সোমবার কুমিল্লায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কী কারণে খুন হলেন তিনি? এর মধ্য দিয়েই কি নির্বাচনকেন্দ্রিক গুপ্ত হত্যা শুরু হল?
কয়েকদিন আগে এক মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপি নেতার লাশ পাওয়া গেল বুড়িগঙ্গা নদীতে। এছাড়া ঢাকা-১৯ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ তালুকদার মো. তৌহিদ জং ওরফে মুরাদ জংয়ের কয়েকজন সমর্থকের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এমনকি গতকাল সোমবার বিকেলে তৌহিদ জংয়ের চারজন সমর্থকের বাড়ির জানালা ও বৈদ্যুতিক মিটার ভেঙে ফেলা হয়। বাড়িগুলোর প্রধান ফটকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়৷ কী এমন ক্ষুব্ধতায় এমন এমন ঘটনা ঘটালো তারা?
রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন দুর্বৃত্তরা এ হামলা চালায়। হামলাকারীরা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তখন আক্রান্তদের। এলাকাবাসী ইটপাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়ে এই অজ্ঞাত হামলাকারীদের হামলার ভয়ে রয়েছে চরম নিরাপত্তাহীন৷ হামলাকারীদের অনেককে চিনেছেও তারা কিন্তু তাদের পরিচয় প্রকাশ করলে আরও হামলা হতে পারে এই ভয়ে নিরাপত্তাহীন সময় যাচ্ছে তাদের৷ কখন কি ঘটে?
এখনও মনোনয়ন চূড়ান্তই হয়নি৷ শুরুতেই যদি মানুষ নিরাপত্তাহীন হয়ে ওঠে এর কি ভবিষ্যত হতে পারে? এদিকে মনোনয়ন নিয়ে শুরু হয়েছে কত রঙ্গ৷ মনোনয়নের ঝুলন্ত মূলো চিবাতে এক দল হতে আরেক দলে ও এক ফ্রন্ট হতে আরেক ফ্রন্টে যোগ দিয়ে চলেছে তারা৷
বিএনপিতে যোগ দেয়া সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মওলা রনি তো প্রকাশ্যেই বললেন, আওয়ামী লীগে মনোনয়ন পেলে তিনি বিএনপিতে আসতেন না৷

জাতীয় পার্টির মহাসচিবকে দলীয় নেতা কর্মীরা অবরুদ্ধ করলেন মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগে৷ আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা হলো কক্সবাজার-৩ (রামু-কক্সবাজার সদর) আসনে জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু মনোনয়ন পাচ্ছেন শুনে আওয়ামী লীগের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের সমর্থকেরা ‘কলাগাছ আন্দোলনে’ নেমে পড়ে। অদ্ভুত এই প্রতিবাদের পর গতকাল সোমবার সাইমুমকে মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সাইমুম নিজেই।
আবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী তালিকায়ও এ আসনে জিয়াউদ্দিনের নাম রয়েছে। ফলে এখানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের চূড়ান্ত প্রার্থী আসলে কে হচ্ছেন, তা এখনো অস্পষ্টই থেকে গেল।
আওয়ামী লীগ একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণায় কক্সবাজার-৩ আসনটি খালি রাখে। তখন এখানে মহাজোটের প্রার্থী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে এই গুঞ্জন ওঠে। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ নেতা সাইমুমের সমর্থকেরা কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কের দুই পাশ, রামু চৌমুহনী, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ঈদগাঁও, বাংলাবাজার, খুরুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কলাগাছ লাগিয়ে বিক্ষোভ দেখান। তারা জিয়াউদ্দিনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
পরিবেশবাদীরা এ ধরনের প্রতিবাদের সমালোচনা করেছেন। কারণ সাইমুমের সমর্থকেরা অন্য জায়গা থেকে শত শত কলাগাছ কেটে সড়কের বিভিন্ন স্থানে লাগিয়েছেন৷ এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে বলে তারা জানান৷ আর এই কলাগাছ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মনোনয়ন পেয়ে গেলেন সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা সাইমুম সারওয়ার কমল৷ তিনি নৌকার নৌকার মাঝি হয়ে গেলেন৷ এখন জিয়া উদ্দীন বাবলুর কী হবে? মহাজোটের প্রার্থী কে বাবলু না কমল?
অন্যদিকে এরশাদ অসুস্থ হয়ে বিদেশ চলে যাচ্ছেন৷ কারও অসুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক না হলেও তিনি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তার এই অসুস্থতা কি শারীরিক না রাজনৈতিক? কারণ, এর আগেও দেখা গেছে নির্বাচন এলেই তিনি অসুস্থ হয়ে যান৷ দশম নির্বাচনে দেশিয় হাসপাতালে গিয়েছিলেন, একাদশে যাচ্ছেন বিদেশে। বিষয়টা ভাববার নয় কি?
কত কি মনোনয়ন রঙ্গ৷ ভিন্ন দল হতে এলেই মনোনয়ন আর যারা দল করে নির্যাতিত ও লাঞ্চিত হয়েছে বহুবার তারা হয় মনোনয়ন বঞ্চিত৷ বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছে কেউ বিএনপি নাম দিয়ে, কেউ ২০ দল নাম দিয়ে আবার কেউ ঐক্যফ্রন্ট৷

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ পর্যন্ত ৮০০ জনকে মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে বিএনপি। মনোনয়নের চিঠিপ্রাপ্তদের মধ্যে ২০০১ ও ২০০৮ সালের পুরনো প্রার্থীদের অধিকাংশই রয়েছেন। রাজশাহী অঞ্চলের বেশ কয়েজন চিহ্নিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলো বিএনপি যাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।
নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) শুরা কমিটির প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যে কজনের নাম বলেছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্যে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত নাটোর-২ আসনে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নওগাঁ-১ সালেক চৌধুরী, নওগাঁ-৬ আলমগীর কবির, রাজশাহী-১ আমিনুল হক, রাজশাহী-২ মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী-৫ নাদিম মোস্তফা।
২০০৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে রাজশাহী অঞ্চলের বাগমারা, রানীনগর ও আত্রাই উপজেলায় বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জঙ্গিরা ‘সর্বহারা’ দমনের নামে হত্যা-নির্যাতনসহ অরাজকতা কায়েম করে। বিএনপি আমলেই ২০০৬ সালের মার্চে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাংলা ভাই টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে যে জবানবন্দি দেন, তাতে আমিনুল হক, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও নাদিম মোস্তফার সহযোগিতা পাওয়ার কথা বলেছিলেন৷
এসব ব্যক্তি জঙ্গীদেরকে বিভিন্ন সময় অর্থ দিয়েও সহায়তা করেছে৷ আজ তাদের মার্কাও ধানের শীষ৷ সেসময়ে জঙ্গীবাদ বিরোধী ছিল যারা তাদের অনেকেরও এবার মার্কা ধানের শীষ৷ ড.কামাল হোসেন, মোস্তফা মহসিন মিন্টু, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মুনসুর, কাদের সিদ্দিকী ধানের শীষের পক্ষ নিয়ে কোন রাজনীতিকে স্বাগত জানাতে চলছেন? সুলতান মোহাম্মদ মুনসুর তার নির্বাচনী জনসভায় এখন জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু না বলে বলছেন জয় বাংলা, জয় ধানের শীষ৷ এসব কিসের ইঙ্গিত?
মনোনয়ন নিয়ে চলছে কান্না, সংঘাত, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও নাটকীয় মনোনয়ন বদল৷ মনোনয়ন বঞ্চিত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের কান্না সকল পত্রিকার হেডলাইন হয়েছে৷ নেত্রকোনার কলমাকান্দা দূর্গাপুরে বর্তমানে এমপি ছিলেন ছবি বিশ্বাস৷ মনোনয়ন পেলেন না তিনি ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্থানীয় নেতারা৷ এখানে ২৬ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিল৷ সবাইকে টপকে মনোনয়ন পেয়ে গেলেন ছবি বিশ্বাসের ভগ্নিপতি মানু মজুমদার৷ তিনি কলমাকান্দা দূর্গাপুরের বাসিন্দা নন৷ তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইলে৷ তিনি আবার নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি৷ নেত্রকোনা জেলার অনেক নেতা এ পদটির প্রত্যাশিত হয়েও পেলেন না আর তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার লোক হয়ে হয়ে গেলেন নেত্রকোনা জেলার সহসভাপতি৷ একেই বুঝি বলা হয়, আল্লাহ যারে দেয় সব দিকেই দেয়। বিষয়টা তাই নয় কি?
মনোনয়ন দেয়া হবে তৃণমূল ও জনমতের আলোকে এসব বলা কি কেবলই বলার জন্যই বলা ছিল নাকি? মানু মজুমদার পেয়ে গেলেন এমপি মনোনয়ন৷ এ নিয়ে তৃণমূলে শুরু হল বিদ্রোহ৷ কেন এই বিদ্রোহের পরিস্থিতি সৃষ্টি? বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে নেত্রকোনা-৪ এ৷ বারবার মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা শফি আহমদকে মনোনয়ন প্রদানের দাবিতে বিক্ষোভ করছে তারা৷

সম্প্রতি প্রথমে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে পরবর্তীতে তৃণমূল বিক্ষোভে মনোনয়ন পেলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা সাজেদা চৌধুরী৷ ঢাকা-১৭ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থীও পরিবর্তন করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদেরকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এর আগে এই আসন থেকে চিত্রনায়ক ফারুককে (আকবর হোসেন খান পাঠান) আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। মনোনয়ন নিয়ে চলছে দল বদল, সংঘাত, বিক্ষোভ৷
মনোনয়নের চিঠি দেয়ার আগে যাচাই বাছাই প্রক্রিয়াটাকে কেন সঠিক ভাবে করা হলো না৷ সঠিক ভাবে হলে তবে আবার বদল হচ্ছে কেন? জরিপটা কারা করল ও কিভাবে করলো? নেতৃত্ব বদলের নতুন ধারা চালু হল স্বামীর বদলে স্ত্রী, পুত্রের বদলে পিতা,শশুরের বদলে জামাই, সম্বন্ধীর বদলে বোনের জামাই প্রভৃতি৷ এসব পরিবর্তনের কী ভবিষ্যত বাংলাদেশে?
আরও চমকপ্রদ বিষয় হল বিএনপির নেতা হয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতা আর আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে যাচ্ছে বিএনপির নেতা৷ এখানে আদর্শিকতার কিছুই নেই৷ আওয়ামী লীগ নেতা জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু না বলে বলছে, জয় বাংলা, জয় ধানের শীষ৷ আবার বিএনপি হতে আসা আওয়ামী লীগ নেতা বক্তৃতার জোসে বলছে, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ৷ এর মাঝে শুরু হল আবার সহিংসতা, খুন এসবের পরিণতি কি? কোন পথে ছুটছে বাংলাদেশের রাজনীতি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







