পশ্চিমবঙ্গে চারটি বিধানসভার উপনির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। এই উপনির্বাচনে রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের জয় ঘিরে কোনো সংশয় ছিল না।তাই প্রত্যাশার বাইরে ভোটের ফল ও কিছু হয় নি।তৃণমূল কংগ্রেস চারটি কেন্দ্রেই জিতেছে।ভোটের হার কমলেও বিজেপি ই দ্বিতীয় স্থানে আছে।আর বামপন্থীদের ভিতরে কেবলমাত্র সি পি আই ( এম) এর দুইজন প্রার্থীর ভোট শতাংশ কিছুটা হলেও বেড়েছে।তবে বামফ্রন্টের অপর দুই শরিক ফরোয়ার্ড ব্লক এবং আর এস পির ভোট শতাংশের নিরিখে আদৌ বাড়ে নি। তাই প্রশ্নটা থেকেই গিয়েছে যে, একদম উত্তরবঙ্গ আর একদম দক্ষিণবঙ্গে, প্রথমটিতে যেখানে প্রার্থী ফ্রন্ট শরিক ফরোয়ার্ড ব্লক আর দক্ষিণে যেখানে প্রার্থী ফ্রন্ট শরিক আর এস পি- এই দুটি কেন্দ্রে কি গোটা বাম শিবিরের ভোট বামফ্রন্ট প্রার্থীঝুলিতে যায় নি? ফ্রন্টগত ভাবে ওই কেন্দ্র দুটি ফ্রন্টের দুই শরিক দলের জন্যে বরাদ্দ হলেও , কেন্দ্র দুটিতে , শরিকদলগুলির সাংগঠনিক শক্তি প্রায় নেই ই।
বাম আমলের প্রথম দিকে উপনির্বাচনগুলিতে শাসক শিবির বিশেষ সুবিধা করতে পারতো না।বিশেষ করে শহর কেন্দ্রিক আসনগুলিতে। আটের দশকের শুরু তে ১৯৮৪ সালের মে মাসে , দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে বেলগাছিয়া পশ্চিম কেন্দ্রের উপনির্বাচনে শাসক বামফ্রন্টের সি পি আই ( এম) প্রার্থী লক্ষ্মী সেন হেরে যায়।জেতেন বিরোধী কংগ্রেস দলের প্রার্থী অমর ভট্টাচার্য। আজকের পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়িয়ে উপনির্বাচনে বিরোধীদল দল জিতবে- এটা একটা স্বপ্নবিলাস। বাম বিরোধী শিবির এবং একটা বড়ো অংশের সংবাদমাধ্যম বাম আমলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ঘিরে নানা কথা বলে থাকেন। কেউ দাবি করেন না , কোনো রাজনৈতিক দলের শাসনকাল ই গণতন্ত্রের সেরার সেরা পরাকাষ্ঠা হিশেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে।তবু ও বলতে হয় যে, নানা সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও বাম আমলে বিরোধীরা যে কোনো ভোটে লড়তে পারতেন।লড়ে জিততেন ও। প্রবল সরকার বিরোধী নাগরিক ও সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে, শাসকের রক্তচক্ষু কেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিক্রম করে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারতেন। গণতন্ত্রের যে পরিসর বহু সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও সেদিন টিকে ছিল , আজ তা কেবল সঙ্কুচিত ই নয়, নিঃশ্বেষিত ও।
পশ্চিমবঙ্গে সদ্য সমাপ্ত উপনির্বাচনে শাসক তৃণমূলের জেতাটা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এখন আর গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়।যদি শাসক শিবির না জিততো , সেটা গুরুত্বপূর্ণ হতো।কারণ, তৃণমূল ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর প্রায় প্রতিটি ভোটেই একচেটিয়া ভাবে জেতাটা তাদের একটা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।যারা একটা সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলে ভোট ঘিরে নানা অভিযোগ করতেন, তাদের বেশিরভাগ মানুষ ই এখন শাসক শিবিরের কোনো না কোনো পদে আছেন।ফলে বাম শিবিরের বাইরে থেকে নাগরিক সমাজ বলে যাঁরা একটা সময়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে খুব হম্বিতম্বি করতেন, তাঁদের শীতঘুম না ভাঙানো ই ভালো! দলীয় পরিমন্ডলের বাইরে যে নাগরিক সমাজকে বামফ্রন্টের শাসনকালের একদম শেষ পর্যায়ে হরবখত দেখতে পাওয়া যেত, সেই নাগরিক সমাজ এখন ‘ নরক গুলজার’ নাটকে,’ কথা কয়ো না, কেউ শব্দ করো না। ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন, গোলমাল সইতে পারেন না’র সার্থক প্রতিচ্ছবি হয়ে গিয়েছেন।
শাসক ভুলে যায়, একদিন তারা বিরোধী শিবিরে ছিলেন। আবার আজকের শাসক ভাগ্যচক্রের পরিবর্তনে কোনো একটা সময়ে বিরোধী আসনে ও হয়তো বসতে পারেন।তবু জেগে থাকে ক্ষমতার আস্ফালন ।বনগাঁয়ে শিয়াল রাজা হওয়ার মতো একবার যদি ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ে তার প্রত্যাশয় কেটে যায় অনন্ত প্রহর! শাসক হবার প্রত্যাশার এই অন্তহীন জাগরের লক্ষ্যে বিরোধী ভুলে যায়, শাসক হতে গেলে যোগ্য বিরোধী হয়ি ওঠা তার অবশ্য কর্তব্য।আর শাসক ভুলে যায়, যতোই সে ভোট করিয়ে নিক, জনগণ কিন্তু নীরবে সব দেখছৃন।বুঝছেন।জানছেন ও।এখন কিছু বলছেন না।আর এই যে এখন কিছু বলছেন নাবলে আগামী দিনেও জনগণ কিছু বলবেন না, মুখ বুজে থাকবেন, চোখ বুজে থাকবেন- এমন টা শাসকের ধরে নেওয়াটা ও মুর্খের স্বর্গেই বাস করা।
এই উপনির্বাচন থেকে দেখা গেল, কয়েকমাস আগে বিধানসভার ভোটে বিজেপি যে ভোট পেয়েছিল, সেই ভোটের হার তারা ধরে রাখতে পারলো না। বিষয়টা ভালো করে বোঝার জন্যে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা কেন্দ্রটির কথাই ধরা যাক।দিনহাটা থেকে গত মে মাসের ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী উদয়ন গুহ হেরে গিয়েছিলেন বিজেপির নিশীথ অধিকারীর কাছে।উদয়ন এবং নিশীথ- এই দুজনেই হলেন দলবদলু প্রার্থী। উদয়ন তাঁর বাবা বাম জামানার দোর্দন্ডপ্রতাপ মন্ত্রী ফরোয়ার্ড ব্লকের কমলকান্তি গুহের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসেন।প্রথমে ছিলেন ফরোয়ার্ড ব্লকেই।২০১১ র ভোটে তিনি ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী হিশেবেই জিতেছিলেন এই দিনহাটা থেকেই। সেই সময়ে বিধানসভার ভিতরে বা টেলিভিশনের সান্ধ্য আসরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী হিশেবে উদয়ন ছিলেন একটি বিশেষ প্রতিবাদী মুখ।’১৬ র ভোটের আগেই বাম বিধায়ক থাকা অবস্থাতেই তিনি তৃণমূলে যোগ দেন।’১৬ র ভোটে লড়েন তৃণমূলের হয়ে।জেতেন।’২১ এ তৃণমূলের হয়ে লড়েই বিজেপির নিশীথ অধিকারীর কাছে অল্প ভোটে হেরে গিয়েছিলেন।উপনির্বাচনে আবার জিতলেন।
নিশীথ অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন শুরু তৃণমূল কংগ্রেসে।তৃণমূলের যুব নেতা হিশেবেই নিশীথের রাজনৈতিক বাড়বাড়ন্ত। পরবর্তীতে কোচবিহার জেলার তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের সঙ্গে নানা ব্যক্তিস্বার্থজনিত কারনেই নিশীথের সংঘাত বাঁধে।কোনো আদর্শজনিত কারনে নিশীথের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব তৈরি হয় নি। তৃণমূলের সঙ্গে নিশীথের বিচ্ছেদের সবটার পিছনেই ছিল স্বার্থজনিত সংঘাত।তাই গত লোকসভা ভোটের(‘১৯) কিছু আগে থেকেই নিশীথ ভেড়েন বিজেপি তে। লোকসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, জেতেন আবার লোকসভার সদস্যপদ রেখেই বিধানসভার ভোটে দাঁড়ান। উদয়ন গুহকে হারিয়ে জেতেন।তারপর আবার বিধানসভার সদস্যপদে ইস্তফা দেন। লোকসভার সদস্যপদ টি বজায় রাখেন।কেন্দ্রে এখন তিনি প্রতিমন্ত্রী।নিশীথ অধিকারীর নাগরিকত্ব ঘিরেও বিতর্ক আছে।তিনি আদৌ ভারতের নাগরিক ই নন।বাংলাদেশের নাগরিক।- এমন অভিযোগ ও খোদ ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী নিশীথ অধিকারীর বিরুদ্ধে রয়েছে।
নিশীথ বিধানসভা থেকে পদত্যাগ করায় দিনহাটা তে এই অকাল ভোট হলো। লোকসভার সদস্যপদ বজায় রেখেই গত মে মাসের ভোটে নিশীথ যখন বিধানসভার ভোটেও লড়েন- তখন ই মানুষ জানতেন , একটা কোথাও অকাল ভোট হবে।হয় লোকসভার অকাল ভোট হবে।নতুবা বিধানসভার, যদি বিধানসভায় নিশীথ জেতেন।নিশীত জিতলেন, জিতেও বিধানসভা থেকে পদত্যাগ করলেন।অকাল ভোট হলো দিনহাটাতে।মাত্র কয়েকমাস আগে যেখানে অল্প ভোটেই বিজেপি জিতেছিল, সেখানে বিজেপি গোহারান হারলো এই উপনির্বাচনে।এমন কি নিশীথ নিজে যে বুথের ভোটার, সেখানেও বিজেপি ভালো ভোটে হেরেছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রথম প্রশ্ন হলো, এই যে অকাল ভোট নিশীথ অধিকারীর জন্যে হলো, তার দায় কে নেবে? ভোটের টাকা তো রাজনৈতিক দলগুলি দেন না।দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ করের টাকাতেই ভোট হয়।আর ঘন ঘন ভোট হলে , ভোটের খরচের একটা প্রভাব পরোক্ষ ভাবে খোলা বাজারের উপরে পড়ে।নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম একলাফে অনেকটাই চড়ে যায়।বিজেপি নেতা নিশীথ অধিকারীর এই ব্যক্তিগত অভিষ্ঠ সিদ্ধির জন্যে যে অকাল ভোট হলো, তার যে প্রভাব খোলা বাজারে পড়বে, এক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের দাম বাড়বে, তার দায় কে নেবে? নিশীথ নেবেন? তাঁর দল বিজেপি নেবেন?
এইরকম একটা রাজনৈতিক চাপান উতোরের ভিতরে সদ্য সমাপ্ত উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে দিনহাটাতে বিজেপির পরাজয় কে কি ভোট রাজনীতির সাফল্য বিধানসভা ভোটের নিরিখে বিজেপি ধরে রাখতে পারছে না- এই সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হবো? নাকি, উপনির্বাচনে শাসকের আধিপত্যের ছবি ই ভোটের ফলাফলে দেখতে পাওয়া যায়?- এটাকেই আমরা মান্যতা দেবো? তা নাহলে, তৃণমূল তাঁদের ভোট বাড়াতে সক্ষম হয়েছে- সেটাই ধরে নেবো? আর বামপন্থীদের ক্ষেত্রে সি পি আই ( এম) কর্মী, সমর্থকেরা এখনো ডিমিট্রভের যুক্তফ্রন্টের তত্ত্বের থেকেই কেফলমাত্র নিজের দলকেই বেশি পছন্দ করছেন, তাই সি পি আই ( এম) যেখানে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যেমন , নদিয়া জেলার শান্তিপুর বা উত্তর চব্বিশ পরগণার খড়দহে বামেদের ভোট বেড়েছে।কিন্তু যেখানে সি পি আই ( এম) নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেই, যেমন, দিনহাটা বা দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার সুন্দরবন ঘেঁসা গোসাবা, যেখানে বামেদের পক্ষ থেকে লড়েছিল আর এস পি, সেখানে কি আপামর বামফ্রন্ট ভুক্ত বামেরা ফ্রন্ট প্রার্থীকে ভোট দেন নি? শান্তিপুরে ফ্রন্ট প্রার্থী সি পি আই ( এম) এর ভোট বাড়ছে ।আর দিনহাটাতে ফ্রন্ট প্রার্থী ফরোয়ার্ড ব্লকের ভোট প্রায় দুই শতাংশের ও নীচে নেমে যাচ্ছে- এর রহস্য টা কোথায়?
ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক , মৌলবাদী শক্তি আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তি– এই দুই বিপদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গেলে বাম ঐকায ভিন্ন অন্য কোনো শর্টকার্ট রাস্তা নেই।বুর্জোয়া রাজনীতিকেরা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে কখনো ই আন্তরিক হবে না।আত্মনিবেদিত তো হবেই না।সবটাই তারা পরিচালিত করবে ভোট রাজনীতির নিরিখে।তাই সাম্প্রদায়িকতার যে কোনো আঙ্গিকের মোকাবিলার জন্যেই দরকার বাম ঐক্য।সার্বিক বাম ঐক্য।ভোটে জেতার নিরিখে ঐক্যের উপরে কেবল জোর দিলে হবে না।ভোটের বাইরে যে নিত্যদিনের মাঠেময়দানের রাজনীতি, সেই রাজনীতির প্রাঙ্গনে জরুরি বাম ঐক্য।এখানে আমাদের দলের প্রার্থী আছেন, তাই এখানে আমাদের প্রার্থীর অনুকূলে ভোট বাক্স উজার করবার জন্যে আত্মনিবেদিত থাকবো আর অমুক খানে আমাদের দলের প্রার্থী নেই, শরিক দলের প্রার্থী আছেন।তাই গা লাগিয়ে খাটবো না শরাক দলের প্রার্থীর জন্যে।সমস্ত বামভোট যাতে একত্রিত হয়ে ফ্রন্ট প্রার্থীর দিকে যায়- সেইজন্যে জানকবুল লড়াই করবো না, গাছাড়া ভাবে চলবো- এই গয়ংগচ্ছ মানসিকতা ছেড়ে বের হয়ে আসতে না পারলে বিপদ সবদিক থেকে আসবে।বাম অনৈক্যের জেরে বাম ভোট যখন ই অবাম প্রার্থীর বাক্সে যাবে, তখন ই ভোট রাজনীতির বাইরেও সাম্প্রদায়িক শিবির এবং তাদের নানা বর্ণের সহযোগীরা লাভবান হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








