কারাবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) এর শহীদ হওয়ার ঘটনায় স্মরণীয় এবং শোকাবহ দিনটিতে বাংলাদেশ সাক্ষী হয়েছে এক নিশৃংস ঘটনার। কারবালায় পানির তৃষ্ঞায় অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করা ইমাম হোসাইন (রা.) এর দলটির সেই মর্মস্পর্শী ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাটির কিছুটা সাদৃশ্য এনেছে হামলার লক্ষ্যস্থল।
হোসেনী দালানের প্রতিকী কারবালা ময়দানের একটি পানির জারের কাছে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদেন গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছে এক কিশোর। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও পুলিশ।
ফোরাত নদীর তীরে সৈন্যের সমাবেশ ঘটিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) এর অনুসারীদের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে পানির জন্য হাহাকার সৃষ্টি করা হয়েছিলো। আর হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি কালে দুর্বৃত্তরা পরপর ছয়টি বোমা হামলায় খাবার পানির পাত্রের পাশেই প্রাণ হারায় ১৫ বছরের কিশোর সাজ্জাদ। ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে প্রায় অর্ধশতাধিক বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
বিশ্বে মহররম মাসে শিয়া সম্প্রদায়ের সমাবেশ ও তাজিয়া মিছিলে হামলার রক্তাত্ত ইতিহাস থাকলেও সৌহার্দ্যপূর্ণ সংস্কৃতির বাংলাদেশের জন্য এই সন্ত্রাসী হামলা এক নতুন অভিজ্ঞতা। কেরানীগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া সাজ্জাদ তার পরিবারের সাত সদস্যের সাথে তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে গিয়েছিল।
‘হায় হোসেন’, ‘হায় হোসেন’ রব তুলে যখন মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তারা, তখনই ঘটে যায় ওই নারকীয় ঘটনা। শক্তিশালী গ্রেনেডের আঘাতে লুটিয়ে পড়ে সাজ্জাদ, ৭/৮টি স্প্রিন্টার তার শরীরে ঢুকে যায়। মৃত্যু হয় সাজ্জাদের।
শুক্রবার রাত দুটোর পর থেকে প্রায় অর্ধশতাধিক আহতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আঘাতের গুরুত্ব বুঝে প্রায় ১২ জনকে ভর্তি করা হয়, বাকীদের প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভর্তি হওয়া আহতদের আহাজারি আর ঘটনায় বর্ণনায় হ্নদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় হাসপাতাল প্রাঙ্গণ।
মর্মান্তিক এই ঘটনায় বিদেশী কূটনীতিকসহ নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন স্তরের মানুষ। নতুন করে বাংলাদেশে ভ্রমণ সর্তকতা জারি করেছে যুক্তরাজ্য-অস্ট্রেলিয়া।
আগাম তথ্য ছিলো গোয়েন্দাদের কাছে
আশুরা উপলক্ষে নাশকতার আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও রাতে শনিবারে হোসেনী দালানে আগত ভক্তদের কোন তল্লাশি ব্যবস্থা ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হোসেনী দালানের চারপাশে প্রচুর র্যাব পুলিশসহ নিরাপত্তাকর্মীরা থাকলেও কাউকেই তল্লাশি করতে দেখেননি।
র্যাব দশম ব্যাটালিয়ান কমান্ডিং অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর বলেন, হাজার হাজার মানুষের মিছিলে জনে জনে তল্লাশি করা সম্ভব ছিল না। দুর্বৃত্তরা সম্ভবত হযরত হাসান-হোসেনের ভক্ত ও সমর্থকদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। সুযোগমতো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা।
রহস্যময় ব্যক্তির ৩দিন ধরে ছবি তোলা
গ্রেনেড হামলার ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকেই এক ব্যক্তি ওই স্থানের ছবি তুলছিলেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় জনগণ। তাৎক্ষনিক অনুসন্ধানে এ তথ্য পেয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র্যাব)। বিষয়টি তাদের আগে থেকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতো বলেও জানিয়েছে র্যাব কর্মকর্তারা।
দায় স্বীকার করে আইএস’র টুইট
বিশ্বজুড়ে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উগ্রপন্থী গোষ্ঠি ইসলামিক স্টেট (আইএস) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। উগ্রপন্থি বার্তা-প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করা সাইট ইন্টেলিজেন্সের বরাতে এমনটি জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম।
আইএস এর বার্তায় শিয়াদের মুশরিক বলেও অবিহিত করে খিলাফতের সৈন্যরা এই হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করা হয়। তবে বাংলাদেশ সরকারের্ পক্ষ থেকে আইএসের কোন অস্তিত্ব নেই বলে একটি জোড়ালো মত রয়েছে।
কে কী বললেন
পুলিশের কাছে হামলার ভিডিও ফুটেজ আছে এবং তা দিয়ে দ্রুত দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। কীভাবে এই হামলা হলো ও কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো দেশেই তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন র্যাব দশম ব্যাটালিয়ান কমান্ডিং অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর। তিনি বলেন, হ্যান্ড মেড যে গ্রেনেডগুলি দেখা গেছে সেগুলো সাইজে ছোট ছিলো। এগুলা আনা নিরাপদ। কারণ তার সাথে একটি ক্লিপ ছিলো যা না খোলা পর্যন্ত বিস্ফোরণ ঘটবে না। হয়তো তারা পকেটে করে এগুলো নিয়ে আসছে।
পুলিশ মহা পরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার মিরপুর পর্বত সিনেমা হলের কাছে এএসআই ইব্রাহীম মোল্লা খুনের সঙ্গে তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার একটা যোগসূত্র থাকতে পারে।
হোসেনী দালানে বোমা হামলার জন্য বিএনপি জামায়াত দায়ী করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেন, পরিকল্পিত সন্ত্রাসী ঘটনা আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি বোঝায় না। দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা কারীরাই হোসেনী দালানে বোমা হামলা চালিয়েছে।
হোসেনী দালানে শিয়াদের সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে এর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আটক ও তদন্ত কমিটি গঠন
হোসেনী দালানে গ্রেনেড হামলায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও পুলিশ। তাদের গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার বিশদ তদন্তে কমিটি গঠিত হয়েছে। হোসেনী দালানের ইমামবাড়া এলাকাটি ছিলো পুরোপুরি সিসিটিভির আওতায়। নিয়ন্ত্রন করা হতো দোতলার কন্ট্রোল রুম থেকে। তদন্তকারীরা এখন সেই ফুটেজ দেখছেন।
হিজরি ৬১ সালে মহররম মাসের ১০ তারিখ ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে কারবালার প্রান্তরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে শহীদ হন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। এর আগে রণকৌশলে চরম অমানবিকতার প্রদর্শন করা ইয়াজিদের সৈন্যরা ফোরাত নদীর তীর ঘিরে হুসাইন শিবিরে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। আর সেই ঘটনার স্মরণে হোসেনী দালানে জড়ো হওয়া নীরিহ জনগণ পানির ট্যাংকির কাছে আবার দেখলো আরেক অমানবিক ঘটনা।







