সম্প্রতি একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে পাকিস্তানের সরকারসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা, নিন্দা ও প্রতিবাদ হয়েছে। এমনকি বিষয়টি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে উত্থাপনের কথাও বলেছে দেশটির সরকার। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিবাদ চলছে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম জুড়ে।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারে পাকিস্তানের ক্রমাগত হস্তক্ষেপ, জাতিসংঘকে যুক্তিহীনভাবে টেনে আনা, পাকিস্তানকে নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি – সবকিছু নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী সাংবাদিক জহিরুল চৌধুরী। এমনকি পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান পাকিস্তানকে কীভাবে দেখে, তা নিয়েও স্বল্প পরিসরেই বাস্তব প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন তিনি।
‘নিউইয়র্কে কয়েক লাখ আফগান নাগরিক বসবাস করেন কয়েক দশক ধরে। প্রতিবেশী পাকিস্তান সম্পর্কে তাদের অনুভূতি জানার চেষ্টা করেছি গত কয়েক বছর। প্রশ্ন করেছি অন্তত ডজনখানেক আফগান নাগরিককে – গত কয়েক দশকের সঙ্কটে প্রতিবেশী দেশটির ভূমিকা সম্পর্কে। সবাই নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। বলেছেন, আফগান সঙ্কটের জন্য দায়ী মূলত পাকিস্তানের বৈরিতা। আজ পাকিস্তানের এক কূটনৈতিক লেখক খালেদ আজিজের লেখা পড়ছিলাম ডন পত্রিকায়। তাতে তিনি লিখেছেন – পাকিস্তান সম্পর্কে মন্তব্য শোনার জন্য তিনি গিয়েছিলেন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি। সেখানে সকল ছাত্র পাকিস্তান সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কয়েকজন এমনও বলেছেন – ইসরাইল সম্পর্কে ফিলিস্তিনিরা যে মনোভাব পোষণ করে, পাকিস্তান সম্পর্কে আফগান নাগরিকরাও একই মনোভাব পোষণ করে।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের গাত্রদাহ লক্ষ্য করার মতো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা করতে পারিনি বলেই তারা আজ এতটা ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। ১৯৭৪ সালে দিল্লিতে সাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান চুক্তিকে তারা জাতিসঙ্ঘের ফোরামেও নিয়ে যেতে চায় বলে সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।
কিন্তু পাকিস্তান যে চুক্তির ১২ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করেই চলেছে, সে সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই ধারায় আটকে পড়া বিহারী পাকিস্তানীদের ফিরিয়ে নিতে অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু সেই অঙ্গীকার মাঝপথে আটকে যায়, এবং গত বছর পাকিস্তান স্পস্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে তারা আর কোনো উর্দুভাষী বিহারী নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে না।
অথচ যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে ওই চুক্তিতে কোনো উল্লেখ ছিল না। শুধু উল্লেখ ছিল তিনটি দেশই সম্পর্ক উন্নয়নে ভবিষ্যতের পানে দৃষ্টি দেবে। পাকিস্তানের ১৯৫ জন উর্ধ্বতন সামরিক অফিসারদের ক্ষমা করাটাই সেদিন ভুল ছিল। বাংলাদেশের ফাউন্ডিং ফাদারসদের সেদিনের সেই নমনীয় ভূমিকার কারণে ভারতের কাছ থেকেও তাচ্ছিল্য পেয়ে আসছে বাংলাদেশ সেই জন্মলগ্ন থেকে। আমাদের রক্তার্জিত স্বাধীনতার সুফল পথ হারিয়েছে।
সেদিন ড. কামাল হোসেন ছিলেন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার স্ত্রী ছিলেন পাকিস্তানের একজন বিচারপতির কন্যা। যদিও হামিদা হোসেইন এখন বাংলাদেশের একজন বলিষ্ঠ মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই পাকিস্তানের ব্যাপারে নমনীয়তার এই নীতি নেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তর থেকেই। পরবর্তিতে জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে আজকের খালেদা জিয়ার বিএনপি সবাই পাকিস্তানি রাজনীতির দোসর। পাকিস্তানি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে সেদেশের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। সে হিসাবে বাংলাদেশে যারা পাকিস্তানের ব্যাপারে উদার, তারা মূলত আইএসআই-এর নীল নকশা বাস্তবায়নের কাজই করে যাচ্ছেন।
শেখ হাসিনার কয়েকটি নীতির কারণে বাংলাদেশ আজ নিরাপদ। এর উল্লেখযোগ্য একটি হলো – বাংলাদেশকে ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহে বাফার স্টেট হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ করে না দেয়া। এতে করে বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় দেশেই বিদ্রোহজনিত অস্থিরতা কমেছে। বাংলাদেশ যদি আজ পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তাতে বাংলাদেশের ক্ষতি কিছুই হবে না।
তবে আমি মনে করি পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্মচারি সংখ্যা কমিয়ে এর কার্যক্রম সীমিত করা উচিত। শুধুমাত্র ক্রিকেট খেলার প্রয়োজনে, খেলোয়াড়দের যাতায়াতে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সে চিন্তা মাথায় রেখে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখলেই যথেষ্ট। আজকের বিশ্বে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানায় না। তবে আমাদের তরুণ ক্রিকেটাররা ক্রিকেট যুদ্ধে পাকিস্তানকে নিয়মিতভাবে পরাজিত করে মধুর প্রতিশোধ নিচ্ছে।
পাকিস্তান যেদিন সাবালক হবে, যেদিন তাদের নীতি বদলাবে সেদিনই বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখবে কি-না। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস, আগুনে মানুষ পোড়ানো কিংবা ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে অপরাজনীতি করার সুযোগ অনেক কমে আসবে।’








