যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জহিরুল চৌধুরী পশ্চিমা দুনিয়ায় বাঙালির সন্দেহবাতিকতা নিয়ে তার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করে
লিখেছেন, ‘স্বভাব যেমন! নিজ উদ্যোগে একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রে
বসবাসকারী অধিকাংশ বাঙালী পরিবারে সন্তানরা বড় হয়ে তাদের বাপ-মায়ের আচরণ
পছন্দ করেন না। অনেক সন্তান বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়, অনেকে ইচ্ছে করে দূরে
থাকতে পছন্দ করে। অনেকে প্রতিবাদ স্বরূপ ভিন্ন ধর্মের ছেলে অথবা মেয়েক বিয়ে
করে। এর কারণ আগে খুব একটা টের পাইনি। এখন নিজের সন্তান বড় হওয়ার পর বেশ
আন্দাজ করতে পারি দূরত্বটা কেন, কিভাবে তৈরি হয়!
ডারউইনের তত্ত্বটি ছিল এরকম পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা প্রাণী জগতের বৈশিষ্ট্য। পশ্চিমা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জীবনধারায় ‘মুক্ত’ ও ‘স্বাধীন’ শব্দ দু’টি বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে। এখানে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরও যদি সন্তানকে আস্টেপৃষ্টে বাধার চেষ্টা হয়, সে সন্তান তখন বিদ্রোহী হতে শুরু করে। এবং এক সময় সে এর প্রকাশ ঘটায়।
বাংলাদেশ থেকে আমরা রক্ষণশীলতা নিয়ে আসি। আরও নিয়ে আসি ‘সন্দেহের বাতিক’। রক্ষণশীলতা যতটা না ক্ষতিকারক, ‘সন্দেহের বাতিক’ এর চেয়ে বহুগুণ বেশি! আমাদের আরও একটি বদ স্বভাব সন্তানদের উপর খুবই ক্ষতিকারক প্রভাব তৈরি করে। সেটি হল- ‘পেছনে কথা বলা’, ইংরেজীতে যাকে বলে “ব্যাক বাইটিং”। ব্যাক বাইটিং এই দেশেও হয়, তবে উচ্চতর পেশায়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা পেছনে কথা বলাটা একেবারে পছন্দ করে না। বাবা-মা’কে যখন তারা কারো বিরুদ্ধে “ব্যাক বাইটিং” করতে দেখে, তখন খুবই বিরক্ত হয়!
কিন্তু এতসব ‘ব’ এর সমাবেশ আমাদের জীবনে যে, “ব্যাক বাইটিং” ছাড়া কি বাঙালীত্ব কল্পনা করা যায়? যেমন একদিন এক মহিলা আমার কানের কাছে স্ত্রীকে বলছিলেন- অমুকের মেয়ে বুকটা প্রায় খোলা রেখেই চলাফেরা করে! কি আশ্চর্য এখন দেখি- তিনিও বেশ বুক খোলা রেখে চলাফেরায় অভ্যস্থ হয়ে উঠেছেন! আরেকটি বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে তুমুল বিতর্ক করেন (আমি ঝগড়া বলব না)। এখন বিবাহ সম্ভবা মেয়েটি মা-বাবাকে মুখের উপর বলে দিয়েছে আমি কখনো বিয়ে করব না। কারণ বিয়ে করলে আমার জীবনও তোমাদের মতই বিষাক্ত হবে!
তিনি আরো লিখেন, আমরা অনেক সহজ কথাও সহজে সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারি না। এক ধরনের অপরাধী মানসিকতা কাজ করে আমাদের মধ্যে সব সময়। চিত্তের দুর্বলতা আমাদের সন্তানরা সত্যি ঘেন্না করে। চিত্তের এই দুর্বলতার কারণে বেশিরভাগ সময় সামান্য অপরাধকেও ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত হই না। আমরা সামান্য অপরাধকে চিপতে-চিপতে তেঁতো বানিয়ে ছাড়ি। সন্তানের সামনে নিজেদের ‘মহান’ হিসেবে উপস্থাপনে ব্যর্থ হই।
তারুণ্য অতিক্রমের আগেই আমরা সন্তানদের সন্দেহ করতে শুরু করি। সন্দেহ নানা দিকে! সন্তান কার সঙ্গে মিশল, কোথায় গেল, কেন গেল ইত্যাদি। সন্তান ঘরে ঢুকার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় ‘জেরা’। সবার আগে আমরা ভাবতে শুরু করি সন্তানটি কারো সঙ্গে যৌন সংসর্গে চলে গেল কি-না? মেয়ে সন্তানটির জন্য আমরা চারদিকে একটি কল্পনার জেলখানা তৈরি করি। আর ছেলেটি ২৮-২৯ বছরের বুড়ো হলেও তার কাছ থেকে আমরা শুনতে ভালবাসি- “হু, আমি মেয়েদের ধারেকাছেও ঘেঁষি না! পারত, আমি মেয়েদের ঘৃণা করি।” এমন ছেলেদের যৌন-স্বাস্থ্য আদৌ আছে কী-না, তা পরীক্ষা জরুরি। তা না হলে মেয়েদের থেকে দূরে থাকতে থাকতে একদিন সে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়ে যেতে পারে!
কী আশ্চর্য, যৌনতা নিয়ে আমাদের এত ভয় কেন? এদেশে তো বারো-তের বছর বয়সেই “নিরাপদ যৌনতা” শেখানো হয়! যৌনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা ভাবতে মোটেও অভ্যস্ত নয়। যদিও আমরা বাংলাদেশি সমাজে লুকিয়ে লুকিয়ে পর্ণ পড়তে শুরু করেছি সেই চৌদ্দ-পনের থেকেই!
আমার নিজের পরিবারের কথা বলেই শেষ করব এ লেখা। আজ সন্ধ্যায় বিংহামটনের ডর্মে মেয়েটিকে কল দিলাম মোবাইলে। তাকে ছাড়া আমার যে দিন কাটেনা, বলার পর আমাকে সে একটি সুখের সংবাদ জানালো- “বাবা জানো আমার আজ খুব খুশি লাগছে”। জিজ্ঞেস করলাম কেন? বলল- “আজ আমার পাঁচটি বই এসেছে মেইলে।
এই কয়দিন আমি রাত এগারটা পর্যন্ত লাইব্রেরিতে বসে বইয়ের অভাব পূরণ করেছি। আমার খুব কষ্ট হয়েছে।” অথচ কী আশ্চর্য, এই কয়দিন আমি লক্ষ্য করেছি মায়ের যন্ত্রণা। ফেইসটাইম অন করে মেয়েটিকে দেখতে চাওয়ার ব্যাকুলতা- “কী করছো এত রাতে, কোথায়? ফেইসটাইম অন করে দেখাও!” মনে মনে কেবল উচ্চারণ করলাম- “বজ্র আঁটুনি না একদিন ফস্কা গেরো হয়!”









