পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের মারদান শহরে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ব্লাসফেমি বা ধর্মকে অবমাননার অভিযোগে হত্যায় নিন্দা জানিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডে তিনি ‘‘হতভম্ব এবং মর্মাহত’’। দেশের নাগরিক আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তা কখনোই সহ্য করা হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলাম অবমাননাকর কথা প্রকাশের অভিযোগ এনে বৃহস্পতিবার মারদানের আবদুল ওয়ালি খান ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মাশাল খানকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই বহু শিক্ষার্থী মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পিটিয়ে হত্যা করে।
এরপর অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই শিক্ষার্থীকে একদল মানুষ অর্ধনগ্ন করে লাথি মেরে এবং পিটিয়ে রক্তাক্ত করছে। তার নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায়ও তার দিকে পাথর ও বড় বড় তক্তাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ছুঁড়ে মারতে দেখা যায় ভিডিওচিত্রটিতে। পরে ওই নিহত শিক্ষার্থীকে সনাক্ত করা হয়।
ব্লাসফেমি, অর্থাৎ ধর্মের প্রতি অবমাননাকর আচরণ বা বক্তব্য দেয়া পাকিস্তানে খুবই স্পর্শকাতর এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী একটি বিষয়। পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইনে এ অপরাধে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সমালোচকদের মতে, প্রায়ই এই আইনের অপব্যবহার করা হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দমন করার কাজে।

পাকিস্তানে সামাজিক মাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননাকর কনটেন্ট চিহ্নিত এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার কট্টর সমর্থক নওয়াজ শরীফ নিজে। অথচ বৃহস্পতিবারের ওই হত্যাকাণ্ডে তিনিই তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। বলেছেন, ‘পুরো দেশের উচিত এই অপরাধের বিরুদ্ধে একযোগে নিন্দা জানানো এবং সমাজে সহনশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পাশাপাশি কাজ করা। এই ঘটনার অপরাধীদের দেখিয়ে দিন, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া সহ্য করবে না।’
ব্লাসফেমি নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকার পরও মাশালের মৃত্যু এবং এরপর ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো পাকিস্তানে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার পাকিস্তানের বেশকিছু শহরে মানবাধিকার কর্মীরা ছোট ছোট প্রতিবাদ মিছিল করেছেন। পাকিস্তানে জাতিসংঘ কার্যালয় এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে।

এ ঘটনায় ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এখন পর্যন্ত মোট ১২ জনকে মাশাল খান হত্যায় জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে। জড়িত আরও ব্যক্তিদের খোঁজা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা হামলাকারীদের ঠেকাতে এগিয়ে যায়নি বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অস্বীকার করে পুলিশ বলেছে, তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মাশাল মারা গিয়েছিলেন।
কী হয়েছিল
ঘটনার আগেরদিন, বুধবার সতীর্থসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথায় কথায় এক সময় ধর্ম নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন মাশাল খান। উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে সেটি ঝগড়ায় রূপ নেয় আর ওই শিক্ষার্থীরা মাশালের বিরুদ্ধে চিৎকার করে ব্লাসফেমির অভিযোগ আনতে থাকে।
এই অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে পরদিন পর্যন্ত। ব্লাসফেমি নিয়ে কথাবার্তায় আকৃষ্ট হয়ে ভীড় বাড়তে থাকে আর তা একসময় কয়েকশ’ মানুষের দলে পরিণত হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানিয়েছে এনডিটিভি।

এই কয়েকশ’ মানুষের বিক্ষুব্ধ দলটি বৃহস্পতিবার লাথি মেরে দরজা ভেঙ্গে মাশাল খানের ঘরে ঢুকে পড়ে। মাশালকে তখন টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার বিধ্বস্ত ঘরের দেয়ালে এখনো ঝুলছে কার্ল মার্ক্স আর চে গুয়েভারার পোস্টার। তার আশপাশেই রয়েছে হাতে লেখা কিছু উক্তি, যার একটি হলো: কৌতুহলী, উন্মাদ আর পাগল হও (Be curious, crazy and mad)।
কেমন ছিলেন মাশাল খান
নিহত মাশাল খানকে যারা চিনতেন, সতীর্থ, বন্ধু ও শিক্ষক, তারা জানান, মাশাল ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন কৌতুহলী শিক্ষার্থী, যিনি প্রকাশ্যে ইসলামের প্রতি আনুগত্য জানিয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করতেন অনেক।
‘সে (মাশাল) যা-ই বলত, সবার সামনে বলত। কিন্তু সে আসলে বুঝতে পারেনি কোন পরিবেশে ছিল সে,’ দুঃখ করে বলেন মাশালের এক শিক্ষক। নিরাপত্তাজনিত ভয়ে আবদুল ওয়ালি খান ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষক নাম প্রকাশ করেননি।








