নিয়োগপত্র থাকলে শ্রমিক ও মালিক উভয়ের জন্য ভাল। এতে প্রয়োজনীয় অনেক কাজ সহজ হয়।
সম্প্রতি ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত ৭৭০ জন শ্রমিকের ওপর একটি জরিপ চালায়।
শ্রমিকদের অবস্থা ও অধিকার বিষয়ক ওই জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা ও গাজীপুরে কর্মরত ৭২ দশমিক ৭০ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের বৈধ নিয়োগপত্র নেই। আর নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে এ হার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে সবাইকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়।

এতে আরো বলা হয়, কর্মক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারীদের বেশি লড়াই-সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হয়রানি, মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, নিয়োগপত্র না থাকলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয় শ্রমিকদের। তাদের মজুরি ও পদবি নিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়। বঞ্চিত হতে হয় ন্যায্য দাবি থেকে।
নব্বইর দশক থেকেই নিয়োগপত্র নিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারকে তথা শ্রম মন্ত্রণালয় ও কলকারখানা অধিদপ্তরকে অবশ্যই পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কারণ আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমিকদের অবশ্যই নিয়োগপত্র দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে সে আইন মানা হয় না।
কারখানাগুলো যেহেতু ফরমাল তাহলে শ্রমিকদের নিয়োগ কেন ইনফরমাল হবে, অর্থাৎ তাদের নিয়োগপত্র থাকবে না কেন এমন প্রশ্ন রাখেন সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ।

তিনি চ্যানল আই অনলাইনকে বলেন, দেশের শ্রম বাজার এখনও অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে। এর আনুষ্ঠানিক রূপ পাওয়া দরকার। এতে মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে, আয়কর পাওয়া যাবে, চুক্তি করা সহজ হবে। শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দিলেই এসব সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
স্বপ্লোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়া বাংলাদেশে শ্রমিকদের নিয়োগপত্র থাকাটা বাঞ্ছনীয় উল্লেখ করে এ কে এস মুর্শিদ বলেন, দেশের জিডিপি বাড়লেও আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। যেহেতু শ্রমিক কারখানায় চাকরি করে তাহলে ওই কারখানায় তাদের নিয়োগপত্র থাকবে না কেন? বরং নিয়োগপত্র দিলে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের জন্যই ভাল বলে মনে করেন এই সিনিয়র গবেষক।
তবে স্বল্প শ্রমিকের উপর জরিপ করা এই প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সমিতি বিজিএমইএ।

সংগঠনটির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, পোশাক খাতসহ এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি লোক জড়িত। কিন্তু এক্ষেত্রে যদি অল্প সংখ্যক শ্রমিকের মতামত নিয়ে জরিপ করা হয়, সেই প্রতিবেদন কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
‘এই জরিপ করার সময় বিজিএমইএ থেকে কোনো তথ্য নেয়া হয়নি। অথচ আমাদের কাছে শ্রমিকদের সব তথ্য রয়েছে।’
তবে শ্রমিকদের অবশ্যই নিয়োগপত্র দেয়া উচিত জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, নিয়োগপত্র দিবে না কেন? অবশ্যই দেয়া উচিত। কেউ যদি ভুল করে নিয়োগপত্র না দিয়ে থাকে তাহলে তাদের এখনি দিয়ে দেয়া দরকার।
জরিপ নিয়ে বিজিএমইএ-র গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, পোশাক খাতে ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে। কিন্তু এত শ্রমিকের মতামত নিয়ে গবেষণা করা কঠিন। যারা জরিপ করেছে তারা স্যাম্পলের ভিত্তিতেই করেছে। অতএব এই প্রতিবেদন নিয়ে বিজিএমইএ-র প্রশ্ন তোলাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।







