দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচনে অনেক জায়গায় সংঘাত, সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার চলছে। জালভোট, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বক্স ছিনতাই ইত্যাদি কারণে গণতন্ত্রের আঁতুর ঘর নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাবোধই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খোদ ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটেই এই অস্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি ক্ষোভ সঞ্চারিত হচ্ছে।
জোটের অন্যতম শরীক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি প্রকাশ্যেই এই অস্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আওয়ামী লীগ দলীয় কতিপয় এমপি ও তার মদদপুষ্ট অনুচররা জয়ের নেশায় এতই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন যে কোনো নৈতিকতা ও নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না। তারা প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে নির্বাচনী প্রচার কাজে বাধা দিচ্ছেন, প্রতিপক্ষ সমর্থকদের ভয়ভীতি ও মিথ্যে মামলার ভয় দেখিয়ে নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চাইতে বাধ্য করেছে এরকম ঘটনাও বহু জায়গায় ঘটছে।
জামায়াতে ইসলামের নেতাকে গ্রেফতার করিয়ে, জেল খাটিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদানে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেয়া, ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন বর্জন, পেট্রোল বোমা মেরে নিরীহ মানুষ হত্যা, বার্ণ ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ মানুষের আহাজারি, ওই নির্বাচন ও তার মাধ্যমে গঠিত সরকারকে অবৈধ বলে আবার তার অধীনে উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র ও সবশেষে দলীয় প্রতীক নিয়ে ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রভৃতি ছিলো পথহারা পথিকের বিপথগামী কর্মপ্রক্রিয়ার অংশ বিশেষ।
বিএনপির কর্মকাণ্ড এই কথাটাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছো? এই পথহারা দলটি ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বর্জন করতে চেয়েও পুনরায় নির্বাচনমুখি হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে নির্বাচনী সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, জালভোট এসবের বিরুদ্ধে তাদের হেরে যাওয়া প্রার্থীদের কোন প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দেশের কোথাও বিক্ষোভ, অনশন, মানববন্ধন কিংবা সংবাদ সম্মেলন কোনটাই হচ্ছে না। অথচ বিভিন্ন ইউনিয়নে নজিরবিহীন অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। ভূতুরে ভোটে ভরে গেছে ব্যালট বাক্স।
কেন্দ্রে মোট ভোট তিনহাজার সিল পড়েছে ছয় হাজার। ব্যালটে এমন ঘটনাও ঘটেছে। ইউপি নির্বাচনে এসব অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ না দেখে মানুষ দেখছে গুপ্ত হত্যা। একদিকে ইউপি নির্বাচন অন্যদিকে শিক্ষক হত্যা, লেখক হত্যা, ব্লগার হত্যা, মসজিদের ইমাম হত্যা, সাধু হত্যা, কারারক্ষী হত্যা ও এনজিও কর্মকর্তা হত্যা দেখছে মানুষ।
বেগম খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন মানতে রাজী নন। তার বক্তব্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। খালেদা জিয়া কি তার এই বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণের জন্যই নির্বাচনে গেলেন? তিনি কি চাচ্ছেন দেশ ও বিশ্ববাসী দেখুক শেখ হাসিনার অধীনে কি রকম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটাও দেখুক যে শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে কোনো শ্রেণি পেশার মানুষেরই জানমালের নিরাপত্তা নেই।
খালেদা জিয়া মনে হয় না জাতীয় নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে মানবেন। হয়তো সেই নির্বাচন বর্জনের উদ্দেশ্যকে দেশ ও বিশ্ববাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য করতেই তার এই ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ।
তার এই উদ্দেশ্যকে সফল করতে বেপরোয়া নেশায় মেতেছে কতিপয় এমপি ও স্থানীয় নেতা। তারা নির্বাচন ও গণতন্ত্রের কোনো নীতি, নৈতিকতা মানতে রাজী নয়। যত টাকা লাগে লাগুক, যত পেশী শক্তি লাগে লাগুক তারা জিততে চায়। পরে জোটের কী হবে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় রাজনীতির কী হবে সেটা তাদের বিবেচ্য নয়। যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ইউপি নির্বাচনে যারা মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার কথার সূত্রে এটা স্পষ্ট যে বাণিজ্যখোর নেতারা অযোগ্য, অসৎ ও পেশীবাজ লোকদের স্বার্থের বিনিময়ে মনোনয়ন পাইয়ে দিয়েছে। 
আর তাদের জয়ের জন্য এত বেপরোয়া হয়ে ওঠার কারণ একটাই তারা লোকসানের ভাগীদার হতে রাজী নয়। বিনিয়োগের টাকা উঠাতে হবে, লাভও করতে হবে। এজন্য চাই জয়। দেশ, রাজনীতি, গণতন্ত্র ও নৈতিকতা নিয়ে ভাবার তাদের কোনো সময় নেই। উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুদের উত্থান ঠেকানোর কথা বলে জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সহিংসতা প্রভৃতি জায়েজ করে দেয়া হলে সেটা মানার মতো নয়। ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে শেখ হাসিনার অধীন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থাবোধ বাড়ত।
সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেও মেজরিটি ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগেরই হতো। আর না পেলেই বা কি হতো? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী জাতীয় চার নেতার এক নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নিজের ইউনিয়ন কিশোরগঞ্জের যশোদলে নৌকা হেরে গেছে।
এতে কি সৈয়দ আশরাফের কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ কিংবা মন্ত্রীত্ব চলে যাবে? মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মমিনের এলাকা নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে। রেবেকা মমিন বঙ্গবন্ধু ও মোশতাক সরকারের মন্ত্রী আব্দুল মমিনের স্ত্রী। তার নিজের পৌর এলাকাসহ উপজেলার সকল ইউনিয়নেই নৌকা জয়লাভ করেছে। এই জয়ে কি রেবেকা মমিন সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ হতে উন্নীত হয়ে মন্ত্রী হয়ে যাবেন?
তাহলে কেনো এই অগণতান্ত্রিক পথে চলে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। পথহারা বিএনপি যেন এরকম একটি পথের খোঁজই চাচ্ছিল। আর সেই পথটা করে দিল কতিপয় দলীয় প্রার্থী। এই পথে খালেদা কদ্দুর যেতে পারবে সেটা তার ব্যাপার। তবে ইউপি নির্বাচন যে তাকে সেরকম একটি পথের খোঁজ করে দিচ্ছে সেটা স্পষ্ট।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







