এফডিসি তাদের ঘরবাড়ি এবং জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু সেখানেও তারা যথেষ্ঠ উপেক্ষিত। তাদের প্রচলিত নাম শুনলেই উপেক্ষাটুকু অনুভব করা যায়। মুখে মুখে তাদের পরিচিতি ‘এক্সট্রা’। অর্থাৎ তারা অতিরিক্ত। সিনেমার বড় কোনো চরিত্র কখনোই তাদের ভাগ্যে জোটে না। তাই ছোট খাটো চরিত্রের মতো তাদের পারিশ্রমিকও ছোট। রূপালি পর্দার মতো বাস্তবেও তারা পার্শ্বচরিত্র। সিনেমা দেখতে গেলে আমরা যেমন তাদের দিকে নজর দেই না, খোঁজ নেই না জীবন তাদেরকে কেমন রেখেছে।
ছোট চরিত্রের এই অভিনেতা-অভিনেত্রী আর কলাকুশলীদের জীবনটা তাই একদমই রুপালি নয়। এমনকি ঈদও তাদের জন্য উৎসবের উপলক্ষ হয়ে আসে না। তাদের ঈদ কাটে আর দশটা দিনের মতোই। কিন্তু গত কোরবানির ঈদে এই ছবিটা বদলে গেল, বদলে দিলেন নবাগতা এক নায়িকা। নিজে হাটে গিয়ে গরু কিনে হাজির হলেন এফডিসিতে। সদ্য তারকাখ্যাতি পাওয়া নায়িকা কোথায় আকাশে উড়বেন, তিনি পা রাখলেন মাটিতেই। বললেন, এফডিসির এই তথাকথিত ‘অতিরিক্ত’রাই তার দ্বিতীয় পরিবার। এই নায়িকার নাম পরীমনি।
পরীমনির কোনো সিনেমা তখনো দেখা হয়নি, তাই জানতাম না তিনি কেমন অভিনয় করেন, কিন্তু মানুষ পরীমনির প্রতি শ্রদ্ধা জন্মেছিল। এরপরের আরো কিছু ঘটনায় শ্রদ্ধা বেড়েছে।
প্রখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণ তার নির্মিতব্য কবিতাকুঞ্জের জন্য অর্থসাহায্য চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন। পরীমনি সেখানেও উপস্থিত। কবিকে পৌঁছে দিলেন এক লাখ টাকা। অথচ আমরা শুনি, নায়িকারা কবিতা-টবিতা পড়েন না। কাজেই শ্রদ্ধা বেড়ে না যাবার কারণ নেই।
জন্মদিনে পরীমনি হাজির হলেন টঙ্গির আইএইচএফ স্কুলে। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাথে কাটালেন বিশেষ দিনটি। জীবন যাদেরকে বঞ্চিত করেছে, তাদের অন্তত একটি দিন আনন্দমুখর হলো পরীমনির সৌজন্যে।
গত জুলাইয়ের কথা, বানের জলে ভাসছে মানুষ। দুর্গত মানুষেরা সামান্য সাহায্যের জন্য তাকিয়ে আছে দূরদিগন্তে। সেখানেও অসহায় মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ালেন পরীমনি।
তবে সবচেয়ে চমৎকৃত হওয়ার মতো কাজটি পরীমনি করেছেন সম্প্রতি। কয়েকদিন আগে মুক্তি পেয়েছে তার সিনেমা ‘আপন মানুষ’। এদিকে প্রবল বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ভেসে গেছে সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। ডুবেছে ফসল, মরেছে মাছ। সাহায্যের আশায় দিন গুণছে অগুনতি মানুষ। পরীমনির তখন মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার প্রচারণায় ব্যস্ত থাকার কথা, কিন্তু তিনি বললেন, ‘আমার সিনেমা দেখার আগে হাওরের মানুষদের সাহায্য করুন। আমরা প্রতীকি নায়ক, নায়িকা। সত্যিকারের নায়ক এই খেটে খাওয়া মানুষেরা।’
আমি মুগ্ধ হলাম। মনে করতে পারলাম না এত চমৎকার কথা শেষ কবে বাংলাদেশের কোনো তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রীর মুখে শুনেছি। জনপ্রিয়তা অর্জন অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। তার চেয়েও কঠিন তার সম্মান ধরে রাখা, কারণ জনপ্রিয়তার হাত ধরেই আসে দায়িত্ববোধ। সেই দায়িত্ববোধের পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত পরীমনি লেটার মার্কস নিয়ে পাশ করেছেন। এই লেখাটি তাই নায়িকা পরীমনি নয়, মানুষ পরীমনির জন্য অভিনন্দন বার্তা।
তারকাখ্যাতির শুরুর ঝড়ে যিনি টালমাটাল হননি, আশা করা যায় বাকিটাও তিনি সামলে নিবেন। পরীমনি এমনই থাকুন, আর আমরা শিখে নেয়ার চেষ্টা করি তার মানবিক গুণগুলো। পরীমনির কাছে আমাদের শেখার আছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








