৫ মার্চ পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি রাজবাড়ী জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর আসমা সিদ্দিকা মিলির এটিই কোনো জেলায় প্রথম পোস্টিং। এর আগে তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।
রাজবাড়ীতে দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে যেমন নিবেদিত থাকবেন, তেমনি পেশাদারীত্বের প্রশ্নে কোনো আপোষ করবেন না। সম্প্রতি পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন দরদী মনের সুন্দর এক প্রকাশ ঘটিয়ে। তার কর্মকালের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই রাজবাড়ীবাসী যেন অন্যরকম এক মহৎ প্রাণের পুলিশ অফিসারের দেখা পান। একটি ছোট্ট ঘটনায় তিনি প্রমাণ করে দেন অর্থবিত্ত লোভ লালসা নয়, সবার উপরে দায়িত্ব আর মানবতা। কয়েকদিন আগে সব বৈষম্য, শ্রেণিভেদ তুচ্ছ করে তিনি অসহায় এক শিশুকে কোলে তুলে নেন আপন মমতায়। সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশ সুপারের এই মানবতার চিত্র ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সর্বত্র প্রশংসিত হন তিনি।
১১ মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ৪৮ মিনিটে এসপি আসমা মিলি নিজের ফেসবুকে একটি ছবিসহ পোস্টিং দেন। সেখানে দেখা যায়, রাস্তায় বসবাসকারী এক মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ের সদ্যজাত সন্তান তার কোলে। পাশেই ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে বসে আছেন ছিন্ন বস্ত্র পরা সেই অসহায় মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়েটি, যে কিনা শিশুটির মা। সমাজের কাছে যে ভীষণরকম অপাংক্তেয়, অগ্রহণযোগ্য। রাস্তার ধুলোবালিতে খেয়ে না খেয়ে যার দিনরাত কেটে গেছে বছরের পর বছর।
এসপি আসমা সিদ্দিকা মিলি তার পোস্টে লেখেন: ‘এক মানসিক প্রতিবন্ধী মা প্রসব করেছে এই শিশুটি। গত পরশু বালিয়াকান্দি থানায় রাস্তায় ঘটনাটি ঘটে। গ্রামের লোকজন এগিয়ে আসে। থানা পুলিশ খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসা দেওয়া হয়। অতঃপর সুস্থ হয়ে ওঠে দু’জনই। আমরা মেয়েটির অভিভাবক খুঁজে পেয়েছি। আশা করছি পরিবারের কাছে ফিরে যাবে আগামীকাল।’
হৃদয় স্পর্শকারী এই ছবিটি দেখে অনেকেই বিস্মিত না হয়ে পারেননি। এসপির কোলে পাগলির বাচ্চা – অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা!
১১ মার্চ রাজবাড়ির অনলাইন পত্রিকা রাজবাড়ী নিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কম এ বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। সেখানে তারা লেখে: রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি ছেলে সন্তান প্রসব করেছেন এক পাগলি। এ খবর শুনে স্থির থাকতে পারেননি জেলার নবাগত পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি (বিপিএম-সেবা)। ওই পাগলি ও তার সদ্যজাত সন্তানকে দেখার জন্য হাসপাতালে ছুটে যান পুলিশ সুপার। সেখানে গিয়ে তিনি পরম মমতায় কোলে তুলে আদর করেন শিশুটিকে। বৃহস্পতিবার (০৮ মার্চ) বিকেলে উপজেলার নারুয়া গ্রামের রুপালী বেগম নামে এক গৃহবধূ ওই পাগলিকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এর পরপরই একটি ফুটফুটে ছেলে সন্তন প্রসব করেন পাগলিটি।
এ খবর শুনে শুক্রবার (০৯ মার্চ) দুপুরে পাগলি ও তার সন্তানকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি। এ সময় রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাকিব খান, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (পাংশা সার্কেল) ফজলুল করিম, বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসিনা বেগম উপস্থিত ছিলেন।
এই একটি ঘটনার মধ্যে দিয়েই এসপি মিলি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন পুলিশ সবার জন্যে এবং তিনি সেই দায়িত্বটিই সযত্নে পালন করেছেন অক্ষরে অক্ষরে। একজন দরিদ্র বঞ্চিত অসহায় পাগলির সন্তান বলে তিনি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য বা উপেক্ষা করেননি। বরং আইনগত বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে চরম মমতায় শিশুটিকে কাছে টেনেছেন। একই সাথে সন্তান এবং সন্তানের মায়ের নিরাপত্তায় যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
এই ঘটনায় রাজবাড়ীবাসী অবাক না হয়ে পারেননি। আর তাই এখনও এই ঘটনা সবার মুখে মুখে ফিরছে। এর আগেও রাজবাড়ীবাসী অনেক এসপিসহ বড় বড় কর্মকর্তাদের দেখেছেন। কিন্তু এত মমতাময়ী একজন এসপি বোধ হয় তারা দেখতে পাননি। আর এ কারণেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনও এই ছবিটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া পুলিশ সুপার আসমা মিলির স্ট্যাটাসে কমেন্ট করেছেন এই বলে, ‘তোমার কাছে এমনটিই তো আশা করি বন্ধু। ভাল থাক আমার রাজবাড়ী তোমার ভালবাসার চাদরে।’
এর আগে এই জেলা প্রশাসককেও আমরা দেখেছিলাম শীতে এক অসহায় শিশুকে নতুন কম্বলে মুড়ে পরম মমতায় নিজের কোলে তুলে নিতে। এ ঘটনায় তিনিও ভীষণরকম নন্দিত হয়েছিলেন।
রাজবাড়ীতে নিজ দায়িত্ব পালনের মধ্যে দিয়ে এসপি আসমা সিদ্দিকা মিলি অনেকগুলো শুভ ইঙ্গিতের সূচনা করেছেন। প্রথমত জীর্ণ-শীর্ণ পাগলির সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে, শিশু ও মায়ের নিরাপত্তা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন রাষ্ট্রযন্ত্রের সেবাটুকু সবার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন অসহায় মানুষকে প্রাণ খুলে ভালবাসতে পারে পুলিশ। রাজবাড়ীতে আঞ্জু বেগম নামের যে নারীকে হত্যা করা হয়, প্রধান আসামী ধরা পড়েছে তার দ্রুত তৎপরতায়।
সারা দেশে একশ্রেণির পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন তখন পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকী মিলির মমত্ববোধ, পেশাদারিত্ব নিঃসন্দেহে কিছুটা হলেও নতুন আলোর পথ তৈরি করে।
এসপি মিলির বাড়ি মাগুরাতে। ২৪তম বিসিএসে তিনি উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৫ সালে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে ডি আর কঙ্গোতে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘ শান্তিপদকে ভূষিত হন। ২০১৭ সালে ভাল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ আইজি ব্যাচ প্রাপ্ত হন।
এ বছর পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮ তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক বিপিএম-সেবা’ পদকে ভূষিত হন। এ বছরের ৮ই জানুয়ারী রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের প্যারেড গ্রাউন্ডে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে) বিপিএম-সেবা’ পদক পরিয়ে দেন।
এসপি আসমা সিদ্দিকা মিলির আরেক পরিচয় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সর্বশেষ নির্বাচিত ভিপি প্রয়াত আইরিন পারভীন বাঁধনের আপন ছোট বোন। তার আরেক বোন আয়েশা সিদ্দিকা শেলী সিঙ্গাপুরে লেবার কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত আছেন।
সবশেষে বলবো পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি একজন পাগলির সন্তানকে কোলে নিয়ে দায়িত্ববোধের যে অনন্য উদাহরণ রাখলেন তাতে বাংলাদেশকেই সম্মান করা হয়েছে। আশা রাখি অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদেরও এটি অনুপ্রাণিত ও দায়িত্বশীল করবে আর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভালো কাজ করার উৎসাহ তৈরি করবে। সমাজে এটিই এখন বেশি দরকার, এটিই এখন বেশি প্রয়োজন। পুলিশে, প্রশাসনে আসমা মিলি, উম্মে সালমা তানজিয়াদের মতো অজস্র জন আছেন যারা পেশাদারিত্বেই ভীষণ উজ্বল স্নিগ্ধ হতে চান, যারা বাংলাদেশকে বদলে দিতে চান হ্নদয় নিঙরানো ভালোবাসায়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







