নিউইয়র্ক এসেছি তখন একমাসের মতো হয়েছে। তখনও জামাইয়ের আদর কমেনি। শ্বশুর সাহেব নিয়মিত আমার খোঁজ রাখেন। শ্বাশুড়ি নিজহাতে রান্না করেন। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরে আমার সমন্ধি নিয়মিত খোঁজ নেন, খেয়েছি কী না। নিউইয়র্কে যে বাসায় আমরা উঠেছি সেটিতে আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, সমন্ধি ও তার পুরোপরিবার থাকেন। তিনতলা কাঠের বাড়ি, যেমনটি এখানে হয়।
এখানকার সবগুলো বাড়ির মূল ধরণটা একইরকম। এই বাড়িটি তৈরি হয়েছে ১৯২০ সালে। আমার শ্বশুরের পরিবার এই বাড়িটি কিনেছেন ২০০৬ সালে। এর আগে এস্টোরিয়ায় একটা বাড়ি ছিল নিজেদের, সেটি বিক্রি করে এটি কিনেছেন সাড়ে ৭ লাখ ডলারে। প্রতিমাসে ইন্সটলমেন্ট দিতে হয়, সাথে ইনসিওরেন্স এবং প্রপার্টি ট্যাক্স। কত দিতে হয় তাও জানলাম, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই। বাড়ির ঠিকানা কম্পোজ করে স্মার্ট ফোনের ইন্টারনেটে দিতেই চলে এলো এই ছবিসহ বাড়ি সম্পর্কে বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট কোম্পানির দেয়া নানা তথ্য। দেখে বোঝার উপায় নেই এই বাড়িতে যারা বসবাস করছেন তাদের সবার চেয়ে এই বাড়ির বয়স বেশি। বাড়ির ব্যাকইয়ার্ড আছে, সেখানে সবজি চাষ করেন এই বাড়ির করিৎকর্মা জামাই কনক।
ওয়ার্কহোলিক বলা যায়, কাজ ছাড়া তার ভালো লাগে না। এখানকার অধিকাংশ বাংলাদেশীদের বাড়িতেই সবজির বাগান আছে। ব্যাকইয়ার্ড এর পাশেই আছে বড় গ্যারেজ। গ্যারেজে শত শত যন্ত্রপাতি, বোঝা যায় গাড়ির টুকটাক কাজ এখানেই হয়। এই হলো বাড়ির হাল।
এখানে কিচেনে বসে প্রায়শই আমার শ্বশুরের সাথে গল্প হয় নানা বিষয় নিয়ে, আমাদের ভবিষ্যত নিয়েও উনিও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। দেশে থাকতেও ওনার এতোটা কাছে আসার সুযোগ হয়নি। একাধারে দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিবারের সাথে বসবাস এবারই প্রথম। উনি আমাকে ‘বাবু’ বলে ডাকতেন।
স্বভাবতই আমার প্রতি ওনার স্নেহপরায়নতায় দেশে রেখে আসা আমার বাবার কথা মনে পড়ে যেত। মনে পড়তো পরিবারের বাকীদের কথা। বিশেষ করে বাবার কথা বেশি বেশি মনে পড়তো। যদিও নিউইয়র্ক আসার আগেই বাবার সাথে পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে আমার মতবিরোধ ছিল। দেশ ছেড়ে আসার আগে সেই মতবিরোধ আরো প্রকট হয়ে ছিল। এবারের মতবিরোধের সাথে বাবার ছিলো অভিমান আর আমার ছিলো রাগ। আমার রাগের যুক্তি ছিলো কিন্তু তাতে পিতার অভিমানের মূল্যায়ন ছিলো না।
শুধু আমি নই, পরিবারের সবাই বাবার সব অভিমানকেই তার সাময়িক রাগের মোড়কে ঢেকে, বিষয়টিকে চরিত্রে রাগের নেতিবাচক দিক হিসাবেই পরিবেশন করেছি। কিন্তু বাবা চিরতরে চলে যাওয়ার পর তার অভিমান স্ফুলিঙ্গ আমাকে অপরাধী করে অন্তরাত্মাকে অনেক পুড়িয়েছে, কাঁদিয়েছে অন্তরকে। বাবা একদিন চলে যাবেন, জানতাম। যখনই কারো বাবা-মা মারা যেত তখনই আমার মনে হতো, এই রকম ঘটনার মুখোমুখি একদিন আমাকেও হতে হবে; আমি কীভাবে সেই ঘটনাকে সামলাবো!!! যেহেতু বাবার হার্ট ফেইলিয়্যুর ছিল তাই দুশ্চিন্তাটা তাকে নিয়েই বেশি ছিলো।
হঠাৎ একদিন বাবাকে স্বপ্ন দেখলাম, বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। স্বপ্নের ইতি টেনে মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভাবলাম বাবাকে নিয়ে বেশি বেশি ভাবছি তাই এই স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু পরের রাতে আবার একই স্বপ্ন। এবার আমি সত্যিই দুশ্চিন্তায় পড়লাম। রাত তখন আড়াইটার মত, বাংলাদেশে তখন বেলা সাড়ে ১২টা। আমি আমাদের ৪ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ভাইকে মোবাইলে টেক্সট করে, আমার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে বাবার খোঁজ খবর নেয়ার কথা লিখলাম। কিন্তু সাথে সাথে ছোটভাইয়ের পাঠানো টেক্সট পড়ে একধারে বিষ্মিত ও ভীত আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম। ও লিখেছে- ভাইয়া, এইমাত্র আব্বার সাথে কথা হলো, উনি তোমার কথা বলে খুব কাঁদছিলেন। মধ্যেরাতে আমার বোবা কান্নায় আমার পাশে শুয়ে থাকা সকলকেই জেগে উঠতে হয়। এতদিন শুনেছি, আপনজন মরে যাওয়ার আগে নাকি প্রিয়জনকে যেভাই হোক একটা প্রাক-খবর পাঠানো হয়। আমাকেও কি তাহলে সেরকম কোন তথ্য পাঠানো হলো! অজানা শঙ্কা আমার মন থেকে সরছে না।
২/১ দিন পর বরিশালে ভাইয়ের বাসায় ফোন করার সময় বাবাকেও পেলাম। ওনার সাথে সামান্য কুশল বিনিময়ের পর কী যেন একটা জরুরি কাজে সেদিন আর বেশি কথা বলা হয় নি। বাবা কী যেন বলতে চাচ্ছিলেন, আমি ভাবলাম সময় নিয়ে পরে বিস্তারিত শুনবো। কিন্তু সেই কথাই যে শেষ কথা হবে কে জানতো! সেদিনই নাকি বাবা বিকেলে আমাদের গ্রামের বাড়ি চলে যান, যাওয়ার পর সম্ভবত একদিন সেখানে থাকার পর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হঠাৎ ২ অক্টোবর, ২০১৪ রাত ১১টায় (বাংলাদেশ সময়) ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের ফ্যামিলি গ্রুপে টেক্সট আসে আব্বা খুব অসুস্থ। অজ্ঞান অবস্থায় আব্বাকে বরিশাল মেডিকেলে ভর্তির পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও উন্নত চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ তিনি দেন নি। ৪ অক্টোবর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। নিউ ইয়র্কে তখন ঈদ-উল-আযহার সকাল। আত্মত্যাগ মহান মহিমায় উজ্জ্বল সেই দিনটিতে আমাকেও ত্যাগ করতে হলো প্রিয় পিতাকে। স্কাইপিতে শেষবারের মত দেখলাম বাবার অভিমানী মুখটা। বিপদের সময় বাবা-মা’র পাশে থাকাটা কপালে থাকতে হয়। বাবা-মাকে সেবা করতে পারার সুযোগ পাওয়াটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। দেশের বাইরে থাকায় শেষবারের মত কাছ থেকে না দেখার, স্পর্শ করতে না পারার কষ্ট কোনদিন ঘুচবে না।
বাবার এই চলে যাওয়াটা কী নাটকীয়, কী অদ্ভুত! মৃতের চলে যাওয়া নিয়ে এমন অনেক অবাস্তব ঘটনা অনেকেরই হয়তো জানা আছে। এতদিন শুনে এসেছি, মৃত্যুর বিষয়টি নাকি আগে থেকেই মানুষ টের পান, টের পান প্রিয়জনেরা। বাবাও কি তবে টের পেয়েছিলেন! না পেলে মৃত্যুর ৩/৪দিন আগে তড়িঘড়ি করে নিজের ছবি ফ্রেমে বন্দী করে দেয়ালে ঝুলিয়ে গেছেন কেন! দেয়ালে টাঙ্গিয়ে গেছেন মক্কা ও মদিনার আলোকচিত্র। আরও অদ্ভূত, মৃত্যুর ৪/৫দিন আগেই পর পর দু’রাত বাবাকে নিয়ে সেই স্বপ্ন দেখা। বাবার প্রিয় মানুষ ছিলাম বলেই হয়তো আমার একটা ছবিকেও ফ্রেমে বন্দী করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখতে বলে গেছেন। অথচ বাবার প্রিয় পুত্র এই আমি, বাবার অভিমান বুঝতে পারিনি, ক্ষমাটাও চাইতে পারলাম অমার্জনীয় ভুলের জন্য…..!!!







