শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। সুস্থ মেরুদণ্ড ছাড়া যেমন কোন প্রাণী সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। একটি জাতির বেলাতেও ঠিক তেমনই। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম দৈন্যদশা বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা বাণিজ্য, পাঠ্যপুস্তকে ভুল বানান ও বিকৃত তথ্য গোটা জাতিকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চলাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরীক্ষার আগের রাত্রে ফটোকপির দোকানে প্রশ্নপত্র পাওয়ার ঘটনা। কোচিং বাণিজ্য, নোট গাইড বিক্রির ধুম, শিক্ষকদের মেতে ওঠা কমিশন বাণিজ্যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের কোচিং করতে বাধ্য করা প্রভৃতি সরকারের অবৈতনিক শিক্ষার ঘোষণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
সম্প্রতি শিক্ষা ব্যবস্থাকে চরম বিপর্যয়ে ও বিতর্কে ফেলে দেয় পাঠ্যপুস্তককে সাম্প্রদায়িকীকরণ, ভুল বানান ও তথ্য বিকৃতি করা। পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা বই হতে বাদ দেয়া হয় হুমায়ুন আজাদের কবিতা: ‘যে বই তোমাকে ভয় দেখায় /সেগুলো কোন বই নয়/সে বই তুমি পড়বে না/ যে বই তোমায় অন্ধকারে বিপথে নেয়। এর বদলে পাঠ্যপুস্তকে বিদায় হজ সংযুক্ত করা হয়। ষষ্ঠ শ্রেণীর বাংলা বইতে ওয়াজেদ আলীর রাঁচি ভ্রমণ বাদ দেয়ার কারণ ভারতের ঝাড়খন্ডের রাজধানী রাঁচি হিন্দুদের তীর্থস্থান।
এর পরিবর্তে সৈয়দ মুজতবা আলীর নীল নদ ও পিরামিডের দেশ সংযুক্ত হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে সত্যেন সেনের ‘লাল গরুটা’ বাদ দেয়ার কারণ গরু মায়ের মত বলে বুঝি বাচ্চাদের হিন্দুত্ববাদ শেখানো হচ্ছে। তার পরিবর্তে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত ‘সততার পুরস্কার’ যুক্ত হয়েছে। সপ্তম শ্রেণীর বাংলা বইতে নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘লাল ঘোড়া’ বাদ দেয়ার কারণ গল্পে লালু নামের একটি ঘোড়া ছিল। গল্পটিতে পশুর প্রতি মমত্ববোধ বুঝি মুসলমানদের পশু কোরবানিতে বাচ্চাদের নিরুৎসাহিত করবে। এর বদলে যুক্ত হয় হাবিবুল্লাহ বাহারের মরু ভাস্কর্য।
এছাড়াও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মে দিনের কবিতা,স্বর্ণদেবীর উপদেশ ও রনেশ দাশ গুপ্তের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক লেখা ‘মাল্যদান’ বাদ দেয়া হয়েছে। পাঠ্য বই হতে রবী ঠাকুরের বাংলাদেশের হৃদয় হতে কবিতাটিও বাদ দেয়া হয়েছে।
বিনামূল্যে ৩৬লাখ ২১হাজার বই বিতরন কতটা স্বার্থকতার ও কতটা প্রশংসার?বিতরণকৃত বইগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে দেশের মানুষ? পূর্ব পাকিস্তানে Bnr( ব্যুরো অফ ন্যাশনাল রি কন্টস্ট্রাকশন) গঠন করেছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। সেই সংস্থার দায়িত্ব ছিল হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে বিতারিত করে সংস্কৃতিকে মুসলমানীকরণ।
তারই অংশ হিসেবে তারা ময়মনসিংহের নাম বদল করে রেখেছিল মোমেন শাহী, কৃষ্ণচূড়া ফুলের নাম বদলে রেখেছিল ফাতেমা চূড়া, সিলেটের নাম বদলে রেখেছিল জালালাবাদ, নজরুলের কবিতা হতে মহাশ্মশান বাদ দিয়ে লিখেছিল গোরস্থান। হিন্দু বলে তারা রবীন্দ্রনাথকেও বর্জনের সুপারিশ করেছিল।
রবী ঠাকুরের বাংলাদেশের হৃদয় হতে কবিতাটিতে আছে, ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে,বাঁ হাত করে শঙ্খ হরণ। এতে বুঝি দেবী দুর্গার স্তুতি করা হয়েছে তাই বাদ দেয়া হয়েছে। শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘লালু’ গল্প বাদ দেয়ার কারণ এতে পাঁঠা বলি ও কালি পূজা চিত্রায়িত হয়েছে। অষ্টম শ্রেণীর বাংলা বইতে হিন্দু কবি বুদ্ধদেব বসুর ‘নদীর স্বপ্ন’ কবিতাটি বাদ দিয়ে মুসলিম কবি কায়কোবাদের ‘প্রার্থনা’ কবিতাটি সংযুক্ত হয়েছে।
আরও বাদ দেয়া হয় উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী রচিত রামায়ন কাহিনী-আদিখন্ড গল্পটি, নবম শ্রেণীর বাংলা বই হতে বাদ দেয়া হয় সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালা মৌ’ গল্পটি বাদ দেয়া হয় জ্ঞান দাস রচিত ‘সুখের লাগিয়া’ কবিতাটি, বাদ দেয়া হয় ভারত চন্দ্র গুণাকর রচিত ‘আমার সন্তান’ কবিতাটি বাদ দেয়া হয় ‘রঙ্গলাল’ বন্দোপাধ্যায়ের স্বাধীনতা কবিতা ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’ কবিতা। আরও বাদ দেয়া হয় অসাম্প্রদায়িক বাউল লালন শাহের ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ কবিতাটি।
এনসিটিবি কার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে তা স্পষ্ট। কিন্তু কেন চাচ্ছে, হিন্দু দেবদেবীর প্রশংসা, হিন্দু ঐতিহ্য, সাত চল্লিশের দেশ ভাগকে হেয় করা প্রভৃতি গল্প কবিতা বাদ দেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এনসিটিবির হিন্দু চেয়ারম্যানেরই নেতৃত্বে। তবে কি তার ভূমিকা বিএনপি নেতা গয়েশ্বর রায়ের মত?
একের পর এক কী ঘটছে বাংলাদেশে? অসাম্প্রদায়িক দাবিদার দলের নেতাদের সাম্প্রদায়িক আচরন। সংখ্যালঘু নিপীড়ন, মন্দির ভাঙচুর, নাসির নগরে নির্যাতকদের আড়াল করতে কতিপয় হিন্দু নেতাদেরই অপচেষ্টা। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যেন সমাজের সর্বস্তরেই জেঁকে বসেছে।
এখন জাতির খোদ মেরুদণ্ডই নড়বড়ে করে দিতে উদ্যোগ নিল। পাঠ্যপুস্তকে ভুল ও বিকৃত তথ্য গোটা দেশকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। পত্রিকার পাতা উল্টালে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ বুলালে শুধু এ সম্পর্কিত লেখালেখি।
গত ১১জানুয়াবি বাংলাবিডি নিউজ এ হেড লাইন হয়েছে: পাঠ্য পুস্তকে ভুল:শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রনেতারা বলেন, শিক্ষামন্ত্রী তার দায়িত্বপালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। সাম্প্রতিক পাঠ্যপুস্তকের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী আঠা দিয়ে ভুল ঢাকার হাস্যকর পরামর্শ দিয়েছেন।
এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনি যেভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন তা আর কোনভাবেই আঠা দিয়ে ঢাকা সম্ভব নয়। গত ১০ জানুয়ারি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন শিরোনাম করেছে: বড় ভুলগুলো আঠা দিয়ে ঢাকার নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর।
সংবাদ পত্রে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতিরপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের খবর প্রকাশ পায়। তিন সদস্য অথবা পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটিগুলো হয়। পাঠ্যপুস্তক কি তবে আঠা লাগানো কমিটি গঠিত হল?
এই কমিটি কয় সদস্য বিশিষ্ট? কারা কারা আছে এই কমিটিতে? পাঠ্য পুস্তকের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে কেউ আঠা লাগিয়ে সংশোধন করতে পারবে বিষয়টাতো সেরকম হতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রী আঠা লাগানোর দায়িত্ব কাদের দিলেন? জাতি তা জানতে চায়।
বড় ভুল সংশোধন পদ্ধতিটা যদি ভুল হয় তবে মস্তবড় ভুলও হতে পারে। বড় ভুলে মন্ত্রীর পদত্যাগের প্রশ্ন উঠছে। মস্তবড় ভুলে কোনো দাবি উঠবে সেটাও ভাববার। এনসিটিবি চেয়ারম্যান হিন্দু হয়েও কেন পাঠ্যপুস্তককে হিন্দুয়ানী মুক্ত করতে চাইলেন? তার কাছ হতে এর সুস্পষ্ঠ ব্যাখ্যা শোনা আবশ্যক।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নেত্রকোণায় উদীচী কার্যালয়ে আত্মঘাতী জঙ্গি বোমা হামলা হয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর তখন বলেছিলেন, চমকপ্রদ বিষয় হল এবার হিন্দু জঙ্গি পাওয়া গেছে। বোমা হামলায় নিহত এক হিন্দুকে তখন জঙ্গি বলে প্রচার করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে তা মিথ্যে প্রমাণ হয়। কিন্তু ১৪দলীয় জোট সরকারের আমলে এনসিটিবির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ কি মিথ্যে প্রমাণিত হতে পারে? চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অভিযোগটা ছিল মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর বর্তমান ১৪দলীয় জোট সরকারের আমলে অভিযোগ জীবিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। আঠা তত্ত্ব বাদ দিয়ে সত্য উদঘাটন করুণ।
কেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা হল? খেলোয়ার কারা?খেলোয়ারদের পরামর্শ দাতা ও পৃষ্ঠপোষক কারা জাতি তা জানতে চায়। গোঁজামিল তত্ত্ব পরিহার করুণ ও সুষ্ঠু প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা নিন। জাতির ভবিষ্যত অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার চেয়ে ভয়াবহ জাতীয় অপরাধ কী হতে পারে?
এব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রী দায় এড়াতে পারেন না। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়ার গৌরব কলঙ্কের কালিমায় আজ সকল উচ্ছ্বলতার আলো হারিয়েছে।
ভুলে ভরা ও বিকৃত তথ্যের বই বিতরণ গৌরবের নয় কলঙ্কের। এ কলঙ্ক দুই মন্ত্রীর, দুই মন্ত্রণালয়ের ও সরকারের। সাম্প্রদায়িকতার ভূত কত গভীরে চলে গেছে। পাঠপুস্তকের এই হযবরল অবস্থাই তার প্রমাণ।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িকতার ভূত মুক্ত না করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন হবে অশ্ব ডিম্বের মত অবাস্তব। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এখন ঘরের আঙিনা কিংবা পথে নয়।তারা ঢুকে গেছে অন্দর মহলে।
ঢুকে গেছে প্রজন্ম গড়ার শেকড়ে। জামাত হেফাজতের ভয়ে অসাম্প্রদায়িক দাবিদাররা বারবার পিছু হটছে। আর তারা ক্রমশ ধেয়ে আসছে। ধেয়ে আসতে আসতে ঢুকে গেছে অন্দর মহলে।এই অন্দর কি সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত হবে? হলে কিভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় হবে এই প্রশ্ন সচেতন নাগরিক সমাজের।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







