নূরা। ৩৮ বছর বয়সী তরুণী। তুখোড় রাজনীতিক। করেন সাংবাদিকতা। মাথায় কোঁকড়ানো চুল, টিকালো নাক। গায়ের রংও দুধে আলতায়। ভীষণ
হাসিখুশি আর চটপটে স্বভাবের। তার প্রেমেই পড়েছে বহুজন। পাণিপ্রার্থীরও
অভাব ছিলো না। কিন্তু নূরার এক বাতিক, এক জেদ ছেলেকে আগে সে পছন্দ করবে।
তারপর অন্যকিছু। এমন শর্তের কারণে এই আধুনিক যুগেও পিছিয়ে যায় তথাকথিত
মুক্তমনা পুরুষেরা।
এদের একজনের নাম ছিলো ফাহিম। ফাহিমও রাজনীতি করতো। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করা। চিন্তায়-চেতনায় মুক্তমনা। পড়ালেখা শেষ করে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ইউএনডিপি’র একটি প্রজেক্টে। বাড়ি থেকে মোটামুটি ফাইনাল করে ফেলেছে ফাহিমকে। কিন্তু নূরার এক কথা, ছেলেকে সে দেখতে চায়, জানতে চায়-তারপর বিয়ের বিষয়ে দেখা যাবে।
তখনও ফাহিমকে দেখেনি নূরা। দুজনের কাজের ব্যস্ততায় সময় মেলানো কঠিন ছিলো দুই পরিবারের পক্ষেই। তারপরও এক শুক্রবার সকালে ঠিক হলো, আশুলিয়া যাবে ফাহিম আর নূরা। বাড়ির সবাই জানে। নূরাও আয়নার সামনে বসে। আনমনে সাজতে থাকে-
গোলাপী রংয়ের একটা কাতান শাড়ি পড়ে। কপালে টিপ আর কানে দুল পড়ে। হাতে পড়ে রেশমি চুড়ি। হাত ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। গন্তব্য আশুলিয়া। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে তাকে তুলে নেবে ফাহিম। চেনার সুবিধার জন্য মিরপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানকে বেছে নিলো নূরা। সেখানেই ফাহিমকে অপেক্ষা করতে বলেছে সে।
মিরপুর-১০ এর পাশেই নূরাদের বাসা। রিকশা করেই মুসলিমের সামনে গিয়ে নামলো নূরা। রিকশাওয়ালাকে ১০ টাকা ভাড়া বের করে দিয়েই চলে গেলো উপরে। দরজা খুলেই চোখে পড়লো গোলাপী রংয়েরই টি-শার্ট পড়া এক যুবককে। চোখ চশমা। গায়ের রং ফর্সা, উচ্চতা ৫ ফুট ৫ মনে হলো নূরার। কাছে গিয়ে পরিচয় দিলো আমি নূরা।
আমি ইকবাল, বলে হাত বাড়িয়ে দিলো নূরার দিকে। নূরা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলল, সরি আমি অন্য আরেকজনকে খুঁজছিলাম।
ইকবাল এবার উঠে দাঁড়ায়। বলে, আরে সমস্যা নাই। বসেন, আপনার কাঙ্ক্ষিত লোক এলে চলে যাবেন। আমার সাথে কিছুক্ষণ বসতে পারেন, আমি অতো খারাপ মানুষ নই-বলেই হাহাহাহা করে হেসে উঠলো।
এইবারে একটু বিব্রতবোধ করছে নূরা। নাও বলতে পারছে না। কারণ সেই তো আগ বাড়িয়ে এখানে এসেছে। এবার একটু চোখ ঘুরিয়ে হোটেলের চারপাশটা দেখে নিলো, আর কেউ আছে কি না? না নেই, তার মানে ব্যাটা এখনও আসেনি ( মনে মনে চরম বিরক্ত হলো।)
হাসি মুখে ইকবালের এগিয়ে দেয়া চেয়ারে বসলো নূরা। বসতে বসতে বলল, আপনি খারাপ, এটা তো বলিনি। বাট আমি অন্যজন ভেবেছিলাম।
কি, ভেবেছিলেন? আর কার জন্যই বা এখানে এসেছেন? বলা যাবে-অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গেই জানতে চাইলো ইকবাল। বলেই জানতে চায়, কফি অর্ডার করি? আপনার লোক আসতে আসতে আমাদের খাওয়া বোধকরি হয়েই যাব- বলেই নূরার মুখের দিকে তাকালো ইকবাল। চোখের ভাষা পড়তে চাইছে মনে হলো। এখন পর্যন্ত ইকবালকে খারাপ মনে হয় নি নূরার, তাই বললো, দিন।
এবার ইকবাল ঠিক সামনের চেয়ারটায় বসেই বলে ফেললো, নূরা আপনাকে অনেক মিষ্টি লাগছে। শুভ্র মনে হচ্ছে আপনাকে।
ধন্যবাদ, বলল নূরা। ইকবালের শব্দ বাছাই বেশ পছন্দ হলো। সবাই যেখানে দেখলেই সুন্দরী লাগছে, সেক্সি লাগছে বলায় অভ্যস্ত, সেখানে এই ছেলেটির প্রশংসা করার ধরনটা বেশ প্রশংসনীয় ভাবলো নূরা। মার্জিত আর বেশ আন্তরিক মনে হলো। পাল্টা প্রশংসা করলো নূরাও। বলল, আপনাকেও ভালো লাগছে।
এবার যদি অভয় দেন, তাহলে কি জানতে পারি কার জন্য আপনার এ অপেক্ষা- বলেই কফির কাপ এগিয়ে দিলো ইকবাল। হাতটা কাপের দিকেই বাড়িয়েছে কি, এমন সময়ে কেউ একজন পেছন থেকে বলে উঠলো, এক্সকিউজ মি, আপনি কি মিস নূরা। আমি ফাহিম।
কাপটা আর নিতে পারলো না নূরা। চেয়ার পেছনে ঠেলে দাঁড়িয়ে পড়লো, বলল হ্যাঁ আমিই নূরা। দেখলো ছেলেটা ৬ ফুটের উপরে হবে লম্বায়। পার্পল রংয়ের ফুলহাতা শার্ট গায়ে, দারুণ স্যুটেট-বুটেড। মাথার সামনের দিকে চুল একটু কম মনে হলো নূরার। গায়ের রংটাও ফর্সাও না, কালোও না। তবে হাতের ঘড়িটা বেশ পছন্দ হলো।
সরি, আমার আসতে দেরী হয়ে গেলো। আসলে আমার এই হোটেলটা চেনা ছিলো না। তাই খুঁজে পেতে কিছুটা বেশি সময় ব্যয় হয়ে গেছে। তাছাড়া আপনার মোবাইল নম্বরটাও ছিলো না, যা হোক, আমি অত্যন্ত দু:খিত। বলেই ইকবালের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আপনি নিশ্চয় নূরার বন্ধু —আমি ফাহিম?
নূরা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ইকবাল হাত বাড়িয়ে বলল, ইকবাল মজুমদার। হ্যাঁ আমি নূরার বন্ধু। আমরা আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
ধন্যবাদ মিস্টার ইকবাল। আমি সত্যিই লজ্জিত।
আরে না না, ঠিকাছে-এমনটা হয়ই। ঢাকা বলে কথা। বলেই দুজনে হেসে উঠলো।
নূরা চুপ করে আছে। তার দিকে ফিরে ফাহিম বলল, চলুন তাহলে বের হওয়া যাক। নূরা এবার ইকবালের দিকে তাকালো। বিস্ময় নিয়ে। ইকবাল ঠিক ততোটাই বিস্মিত করে নূরাকে বলল, ঠিক আছে নূরা তোমরা যাও, আমি তোমার সাথে পড়ে দেখা করবো।
এবার ফাহিম আর নূরা দরজার দিকে বের হয়ে যাচ্ছে। ইকবাল কাছে গিয়ে বলল, নূরা তোমার টিস্যুটা ফেলে যাচ্ছিলে-এই নাও। হাতে এমনভাবেগুজে দিলো -নূরার সন্দেহ হলো। তবুও কিছু বলল, না। শুধু হাতে নিলো। আর চলল, ফাহিমের সাথে।
নিচে একটা সুন্দর পাজেরো গাড়ী। কালো রংয়ের। ফাহিম গাড়ীর দরজা খুলে, নূরাকে বসার আমন্ত্রণ জানালো। নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো। গাড়ী ছুটে চলেছে আশুলিয়ার দিকে। গাড়ীতে গান বাজছে……..
কথা আগে শুরু করলো নূরাই। জানতে চাইলো, নজরুল আপনার প্রিয়, তাই না। হ্যাঁ, সোজা-সাপটা উত্তর দিলো ফাহিম। এরপর আরো অনেক কথা। গাড়ি চলছে আর চলছে একে অপরকে জানার চেষ্টাও। সারাদিন একসাথে ঘুরলো ফাহিম আর নূরা। ফেরার পথে গাড়ীর দরজা খোলার আগে ফাহিম নূরার খুব কাছে গিয়ে একটাই কথা বলল, একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে-নূরা তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
ফাহিমের এই আকস্মিক কাছে আসায় বিস্মিত নূরা। একটু হেসেই বলল, চলেন যাওয়া যাক। পরে আবার কথা হবে। নূরা ফিরে আসলো বাসায়। এতোক্ষণ ফাহিমের সাথে থাকার কারণে ইকবালের দেয়া টিস্যু পেপারটা খুলে দেখা হয়নি। এবার ব্যাগে হাত দিয়ে সেটা বের করলো। দেখলো একটা ফোন নম্বর। নিচে লেখা, প্লিজ ফোন করো!
বাসায় ঢোকার সাথে সাথেই ছুটে এলো নূরার মা মনিরা। মা, জানতে চাইলো কি রে, ফাহিমকে তোর পছন্দ হলো?
মা, তুমিও যে কি বলো না, একদিনেই কি মানুষ চেনা যায়? আরো কয়েকটা দিন আমাকে দাও মা। তবে কিছু বিষয় ভালো লেগেছে আমার। আরো কয়েকটা দিন গেলে আমি আমার পূর্ণ মত তোমাদের জানিয়ে দেবো।
সে না হয় বুঝলাম, কিন্ত ফাহিম কি তোকে পছন্দ করেছে- জানতে চাই্লো মা।
কি জানি-বলল তো তেমনি-বলল নূরা। বলেই মা কে বলল, মা এখন আমি টায়ার্ড, তুমি যাও তো, আমি একটু রেস্ট নিবো।
ঘরে পড়ার পোশাক পড়ে বেডে বসেই ফোন নম্বরটা আবার বের করলো নূরা। অদ্ভুত এক আকর্ষণবোধ করছে ইকবালের প্রতি। কেন-বুঝতে পারছে না। ফোন করবে কি করবে না-এ নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো-তারপর ফোনটা নিয়ে ডায়াল করেই বসলো..২৪৪১১৩৯। হ্যালো, এটা কি….।
আমি জানতাম তুমি ফোন করবে নূরা। তোমার এই ফোনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম এতোক্ষণ। তুমি যাওয়ার পর থেকেই অপেক্ষা করছি-কখন ফোনটা কর তুমি?-বলল ইকবাল।
তাই-কিন্তু কেন এ অপেক্ষা জানতে পারি-জানতে চাইলো নূরা।
এবার হো হো হো করে হেসে উঠলো ইকবাল। বলল- যদি বলি, যে কারণে তুমি ফোনটা দিয়েছো, ঠিক একই কারণে আমার এ উৎকন্ঠা- তাহলে কি বুঝতে সুবিধা হবে তোমার? সত্যি বলতে কি তোমার এই এই হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরিচিত হওয়ার সাবলীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে, সেই সাথে পরিস্থিতি সামলে নেয়ার যে দারুণ গুণ তোমার মধ্যে দেখলাম তাতেও মুগ্ধ আমি। কোন আড়াল নয়, ভনিতা নয়, তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। তোমার ই-মেইল অ্যাড্রেস দাও আমি আমার পুরো বায়োডাটা পাঠাই। আর যদি মুখেই শুনতে চাও তাহলে বলি, আমি ইকবাল মজুমদার। আমাদের বাড়ী ধানমন্ডিতে। আমি একটা টিভি স্টেশন দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। পড়াশুনা করেছি দেশের বাইরে, লন্ডনে। এখন দেশেই।
নূরাকে কিছু বলতে না দিয়েই গড়গড় করে বলে যাচ্ছে ইকবাল। একই সঙ্গে বলে বসলো, একদিন আমাকে সময় দাও। আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
এবার নূরা বলল, ঠিক আছে। আগামীকাল আমরা একই রেস্টুরেন্টে দেখা করবো। বলেই ফোনটা রেখে দিলো নূরা। এমন সময় রুমে পানির জগ আর গ্লাস দিয়ে গেলো টুনির মা। টুনির মা নূরাদের বাসায় কাজ করে ১২ বছর। তার আসল নাম জানে না নূরা। শুধু জানে তার নাম টুনির মা। জানতেও চায় না। কারণ টুনির মার স্নেহ-শাসনেই তো বড় হয়েছে নূরা। সবাই টুনির মা ডাকলেও নূরা তাকে খালামনি ডাকে। টুনির মাও খালামনি ডাকে নূরাকে।
খালামনি, আইসা পড়ো..টেবিলে খাবার দিয়েছি।
আচ্ছা ঠিকাছে, তুমি যাও-আমি আসছি বলল নূরা।
পরদিন নীল রংয়ের একটি সালোয়ার কামিজ পড়েই মুসলিমে গেলো নূরা। দেখলো আগে থেকেই বসে আছে ইকবাল। আজ ইকবালের গায়ে চে’র একটা গেঞ্জি গায়ে। আজকেও ইকবালকে সুন্দর লাগছে।
সরি-আই এম লেট-বলল নূরা।
আরে না-ইটস ওকে, আমি এক্সাইটেড ছিলাম-বলল ইকবাল।
এবার বলো, তোমার কি মত। তোমার মত পেলেই আমি তোমাদের বাড়িতে যাবো। এর আগে না।
নূরা বলল-সবাইতো মেয়ের বাড়িতে আগে প্রস্তাব দেন। তারপর মেয়ের মত জানতে চান। আপনি আগে আমার মত জানতে চাইছেন যে?
এবার হেসেই ফেলল ইকবাল। বলল-আপনি আপনি কেন বলছো। শোনো আমাদের বিয়ে হোক বা না হোক, আমরা তো ভালো বন্ধু হতেই পারি-তাই না?
তা-পারি। কিন্তু আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি কিন্তু?
উত্তর-কারণ আমি মেয়েদেরকেও মানুষ মনে করি। তোমার নিজস্ব একটা মত আছে, নিজস্ব পছন্দ আছে। সেই পছন্দের একটা গুরুত্বও আছে। আমি এটাকে সম্মান করি। তাই আগে তোমার মত-তারপর প্রস্তাব-বুঝেছ।
ইকবালের এমন কথায় মুসলিমেই হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল নূরা। ৩৮ বছর বয়সী একটা মেয়ে নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারলো না। নূরার কান্নাকে যেনো নিমিষেই বুঝতে পারলো ইকবাল। কাছে গিয়ে বসলো। বলল, আমি আছি তোমার সাথে।
কান্না থামিয়ে ইকবালের হাতে একটা কাগজ দিয়ে নূরা বলল, আজ যাই। পড়ে দেখা হবে। বলেই ঝড়ের বেড়ে বেড়িয়ে গেলো দরজা থেকে চোখ সরিয়ে হাতে দেয়া নূরার কাগজটা খুলল ইকবাল। তাতে নূরাদের বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর আর বাবা-মায়ের নাম ঠিকানা।








