নাম ধাম কিছু নেই। ২০১৩ সালে হঠাৎ শোনা যায় দেশের প্রখ্যাত নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ নামের এক ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছেন নতুন মুখ। নাম তার নূর ইমরান মিঠু। ছবি মুক্তির আগে প্রমোশনাল ইভেন্টে দেখা মেলে তার। গোবেচেরা ধরনের একজন মানুষ! অভিনয় যে তার কর্ম নয়, সেটা সরলভাবে তখনও তিনি বলেছেন। কিন্তু তারপরও ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ মুক্তির পর এই গোবেচারা ধরনের মানুষটির অভিনয় ভালো লাগেনি এরকম দর্শক খুঁজে পাওয়া দুস্কর। ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ দেখে প্রায় সবাই ভারতীয় অভিনেত্রী সিনা চৌহানার চেয়েও অভিনয়ে এগিয়ে রাখেন মিঠুকে।
তবে এরপর আর কোথাও মিঠুকে দেখা যায়নি। পর্দার সামনে অভিনেতা হিসেবে আসেননি তিনি। তাহলে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন এই অভিনেতা?
‘অভিনেতা’ সম্বোধনেও আপত্তি আছে তার। কিন্তু পিঁপড়াবিদ্যায় যে অভিনয় করলেন? এমন প্রশ্নে মিঠু বলেন, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার গুরু। তার সঙ্গেই সিনেমা এসিস্ট করতেন। কিন্তু পিঁপড়াবিদ্যার প্লট মাথায় এলে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির সাথে মিঠুর সাদৃশ্য খুঁজে পান নির্মাতা। ফলে তাকেই দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় ক্যামেরার সামনে। সাবলীল ভঙ্গিতে পুরোটা সময় শুধু নির্মাতার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ শেষ, তার অভিনয় ক্যারিয়ারও শেষ!
হ্যাঁ। নির্মাণের জন্যই এই শহরে এসেছিলেন মিঠু। পিঁপড়াবিদ্যার পর অভিনয়ে আরো প্রস্তাবও পেয়েছেন তিনি। কিন্তু সে পথে যাননি। নির্মাণের সঙ্গেই থেকেছেন। বেশ কয়েকটি নাটক নির্মাণ করেছেন। এরমধ্যে ‘মোহন্ত’ নামের নাটকটি বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। তবে নাটক বানাতেও শহরে আসেননি মিঠু। তার প্রধান টার্গেট সিনেমা নির্মাণ!
কিন্তু চাইলেই কি সিনেমা নির্মাণ করে ফেলা সম্ভব? টাকা কে দিবে? একজন তরুণ নির্মাতার উপর কে ভরসা রাখবে অন্ধ বাণিজ্যের এই শহরে? কিন্তু তরুণ নির্মাতার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখলো ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। তার গল্প দৃশ্যায়ন ভাবনা, সিনেমা নিয়ে অ্যাম্বিশেনের কারণেই হয়তো তার উপর ভরসা রাখতে রাজি হলো ইমপ্রেস। এবার স্বপ্ন পূরণের পালা। কার গল্পকে সিনেমায় দেখাবেন তিনি?
শরণাপন্ন হলেন এই শহরের সবচে দাপুটে এক গল্প কথকের কাছে। তার নাম শাহাদুজ্জামান। নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় কল্পকার তিনি। লিখেছেন কয়েকটি বিহ্বল গল্প, পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ, কেশের আড়ে পাহাড় কিংবা অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প। যার লেখা প্রতিটি গল্প অভিনব আর অসাধারণত্বে ভরপুর। এই লেখকের দুটি গল্প ‘মৌলিক’ ও ‘সাইপ্রাস’ নিয়ে কাজ করতে চাইলেন মিঠু। অনুমতি চাইলেন লেখকের কাছে। শুধু তাই না, চিত্রনাট্যেও তাকে সহায়তা করতে বললেন। তার জবাবে তরুণ এই নির্মাতাকে কী বললেন শাহাদুজ্জামান?
দেখে নিন লেখকের জবানীতেই। সম্প্রতি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে তরুণ নির্মাতা নূর ইমরান মিঠুর সঙ্গে প্রথম পরিচয় এবং তার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। চ্যানেল আই অনলাইন পাঠকদের জন্য লেখকের স্ট্যাটাসটি অনুমতিক্রমে হুবুহু তুলে ধরা হলো:
‘পিঁপড়াবিদ্যা‘ চলচ্চিত্রে প্রথম দেখি নূর ইমরান মিঠুকে। পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, মিঠুর মতো অপেশাদার এক অভিনেতাকে তার ছবির প্রধান চরিত্রে নির্বাচন করে একটা চমক সৃষ্টি করেছিলেন। ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ ছবিটির অভিনবত্ব ছিলো এর বিষয় ভাবনাতেও। ছবিটি আমার ভালো লেগেছিলো। সে ছবিতে মিঠু ভারতীয় পেশাদার সহঅভিনেত্রীকে পাল্লা দিয়েছে ভালো এটুকু মনে আছে। তারপর ভুলেই গিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎ মিঠু আমার সাথে কথা বলবার জন্য দেখা করতে চায়। পরিচয় হয় প্রথমবারে মতো, দীর্ঘক্ষণ কথা হয় তার সাথে। পর্দার বাইরে নেহাতই আটপৌরে, সরল, বিনয়ী মিঠুকে ভালো লাগে। অবাক হই যখন মিঠু জানায় যে অভিনয় সে করেছে নেহাত অনুরোধে। তার মূল স্বপ্ন ছবি নির্মাণ করা এবং সেভাবেই সে নিজেকে তৈরী করছে বহুদিন ধরে। সেই সাথে জানায় সে তার প্রথম ছবি করতে চায় আমার গল্প নিয়ে। কথা বলে টের পাই আমার প্রতিটি গল্প, উপন্যাস তার খুঁটিয়ে গভীরভাবে পড়া, এও বুঝতে পারি বিশ্ব চলচ্চিত্র বিষয়েও তার জানাশোনা ভালো। মিঠু জানায় সে আমার ‘মৌলিক‘ এবং ‘সাইপ্রাস‘ নামের ভিন্ন দুটো গল্পকে মিলিয়ে একটা স্ক্রিপ্ট দাঁড় করাতে চায়। আমাকে অনুরোধ করে চিত্রনাট্য লিখে দেবার জন্য।
চলচ্চিত্র আমার বহুকালের আগ্রহের ব্যাপার। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়ে আছি দীর্ঘদিন। ফলে চলচ্চিত্র বিষয়ে কোন প্রকল্পে যুক্ত হতে আমার আগ্রহের কমতি নেই। আমার গল্প নিয়ে ইতিমধ্যে কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরী হয়েছে। মিঠু একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রই তৈরী করতে চায়। রাজী হই এবং ওর সঙ্গে মিলে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরী করি। চিত্রনাট্য করতে গিয়ে মূল গল্পের কাহিনী কাঠামো থেকে সরে আসতে হয়েছে অনেকটুকু। ছবির নাম দেই ‘কমলা রকেট‘। রকেট নামে পরিচিত বৃটিশ প্রবর্তিত কমলা রঙের স্টিমারগুলো এখনও যাত্রী বহন করে বেড়াচ্ছে খুলনা, বরিশাল রুটে। বহুবার গেছি সেই স্টিমারে। ‘কমলা রকেট’ সেই স্টিমারের এক যাত্রারই গল্প। একটা জাহাজ যেন একটা ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। একটা গল্পের ভেতর অনেকগুলো গল্পের জ্বালামুখ। বাংলাদেশ যে নানা স্তরের ক্রান্তির ভেতর দিয়ে পথ কেটে যচ্ছে এটা তারই গল্প।
অসম্ভব পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সাথে অল্প সময়ে ছবিটা তৈরী করে ফেলেছে মিঠু। তার মতো নবীন পরিচালকের পক্ষে ইমপ্রেস প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পাওয়া সৌভাগ্যের। ছবিটির চূড়ান্ত ভার্সন দেখবার পর আমার মনে হয়েছে মিঠু আমার গল্পকে সত্যিকার চলচ্চিত্র ভাষায় বদলে দিতে পেরেছে। এটি ক্যামেরায় ধরা নাটক নয়, টেলিফিল্ম নয়, এটি যথার্থ চলচ্চিত্র। একটা দেশে নানা রকম চলচ্চিত্র হওয়া প্রয়োজন। হচ্ছেও বাংলাদেশে। এ ছবির ব্যাপারে আমার পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া মুশকিল তবে এইটুকু বলতে পারি ‘কমলা রকেট’ কোন আটপৌরে ছবি নয় এর রকম এবং স্বাদ অন্যরকম। ‘কমলা রকেট‘ এই ঈদে মুক্তি পাচ্ছে দেশের নানা হলে। মিঠুর জন্য আমার অশেষ শুভকামনা।’’








